গণজাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রামঃ ডায়রির পাতা থেকে-২

“তোরা ইয়্যুন গরি কি গরিত পারিবিদে? কতিক্কিন মানুস আছে দেখির তো। চাই ল.. সাত দিনর বেশী থাইলে আঁরে কইস। ব্যাকগুন লিপিস্টিক পার্টির পোয়া এডে। সাত দিন ফালাইবু, সাত দিন পর চাইবি দে ব্যাকগুন ফুডুস।“



৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

রাতে ঘুমাতে গিয়েছিলাম শাহবাগের আন্দোলনের উত্তেজনা নিয়ে, চট্টগ্রামের প্রতিবাদ এভাবে কেবল মানববন্ধন-মিছিল দিয়ে শেষ করার হতাশা নিয়ে, আর ৬ তারিখ নতুন করে শুরু করার প্রত্যয় নিয়ে। ৫ তারিখ রাতে ফেসবুকের হোমপেজ বারবার রিফ্রেশ করছিলাম শুধুমাত্র শাহবাগ নিয়ে কোন খবর আসে নাকি দেখার জন্য। এক লাইনের কোন স্ট্যাটাস পেলেও সেটা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে দেখছিলাম। আর ভেতরে ভেতরে খুব উত্তেজিত হচ্ছিলাম। আমাদের চট্টগ্রাম অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরামের সুমিত দা ৫ তারিখ আমাদের সাথে ছিলেন না। পরে ফোন করলে উনি ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলেন, “তোরা মিছিল মিটিং কর। মিছিল মিটিং করে ফাঁসি দে।” তখন আমার কিছুই বলার ছিল না। প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলাম ৫ তারিখ কিছু একটা করে দেখাবো বলে। এভাবে মিছিল করে শেষ করার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। যাই হোক, শাহবাগ প্রজন্ম চত্তরের তরুণদের দেখে আমি সিওএএফ-এর বাকিদের (নির্ঝরদা, সমীরদা) অনেক্ষন খোঁচাই। তারা আমাকে শেষ পর্যন্ত আশ্বস্ত করেন যে, সমাবেশ হবে এবং ঢাকার মত অবস্থান করবো। আমার প্রস্তাব ছিল জিইসি দখল করা। সেটা অবশ্য প্রচণ্ড আবেগ থেকে বলেছিলাম। কিন্তু এর মধ্যে দুইটি ইভেন্ট ক্রিয়েট করা হয়। একটা শহীদ মিনারে সমাবেশ ও শেষে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল (৪টা থেকে শুরু হবার কথা ছিল), আরেকটা প্রেস ক্লাবে সমাবেশের(৩টা থেকে শুরু হবার কথা ছিল)। (শহীদ মিনারে ইভেন্টের লিংকটি পাইনি, তাই দিতে পারছি না) এটা নিয়েও আমাদের মধ্যে বেশ বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। শেষে সিদ্ধান্ত হয়, প্রেস ক্লাবের সমাবেশ গিয়ে শহীদ মিনারে মিলিত হবে। কারণ প্রথমে আমাদের পরিকল্পনা ছিল সমাবেশ শহীদ মিনারে করার।

সকালে আটটায় ঘুম থেকে উঠি। উঠেই একাত্তর টিভির সামনে বসে পড়ি। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ থেকে লাইভ দেখাচ্ছিল। বাবাকে ডেকে এনে দেখাই। বাবা আমাকে বলেন,

“তোরা ইয়্যুন গরি কি গরিত পারিবিদে? কতিক্কিন মানুস আছে দেখির তো। চাই ল.. সাত দিনর বেশী থাইলে আরে কইস। ব্যাকগুন লিপিস্টিক পার্টির পোয়া এডে। সাত দিন ফালাইবু, সাত দিন পর চাইবি দে ব্যাকগুন ফুডুস।“

(তোমরা এসব করে কি করতে পারবে? কতগুলো মানুষ আছে দেখছি তো। দেখো.. সাতদিনের বেশী থাকলে আমাকে বলো। সব বাম [লেফটিস্ট>লিপিস্টিক>বাম] দলের ছেলেরা ওখানে। সাত দিন লাফাবে, সাত দিন পর দেখবে সবাই হাওয়া।“
তখন বাবাকে কিছু বলতে পারিনি। শুধু বসে ছিলাম তিনটা বাজার অপেক্ষায়। আর একটা জবাব দেবার অপেক্ষায়, “আমরা তরুণরা পিছু হটি না। এখানে কেউ রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আসেনি। সবাই এসেছে প্রাণের দাবিতে। আপনারা ভেতো বাঙ্গালি হতে পারেন। আমরা না। আমরা তরুণ প্রজন্ম আপনাদের মত ভুলোমনা না। আমার মত অনেকের ফ্যামিলি থেকে এমন বলছে হয়তো। রাস্তার মানুষ হয়তো তাকিয়ে হাসছে। তাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার সময় হয়েছে তারা যা ফেলে রেখেছে, আমরা সেটা উদ্ধার করে আনতে জানি। আমরা দেখিয়ে দেবো আমরা ভুলে যাইনি। আজ সেই সময় এসেছে, এই হতাশাবাদীদের কাঁচকলা দেখানোর।“ আমরা এক হতে জানি। আমার বন্ধুরা সবাই জিজ্ঞেস করছিল কোথায় যাবে। আমি তাদেরকে বিকাল ৩টায় প্রেসক্লাবে যেতে বলি। তিনটা বাজতেই নির্ঝরদার ফোন। সমাবেশ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি থ্রী কোয়ার্টার পরে চলে আসি সমাবেশে। গিয়ে দেখি মাঝখানে গোল করে বসে উদীচির শিল্পীরা গান করছে, আর সবাই তাদেরকে ঘিরে বসে আছে, কারো কারো হাতে প্ল্যাকার্ড। সবার মুখে এক দাবি, মনে এক প্রত্যয়, রাজাকারের ফাঁসি। আস্তে আস্তে মানুষ বাড়তে থাকে। সবাইকে দেখে মনের ভেতর এতটা আনন্দ হচ্ছিল বলার মত না। জীবনে এর আগে কখনো কোন সমাবেশে যাইনি। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে ভাবছিলাম, ৭ই মার্চ কি মানুষের মনে এরকম অনুভূতিই হয়েছিল? আমাদের পাড়া থেকে সব পরিচিত ভাইয়ারা, বন্ধুরা গিয়েছিল। যাকে কোনদিন টুঁ শব্দ করতে দেখিনি সেও চলে এসেছে প্রেস ক্লাবের সামনে। দেখছিলাম আর শিহরিত হচ্ছিলাম। মানুষ কি পরিমাণ ক্ষোভ বুকের ভেতর পুষে রেখেছিল বুঝতে পারছিলাম। ফেসবুক-ব্লগ থেকে এই আন্দোলন রাস্তায় নেমে এসেছে ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল। আইইউবির সামনে থেকে জামালখান মোড় পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। আমরাও গান ধরি তালে তালে। সুরেলা গলা কিংবা কাককণ্ঠ তখন কোন ব্যাপার ছিল না। সবাই গান ধরেছে বুকের ভেতর থেকে। গানগুলো গলা দিয়ে বের হচ্ছিল না। বের হচ্ছিল চেতনা দিয়ে। একদিকে গান হচ্ছিলো আর আরেকদিকে রাস্তায় আলপনা আঁকছিল কেউ কেউ। লোক সমাগম প্রেসক্লাবে বেশী হওয়ায় শহীদ মিনারের সমাবেশ মশাল মিছিল নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দেয়। ৭টার দিকে নির্ঝরদা, সমীরদা, সৈকতদা, আমি খেতে যাই। খেতে খেতে বলছিলাম সমাবেশের কথা। কি হবে জানিনা এরপর। কতদূর যাবে জানিনা এই আন্দলন.. তারপরো আমাদের মনে তখন ক্ষোভমিশ্রিত আনন্দ।

সন্ধ্যা নামতেই মোমবাতি জালিয়ে, মশাল নিয়ে বসে যায় সবাই। সিওএএফের পক্ষ থেকেই মোমবাতি কিনে দেওয়া হয় সবাইকে। দুলাল ভাই টাকা দেন সেটার জন্য। কিছুক্ষন পর আমাদের সমাবেশে উপস্থিত হন মইনুদ্দীন খান বাদল এমপি। উনি সংহতি জানিয়ে ভাষণ দিয়ে চলে যান। আরো কয়েকজন আসেন সংহতি জানাতে। তাদের নাম মনে নেই। এর পর চলতে থাকে গান আর স্লোগান। কয়েকটা কুশপুত্তলিকাও দাহ হল। রাতে সিনেমা দেখানো হলো। সিনেমা দেখানোর দায়িত্বে ছিলেন অনুপ আঙ্কেল। সেদিন দেখানো হয়েছিল “ওরা এগার জন”। প্রজেক্টর আর ল্যাপটপের দায়িত্তে ছিলাম আমি। রাতের ১০টার দিকে শুরু হয়ে সাড়ে এগারটায়ও যখন শেষ হলো না, তখন হাসান ফেরদৌস আঙ্কেল জিজ্ঞেস করেন আর কতক্ষণ বাকি। উনি তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্যে চাপ দিতে থাকেন। ততক্ষনে মানুষ অনেক কমে এসেছিল। আমি শেষ করিনি। ডিভিডি থেকে দেখানো হচ্ছিল বলে সিনেমা আটকে যায় এক পর্যায়ে। তখন তারা সিনেমা শেষের ঘোষণা দিয়ে পরের দিন তিনটা থেকে সমাবেশ করার ঘোষণা দেন। আমরা কয়েকজন সারারাত থাকার কথা বললে তারা যুক্তি দেখান সামনে খাস্তগীর স্কুলে পরদিন এসএসসি পরীক্ষার সেন্টার। আমরা সেদিন মেনে নিয়ে চলে যাই। যদিও সুমিত দা শহীদ মিনারে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন, উনারা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মেনে নেননি সেটা।
সেদিনকার মত ঘরে ফিরে আসি ১২টায়। ঘরে ফিরে বাঁধন ভাইকে কল দিই। উনি তখনো শাহবাগে।

(চলবে)

১১ thoughts on “গণজাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রামঃ ডায়রির পাতা থেকে-২

  1. হুম প্রথম দিন যাই নাই, কেননা
    হুম প্রথম দিন যাই নাই, কেননা আমার যুক্তি ছিলো কি হবে এসব করে? লোক দেখানো একদিনের মানববন্ধন,প্রতিবাদ এরপর সব শেষ, কিন্তু যখন আশ্বস্ত হলাম দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বো না তখন না এসে পারি নাই এবং দ্বিতীয় দিনেই এসেছি।

    এখানে উল্লেখ্য যে দ্বিতীয় দিনে দুলাল ভাই নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়েছিলেন মোম কেনার জন্য। প্রায় ২৫-২৭ প্যাকেট মোম এনেছিলাম যার থেকে ৫/৬ প্যাকেট মেডিকেল কলেজকে আর বাকীগুলো মূল চত্বরেই রাখা হয়েছিলো।

  2. লেখা থামাবেন না। পুরা ঘটনা
    লেখা থামাবেন না। পুরা ঘটনা ইতিহাস আকারে লেখা থাক প্ল্যাটফরমে। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. লাস্ট বাস ঐখাকে কুম্ফু
    লাস্ট বাস ঐখাকে কুম্ফু পাণ্ডার পত ছেলে একটা লাফা লাফি করে যে ঐটা কি আপনি নাকি আপনার বন্ধু??

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *