মুক্তিযুদ্ধ : সিলেট’র অগ্নিঝরা দিনগুলি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে যেমন একক কোন দল, গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির অর্জিত ফসল নয়। তা লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এক সাগর রক্ত, দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত এবং এককোটি মানুষের শরনার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয়ের ফলে জাতি বিজয় অর্জন করেছে। দেশের কৃষক শ্রমিক ছাত্র জনতা হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। গ্রামগঞ্জ, নগর, বন্দরে মানুষ যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত জ্বলে উঠেছিল। জাতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে সংগ্রামী ঐতিহ্যের হাত ধরে সিলেটবাসীও চূড়ান্ত এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সেই বৃটিশ আমল থেকে দেখা যায় আত্মবিকাশের পথে সকল লড়াইয়ের ময়দানে সিলেট অঞ্চল গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় এক সামগ্রীক স্বাধীন মুক্তাঞ্চলের ন্যায় বৃহত্তর সিলেট সব সময় ছিল এক প্রগতীশীল আন্দোলন সংগ্রামী জনপদ। সকল প্রকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় মৌলিক পরিবর্তনে এ জেলা ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে স্বতন্ত্র পটভূমিকায় অগ্রণী ভূমিকা রেখে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধ আসলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক দ্বায়বদ্ধতার শৃঙ্খল মুক্ত মৌলিক পরিবর্তনের জনযুদ্ধ। গ্রামগঞ্জে, শহরে-বন্দরে যে যেভাবে পারে হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করেছে। জনগণের অংশগ্রহণ ছিল এত স্বতঃস্ফূর্ত এবং ব্যাপক, এর সামগ্রিক নিচ্ছিদ্র বিবরণ লিপিবদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব। হাতেগোণা কিছু লোক ছাড়া সবাই মনে-প্রাণে চেয়েছে দেশ শত্রুমুক্ত হোক। প্রতিরোধের এক পর্যায়ে কৃষক, শ্রমিক, কামার-কুমার, জেলে, তাঁতী, ছাত্র-শিক্ষক, নেতা-কর্মী, পুলিশ, ইপিআর, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ও নিয়মিত সেনা সদস্যরা দলে দলে ভারতে ছুটে যান। গড়ে উঠে সংগঠিত প্রতিরোধ। ভারতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। জাতির এই ক্রান্তিকালে সিলেটের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সামরিক বেসামরিক, সাংবাদিক, লেখকরা আকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাত থেকেই সিলেটে শুরু হয় প্রতিরোধ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় পর্যন্ত যুদ্ধের মাঠে, যুদ্ধ পরিচালনায়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনে দেশে-বিদেশে সিলেটবাসী স্থাপন করেছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তির জন্য ছিল উন্মুখ। প্রতিটি অঞ্চলের নর-নারী, আবাল-বৃদ্ধের আত্মত্যাগ ও অবদানে তাই সফল হয় মুক্তিযুদ্ধ। সিলেটের বেলায় রয়েছে কিছু ব্যতিক্রমী বিষয় সশস্ত্র বাহিনীর অভিজ্ঞ প্রবীণ ও উদ্যমী নবীন সদস্যরা দেশমাতৃকার মুক্তির লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়েন। প্রবাসী সিলেটীরা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে জনমত গঠন এবং অর্থ সংগ্রহ করে বিজয়কে ত্বরান্বিত করে তোলেন।
সিলেটে মুখোমুখি প্রতিরোধ মূলত শুরু হয় ২৫ মার্চ রাতে। পরিকল্পিত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় আরো পরে। এর আগের কয়েকটি ঘটনা সিলেটকে প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল। ১লা মার্চ ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। সিলেটে ও সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল। ৩রা মার্চ ছিল হরতাল। তখন সিলেট শহরের নয়া সড়ক খাজাঞ্চি বাড়িতে ছিল ইপিআর সেক্টর সদর দফতর। এখান থেকে জনতার একটি মিছিলে গুলি করা হয়। শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে গুলিতে একজন নিহত রয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে বসে। সন্ধ্যা ৭টায় ১২ ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন ১৪৪ধারা জারি করা হয়। মানুষ তা অমান্য করে নেমে আসে রাজপথে। ঐদিন গ্রেফতার হন ৩৩ জন। ৭ মার্চ রাতে সরকারী নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান সিলেট কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১০ মার্চ বিকেলে মহিলা পরিষদ মিছিল বের করে। ১৯ মার্চ সিলেট রেজিস্টারী মাঠে কলমতুলি কণ্ঠ সংগ্রাম পরিষদ দুর্জয় বাংলা নামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ২৩মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ঐদিন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী ও এমএন এ দেওয়ান ফরিদ গাজীর শেখঘাটস্থ বাসায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে। পরে ডিসি অফিসে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন শোয়েব আহমদ চৌধুরীসহ বেশ ক’জন তরুণ।
এভাবে এগিয়ে আসে কালো রাত ২৫ মার্চ। ঐদিন বিকেলে বিশাল লাঠি মিছিল শেষে রেজিস্টারী ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় জনসভা। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে আশংকা-রাতে ক্র্যাক ডাউন হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সুরমা মার্কেটস্থ আওয়ামী লীগ অফিসে বসে জরুরী সভা। বৈঠকে ইসমত আহমদ চৌধুরী, সিরাজ উদ্দিন আহমদ, শাহ মোদাব্বির আলী, আব্দুল মুনিম, ডাঃ নূরুল হোসেন চঞ্চল, আখতার আহমদ, লুৎফুর রহমান এমপি, এ, নূরুল ইসলাম, এনামুল হক চৌধুরী, সদর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, শোয়েব আহমদ চৌধুরী, রফিকুল হক, রইস আলী, তরিকুলস্নাহ, এনামুল হক, মকসুদ ইবনে আজিজ লামা, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখকে ক্র্যাক ডাউন হলে পাকিস্তানী বাহিনীর মোকাবেলায় দায়িত্ব দেয়া হয়। দেওয়ান ফরিদ গাজী দায়িত্ব ও এলাকা বন্টন করে দেন।
মার্চ মাসের শুরুতেই অবশ্য এ.এইচ সা’দত খানকে আহ্বায়ক ও অন্যান্যদের সদস্য করে বৃহত্তর সিলেট জেলা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। সদস্য ছিলেন, ডাঃ এমএ মালিক এমপিএ, ডাঃ নূরুল হোসেন চঞ্চল, সিরাজ উদ্দিন আহমদ, শাহ মোদাব্বির আলী, আব্দুল মুনিম, মুহিবুর রহমান চৌধুরী, ইসহাক মিয়া, জমির উদ্দিন আহমদ। প্রস্তুতি লগ্নে সামনের কাতারে ছিলেন ন্যাপ নেতা পীর হাবিবুর রহমান, আব্দুল হামিদ, ইকবাল আহমদ চৌধুরী, গুলজার আহমদ, আরশ আলী, কামরুজ্জামান, সরদার আব্দুল লতিফ, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপিএ, আব্দুস সামাদ আজাদ, চিত্তরঞ্জন দত্ত, বরুণ রায়, চৌধুরী আব্দুল হাই, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আলী ছদ্দর খান রাজা, এনামুল হক মোস্তফা শহিদ, লতিফুর রহমান চৌধুরী, কৃপেন্দ্র বর্মণ, ইয়াকুব চৌধুরী, আফছর আহমদ, মোস্তফা আলী, সামসুল হুদা, গোপাল কৃষ্ণ মহারত্ন, শ্যামা প্রসন্ন দাশ গুপ্ত, ইছমত আহমদ চৌধুরী, আব্দুস সোবহান, হারুনুর রশদি চৌধুরী, মাহবুব রব সাদী, জুনাব আলী, ডাঃ সামসুল হোসেন, ডাঃ মুতাকাব্বির চৌধুরী, দেওয়ান আলী রাজা, সৈয়দ ফজলুল হক, সৈয়দ আফরোজ বঙ্, এনামুল হক চৌধুরী, আকদ্দস সিরাজুল ইসলাম, শাহ আজিজুর রহমান, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, নীহার চৌধুরী, ব্যারিস্টার আব্দুল মুন্তাকিম চৌধুরী, লুৎফুর রহমান, আজিজুর রহমান, এড. তবারক হোসেন, সৈয়দ আব্দুল হান্নান, মোঃ শাহজাহান মিয়া, শহীদ কুতুব মিয়া, শহীদ কাদির মিয়া, সুনাওর আলী, মওলুল হোসেন, হাজী রমিজ উল্লাহ, নজীর আহমদ প্রমুখ।
হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার মহকুমা পর্যায়েও অনুরূপ প্রস্তুতি নেয়া হয়। এই প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক তৎপরতার মুখেই ২৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে সিলেট শহরে পাকবাহিনী তাদের অপারেশন শুরু করে। অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়। ব্যারিকেড দিয়ে এবং সম্ভাব্য পন্থায় প্রতিরোধে নামে জনতা। ইপিআর বাহিনীর সেনা ও অফিসাররা দল ছুট হয়ে যোগ দেন জনতার সঙ্গে। এই প্রতিরোধে বেশ ক’জন শহীদ হন। ২৫ মার্চ থেকে ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত ছিল অবিরাম কারফিউ। এর মধ্যে ছিল প্রতিরোধ। এ দিকে অন্যান্য স্থানেও প্রতিরোধ থাকায় পাকবাহিনীর রসদ ও সরবরাহ কমে আসে। প্রতিরোধের মুখে পাকবাহিনী পিছু হটে সালুটিকর বিমান ঘাঁটিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এই ফাঁকে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। পরে পাকবাহিনী আবার গোলাবারুদসহ শহরের দিকে অগ্রসর হয়। মুক্তিযুদ্ধের সৈনিকেরা পাড়ি জমান ভারতের দিকে। খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধের চেষ্টা ছিল। তবু এপ্রিলের শেষ দিকে সমগ্র জেলা পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ভারতে আশ্রয় নেয় ছাত্র জনতা। ইপিআর, পুলিশ, বেঙ্গল রেজিমেন্ট, আনসার মুজাহিদ নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী।
সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা সিলেট অঞ্চলেই হয়েছিল। তবে তা সিলেট জেলার চারটি মহকুমা নিয়ে যথাক্রমেঃ- সিলেট সদর, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ মিলে সিলেট জেলা ছিল (বর্তমানে সিলেট বিভাগ)। হবিগঞ্জ জেলার তেলিয়াপাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পাহাড়, টিলা, চা বাগান, পশ্চিম পাশে হবিগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল লাইন এবং সড়ক, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত বেষ্টিত স্থানটি সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী অফিসারদের কাছে নিরাপদ মনে হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তারা যোগাযোগ করে এই তেলিয়াপাড়ায় এক সম্মেলনের আয়োজন করেন। সে অনুযায়ী ৪ এপ্রিল ১৯৭১ সকালে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ডাকবাংলায় সেনা অফিসাররা সমাবেশে মিলিত হন। বাঙালি বিদ্রোহী ও অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের মধ্যে এতে উপস্থিত ছিলেন কর্ণেল (অবঃ) আতাউল গণি ওসমানী, কর্ণেল এস.এম. রেজা, লেঃ কঃ (অবঃ) আব্দুর রব, মেজর (অবঃ) কাজী নূরুজ্জামান, মেজর কে,এম, শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর নূরুল ইসলাম, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী, ক্যাপ্টেন আব্দুল মতিনসহ কিছুসংখ্যক অফিসার। মেজর জিয়াউর রহমান রামগড় থেকে এসে এ সামবেশে যোগ দেন। বিএসএফ-এর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার পাণ্ডে এ সমাবেশের আগে সম্ভাব্য সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এই বৈঠক ছিল প্রথম সাংগঠনিক ভিত্তিভূমি। এতে এম.এন.এ. কর্ণেল (অব) আতাউল গণি ওসমানীকে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর ১০ এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করে প্রবাসী সরকার।
মৌলভীবাজার মহকুমায় আওয়ামীলীগ নেতা মোঃ ইলিয়াছ আহমদ এম.পি, আজিজুর রহমান, ন্যাপ ফনিন্দ্র কুমার ভট্টার্চায, ফরিদ আহমদ চৌধুরী, আওয়ামীলীগ ডাঃ আব্দুল আলী, ইসমাইল হোসেন, কমলেশ ভট্টাচার্য, ডাঃ রমা রঞ্জন দেব, ন্যাপ ডাঃ গিরিন্দ্র চক্রবর্তী, আওয়ামীলীগ সৈয়দ আমজাদ আলী,তোয়াবুর রহিম, মির্জা আজিজ আহমদ বেগ, তৈমুছ আলী, সিরাজুল ইসলাম, আব্দুল মালেক, রহিম বঙ্, সোলেমান আহমদ চৌধুরী, রবি চক্রবর্তী, ন্যাপ মাখন লাল দাশ, আব্দুল জব্বার, আলতাফুর রহমান চৌধুরী, ন্যাপ নেতা সৈয়দ মতিউর রহমান, তারা মিয়া, মায়া মিয়া, গজনফর আলী চৌধুরী, শফকতুল ওয়াহেদ, রাধিকা মোহন গোস্বামী, গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, রাসেন্দ্র দত্ত, সৈয়দ আলী আকতার, মোঃ আব্দুল জলিল, ডাঃ আবুল কালাম আজাদ, সিরাজুল হক, আব্দুল ওয়াদুদ, সাংবাদিক এম এ সালাম, নুরুল ইসলাম মুকিত, সৈয়দ মুজিবুর রহমান, আনসার ক্যাপ্টেন আব্দুল মুসাব্বির, ক্ষিরোদ দেব চৌধুরী, ন্যাপ সৈয়দ মুয়িজুর রহমান, খেলু ভৌমিক, রাধাকান্তা তাঁতী, গোলাম মুহিত খান, সুনির্মল কুমার দেব, আওয়ামী ছাত্র এন আই আজিজুল হক, ন্যাপ গৌরাপদ দেব কানু, অদৈত সেন, মমতাজ আরা চৌধুরী, শামসুন নাহার বেলা, নাসির উদ্দিন চৌধুরী, ন্যাপ আলাউর রহমান চৌধুরী, মুজিবুর রহমান মুজিব, সৈয়দ মহসিন আলী, ছাত্র ইউনিয়ন সৈয়দ আবু জাফর আহমদ, সলিল শেখর দত্ত, রণবীর রায় মঞ্জু, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম, এস এ মুজিব, এম এ মান্নান, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শ্রীনিবাস ভট্টাচার্য বলাই, বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন নেতা পরিতোষ চক্রবর্তী ও আব্দুল মুকিত খানকে সদস্য করে মৌলভীবাজারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত সংগ্রাম কমিটি গঠনের মাধ্যমে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
২৫মার্চ রাতে ১৪৪ধারা জারি করে পাক হায়নারা সেদিন আজিজুর রহমান, প্রেমা ঘোষ, মতিউর রহমার চৌধুরী ও অদৈত সেন অধিকারীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরদিন ২৬শে মার্চ শহরের চারদিক থেকে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ মিছিল মৌলভীবাজার শহরে প্রবেশের চেষ্টা করলে চাঁদনীঘাট পুলের উপর অবস্থানরত পাক সেনারা কৃষক লন্দু মিয়াকে হত্যা করে। ২৭মার্চ ও ২৮ মার্চ সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ফরেস্ট অফিস কার্যালয়ের সামনে থেকে পাক সেনারা মিছিলের উপর গুলি চালিয়ে ন্যাপ নেতা গৌরাপদ দেব কানু ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শ্রীনিবাস ভট্টাচার্য বলাই কে ধরে নিয়ে জিপের পিছনে রশি দিয়ে বেঁধে শহর প্রদক্ষিণ করে গুলি করে হত্যা করে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ন্যাপ নেতা গৌরাপদ দেব কানু প্রথম শহীদ, শ্রীনিবাস ভট্টাচার্য বলাই দ্বিতীয় শহীদ। শেরপুরের সুনীল ভৌমিক তৃতীয়, আনিছ মিয়া চতুর্থ, জুড়ির ন্যাপ নেতা হরিচন্দ্র দাশ ও তাঁর ভাই পঞ্চম শহীদ। এছাড়াও পাকিস্তান হানাদার বাহিনী মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলাধীন শমসেরনগর দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম বিমান বন্দর এলাকায় কর্তব্যরত ইপিআর বাঙালী মুক্তিযুদ্ধা জোয়ানরা কে ফোর্সের অধিনায়ক খালেদ মোশারফের ভয়াবহ যুদ্ধ হয় ২৭শে মার্চ। সেসময ইপিআর বাহিনীর সহায়তায় স্থানীয় শমসেরনগর বাজারে এক দু’তলা ভবনের ছাদে এমবুশ স্থাপন করে ব্যারিকেড সৃষ্টি করলে সেখানে হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলের নের্তৃত্বে ৯ সদস্যের পাকবাহিনী দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, এবং তাঁরা ঐ যুদ্ধে নিহত হয়। সেখানে শমসেরনগরের বিশিষ্ট বাঙালী জাদুকর সিরাজুল ইসলাম নির্মমভাবে শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে শমসেরনগরের মুক্তিকামী জনগণ যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। মূলত ২৮শে মার্চ একাত্তরে শমসের নগরে হানাদারবাহিনীকে মুক্তিযুদ্ধারা আক্রমন করে পরাজিত করার ঘটনায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায়।
মৌলভীবাজার পর্যটন রেস্ট হাউজে অবস্থান গ্রহণ করে মেজর সি আর দত্ত, কর্ণেল রব, মেজর নুরুজ্জামানের নের্তৃত্বে মুক্তিযুদ্ধারা সিলেটের পথে রওয়ানা হলে শেরপুরে চারদিন তুমুল মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে ন্যাপ নেতা বিজয় ভৌমিকের বড়ভাই লন্ডন প্রবাসী সুনীল ভৌমিক শহীদ হন। পাক বাহীনি সে যুদ্ধে শেরপুরে টিকতে না পেরে সিলেট অভিমুখে পশ্চাতগমণ করে সাদিপুরে অবস্থান নেয়। মেজর শফিউল্লার নের্তৃত্বে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট সাদিপুরে এসে মুক্তিযুদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়ে শক্তি বৃদ্ধি করলে পাক বাহিনীরা গোয়ালাবাজার, তাজপুর, রশিদপুর,তেলিহাওয়র, খাদিমনগর হয়ে সিলেট বিমান বন্দরে অবস্থান নেয়। সেখানেও মুক্তিবাহিণীরা তাদেরকে পাঁচদিন অবরোধ করে রাখে। পাক বাহিনীরা বিমানযোগে অবিরাম শেলিং স্টাকিং এর মুখে মুক্তিযুদ্ধারা টিকতে না পেরে পিছু হটতে থাকে। এ সময় র্দুধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আজিজ মারাত্মকভাবে আহত হন। হানাদাররা সিলেট দখল করে জল, স্থল ও অন্তরীণে আক্রমণ করতে থাকলে মুক্তিবাহিনীরা ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এসময় চলতে থাকে খুন, হত্যা, নারী ধর্ষণ, লোটপাট, অগ্নিসংযোগের মত অমানবিক কার্যকলাপ। এক পর্যায়ে এপ্রিল ও মে মাসে শ্রীমঙ্গলের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা নীহারেন্দু হোম চৌধুরী সজল মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিযুদ্ধাদের সহায়তা করার কারণে পাকবাহিনী ও তাদের দোসর দ্বারা তাঁর রুপসপুরস্থ মামার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ওপর দিকে শ্রীমঙ্গল, ভাড়াউড়া নিবাসী বিশিষ্ট জমিদার হোম পরিবারের ৯ সদস্যকে সাধুবাবার গাছতলা ও সুনগইর বালুচরে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁরা যথাক্রমে : সত্যেন্দ্র কুমার হোম চৌধুরী, ত্রিনয়ণী হোম চৌধুরী, দেবেন্দ্র কিশোর হোম চৌধুরী, যতিন্দ্র কুমার হোম চৌধুরী, সীতানাথ হোম চৌধুরী, নলিনী কান্ত হোম চৌধুরী, নরেন্দ্র চন্দ্র হোম চৌধুরী, ইন্দ্র কুমার হোম চৌধুরী ও জোসনা দত্ত জোৎস্না চৌধুরী। তাঁরা সকলেই ছাত্র ইউনিয়ন নেতা নীহারেন্দু হোম চৌধুরী সজলের জেঠা, জেঠিমা ও জেঠাত বোন পাক বাহিনীর হাতে নির্মম ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হন।
সিলেট জেলার পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বে প্রায় ১০০ মাইল পাহাড়ী সীমান্ত নিয়ে গঠিত হয় চার নম্বর সেক্টর। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত। তিনি ছয়টি সাব-সেক্টরে এলাকাকে ভাগ করে নেন। এসব সাব-সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন মাহবুবুর রব সাদী, ক্যাপ্টেন আব্দুর রব, লেঃ নিরঞ্জন ভট্টাচার্য, লেঃ জহির, ফ্লাইট লেঃ কাদের, লেঃ ওয়াকিউজ্জামান ও ক্যাপ্টেন এনাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিলেট এলাকার জন্য আরেকটি সেক্টর গঠন করতে হয়- পাঁচ নম্বর সেক্টর। সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এ ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। উল্লেখ্য অন্য কোনো একক জেলায় দু’টি সেক্টর গঠন করা হয়নি। এই পাঁচ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। তিনিও ছয়টি সাব-সেক্টরে এলাকা ভাগ করেন এতে নেতৃত্ব দেন সুবেদার নজির হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা ফারুক, সুবেদার মেজর বিআর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন হেলাল, লেঃ মহিবুর রহমান, লেঃ আব্দুর রউফ, লেঃ তাহের উদ্দিন আখনজী, লেঃ এসএ খালেদ, সুবেদার গণি, ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন, এফএফ এনামুল হক চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন মুসলিম উদ্দিন।
সিলেটে হানাদার বাহিনীর পক্ষেও কিছু লোক ছিলেন। প্রথম দিকে এরা ছিলেন অসংগঠিত। কার্যত ৭০-এর নির্বাচনের পর অন্য কোনো রাজনৈতিক দলেরই কার্যক্রম ও প্রভাব ছিল না। সমগ্র জেলা পাক সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর রাজাকার সংগ্রহ ও সংগঠিত হয়। এরা সেতু ও স্থাপনা পাহারা দিত। হানাদার বাহিনীর দোসর এই রাজাকারদের নানা রকম অত্যাচার ছিল। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠির ক্ষোভ ও প্রতিরোধে এরা শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে নেতৃত্বে সিলেটের উজ্জ্বল উপস্থিতি গৌরবজনক। সর্বাধিনায়ক জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী (তখন অবঃ কর্ণেল) চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুল বর, সহকারী চীফ অব স্টাফ কর্ণেল এ, আর চৌধুরী, মেজর জেনারেল সি আর দত্ত সেক্টর কমান্ডার, মেজর আবুল ফাত্তাহ চৌধুরী, চীফ অব স্টাফের দফতরে স্টাফ অফিসার-সবাই সিলেটের সন্তান।
এছাড়াও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদমর্যাদার অফিসারদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন- মেজর জেনারেল মঈনুর হোসেন চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার আব্দুল আজিজ, কর্ণেল এজাজ চৌধুরী, কর্ণেল এম এম কে জেড জালালাবাদী, কর্ণেল তাহের উদ্দিন আখনজী, মেজর মোত্তালিব (অবঃ), মেজর জেনারেল হারুন আহমদ চৌধুরী, মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, ব্রিগেডিয়ার আব্দুল মতিন, মেজর আলী ওয়াকিউজ্জামান, কর্ণেল চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, এমবি নূর চৌধুরী প্রমুখ। [উল্ল্নেখ্য সেনা কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত] এছাড়া অনেক সিপাহী, পুলিশ ও ইপিআর সদস্যও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
বেসামরিক দায়িত্ব পালনেও সিলেটের কৃষি সন্তানেরা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসী সরকারের আইন সচিব ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ আব্দুল হান্নান চৌধুরী। বৃহত্তর সিলেটের সকল এমএনএ এবং এমপিএ যুদ্ধকালে সাংগঠনিক, রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। দেওয়ান ফরিদ গাজী ছিলেন মুজিবনগর প্রশাসনের ‘নর্থ ইষ্ট’ জোনের চেয়ারম্যান। তিনি ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টর অধিনায়কের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং বৃহত্তর সিলেট ও কিশোরগঞ্জের মুক্তাঞ্চলের প্রশাসকেরও দায়িত্ব পালন করেন। জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আব্দুস সামাদ আজাদ ও ন্যাপ নেতা দেওয়ান মাহবুব আলী বাংলাদেশের পক্ষে ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসেবে বুদাপেষ্ট শান্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশসহ বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ে নিরলস কাজ করেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক প্রতিনিধির দায়িত্ব কৃতিত্বের সাথে সম্পাদন করেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বৃহত্তর সিলেটের এমএনএ এবং এমপিএ-গণ সবাই মুক্তিযুদ্ধে শরীক হন।
১৯৭০ এর নির্বাচনে বৃহত্তর সিলেটের এমএনএ গণ: ১। দেওয়ান ফরিদ গাজী ২। জেনারেল মহম্মদ আতাউল গনি ওসমানী ৩। দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী ৪। আবদুল হক ৫। আবদুর রহিম ৬। আবদুস সামাদ আজাদ ৭। আবদুল মনতাকিম চৌধুরী ৮। মোঃ ইলিয়াছ ৯। মেজর জেনারেল আব্দুর রব ১০। মানিক চৌধুরী ও ১১। মোস্তফা আলী।
এমপিএগণ: ১। ডাঃ আবদুল মালিক ২। আবদুল রইছ ৩। আবদুজ জহুর ৪। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (ন্যাপ) ৫। সমসু মিয়া চৌধুরী। ৬। আবদুল হেকিম চৌধুরী ৭। লুৎফর রহমান এডভোকেট ৮। মসউদ চৌধুরী ৯। হবিবুর রহমান ১০। আবদুল লতিফ ১১। কাজী সিরাজ উদ্দিন ১২। আলতাফুর রহমান চৌধুরী ১৩। নবাব আলী ছবদ্দর খান ১৪। আজিজুর রহমান ১৫। তোয়াবুর রহিম ১৬। তৈমুছ আলী ১৭। আবদুল আজিজ চৌধুরী ১৮। এনামুল হক মোস্তফা শহীদ ১৯। গোপালকৃষ্ণ মহারত্ন ও ২০। মৌলানা আসাদ আলী ২১। ডাঃ আবুল হাশিম।
দেশে অবস্থান করেও সিলেটের বিশিষ্ট অনেক ব্যক্তি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবগেঅর মধ্যে এএইচ সা’দত খান, আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম, বরুন রায়, ইকবাল চৌধুরী, গুলজার আহমদ, এনাম আহমদ, চৌধুরী জয়নাল আবেদীন, জাকির খান চৌধুরী, ইসমত চৌধুরী, শাহ মুদাব্বির আলী, পীর হবিবুর রহমান, যুব ও ছাত্র নেতাদের মধ্যে আখতার আহমদ, ডাঃ দেওয়ান নূরুল হোসেন, চঞ্চল, বাবরুল হোসেন বাবুল, শাহ আজিজুর রহমান, এনামুল হক চৌধুরী, রফিক আহমদ, সদর উদ্দীন, আবদুল মোক্তালির, সুলেমান (শহীদ), আশরাফ আলী, মকসুদ ইবনে আজিজ লামা, শোয়েব আহমদ চৌধুরী, সিরাজউদ্দীন আহমদ, মুজিবুর রহমান মুজিব, মাহবুবুর রব সাদী, নিজাম উদ্দিন লস্কর, এটিএম মাসুদ টিপুসহ আরো অনেকে উজ্জ্বল অবদান রেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য সিলেট অঞ্চলের তেত্রিশজন সরকারী পদক পেয়েছেন। তারা হলেন:
বীর উত্তম: ১। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুর রব, হবিগঞ্জ ২। মেজর জেনারেল চিত্তরঞ্জন দত্ত, হবিগঞ্জ ৩। ক্যাপ্টেন হারুন আহমদ চৌধুরী, বিয়ানী বাজার ৪। ক্যাপ্টেন মুহম্মদ আজিজুর রহমান, গোলাপগঞ্জ ৫। সুবেদার মেজর আফতাব আলী, গোলাপগঞ্জ ৬। শহিদ নায়েক শফিক উদ্দিন চৌধুরী, গোলাপগঞ্জ।
বীর বিক্রমঃ ১। শমসের মুবিন চৌধুরী, গোলাপগঞ্জ ২। মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী, বালগাঞ্জ ৩। ডক্টর তৌফিক এলাহি চৌধুরী, বিয়ানীবাজার ৪। ক্যাপ্টেন বদরুন্নুর চৌধুরী, সিলেট সদর ৫। সুবেদার মেজর ফখরউদ্দিন চৌধুরী, গোলাপগঞ্জ। ৬। শহীদ হাবিলদার জুম্মা মিঞা, গোলাপগঞ্জ ৭। শহীদ মাহমুদ হোসেন, কানাইঘাট ৮। নীলমনি সরকার, সদর সিলেট ৯। ইয়ামীন চৌধুরী, গোলাপগঞ্জ ১০। ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন নেতা জগৎ জ্যোতি দাস, আজমিরীগঞ্জ ১১। শহীদ কনষ্টেবল তৌহিদ, গোলাপগঞ্জ ১২। শহীদ মুজাহেদ সিপাই রমিজ উদ্দিন, শায়েস্তাগঞ্জ।
বীর প্রতীক: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ আবদুল মতিন ২। শহীদ রফিক উদ্দিন, কানাইঘাট ৩। মাহবুবুর রব চৌধুরী সাদী, নবীগঞ্জ ৪। শহীদ নুর উদ্দিন আহমদ, নবীগঞ্জ ৫। মুহম্মদ ইদ্রিস, ছাতক ৬। এনামুল হক চৌধুরী, বালাগঞ্জ ৭। এম আবদুল হালিম, সুনামগঞ্জ ৮। ফখর উদ্দিন চৌধুরী, গোলাপগঞ্জ ৯। মুহম্মদ আবদুল মজিদ, দোয়ারা বাজার ১০। সিরাজুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ ১১। শহীদ নায়েক রাশেদ আলী, ফেঞ্জুগঞ্জ ১২। শহীদ নায়েক আবদুল মালিক, গোলাপগঞ্জ ১৩। এ.কে.এম আতিকুল ইসলাম, বিয়ানীবাজার ১৪। মহম্মদ মইজুল ইসলাম, মৌলভীবাজার, রাজনগর ১৫। মকবুর আলী, সুবেদার, ফেঞ্জুগঞ্জ।

উল্লেখ্য, সিলেট জেলা সদর মহকুমা, সুনামগঞ্জ মহকুমা, হবিগঞ্জ মহকুমা ও মৌলভীবাজার মহকুমা মিলে সর্বমোট ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, মুক্তিযুদ্ধা শহীদ হন ৩৪৭৪জন, মোট গণহত্যার শিকার ৫৩৬৫জন, আহত পঙ্গু ১১৩২জন, শারিরিক নির্যাতনের শিকার ৩৭২৯জন, ধর্ষিতা বিরাঙ্গনা নারীর সংখ্যা ২১২৯জন, এর মধ্যে অনেকেই চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশে চলে গেছেন এবার অনেকেই ৪২বছরে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। নারী হত্যা করা হয়েছে ২০৫জন, ঘরবাড়ি-দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ৮০৬৪, বাড়িঘর-চা বাগান-ব্যাংক লোটপাট করা হয়েছে ৭৭২৯, বুদ্ধিজীবি হত্যা করা হয়েছে ২৮৪জন। এতে করে দেখা যায় সিলেট বিভাগে শহীদ, গণহত্যা, নারী হত্যা, বুদ্ধিজীবি মিলে সর্বমোট ৯৩২৮জন মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগের মাধ্যমে নিহত হয়েছেন।
সবশেষে সুদীর্ঘ নয় মাস মহান মুক্তিযুদ্ধের লড়াইয়ের পর দেশবাসীর ন্যায় বৃহত্তর সিলেট জেলা ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে শত্রু মুক্ত হয়।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠালাভের পর হতে দীর্ঘ ৪২বছর অতিবাহিত হয়ে ৪৩তম বিজয় দিবস যথাযোগ্য মর্যাদার সহিত সারাদেশে পালিত হতে যাচ্ছে। এমতাবস্তায়ও দেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল ভোগকরতে আজও পারেনি। এ বিজয় দিবসে সকলের অঙ্গীকার হোক আর্তসামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে আপামর জনসাধারণের মৌলিক পরিবর্তন, সুখী, সমৃদ্ধশালী, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এ প্রত্যাশা পূরণে বাংলাদেশী বাঙ্গালীরা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে নির্দ্বিধায় সক্ষম হলে চুড়ান্ত মুক্তি হবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

১ thought on “মুক্তিযুদ্ধ : সিলেট’র অগ্নিঝরা দিনগুলি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *