জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসটি লেখার অজানা ইতিহাস!

টুনি বুড়ো মকবুলের তৃতীয় পক্ষ। গায়ের রং কালো। দোহারা গড়ন। আয়ত চোখের এই মেয়েটির বয়স তেরো-চৌদ্দর মাঝামাঝি। কিশোরীর চঞ্চলতা এখনো তার মধ্যে বিরাজমান। তাই ঘর-সংসার কাকে বলে সে বুঝে ওঠেনি। সমবয়সী কারোর সঙ্গে দেখা হলে সে গল্পে মেতে ওঠে। কখনো হাসতে হাসতে মেঝেয় গড়াগড়ি খায়।

পরীর দীঘির পশ্চিম ও পুব ধারে চারটি করে সামনে নুয়ে পড়া বাঁশের তৈরি বেড়ার ছোট ছোট আটটি কুঁড়েঘর একসঙ্গে লাগানো- এই হলো শিকদার বাড়ি। পুবের দিকের উত্তরের ঘরে থাকে মকবুল। তার তিন বিবি আমেনা, ফাতেমা ও টুনিকে নিয়ে বসবাস করে সে। মন্তুও একই বাড়ির সদস্য। একেবারে দক্ষিণের ছোট্ট ঘরটায় থাকে মন্তু। এই দুনিয়ায় তার কেউ নেই। বাবা, মা, ভাই, বোন কেউ না। মন্তু পরের জমিতে লাঙল চষে ধান বোনে। তারপর ধানের মৌসুম শেষ হলে কলাই, মুগ, তিল ও সরিষার খেতে কাজ করে। মাঝেমধ্যে লাকড়ি কাটার চুক্তি নেয়। আবার যাত্রী কিংবা মালামাল নিয়ে নৌকায় মাঝির কাজ করে। যদিও সবাই মন্তুকে মনে করে একগুঁয়ে, বদমেজাজি স্বভাব, জানোয়ারের মতো। কিন্তু টুনির চোখে এমন মাটির মানুষ এ দুনিয়ায় আর নেই!

তিন বউকে খাওয়ানোর মতো জমিজমা মকবুলের তেমন নেই। বউরা কাজ করে আয় করে, তা দিয়েই মকবুলের দিনগুজার হয়। টুনি সদ্যজাগ্রত যৌবন নিয়ে ভালোবাসার কাঙাল। স্বামীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত, তাই মন্তুর সঙ্গে টুনির খুব ভাব। রাত-বেরাতে টুনির আবদারের সঙ্গী হয় সে। কখনো অন্ধকার রাতে পরের পুকুরে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলে। কখনো শীতের হাড়কাঁপুনি রাতে টুনি অন্যের খেজুরগাছে সিরনি রাঁধার জন্য হাঁড়ি নিয়ে গাছে ওঠে, তারও সঙ্গী হয়। ধীরে ধীরে টুনি মন্তুর প্রতি আকর্ষিত হয়।

আঘাতজনিত কারণে মকবুল মারা গেলে টুনির বিলাপ দেখে বিস্মিত হয় মন্তু। সূর্য ওঠার আগে যখন পুব আকাশে শুকতারা জ্বলজ্বল করে জেগে থাকে, তখন দীঘি থেকে শাপলা তুলে টুনির জন্য আনে মন্তু। সুগুপ্ত ভালোবাসা হাতে নিয়ে এক অব্যক্ত বেদনার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে টুনি নিথরভাবে থাকে দাঁড়িয়ে। ভোরের আকাশে সূর্যের লালিমা নিয়ে ভালোবাসার জাগ্রত বর্ণচ্ছটা। টুনির জীবনেই মন্তু চোরা স্রোতের মতো। একদিকে বৃদ্ধ স্বামী মকবুল, অন্যদিকে যৌবনের জয়গান নিয়ে মন্তু। এই দ্বৈরথের মধ্যেই আবার আম্বিয়ার আসা যাওয়া। এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলতে থাকে আবহমান বাংলার বিস্তারিত এক বর্ণনা।

অসাধারণ মুন্সিয়ানা দিয়ে জহির রায়হান তার এই ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের মধ্যে যেভাবে আবহমান বাংলার স্বকীয়তা ও ধারাবাহিকতাকে বেঁধেছেন, এক কথায় তা অসামান্য। বাংলা সাহিত্যে এমন কালজয়ী উপন্যাস খুব বেশি নয়। সারা প্রিথিবীতেই একই অবস্থা, মহান সাহিত্যের সংখ্যা কখনোই অনেক নয়। স্বাভাবিকভাবেই তাই যে কারো আগ্রহ জন্মাতে পারে, কিভাবে এই মহৎ উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল। কী করেছিলেন জহির রায়হান! সেই গল্প বলতেই আজ এত কথার অবতারণা! তার আগে একটু জহির রায়হানের কথা বলে নিতে হয়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে এবং জীবনস্পর্শী প্রতিবাদী সাহিত্য ধারায় জহির রায়হান এক বিশিষ্ট শিল্পী। চলচ্চিত্র প্রতিভা পরবর্তী আশ্রয়স্থল হলেও তার আবির্ভাব ঘটেছিল কথাসাহিত্যে। সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, রাজনৈতিক কর্মী, চিত্রপরিচালক- নানা পরিচয়ে তার কর্মক্ষেত্রের পরিধি স্পষ্ট। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণের দ্বারা একজন গণমুখী শিল্পীর ভূমিকা কেমন হবে- জীবন দিয়ে তিনি তার উদাহরণ হয়ে আছেন।

১৯৩৫ সালের ৫ আগস্ট (নানা বইয়ে তার জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৯ আগস্ট, কিন্তু তার বোন দাবি করেছেন জহির রায়হানের জন্ম তারিখ ৫ আগস্ট) তৎকালীন নোয়াখালি জেলার ফেনী মহকুমার অর্ন্তগত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। প্রকৃত নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ডাক নাম জাফর। জহির রায়হানের স্কুল জীবনের অধিকাংশ অধিকাংশই কেটেছে কলকাতায়। ১৯৪০ সালে তিনি কলকাতা মডেল স্কুলে ভর্তি হন। পিতা হাবিবুল্লাহ তখন কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। মডেল স্কুলে জহির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর তাকে মিত্র ইনস্টিটিউশনে (মেইন) ভর্তি করা হয়। এখানে ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলে তিনি আলীয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্শিয়ান বিভাগে ভর্তি হন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর জহির তার পিতার সঙ্গে মজুপুর গ্রামে চলে আসেন এবং সেখানে গ্রামের স্কুলেই তিনি লেখাপড়া করেন। স্থানীয় আমিরাবাদ হাই স্কুল থেকে ১৯৫০ সালে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর আর খুব বেশিদিন তিনি গ্রামে থাকেননি। গ্রাম বাংলাকে অত্যন্ত গভীরভাবে তিনি দেখেছেন। অল্প সময়ের পর্যবেক্ষণকে মাথায় পুরে রেখেছিলেন অসীম মমতা দিয়ে। পরবর্তীতে ইট-কাঠের শহর তার কাছ থেকে সেসবের কিছুই কেড়ে নিতে পারেনি। বরং হাজার বছর ধরে’র মাধ্যমে তিনি বাঙালীকে বাংলা চিনিয়ে চলেছেন আজো।

মূল ঘটনায় চলে যাই। যেভাবে লেখা হয়েছিল মহতি এই উপন্যাসটি। ১৯৭০ সালে আরো অনেক প্রগতিশীল তরুণের মতো জহির রায়হানও ছিলেন সমাজ পরিবর্তন আন্দোলনের একনিষ্ঠ একজন কর্মী। তিনি তখন পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার দাবিকে জনপ্রিয় করে তুলতে একটা ইংরেজি সাপ্তাহিক বের করছিলেন। নাম ছিল, ‘এক্সপ্রেস’। আলমগীর কবির ওটা সম্পাদনা করতেন। বের হতো গাজী শাহাবুদ্দিন মনুর সন্ধানী প্রেস থেকে। সে সময় যে যেখানে ছিলেন সবাই একটা লক্ষ্য সামনে রেখেই কাজ করছিলেন। আর তা হচ্ছে স্বাধীনতার আকাঙ্খা, মুক্তির আকাঙ্খা!

শুধু চলচ্চিত্রকার নয়, লেখক হিসেবেও জহির রায়হান তখন জনপ্রিয়তার দিক থেকে তুঙ্গে। গাজী শাহাবুদ্দিন মনু তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। মনু তখন সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করতেন একটা। নাম ছিল ‘সচিত্র সন্ধানী’। বন্ধুর কাগজে নিয়মিত লিখতেন জহির রায়হান। তখন বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যা বের হওয়ার রেয়াজ চালু হয়েছিল। কলকাতার পত্রিকাগুলোর শারদীয় সংখ্যা দেখেই এই ধারা চালু হয়। সে বছর একুশে ফেব্রুয়ারির কিছু আগে এমনই বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যা হবে। গাজী শাহাবুদ্দিন মনুও তখন সচিত্র সন্ধানীর ঈদ সংখ্যার জন্য জহির রায়হানকে দিয়ে লেখাবেন। কিন্তু জহির রায়হান নানা কাজে ব্যস্ত। তাকে পাওয়া যায় না কিছুতেই। সিনেমা জগতে তখন তিনি বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তি। দুই পাকিস্তান ও ভারত পেরিয়েও তার সুনাম। লেখক হিসেবেও সুখ্যাতি।

এমন সেলিব্রেটি লেখককে কিছুতেই ধরতে পারছিলেন না গাজী শাহাবুদ্দিন মনু। এক পর্যায়ে তিনি ‘সচিত্র সন্ধানী’র ঈদ সংখ্যায় লেখার জন্য জহির রায়হানকে একরকম অপহরণ করলেন! তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন, একটা ঘরে ঢুকিয়ে বললেন, সাত দিনের মধ্যে উপন্যাস লিখতে হবে। দরজা বন্ধ করে দিয়ে চা, সিগারেট, যা লাগে সব দিলেন। বললেন, যা চাই সব পাবে, শুধু বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। কারো সাথে যোগাযোগ নেই। এভাবে গাজী শাহাবুদ্দিন মনু তাকে দিয়ে একটা উপন্যাস লেখালেন। জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস, বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ- ‘হাজার বছর ধরে’ এভাবেই লেখা হয়েছিল। এই তথ্যগুলো দিয়েছেন জহির রায়হানের চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির। যতবারই ভেবেছি, এ নিয়ে লিখব, একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। হাজার বছর ধরে’র ইতিহাস লিখে ফেলব এমন এক নিমিষেই। যাই হোক, হয়তো তার আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে বসলে আরো বিস্তারিত লেখা যেত। সেই সুযোগটা পাওয়া গেল না বলে এই অল্প কথার মধ্যেই আপনাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আর আমার খচখচানিটাও গেল না।

৭ thoughts on “জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসটি লেখার অজানা ইতিহাস!

  1. জানার আছে অনেক কিছু। এই
    জানার আছে অনেক কিছু। এই তথ্যটা প্রথম আমাকে দেয় সাক্ষাৎকারেই শা. ক. বলেছিলেন। বেশ ভালোই গুছিয়ে লিখেছেন আপনি। ধন্যবাদ।

  2. একটা ভাল উপন্যাস লেখার পেছনেও
    একটা ভাল উপন্যাস লেখার পেছনেও থাকে অনেক ইতিহাস। জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস লেখার পেছনের এই কাহিনী জানা ছিল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *