আমাদের শহরে আমরা যেমন

আমাদের একটা শহর ছিলো! ছিলো বললাম, কারণ আমাদের শহরটা তার বানানের মতোই হয়ে গেছে! তালিবা-শ ভেঙ্গে ১ ০ ০% আর পরের হর+র = হরর অর্থ্যাৎ ১০০ভাগ হরর হয়ে গেছে! আমরা বরাবরই প্রভূ প্রিয়। আমরা প্রভূদের ঘাড়ের মধ্যে আসন পেতে দেই। পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি, যারা প্রভূদের ঘাড়ে আসন পেতে দেয়। আর আমাদের প্রভূরা আমাদের ঘাড়ে বসে আমাদের নির্দেশনা দেয়, আমাদের পরিচালিত করে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রভূ আসে। যখন যে প্রভূ আসে তখন সে প্রভূ আর ঘার থেকে নামতে চায় না। আমাদের এক দলের ঘাড় যদি নামাতেও চায় অন্যদল নামাতে দেয় না। আমরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন ঘাড় বাঁকা করে হাটি, কিছুটা কুঁজো হয়ে হাটি। প্রভূদের ভারে আমরা ভারাক্রান্ত। একেকবার একেকদল প্রভূ আসে। অনেকদিন আগে সমুদ্রের ওপারের একদল প্রভূ আমাদের ঘাড়ে আসন পেতে বসেছিলো। আসন পেতে বসেছিলো বললে মনে হয় ভুল হবে। আমরাই আসন পেতে দিয়েছিলাম। নিয়মিত আসন ঝেড়ে দিতাম, পরিষ্কার করতাম নিজের সর্বোচ্চ পরিষ্কার পোষাক দিয়ে। সেই প্রভূ আর ঘাড় থেকে নামতেই চাচ্ছিল না। অনেক কষ্টে প্রায় ৭৩,০০০ দিন অথ্যাৎ ২০০ বছর পর আমরা তাদের নামিয়েছি। তারা আমাদের ঘারে একটা ক্ষত সৃষ্টি করে দিয়ে গেছে। সেই ক্ষতের উপরেই আমাদের নতুন প্রভূদের আমরা আসন পেতে দিয়েছিলাম।আমাদের নতুন প্রভূরাও আমাদের ঘার থেকে নামতে চাইছিলো না। আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে আগের প্রভূদের নামিয়েছিলাম, সেই স্বপ্ন পূরণের প্রতিশ্রুতি নতুন প্রভূরা দিয়েছিলো। কিন্তু ঘাড়ে ওঠার পর সব ভূলে গেছে। এই প্রভূরা আমাদের ঘাড় থেকে আমরা জোড় করে নামিয়েছিলাম প্রায় ৮৮২৮ দিন পর। তারপর ঘাড়ে বসালাম আরেকদল নতুন প্রভূদের। আমরা যে প্র্রত্যাশা নিয়ে তাদের ঘাড়ে বসিয়েছিলাম, তা পূরণ হয়নি। সেদিন এক বৃদ্ধ চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা কোন প্রভূদের আপনার ভালো লেগেছিলো? চাচা অনেকক্ষণ চিন্তা করেও কোন উত্তর দিতে পারলো না। এরা কেউ জীবদ্দশায় ভালো প্রভূ দ্যাখেনি। অথচ সবাই স্বপ্ন দ্যাখে ভালো প্রভূর।
আমরা খুব প্রভূ ভক্ত জাতি। আমাদের একেকদল প্রভূ আসে আর নতুন নতুন নিয়ম প্রবর্তন করে। আমরাও সেগুলো পালন করে চলি। আমরা যে প্রভূদের এখন ঘাড়ে আসন পেতে দিয়েছি। তারাও কিছু আইন প্রণয়ন করেছে। আমরাও সেগুলো বাধ্য ছাত্রের মতো পালন করছি।

ইদানিং একটা আইন হয়েছে সুঁই-সুতো আইন। যে আইনের ফলে আমরা এখন কথা বলতে পারি না। ইঁশারায় মত প্রকাশ করি। প্রভূদের একটা বিলাসী ঘর আছে। যে ঘরটা আমরাই টাকা দিয়ে চালাই। সেই ঘরে মহা প্রভূ, বড় প্রভূ, ছোট প্রভূ সবাই মিলে একদিন ঠিক করলো শহরের সব সুঁই-সুতো কিনে নিবে। ওরা সুঁই সুতো কিনে আমাদের মুখ সেলাই করা শুরু করলো। এক চাচা প্রতিবাদ করে বললো আমার মুখ সেলাই করছো কেন?
প্রভূদের লোকেরা (চামচা প্রভূ) বললো, এটা নতুন নিয়ম। সবাই মানতে বাধ্য।
সেই চাচা মানতে রাজি হয়নি বলে চামচা প্রভূরা তাঁকে ধরে একটা কুঠুরিতে আটকে রাখলো। ওটা প্রভূদের অবাধ্য যারা, তাদের বন্দী রাখার জায়খা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইদানিং কালে।
তারপর আমরা সবাই মেনে নিলাম। কারো মুখ সেলাই করে দেওয়া হলো, বেশির ভাগই নিজেই নিজের মুখ সেলাই করে নিলো। এখন আমরা এই নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

আমাদের শহরে আরেকটা আইন হয়েছে। চামচা প্রভূরা যদি মনে করে কেউ মুখের সেলাই খুলে ফেলবে, তাহলে তাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে। তাই আমরা সবাই যে যার মতো শরীর বাঁচিয়ে পথ চলি।
আমাদের শহরে একদল লোক আছে যারা বালুর শহরে বসবাস করতে চায়। সফেত কাপড় পরিধান করে থাকে এরা। আমরা সবাই তাদের খুব শ্রদ্ধা করি। দেখলেই তাদের পা থেকে ধূলি নিয়ে মাথায় দেই। ধুলি নিতে নিতে মাথা এত বেশি ভারী হয়ে গেছে যে, সেখানে অবস্থিত মগজটা ধুলির কারণে রসহীন হয়ে শুকনো হয়ে গেছে। আমাদের প্রভূরাও এদের খুব খাতির যত্ন করে। সব প্রভূরা, প্রভূ প্রত্যাশিরা এদের কাছে পেতে চায়। এই বালুবাসীরা অন্য মতের মানুষেদের সহ্য করতে পারে না। এদের হাত যখন তখন ধারালো হয়ে ওঠে।

আমাদের শহরে প্রভূদের ইস্কুল, বিশ্ব- ইস্কুলের লেবাসধারী কিছু চ্যালা প্রভূ আছে। এরা যাখন তখন, যার তার কোলে বসতে পারে। সেদিন এক রিকসা ওলালে এই চ্যালা প্রভূরা চড় মারছিলো।
জিজ্ঞেস করলাম, কেন এটা করলেন? বললো, তুমি নিয়ম ভঙ্গ করেছো।
-কেন?
-তোমার মুখ সেলাই করা, তারপরও তুমি কথা বলেছো। আমরা বিশ্ব-ইস্কুলের চ্যালা প্রভূ। আমরা যখন তখন এই অধিকার রাখি।
– ওওওওওওওওওওও (আমি বললাম)
-এই বার তোমার শাস্তি হবে।
– কেন? (আমি বললাম)
-তুমি আইন ভঙ্গ করেছো।
– আমি বললাম, আমি আর ভঙ্গ করবো না, আমায় ক্ষমা করে দেন চ্যালা প্রভূ।
তারপর তাদের পা থেকে ধুলি এনে মাথায় রাখলাম। বিভিন্ন প্রকার ধূলির কারণে আমাদের মাথা এতো বেশি ভারি, নোংরা হয়েছে যে, এখন মাথায় উঁকুন জন্ম নিয়েছে!
আমাদের শহরে অনেক গুলো বাক্স প্রদর্শন কেন্দ্র আছে। যাকে আমরা টিবি (টেলিভিশন) বলি। সেখানে আমাদের প্রভূরা নিজেদের ছবি, নিজেদের স্তবগীতি লাগিয়ে রেখেছে। আমরা এখন আর অন্য কিছু দেখতে পারিনা। আমরা শুধু প্রভূদের প্রতিদিনের স্তবগীতিই শুনি। এটাই এখন আমাদের শুকনো মগজে ঘোরে। সারাদিন সেটাই গুণগাণ করি।
কিছুদিন আগে আমাদের শহরে অনেক পানি উঠেছিলো। পানিতে ভেসে গেছে আমাদের সবকিছু। সেই টিবির এক দল চাইলো সেগুলো দ্যাখাবে। কিন্তু আমাদের প্রভূরা সেটা না দেখিয়ে নতুন স্তবগীতি দ্যাখালো। আর সেই টিবির লোকগুলোও হলুদ নামক একটা রোগে আক্রান্ত। এর কোন সুচিকিৎসাও নেই।

আমাদের দেশে আরেকদল লোক আছে। যারা অনেক বড় বড় কাগজ বের করে। যাকে আমরা পেপার বলতাম। এখনতো বলতে পারিনা কারণ মুখে সেলাই। আমাদের প্রভূরা একটা কক্ষ বানিয়েছে। সেটার নাম নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। সেখানে রয়েছে আমাদের প্রভূদের কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি……. আঙ্গুল। ফলে সেই কাগজ গুলো শুধু প্রভূদেরই গুণগান ছাড়া উল্টো কিছু বের হয় না। অবশ্য এই লোকগুলোও সেই হলুদ নামক একটা রোগে আক্রান্ত। এর কোন সুচিকিৎসাও নেই।

আমাদের শহরে অনেক উঁচু উঁচু ভবন আছে। কিন্তু প্রভূরা যেটায় বসে সেটা শুধু শক্তিশালী। আর আমরা যেটায় কাজ করি সেটা অনেক নড়বড়ে। যখন তখন ভেঙ্গে যায়। মাঝে মাঝেই ভেঙ্গে যায়, আগুন লেগে যায়। তখন আমাদের নিয়ে অনেকেই দৌড়-ঝাপ করে। আমাদের ঘাড়ে ওঠার স্বপ্ন দ্যাখে।

আমাদের শহরে খুব গুরুত্বপূর্ণ একদল লোক আছে। যাদের আমরা খুবই সম্মান করি। যারা দোকানদার! এরা শুধু একটা পণ্য বিক্রি করে। সেটার নাম বুদ্ধি। এরা বুদ্ধি বিক্রি করে চলে। বিভিন্ন ধরণের দোকানদার আছে। কেউ প্রভূদের দোকান করে, কেউ প্রভূ প্রত্যাশিদের দোকান করে। কিন্তু আমাদের দোকান কেউ করে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, আমাদের জামানত দেওয়ার টাকা নেই।

তবে একদল লোক আছে যারা আমাদের কথা বলে। ওরা কাস্তে আর হাতুড়ি মাথায় নিয়ে ঘোরে। যারা আমাদের কাছে আসতে চায়, যারা আমাদের ঘাড়ে নয় পাশে বসতে চায়। কিন্তু এই দূর্লভ দলের আবার বিভিন্ন উপদলও আছে। উপদল অবশ্য করে দিয়েছে আমাদের ঘাড়ে যারা বিভিন্ন সময় বসেছিলো তারা। সেই উপদলগুলোকে আমাদের প্রভূরা গ্রাস করে নিয়েছে। এরাও এখন প্রভূদের দলে। শুধু গুটি কয়েকজন যায় নি প্রভূদের দলে। মাঝে মধ্যে নিজের মুখের সুতো কেটে এরা আমাদের জন্য কথা বলে। আবার চামচা প্রভূরা ওদের মুখে সেলাই দেয়। আবারও ওরা সেলাই কেটে কথা বলে। কিন্তু এই তালিকা খুবই সংক্ষিপ্ত।

আরও অনেক দল আছে আমাদের শহরে। আরেকদিন বলবো। তবে একটা কথা বলে যাই, বিভিন্ন মানুষদের আমি গোপনে জিজ্ঞেস করেছিলাম। অধিকাংশ মানুষই এই দাসত্ব থেকে মুক্তি যায়। কিন্তু মুক্তি পায় না। কারণ একদল প্রভু নামলে আরেকদল প্রভূ ওঠে। সবাই ঘাড়েই ওঠে। পরিবর্তন প্রত্যাশি অধিকাংশ মানুষই আর ঘাড়ে প্রভূদের নিতে চায় না। এরা চায় সবাই পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করুক। সবাই সমান থাকুক। এমন একটা শহর নির্মান করতে, যে শহরে থাকবেনা কোন মহা প্রভূ, বড় প্রভূ, চামচা প্রভূ। সবাই থাকবে সমান।

১৪ thoughts on “আমাদের শহরে আমরা যেমন

  1. মাঝে মধ্যে নিজের মুখের সুতো

    মাঝে মধ্যে নিজের মুখের সুতো কেটে এরা আমাদের জন্য কথা বলে। আবার চামচা প্রভূরা ওদের মুখে সেলাই দেয়। আবারও ওরা সেলাই কেটে কথা বলে।

    সেই মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *