দিগম্বরী

১.
মেয়েটা পুরো দিগম্বর দাঁড়িয়ে আছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না।
তার চুল গুলো মাথা বেয়ে কোমরের নিচে প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি। বেশ ঘনও বটে। বাতাসে উড়ছে। ঢেউ খেলানো সে উড়ন।
সাকিবের বুকে ধুকপুক ধুকপুক করতে লাগল। এত রাতে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে কল্পনাই করতে পারে নি সে।

রাত জেগে পড়া অভ্যেস সাকিবের।
পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বারান্দায় বসে সিগারেট ফুঁকে সে।

রূমটাতে সে একাই থাকে। যদিও পাশের রূমগুলো তে দু’জন করে থাকে। সাকিবের অন্যকারও সাথে থাকাতে অপছন্দ। নিজের মত করে থাকা যায় না। স্বাধীনতা খর্ব হয়।
প্রাইভেসি নষ্ট হয়। দেখা গেল গভীর রাতে তার নেংটো হয়ে যেতে ইচ্ছে করল।
কিন্তু রুমমেট থাকলে তা সম্ভব না।

১.
মেয়েটা পুরো দিগম্বর দাঁড়িয়ে আছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না।
তার চুল গুলো মাথা বেয়ে কোমরের নিচে প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি। বেশ ঘনও বটে। বাতাসে উড়ছে। ঢেউ খেলানো সে উড়ন।
সাকিবের বুকে ধুকপুক ধুকপুক করতে লাগল। এত রাতে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে কল্পনাই করতে পারে নি সে।

রাত জেগে পড়া অভ্যেস সাকিবের।
পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বারান্দায় বসে সিগারেট ফুঁকে সে।

রূমটাতে সে একাই থাকে। যদিও পাশের রূমগুলো তে দু’জন করে থাকে। সাকিবের অন্যকারও সাথে থাকাতে অপছন্দ। নিজের মত করে থাকা যায় না। স্বাধীনতা খর্ব হয়।
প্রাইভেসি নষ্ট হয়। দেখা গেল গভীর রাতে তার নেংটো হয়ে যেতে ইচ্ছে করল।
কিন্তু রুমমেট থাকলে তা সম্ভব না।
সাকিবের মাঝে মাঝে রূমে নেংটো হয়ে হাঁটার স্বভাব আছে। ওয়াশরূমে সে দিগম্বর হয়েই কাজ সারে।

তার ফিলোসফি কিছুটা নেচারিস্টদের মতই। নেংটো হলে প্রকৃতির কাছাকাছি চলে যাওয়া যায়।
দুনিয়াতে মানুষ এসেছে নেংটো হয়ে, যাবেও নেংটো হয়ে।

তাছাড়া রাত জাগনা মানুষের একা রূম হলেই সুবিধা। এই ভেবেই একা রূম নিয়ে থাকে সে।

আগে যে বাসায় থাকত সেখানেও একা রূম নিয়ে থাকত সাকিব। সমস্যা ছিল ঐ বাসায় পানি পাওয়া যেত না সময় মত। গভীর রাতে তার প্রকৃতির ডাক পেল। কিন্তু দেখা গেল তখন এক ফোঁটা পানিও নেই। দুনিয়ার এই রীতি। মানুষের প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো পাওয়া যায় না।
অফিসে যাওয়ার আগে মানুষ ঘড়ি খুঁজে পায় না। গুরুত্বপূর্ণ কল করার সময় হাতের কাছে ফোন খুঁজে পাওয়া যায়না।

আগের বাসাটার ভাড়াও ছিল অধিক।
সবকিছু মিলে বর্তমান বাসাটা বেশ ভালো। ভাড়াও আগের চেয়ে হাজার খানিক কম।
রূমে পর্যাপ্ত আলো বাতাস পাওয়া যায়। বেলকনি আছে একটা। সেখানে সাকিব নানা জাতের ফুলের চাষ করেছে।
ভরা পূর্ণিমায় জানালা গলে চাঁদ রূমটাকে আলোকিত করে দেয়।
সাকিব বর্তমানে আছে মহা সুখে।

২.
সাকিবের বেলকনি ঘেঁষা পাশের ফ্ল্যাটের বেলকনিটা।
দিনের বেলায় এই বেলকনিতে কাউকে দেখা যায় না। বেলকনিতে কাপড় নাড়াতেও কাউকে দেখা যায় না।
কিন্তু গভীর রাতে ঐ দিগম্বরী রমনীকে প্রায়ই দেখে সাকিব।
এই রহস্যময়ীর প্রেমে পড়ে গেছে সাকিব।
বেলকনির লাইট অফ করে মেয়েটার গাত্র দর্শন তার নেশা হয়ে গেছে।

রাত তিনটা বেজে সাতচল্লিশ।
সাকিব সিগারেট ফুঁকছে বেলকনিতে বসে। বেলকনির আলো নেভানো।
দিগম্বর হয়ে পাশের বেলকনিতে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। নড়াচড়া করছে না। চুল গুলো পতাকা হয়ে উড়ছে।
মেয়েটা দিগম্বরী হলেও তাকে দিগম্বর বলার মত আজও সাকিব কিছুই দেখতে পায় নি। আবছা অন্ধকার আর বিশাল চুলের ফাঁক গলে কতটুকই বা দেখা যায়?

সাকিবের টব গুলোতে বেলি ফুল গাছ নেই। তবুও সে বেলি ফুলের গন্ধ পাচ্ছে। মনে হচ্ছে তাজা বেলিফুল এনে কেউ তার নাকের কাছে ধরেছে।
উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ছাত্র হওয়া সে অনেক ফুলের ঘ্রান আলাদা করতে পারে।

– কি করছেন?
– সিগারেট ফুঁকছি।
– সিগারেট স্বাস্থ্যহানির কারন।
– স্বাস্থ্যহানির আরও অনেক কারন আছে। এই যেমন এই শহরের বাতাস। অক্সিজেন পান নয়, সাক্ষাত বিষ পান করছি। সিওটু আর কার্বন মনোতে ভরা। কার্বন মনো আবার নিরব ঘাতক। শরীরের ভেতরে নিরবে ঢুকে। তারপর নিরবে কাজ চালিয়ে পগারপার। মরবই যখন নিরব ঘাতকের হাতে কেন, সরব ঘাতকের হাতেই মরব।
– আপনার নাম সাকিব?
– শুধু সাকিব না। এস এম রায়হানুল কবির সাকিব। এস এম মানে জানেন? এস এম মানে সৈয়দ মোহাম্মদ। আমরা সৈয়দ বংশ। মোহাম্মদ নবীর উম্মত।
– আপনি বেশি বাড়িয়ে কথা বলেন।
– মুখ দিয়েছেন যিনি, কথা দিয়েছেনও তিনি। আমার কী দোষ? আচ্ছা, আপনি কে?
– আমি অঙ্কুর।
– এখনো অঙ্কুরেই আছেন? বড় হয়ে ফল ফলাদি দিবেন কবে?
– ফল ফলাদি বীজ হয়ে গেছে। আপনার হাতের সিগারেটটা দিবেন?
– আপনি সিগারেট ফুঁকেন? সমস্যা না। মধ্যরাতে একজন সিগারেট পার্টনার পাওয়া গেল। একা একা সিগারেট খেয়ে মজা নেই। এই ধরুন।

সাকিব অনেক চেষ্টা করেও হাতটা ঐ বেলকনি পর্যন্ত নিতে পারে নি।
সিগারেটটা হাত খসে নিচে পড়ে গেল।
সাকিব বেলকনি দিয়ে নিচে দেখার চেষ্টা করল। মাথা উঠিয়ে দেখে ঐ দিগম্বরী নেই।
তার খুব জানার ইচ্ছে ছিল মেয়েটা দিগম্বরী হয়ে থাকে কেন?
এভাবে গভীর রাতে দিগম্বরী দেখে কারও মাথা ঠিক থাকে? মানুষের অনুভূতি বলে তো একটা কথা আছে না-কি!

৩.
সাকিবের বাসার দায়িত্বে আছে মোহসিন।
মোহসিন নিতান্তই ভদ্র ছেলে। একটু সহজ সরল। সব সময় স্বর নামিয়ে কথা বলে। হাঁটে বিড়ালের মত। আগের জনম বলে যদি কিছু থাকে, তবে ঐ জনমে এই ছেলে নিশ্চিত কারও পোষা বিড়াল ছিল।
হয়ত কোন আদরের দুলালী তারে আদর যত্ন করে আরও বিড়াল বানিয়ে দিয়েছে।

দূর্বল এবং ভদ্রগোছের হওয়ায় বাসার সবাই মোহসিনের কাঁধে সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে।
ভাড়া তোলা, মিলের হিসেব, কারেন্টের বিল দিতে যাওয়া, সব ছেলেটা করে।
দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচারের বাস্তব উদাহরণ হল মোহসিন। হায়রে দুনিয়া…

সপ্তাহ খানেক পরে কোরবান ঈদ।
কেউ কেউ বাড়িতে চলে গেছে। কেউ দু একদিনের মধ্যে যাবে।
সাকিবের দরজায় নক দিয়ে মোহসিন বলল,
– ষাকিব্বাই, বিতরে আচেন?
– জ্বি ভাইয়া, ভেতরে আছি। দরজা ঠেলা দাও।
– তো ষাকিব্বাই…
– ওয়েট, তোমার বাড়ি জানি কোথায়?
– বাইয়া চাঁনফুর, হাজীগঞ্জ।
– তো মহৎষিং…
– বাইয়া, মহচিন…
– তো মহচিন, কি বলতে আসছ তুমি?
– বাইয়া, আফনি বাইত ঝাবেন কখন?
– একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করি ফালাইছ তুমি। সবাই কি চলে গেছে?
– না, বাইয়া। দু একদিনের মইদ্দে ছলে ঝাবে।
– তুমি কখন যাবা?
– আমি শবার শ্যাষে জাব।
– তাইলে তো তুমি ঈদের দিন বাড়িতে যাইতেছ।
– বাঈয়া, বুজলাম না।
– আমার প্রোজেক্টের কিছু কাজ পড়ে আছে। এইদিকে সুপারভাইজার স্যারও আমাকে ছুটি দিচ্ছেন না। মনে হয়না ঈদের আগেরদিন ছাড়া ছুটি পাব।
– তাইলে বাঈয়া, আফনের কাছে আমি বাষার দায়িত্ব বুজাই দি যাব।
– সে কোন সমস্যা না। তোমরা নিশ্চিন্তে বাসায় চলে যাও। ফি-আমানিল্লাহ।

৪.
অঙ্কুরের সাথে সাকিবের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে।
মেয়েটার অনেক সুখের দুখের কথা জানা হয়েছে তার। অঙ্কুর বিবাহিত। তার গর্ভে দুইটা মানব অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে।
তার স্বামী চায় না তাদের এত তাড়াতাড়ি সন্তান হোক।

অঙ্কুরের স্বামী সব সময় বাসায় থাকে না।
মাসে দু তিনবার আসে। বন্ধুদের নিয়ে মোজ মস্তি করে চলে যায়।
আর এই দুই তিনদিন অঙ্কুরের উপর বেশ দখল যায়।

সাকিব নিজ থেকেই আবিষ্কার করল, অঙ্কুর আসলে সেক্স ডিপ্রাইভড।
সেক্স ডিপ্রাইভড রমনীর চক্ষু এবং কথাবার্তা শুনে বোঝা যায়। অঙ্কুরের চক্ষু দেখেনি সাকিব। কিন্তু তার কথাবার্তার ঢংই বলে দেয় সে সেক্স ডিপ্রাইভড।
তাছাড়া মাতৃত্বস্বাদও একটা ব্যাপার।

কিন্তু সাকিব এই রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি, অঙ্কুর দিনে দেখা দেয় না কেন?
দিগম্বরী হয়ে থাকারই বা রহস্য কী?
কোন মেয়েকে এমন প্রশ্ন সরাসরি করাও যায় না।

ঈদের আছে আরও তিনদিন।
রাত তিনটা সতের।
সাকিব সিগারেট ফুঁকছে।
– সাকিব আছ?
– হুঁ, অঙ্কুর। তোমার অপেক্ষায় আছি। এত লেট করলে কেন? তোমার হাজবেন্ড বাসায়?
– না।
– তাহলে লেট কেন?
– আমার দর্শনের জন্যে এত উতলা কেন তুমি?
– উতলা কেন সেটা বুঝাই কি করে?
– তোমার চোখ দেখেই বুঝি, তুমি কেন উতলা?
– তুমি আমার চোখ দেখলা কেমনে? সবসময় তো আমার দিকে নিতম্ব ঘুরিয়ে রাখ।
– মানুষের কথা শুনে আমি তার চোখ দেখতে পাই। তোমার চোখে আমি অন্যকিছু দেখতে পাচ্ছি।
– কী দেখতে পেলে?
– তোমার বাসায় কে কে আছে?
– সবাই বাড়িতে চলে গেছে।
– একা তুমি? ভয় পাও না?
– একা কে বলল? তুমি আছ না? আর ভয় কিসের? ভয় হল মানুষের দূর্বল মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। আমি দূর্বল না।
– ওরে আমার সাহসি রে…
– আচ্ছা, তুমি তোমার মুখমন্ডল আমায় দেখাবে না?
– কাল তোমার বাসায় আসব। তখন পুরোটাই দেখো।
– তুমি কি বলেছ, বুঝতে পারছ?
– কেন আমি তোমার বাসায় আসি, তোমার হাত ধরে গল্প করি, তা তুমি চাও না? তাছাড়া তুমিতো আমাকে দেখতেই চাও।
– না মানে আমি নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। সত্যিই আসবে তুমি?
অঙ্কুরের প্রস্থান ঘটল।

সাকিব ঘুমানোর চেষ্টা করছে। ঘুম আসছে না।
তার মন অত্যধিক পুলকিত। রূমের লাইট অফ করে দিয়ে সাকিব দিগম্বর হয়ে শুয়ে পড়ল।

ওয়াশরূমের ট্যাপ গলে টুপটুপ করে পানি পড়ছে।
পানি পড়ার শব্দ প্রতিফলিত হয়ে অন্যধরনের একটা শব্দ সৃষ্টি করছে।
সাঁই সাঁই করে ফ্যানটা ঘুরছে। পানির শব্দ আর বাতাসের শব্দ মিলে তৃতীয় একধরনের শব্দ হচ্ছে।

অঙ্কুরের ডাকে সাকিবের ঘুম ভেঙে গেল।
সাকিব বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল।
অঙ্কুর এখন আর দিগম্বরী নয়।
তার পড়নে একটা কিঞ্চিত ময়লা শাদা শাড়ি। এই শাড়ি থেকে দ্যুতি আসছে।
একটা ভরা চাঁদ যখন পুকুরে এসে পড়ে, আর তার আলো আশেপাশের মানুষ যেমন দেখতে পায়, দ্যুতিটা ঠিক তেমন।

অঙ্কুর সাকিবের দিকে মুখ করে হাসছে।
চুলের ফাঁকে এই হাসি অস্পষ্ট। চুল দিয়ে মুখ আধেক আধেক দেখা যাচ্ছে। চোখ দুটো খানিক লাল খানিক নীল হয়ে জ্বলছে।

– সাকিব, এই দিকে আসো।
– আসছি।
হাত বাড়িয়ে সাকিব অঙ্কুরকে ধরার চেষ্টা করল। পারল না।
অঙ্কুর হাত বাড়িয়ে সাকিবের গলা চেপে ধরল।
একটা মেয়ের হাত এত লম্বা কিভাবে হয় সাকিব বুঝতে পারল না।
তার কন্ঠ দিয়ে গোঙরানির শব্দ বের হচ্ছে।
অঙ্কুর গলা চেপে ধরে সাকিবকে বেলকনির গ্রিল দিয়ে বের করে নিয়ে আসল। তারপর তাকে দুই বেলকনির ফাঁকা জায়গা দিয়ে নিচে ফেলে দিল।
তার চিৎকার গভীর হল।

সাকিবের ঘুম ভেঙে গেল।
ফোনটা বেজেই চলেছে।
তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। তার হার্টটা অস্বাভাবিক লাফাচ্ছে।
হাতের কাছে পানি ছিল। এক জগ পানি সে একসাথে খেয়ে ফেলল।
সাকিব স্বপ্নটার কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পেল না।

৫.
আজকের দিনটা সাকিবের কাছে বেশ আনন্দময়।
ভোরের স্বপ্নটা তার কোন ভাবনার কারনই হল না। বরং ভেবে নিজেই হাসছে।

সাকিব রূমটা নিজের হাতেই গোছালো।
সারা ঘর ঝাড়ামোছা করল। বেলকনি দিয়ে বেশ কয়েকবার উঁকিও দিল। কিন্তু কাউকেই দেখল না।

তার অপেক্ষা করতে ভালো লাগছে না। দিনটা শেষ হলেই রাত নেমে আসবে। গভীর রাতে হবে অঙ্কুরের সাথে দেখা।
ভাবতে তার মন বারংবার পুলকিত হয়ে উঠছে। তার আজ মন পুলকিত হওয়া দিবস।
বাইর থেকে খাবার দাবার এনে রাখল সে।
দু’জন মিলে একসাথে লেট নাইট ডিনার করবে।

ফ্ল্যাটের দারোয়ানকে সাকিব ম্যানেজ করে রাখল।
বলল তার এক বন্ধু আসবে অনেক রাতে। দারোয়ানের আবার ঘুম ব্যারাম। সে সাকিবকে গেইটের স্পেয়ার চাবি দিয়ে দিল।

রাত দুইটা সাতাশ।
সাকিব বেলকনিতে বসে আয়েশ করে সিগারেট খাচ্ছে। আর মনে মনে অঙ্কুরে হারিয়ে যাচ্ছে।

বাসার কলিংবেল বেজে উঠল।
সাকিব দৌঁড়ে দরজার কাছে গেল। ডোর ওয়াচার দিয়ে বাইরে দেখল।
একটা মেয়েকে দেখতে পেল রক্ত লাল শাড়ি পড়া। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
চুলগুলো উড়ছে।

সাকিব বলল, কে?
ওপাশ থেকে কোন উত্তর এল না।
সাকিব জিজ্ঞেস করল, কে অঙ্কুর?
ডোর ওয়াচার দিয়ে দেখা গেল মেয়েটা মাথা নাড়ছে।
দরজা খুলতেই মেয়েটা হনহন করে হেঁটে সাকিবের রূমের দিকে চলে গেল।
এমনভাবে গেল যেন মেয়েটার রূমটা কতদিনের চেনা। সাকিব লক্ষ্য করল অঙ্কুরের নগ্ন পা। ধুলোমাখা বেশ।
রূমে ঢুকেই অঙ্কুর লাইট অফ করে দিল।

– কি ব্যাপার অঙ্কুর, লাইট বন্ধ করলে কেন?
– এমনি। লাইট আমার ভালো লাগে না। দেখনা আমি দিনে বাসা থেকে বের হই না!
– আচ্ছা, সমস্যা নেই। আমরা অন্ধকারেই কথা বলি।
সাকিব বেলি ফুলের গন্ধ পেল। তাজা বেলি ফুল। মনে হল এখ্যুনি গাছ থেকে পাড়া হয়েছে।
– তুমি কি বেলিফুলের সুগন্ধি মেখে এসেছ?
অঙ্কুর কথা বলল না।
– রাতে খেয়েছ? না খেলে চল খাবে। আমি এখনো খাই নি।
অঙ্কুর কিছুই বলল না।

– সাকিব, একটু এ দিকে আসবে? আমার পাশে এসে বস।
সাকিবের মন আনন্দে ভরে গেছে।
কিন্তু তার শরীর কাঁপছে।
দুই অবস্থায় মানুষের শরীর কেঁপে উঠে। অতি দু:খিত অবস্থায় আর অতি আনন্দঘন অবস্থায়।
সাকিব কাঁপছে অতি আনন্দঘন অবস্থায়।

সাকিব অঙ্কুরের পাশে এসে বসল।
অঙ্কুর বলল, আরও কাছে আস।
সাকিব আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল।
তার শরীরে মুহুর্তে বিদ্যুৎ শকের অবস্থা হল।
তার মনে হল অঙ্কুরের শরীরে কোন বসন নেই। পুরো বিবসনা।
অঙ্কুরের চুল সাকিবের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিল।
– সাকিব, তোমার কেমন লাগছে?
– একটু সাফোকেটিং।
– একটু না। বেশিই সাফোকেটিং লাগছে তোমার। আমি তোমার দৃষ্টি পড়তে পারছি।
– তুমি কি আমার মনও পড়তে পারছ?
– হুঁ, পারছি।
– কী পেলে?
– তোমার রূমে তো আমি আর তুমি ছাড়া আর কেউই নেই। তোমার মনে যা, তা তোমার হাতের কাছে।

সাকিবের কাছে সব অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে মানুষ জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়।
বেলি ফুলের ঘ্রান আরও তীব্র হচ্ছে।
– অঙ্কুর, আমি তোমাকে একটু দেখতে চাই।
– ১০ সেকেন্ড দেখার সুযোগ পাবে। লাইট জ্বালিয়েই আবার নিভিয়ে দিবে।
– আচ্ছা।
১০ সেকেন্ডে সাকিব শুধু অঙ্কুরের সুডৌল বিবসন শরীরটাই দেখল। পারফেক্ট ফিগার।
মুখ চুলে ঢাকা ছিল বলে দেখতে পারল না।
সাকিব নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না।
তার নি:শ্বাস ভারী হয়ে যাচ্ছে।
কান দিয়ে গরম হাওয়া বের হচ্ছে।
সে অঙ্কুরের পাশে গিয়ে বসল।

– তুমি এমন হাপাচ্ছ কেন সাকিব?
– আমি কী বলব? তুমিতো আমার মন পড়তেই পারছ। তাছাড়া এমন বিবসন বাস্তব রমনী আমার প্রথম দেখা।
– হুঁ। কাছে এসে বসো।
সাকিবের বাহুডোরে বন্দি হল অঙ্কুর।
কিছু চাপা স্বর আর গোঙরানির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

বেলিফুলের ঘ্রান গাঢ় হচ্ছে।
তীব্র ঝাঁঝালো সে ঘ্রান।

৬.
ঈদের পঞ্চম দিন।
আকাশের অবস্থা বেশি সুবিধার না।
এই মেঘ এই রোদ্দুরের কানামাছি চলছে।
এমন অবস্থা মোহসিনের ভালো ঠেকছে না।
তার কথা, আসলে বৃষ্টি ঝুম করে আয়। এই আসিস, এই যাস। এই গুলা কেমন কান্ড? তার আবার রোদ্দুরের সাথে চলছে মশকারী।

শাহি পরিবহনের জাপান ৪ নং সিটে বসে আসছে মোহসিন। লক্ষ্য চট্টগ্রাম। কিন্তু তা এখনো বহুদূর।
তার মা আসার সময় কিছু রান্না করা মাংস আর পিঠা দিয়ে দিয়েছে। সব নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
বেশ কয়েকবার সাকিবের নাম্বারে ফোন দেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
নিতান্তই ভদ্র ছেলে দেখে তার মাথা খারাপ হচ্ছে না। অন্য কেউ হলে এতক্ষনে ‘শালারপুত’ বলে একটা গালি দিয়ে দিত।

রাত দশটা বেজে সাত মিনিট।
মোহসিন বাসায় এসে দরজা নক করল। কিন্তু কেউ খুলছে না। এ কেমন মশকারী?
এ কেমন রসিকতা? দরজার সামনে একজন মানুষ কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবে?
মানুষ দুইটা ক্ষেত্রে খুব বেশি বিরক্ত হয়।
এক, কারও জন্যে অপেক্ষায়। দুই, বাইর থেকে আসার পর দরজা খুলতে দিরং হলে।
মোহসিনের চেহারায় বিরক্ত স্পষ্ট।

দারোয়ানের কাছ থেকে স্পেয়ার চাবি এনে মোহসিন দরজা খুলল।
রূমে ঢুকেই তার অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। কিন্তু সে অজ্ঞান হল না। তার মন ভালো হয়ে গেল।
এত সুন্দর ঘ্রান রূমে আগে কখনো পায় নি।
সাধারণত বেশ কিছুদিন কেউ রূমে না থাকলে রূম ভ্যাপসা দুর্গন্ধে ভরে যায়। দরজা জানালা খুলে দিয়ে ফ্যান ফুল স্পিডে ছেড়ে দিতে হয়।
দু একদিন এ গন্ধ থেকে যায়।

মনে মনে সাকিবকে ধন্যবাদ দিল মোহসিন।
তার ধারনা এই লোকের কাজ উদ্ভিদ নিয়ে। নিশ্চিত এমন কিছু রেখে গেছে বাসায়, যার কারনে রূম দুর্গন্ধ মুক্ত।
একটু শব্দ করেই বলল, দন্যবাদ ষাকিব্বাই।

বাসায় ঢুকে মোহসিন এই ২য় বার অবাক হল!
সে সাকিবের রূমে লক্ষ্য করল সমানে পিঁপড়া ঢুকছে আর বের হচ্ছে।
আর ঘ্রানটা সাকিবের রূম থেকেই আসছে।
মোহসিন সাকিবের রূমের দিকে এগিয়ে গেল। ঘ্রানটা স্পষ্ট হয়ে তার নাকে ধরা দিচ্ছে।
দরজার লক ঘুরাতেই দরজাটা খুলে গেল।
রূমের লাইট জ্বালাল সে।
বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে মোহসিন রূম থেকে দৌঁড় দিয়ে ফ্ল্যাটের দারোয়ানের সামনে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

পুলিশ এসছে।
সাকিবকে তার রূমে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তার শরীর বিবস্ত্র ছিল। সারা শরীর পিঁপড়ায় ছেয়ে গেছে। দলে দলে পিঁপড়া তার চোখের ভেতর ঢুকছে।
গলা বরাবর দাঁতের চিহ্ন দেখা গেল। চারটা দাঁতের চিহ্ন বেশ গভীর। যদিও গলাটা তার শরীর থেকে আলাদা করা।

সাকিবের রূমের আশেপাশে বেশ ভালোভাবে দেখছে পুলিশ।
বেলকনিতে গাছ গুলো আধমরা হয়ে আছে।
তবুও শুকনো বেলি ফুলের ঘ্রান কোত্থেকে আসছে কেউ বুঝতে পারছে না।

পুলিশ পাশের বেলকনির দিকে তাকালো।
দারোয়ানকে প্রশ্ন করল, এই বেলকনির ফ্ল্যাটে কারা থাকে?
দারোয়ান জবাব দিল, এই ফ্ল্যাটে কেউ থাকে না। বাড়ির মালিক এই ফ্ল্যাট কারও কাছে ভাড়াও দেন না।

পুলিশ কর্মকর্তা গভীর নি:শ্বাস ফেললেন!
তাঁর শ্বাসের সাথে শুকনো বেলি ফুলের ঘ্রান ফুসফুসে চলে যাচ্ছে।

-:সমাপ্ত:-

৬ thoughts on “দিগম্বরী

  1. তার ফিলোসফি কিছুটা

    তার ফিলোসফি কিছুটা নেচারিস্টদের মতই। নেংটো হলে প্রকৃতির কাছাকাছি চলে যাওয়া যায়।
    দুনিয়াতে মানুষ এসেছে নেংটো হয়ে, যাবেও নেংটো হয়ে।

    নেঙটা সাজু ভাইয়ের অনুসারী নাকি?

  2. খুব ভালো লাগছে। এধরনের গল্প
    খুব ভালো লাগছে। এধরনের গল্প পড়ার মজাই অন্যরকম।
    একটা দিগম্বরির অন্ধকারময় ছবি থাকলে আরো ইন্টারেস্টিং হত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *