মিড লাইফ ক্রাইসিস

আজকাল তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরলে, কেমন জানি এক ধরনের শুন্যতা ঘিরে ধরে।প্রতিদিনের রুটিন কাজগুলোর সিকোয়েন্স, একটার পর একটা আসতে থাকে,এই পর্যন্ত না হয় মেনে নিলাম, তাই বলে ডায়ালগগুলো ও এক হতে হবে?ইচ্ছে করে,সকল প্রশ্নের উত্তর মনে যা আসে তাই দিয়ে দেই।যেমন ধরুন,
সারাদিন অফিসে কি করলে?
ধেই ধেই করে নেচেছি।
দুপুরে খেয়েছিলে?
নাহ, সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম।
কারেন্ট বিলটা দিয়েছিলে?
নাহ, ঐ টাকা দিয়ে কটকটি কিনে খেয়েছি।
টিভি না দেখে,বাচ্চাগুলোকে একটু পড়াটা দেখিয়ে দিলেও তো পারো।
নাহ, পারবনা, নিজেরা পড়তে পারেনা? না পারলে গোল্লায় যাক। কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করোনা।
মশারিরটা টানাতে পারনা?
নাহ পারিনা, কেন তোমার হাতে কি হয়েছে? আমি কি তোমার চাকর?
হয়ত প্রশ্নগুলোর গায়ে অনেক মায়া মমতা আহ্লাদ,জড়ানো আছে, কিন্তু এই গায়ে জড়ানো ভাবটাই এখন আর ভালো লাগছেনা, বিরক্ত লাগে, প্রশ্নগুলো রোজকার মত স্থান পাত্র ভেদে এক থাকলেও, উত্তরগুলো সাহস করে দেয়া হয়না।ভাগ্যিস উপরওয়ালা মানুষদেরকে একে অপরের মাইন্ড রিড করার ক্ষমতা দেননি, দিলে হয়ত ৭ দিনের মধ্যে পৃথিবীটা জনমানব শুন্য হয়ে যেত। একটা এনজিওতে কাজ করি, এদের নিজস্ব কিছু টার্ম আছে, যেমন কোন কিছু নিয়ে ঘাপলা হলেই শেয়ার করতে হয়।ইদানিং খেয়াল করছি প্রতিদিন নিজের মধ্যে একটা কিছু ঘাপলা ব্যাপার স্যাপার ঘটেই চলছে, ঠিক ধরতে পারছিনা, মনে মনে ভাবছিলাম কার সাথে শেয়ার করা যায়? HR সেকশনের নিলুর কথা মনে পড়ল।
নিলু,একটু সময় হবে,একটা ব্যাপার নিয়ে শেয়ার করার দরকার ছিল।
নাহ, বজলু ভাই, ভীষণ ব্যস্ত, এখন সময় হবেনা, ৪ টার পর।কড়া লিপস্টিকের হাসি দিয়ে চোখ তুলে বললেন নিলু।মনে মনে আবার উত্তর দিলামঃ
দেমাগ দেখানর কি আছে? টাইম চাইলাম দেখে ভাও খাইলেন মনে হয়! যেইনা চেহারা নাম রেখেছে পেয়ারা।
নিলু অফিসের সকলের কাছে থিংক ট্যাঙ্ক টাইপের মানুষ, সকল বিপদের সঠিক সুরাহা তার কাছ থেকে পাওয়া যায়, বাসার কাজের লোকের পালিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ছেলে মেয়েদের প্রেমপত্র চালাচালি বন্ধ করা পর্যন্ত।কোথায় যেন পড়েছিলাম, ব্রেইন এবং বিউটি এর কম্বিনেশন মহিলাদেরকে ভয়ংকর করে তোলে।সেই রকমের ভয়ংকর এই নিলু ওরফে নিলুফার। সব সময় ধরা খেয়ে যাই,যখনি চোখাচোখি হয়,দেখে আমি ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। বসে আছি কখন ৪ টা বাজবে? অপেক্ষার সময় নাকি কাটতে চায় না, আমার বেলায় দেখলাম উলটো হল,হঠাৎ করেই কোত্থেকে যেন হাজির হল নিলুফার।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি কাটায় কাটায় ৪টা বাজে।
চলুন, কোথাও গিয়ে বসি, আমাকে কোন সুযোগ না দিয়ে হাটা শুরু করল। আমি ওর পিছন হাটতে হাটতে অফিসের ক্যান্টিনে এসে বসলাম। ইদানিং খেয়াল করেছি কেন জানি স্ত্রী ছাড়া অন্য যে কোন নারীর সাথে কথা বলতে কিংবা সময় কাটাতে আমার ভাল লাগে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলঃকি যেন বলবেন, বজলু ভাই, বলেন।
নাহ, তেমন কিছুনা।
ভনিতা না করে সরাসরি বলে ফেলুন।
বউয়ের সাথে নীরব বাক্য যুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিদিনকার ক্রমশ বেড়ে চলা বিরক্তি ভাব,সবই খুলে বললাম।কথা শেষ না হতেই হাসিতে ফেটে পড়ল নিলুফার।
আরে এটা বুঝলেন না, এটাকে বলে মিড লাইফ ক্রাইসিস।এটা হলে,নিজের বলতে যা কিছু আছে তার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়,রাতের ঘুম হারাম করে বারান্দায় পায়চারি করতে করতে দার্শনিক হয়ে যায়।সোজা বাংলায় বললে সুখে থেকে অনবরত ভুতের কিল খেয়ে খেয়ে বনের মোষ ঘরে নিয়ে আসা। বরাবরের মত হা করে চেয়ে রইলাম ওর দিকে। দম নিয়ে আবার শুরু করলঃ অনেকটা বর্তমানে দেশের অবস্থার মত। দেশটার জনগণও এখন মিড লাইফ ক্রাইসিসে কাটাচ্ছে। নৌকায় চড়েতো মাঝি মাল্লারা সব ডাকাত হয়ে যায়, ধান ক্ষেতের সব ফসল খেয়ে নেয় পঙ্গপালের দল, লাঙ্গল দিয়ে আজকাল আর ধান চাষ হয়না, সুপারি বাগানে পড়ে থেকে থেকে বাতিল মাল হয়ে গেছে।দাড়িপাল্লা দেখিয়ে এখন আর সহজে নেশা ধরানো যাচ্ছেনা, তাইতো চাদের গায়ে ছবির পর ছবি ঝুলাতে হয়।পরকীয়া প্রেম দিয়ে যে ঘর ঘুছান যায়না তাতো হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে জনগণ,তাইতো তালাক দিতে গিয়েও ব্ল্যাকমেইল্ড হয়ে বার বার কাজি অফিস থেকে ফেরত আসে। কি, ডায়ালগবাজি কেমন লাগল? বলে আবারও সেই হাসি, হাসলে পৃথিবীর সকল মেয়েকেই সুন্দরী দেখায়।
বুঝলেন বজলু ভাই, আপনাকে এক ঘেয়েমিতে পেয়ে বসেছে, আপনার চেঞ্জ প্রয়োজন। আপনারা ছেলেরাতো মেলোড্রামা বেশি পছন্দ করেন,তাই রবি ঠাকুর নয় বরং শরৎ বাবুই আপনাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। আপনাকে একটা বুদ্ধি দেই, ঘর ভালো না লাগলে রাজনীতিতে নেমে পড়ুন, অনেক মেলোড্রামা পেয়ে যাবেন। কিভাবে বোমা ফুটিয়ে ক্লাইম্যাক্স তৈরি করতে হয়, কিংবা কেমন করেই বা ব্যাগের বোমা টেবিলে সাজিয়ে আইনি ধারা গুনতে হয়? চোখে ঝিম ধরে এল, সামনে বসে থাকা এমন সুন্দরী মেয়েটাকে আগে কখনো দেখেছি বলে মনে করতে পারছিনা। কি আবোল তাবোল বকছে? এলাম মশারির কোনা টানানোর বিরক্তি নিয়ে আর উনি কিনা রাজনীতির কোনা ধরিয়ে দিলেন। আলোচনা কিংবা শেয়ারিং যাই বলুন না কেন, আর বেশি দূর এগোল না। শরৎ বাবুর নায়িকাদের মতই এক ধরনের ঘোর তৈরি করে নিলুফার চলে গেল। বাসায় ফিরলাম যথারীতি, এরপর আবারও সেই একই সিকোয়েন্স, একই প্রশ্ন, শুধু উত্তরগুলো আলাদা।
হঠাৎ নড়াচড়ায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। কানের কাছে খুব আস্তে আস্তে কে যেন বললঃ চল বারান্দায় গিয়ে বসি, বাইরে আজ খুব সুন্দর জোছনা নেমেছে।

১ thought on “মিড লাইফ ক্রাইসিস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *