একটি সিদ্ধান্ত

আয়নার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে রিতা। আজ তার বিয়ে। কনের সাজ তার গায়ে। গায়ে সোনালী পাড়ের লাল বেনারসী। একেবারে রক্তিম লাল। পায়ে আলতা, কপালে লালা টিপ। গলায় কয়েক ভরী ওজনের গহণা। নাকে, কানে, সিঁথিতে তো আছেই। হাতে স্বর্ণের বালা, সাথে চুড়ি আছে সেগুলোও স্বর্ণের ।তার বোন মিতা জিজ্ঞেস করলো দেখতো আপি, তোকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। এবার রিতা মুখ তুলে তাকালো। রিতা গায়ের রং শ্যামলা, তবুও মেকাপ দিয়ে তাকে প্রসাধনী সামগ্রীর বিজ্ঞাপণের মডেলদের মতন সাদা বানাতে কেউ কোন কসুর বাদ রাখেনি।

-এত মেকাপ দিয়েছিস কেনো!
-তো লোকে কি বলবে? কনের গায়ের রং কালো?

আয়নার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে রিতা। আজ তার বিয়ে। কনের সাজ তার গায়ে। গায়ে সোনালী পাড়ের লাল বেনারসী। একেবারে রক্তিম লাল। পায়ে আলতা, কপালে লালা টিপ। গলায় কয়েক ভরী ওজনের গহণা। নাকে, কানে, সিঁথিতে তো আছেই। হাতে স্বর্ণের বালা, সাথে চুড়ি আছে সেগুলোও স্বর্ণের ।তার বোন মিতা জিজ্ঞেস করলো দেখতো আপি, তোকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। এবার রিতা মুখ তুলে তাকালো। রিতা গায়ের রং শ্যামলা, তবুও মেকাপ দিয়ে তাকে প্রসাধনী সামগ্রীর বিজ্ঞাপণের মডেলদের মতন সাদা বানাতে কেউ কোন কসুর বাদ রাখেনি।

-এত মেকাপ দিয়েছিস কেনো!
-তো লোকে কি বলবে? কনের গায়ের রং কালো?
-বিয়ের আগেই যদি গায়ের রং লুকিয়ে যাওয়া লাগে, বিয়ের পরে কি করবো? আর গায়ের রং এত সমস্যা হলে বিয়েতে রাজি হলো কেন?
-বাজে বকিস না।। মেকাপ দিয়ে দিচ্ছি ।

রিতা আর কথা বাড়ালো না। মিতা দেখতে অনেক ফর্সা, তার বিয়ের সময় মেকাপের খরচ ও বাঁচবে, আর কালো খোটাটাও শুনতে হবে না। চারপাশের অবস্থা আন্দাজ করার চেষ্টা করলো সে। দেখার উপায় নেই। সে আছে নিজের ঘরে। কনের ঘরে তো যে কেউ যেতে পারে না, আর বর আসার আগে কনে বের ও হবে না, তাও সে আন্দাজ করলো। যে পরিমাণ কোলাহল তাতে বুঝলো – সবাই ব্যস্ত, যেন সবাই কোন ট্রেনের জন্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, রিতাকে সে ট্রেনে তুলে দিতে পারলে তারা হাফ ছেড়ে বাঁচে। এত সব ব্যস্ততার মাঝে রিতার নিজেকে মনে হচ্ছে কোন মূর্তির মতন, যাকে সবাই দেখতে পায়, কিন্তু মূর্তি সে ব্যাপারে ভাবলেশহীন।

পাত্র শাহেদ। রিতার ক্লাসমেট ছিলো। পরিচয় থেকে ভালোলাগা। আর সে ভালোলাগা ভালোবাসায় রূপ নিতে সময় লাগেনি। দুজনের পরিবার ও অমত করেনি। তাদের সম্মতিতেই বিয়েটা হচ্ছে। তারপরো রিতার ভাবলেশহীনতা কেমন যেন বেমানান লাগে। এমন নয় যে তার অমতে বিয়ে হচ্ছে। তারপরো, কিছু বিষয় তার ভিতরে খোঁচা দিচ্ছে। যেন তাকে ব্যঙ্গ করছে, কিন্তু সে নিরুপায়।

পাঁচ বছর আগের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাস। রিতা বসেছে ফার্স্ট বেঞ্চে। তার চিরকালের অভ্যাস। ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। এমন সময় ক্লাসে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলো একটা ছিপছিপে গড়নের ছেলে। কাপড় চোপড় দেখেই বুঝা যায় বেশ ধনী পরিবারের ছেলে। ক্লাসে ঢুকে স্যারকে সরি বলে তাকালো সামনে। শুধু ফার্স্ট বেঞ্চে রিতার পাশের সিটটা খালি। সেখানেই বসলো। ক্লাস শেষ হবার পর বললো, আমি শাহেদ, ছেলেটার মুখের সুন্দর হাসি দেখে রিতা না হেসে পারলো না। বললো আমার নাম রিতা।

-আমার সাথে এক কাপ চা খাবে রিতা?
-এক কাপ চা দুজনে খাবো কীভাবে? হাহাহা।
-না মানে, দুকাপ ।
-হাহাহা। আজকে না। আরেকদিন।

এরপর রোজ শাহেদ এসে ক্লাসের সেই ফার্স্ট বেঞ্চের রিতার পাশের সিটটাতেই বসতো। দিন গড়িয়ে যায় মাস, গড়িয়ে যায়, একদিন শাহেদ রিতাকে বলেই ফেলে, রিতা তোমাকে অনেক ভালোবাসি। শুনে রিতা বলে এইভাবে খালি হাতে? হাহাহা। রিতাকে অবাক করে দিয়ে শাহেদ ব্যাগ থেকে একতোড়া ফুল বের করে দেয়। বিভিন্ন রঙের। রিতাও শাহেদের প্রতি দূর্বল ছিলো। আর না করতে পারেনি। দিনটা ছিলো ১৪ ফেব্রুয়ারী। ভালোবাসা দিবস।

এরপর দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর কেটে গেলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে শাহেদ তার বাবার ব্যবসার হাল ধরেছে। বিরাট ব্যবসা। কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ সেখানে। মুনাফাও নেহায়েত কম না। রিতার মা বাবা মেয়ের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আর রিতার পছন্দের কথা ভেবে দ্বিমত করেননি। রিতার আফসোস হয়, সেদিন যদি সে শাহেদকে না বলতে পারতো, তাহলে আজকে তাকে মনের ভিতর এই যুদ্ধ চালাতে হতো না। শেষ না হওয়া যুদ্ধ। যেটা চলবে জীবনভর।
কিন্তু কেন তার এরকম মনে হচ্ছে সেটা সে কাউকে বলতে পারছে না। তার নিস্পৃহভাব তার অসহায়তার বিম্ব। কিন্তু সেটা কেউ দেখে না। জগতটা এমন, আয়নাতে না পড়লে সে বিম্ব কেউ দেখে না।

শাহেদকে রিতা যখনি জিজ্ঞেস করতো, আমার জন্য কি করতে পারো? শাহেদ একটাই উত্তর দিতো সবকিছু, যা চাও তাই। রিতা হাসতো, মানুষ চাইলেই কি সব পারে নাকি। এটা বাস্তব জীবন , কোন সিনেমা না। কিন্তু শাহেদের সেই এক কথাই ছিলো, সবকিছু সে করতে পারবে। কত প্রতিজ্ঞা করেছে সে রিতার কাছে! সে রিতার সব হবে, তার ছায়া হবে, সারাজীবন তার পাশে থাকবে। একবার রিতা জিজ্ঞেস ও করেছিলো, তোমার মা বাবা যদি আমাদের সম্পর্কের ওপর কোন শর্ত জুড়ে দেয়? কি করবে? শাহেদের সেই স্বভাবজাত উত্তর, আমি তোমার পাশেই থাকবো, এইটা আমার ওয়াদা রইলো।

শাহেদ তার ওয়াদা রাখেনি। এমনকি তার বিবেক একটা ভুল কাজের প্রতিবাদ করার চেষ্টাও করেনি। ব্যবসায়ী বাবার ব্যবসায়ী ছেলে। সব তাদের কাছে টাকা। নাহলে শাহেদের বাবা যখন নির্লজ্জের মতন রিতার মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে গহণা সহ কয়েক লক্ষ টাকা যৌতুক চেয়ে বসলো- তাও যৌতুক দেয়া প্রথা দাবি করে, তখন সে বাঁধা দেয়নি কেনো? যখন শাহেদের বাবা সবার সামনে বলেছিলো, এহ! মেয়ে তো দেখছি ডার্ক, তুই কি অন্ধ নাকি? কত ফর্সা মেয়ে আছে দেশে – তখন সে কিছু বলেনি কেন? এমনকি রিতা যখন তাকে ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলো, কোন আক্কেলে যৌতুক চাওয়া হয়েছে, তার উত্তর ছিলো, হাউ কেন আই সে দ্যাট? ড্যাডি বলেছে তাই দিবা। রিতা অবাক হয়েছিলো, এ কোন শাহেদ? এত বদলে গেছে কেনো?

এই বুঝি সাথে থাকা? পাশে থাকা? এই বুঝি প্রতিজ্ঞা? মেয়ের সুখের কথা ভেবে রিতার মা বাবা তাদের শেষ সম্বলটুকু একসাথে করে বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন। ভাবেননি মেয়ে কি আদৌ সুখী হবে সেই ছেলের সাথে, যে কিনা ভোল পাল্টাতে এক মুহূর্তও সময় নেয়নি?

হাউ কেন আই সে দ্যাট? ড্যাডি বলেছে তাই দিবা

– কথাটা রিতার কানে বাঁজছে। আয়নার দিকে আরেকবার তাকালো। কিছুটা অবাক হলো। আয়নাটা যেন তাকে বলছে, বোকা মেয়ে বোকাই রয়ে গেলি। যে ছেলে আজকে টাকার জন্য ভোল পাল্টে ফেললো, তোকে দেয়া সব প্রতিজ্ঞা পায়ের নিচে পিষে মেরে ফেললো, তাকে তুই বিয়ে করবি? যে আজকে টাকার জন্য ঠিক বেঠিক ভুলে গেলো, সে কাল তোকে ভুলে যাবে না তার নিশ্চয়তা কি? এখনো সময় আছে, এই নেশা থেকে জেগে ওঠ। এখনো সময় আছে। নিজেকে মারিস না। নিজেকে শেষ করিস না।

আপি এই আপি! মিতার ডাকে বাস্তবে ফিরে এলো রিতা। কোন ঘোরে আছিস। আগেই সব স্বপ্ন দেখে ফেললে বিয়ের পর কি দেখবি? তার রসিকতায় মোটেও হাসি পায় না রিতার। আপি, ওঠ! বর এসেছে তো, সবাই নিচে ডাকছে। কাজী এসে পড়েছে। রিতা উঠে দাঁড়ালো।

রিতা বাবা মায়ের আদরের লক্ষী মেয়ে। প্রতিবাদ দূরে থাক, কখনো সে কারো সাথে ঝগড়াও করেনি। কাউকে কড়া ভাষায় কিছু বলা তো অনেক দূরের কথা। কিন্তু এই শান্ত মেয়েটা আজকে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বেশ কঠিন সিদ্ধান্ত। সে জানে এর ফল কি হতে পারে। তবে সে আজ অটল। আবেগ আজ মূল্যহীন। সে শুধু মিতাকে বললো, তোর ফোনটা আমাকে দিবি আপি প্লিজ? একটা জরুরি ফোন করবো।

===============================================================

পরদিন খবরের কাগজে শাহেদ আর তার বাবার ছবি এসেছিলো। হাতে হাতকড়া। শিরোনাম ছিলো, বিয়ের আগে যৌতুক দাবী করায় শিল্পপতি এবং তার পুত্র গ্রেফতার। মামলা করলো কনে নিজে।

রিতা সেদিন পেরেছিলো। আমাদের সমাজের বাকি মেয়েরাও যদি রিতার মতন সাহসী হত, তাহলে এই ঘৃণ্য প্রথাটা কবেই জাদুঘরে চলে যেত। আফসোস, সেটা হয় না, আর যৌতুক নামের রাক্ষসটা আমাদের দিয়ে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করেই চলে। আমরা কিছুই করতে পারি না।

৬ thoughts on “একটি সিদ্ধান্ত

  1. এই সাহসী হয়ে ওঠার কাজটা
    এই সাহসী হয়ে ওঠার কাজটা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। রিতা, আপনি বা আপনাদের মতো মানুষের সংখ্যা একে একে যত বাড়তে থাকবে ততই ঐসব অমানুষদের হাতে হাতকড়া পড়তে থাকবে

  2. পুরাই বিটিভিতে দেখানো সামাজিক
    পুরাই বিটিভিতে দেখানো সামাজিক সচেতনতামূলক নাটিকা, মেলোড্রামাটিক প্লট !!! সচেতনতা সৃষ্টিই লক্ষ্য হলে প্রচেষ্টা ভালো। আর যদি গল্প লেখার জন্য হয়, তবে বলবো হতাশ করেছেন।

    1. ঘটনা মেলোড্রামাটিক দেখালেও
      ঘটনা মেলোড্রামাটিক দেখালেও এমনটা কিন্তু ঘটছে। এমনকি আমার গ্রামেই এমন একটা ঘটনা দেখেছি আমি। ৭ বছরের প্রেমের বিয়েতে ৫ লক্ষ টাকা যৌতুক চাওয়াতে মেয়েটি বিয়েতে রাজি হয়নি। ছেলেটি এর দুই সপ্তাহ পরে অন্য মেয়েকে বিয়ে করলে মেয়েটি আত্মহত্যা করে।

    2. মেলোড্রামাটিক অস্বীকার করবো
      মেলোড্রামাটিক অস্বীকার করবো না। আর এটা পুরো গল্পও নয়। সচরাচর এমন হয়, সেখান থেকে নিয়েই লিখেছি। আর ফিনিশিং পার্টটা বদলাবে। ভালো ফিনিশিং মাথায় আসলে দিয়ে দিবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *