মার্চ ২০১২, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা : সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পোস্টমর্টেম

মার্চ ২০১২, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা : ১টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পোস্টমর্টেম

৩১ মার্চ ২০১২, শনিবার। এর আগের দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন আনোয়ার হোসেন ওরফে আকুল মেম্বার এবং তার অন্য ভাইয়েলা। আকুল মেম্বারের বাড়িতে তখন রান্না হচ্ছিল। চুলা ভাত। বাড়ির মহিলারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাড়িতে ঢুকে পড়ে কয়েকশো লোক। পালিয়ে যায় আকুলের এবং তার ভাইয়ের বৌয়েরা। লাত্থি মেরে চুলার ওপরের ভাতের হাড়ি ফেলে দেয় ধর্মান্ধ উগ্রবাদীরা। মুহুর্তের মধ্যে আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আকুল মেম্বারের বাড়ির ৫টি ঘর। কোরআনকে রক্ষার নামে যে আগুন ধরানো হয়, সে আগুনে ৫টি ঘরে রাখা কোরআন শরীফগুলো।


মার্চ ২০১২, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা : ১টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পোস্টমর্টেম

৩১ মার্চ ২০১২, শনিবার। এর আগের দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন আনোয়ার হোসেন ওরফে আকুল মেম্বার এবং তার অন্য ভাইয়েলা। আকুল মেম্বারের বাড়িতে তখন রান্না হচ্ছিল। চুলা ভাত। বাড়ির মহিলারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাড়িতে ঢুকে পড়ে কয়েকশো লোক। পালিয়ে যায় আকুলের এবং তার ভাইয়ের বৌয়েরা। লাত্থি মেরে চুলার ওপরের ভাতের হাড়ি ফেলে দেয় ধর্মান্ধ উগ্রবাদীরা। মুহুর্তের মধ্যে আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আকুল মেম্বারের বাড়ির ৫টি ঘর। কোরআনকে রক্ষার নামে যে আগুন ধরানো হয়, সে আগুনে ৫টি ঘরে রাখা কোরআন শরীফগুলো।

৩১ মার্চের ঘটনার বর্ণনা দিতে যেয়ে কেদে ফেলেন আকুল মেম্বারের বাবা বৃদ্ধ জিয়াদ আলী মীর (৬০)। নিজের হাতে গড়া বাড়ি ঘর ধ্বংস করে দিয়েছিল মৌলবাদীরা।

গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে ধর্মান্ধদের উসকে দিয়ে বসতবাড়ি, স্কুল এবং সাংস্কৃতিক একাডেমী পোড়ানো এবং ভাংচুরের ঘটনায় জড়িত ছিল ইসলামী ছাত্র শিবির এবং জাতীয় পার্টি নেতারা। পোস্টমর্টেমে সেই সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর কৌশলটি উঠে আসে।

তথ্য জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী এলাকাবাসী, হামলাকারী ও হামলার শিকার স্থানীয়রা।

ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা ২০১২ সালের ২৯ মার্চ দুপুরে প্রথম আগুন দেয়, ফতেহপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বাড়িতে।
তিনি বলেন, এ স্কুলটিতে সবসময়ই ২১শে ফেব্রæয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর বিভিন্ন সাংস্কৃতির অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহন করেন। এবারের ২৬ মার্চের অনুষ্ঠানের আগেও একটি কমিটি করা হয় ৬ মার্চ। কমিটিতে ছিলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক রেজওয়ানুল হক, ম্যানেজিং কমিটির এক সদস্য আবদুল হাকিম এবং স্কুলের শিক্ষিকা মিতা রানী বালা।

১৭ মার্চ কমিটি দ্বিতীয় সভায় বসলো। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরনীর তারিখ নির্ধারন করা হয় ২৭ মার্চ।

আকুল মেম্বার বলেন, প্রত্যেকবারই স্কুলের অনুষ্ঠানে ছেলেদের অংশগ্রহনে একটি নাটক এবং মেয়েদের অংশগ্রহনে একটি নাটিকা পরিবেশন করা হয়। এছাড়াও গান, কবিতা আবৃত্তি ছিল। আবুল মনসুর আহমদের ‘হুযুরের কেবলা’ নাটকটির নাট্যরুপ দেন আনোয়ারের ছোট ভাই মীর শাহীনুর রহমান। এ নাটকটি ফাযিল শ্রেণীতের পড়ানো হয়।

অনুষ্ঠানের কমিটি নাটকটি পড়ে দেখেন এবং মঞ্চায়নের স্বিদ্ধান্ত নেন। শাহীনের পরিচালনায় স্কুলের শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকদিন অনুশীলন শেষে একটি প্রযোজনা দাড় করান। মেয়েদের নাটিকাটি লেখেন এবং পরিচালনা করেন মিতা রানী বালা।
নাটক শুরু হয় সন্ধ্যার পর। নাটকের একটি অংকে একজন ভন্ড পীরের চরিত্র থাকে। নাটকের শেষ দিকে ভন্ড পীরের বিরোধীতা করে একটি প্রতিবাদী চরিত্র। সে চরিত্রটিকেও পাগল বলে আখ্যায়িত করে ভন্ড পীর চরিত্রটি।

হঠাৎ করে নাটকের শেষ দিকে গ্রামের একটি ছেলে মামুন আল রশিদ মিন্টু উঠে প্রতিবাদ জানায়। চিৎকার করে বলে, ‘মরা কাবার সামনে হুযুর নবীজির নামে ভন্ডামী।’

বলতে থাকেন আকুল মেম্বার, এ ছেলেটি শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। তারপরও প্রতিবাদ জানালে আমি নাটকটি বন্ধ করে দেই। পরে নাটিকা, একটি কবিতা, গান, নাচ পরিবেশন ও পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠান হয়। আর কোন সমস্যা হয়নি।

পরের দিন আমার ছোট ভাই, শাহীন নাটকটি বন্ধ করে দেয়ার কারন জানতে চায় স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে। শিক্ষকরাও শাহীনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।

২৮ মার্চ ২০১২, বুধবার কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এরই মধ্যে নাটক বন্ধ করে দেয়া মিন্টু সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক দৃষ্টিপাতের দক্ষিন শ্রীপুর প্রতিনিধি মিজানুর রহমানকে (স্থানীয় ইসলামী ছাত্র শিবিরের রোকন) বিষয়টি জানান।

পরের দিন, ২৯ মার্চ দৃষ্টিপাতে নাটকটি নিয়ে এমন ভাষায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, যেন মানুষের মনে হয় ইসলাম ও মহনবী (স) কে বিকৃত করে নাটক পরিবেশিত হয়েছে। শ্রীপুরে এ পত্রিকাটির সার্কুলেশন ৫ থেকে ১০ কপি হলেও সেদিন আসে ১০০ কপি।

এ ভাঙ্গচুর আর লুটপাটের জন্যে সবচেয়ে বেশী দায়ী করা হয় দৃষ্টিপাতের ওই সংবাদটিকেই। সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘কালিগঞ্জে নাটকের মাধ্যমে মহানবী (স) কে অসম্মান-তৌহিদী জনতার প্রতিরোধে নাটক অনুষ্ঠান ভন্ডুল।’

এমনকি যেদিন ফতেপুরে হামলা করে মৌলবাদীরা সেদিন দৃষ্টিপাতের শিরোনাম ছিল, ‘তৌহিদী জনতা আজ নূরনগর থেকে আসছে ফতেপুরের উদ্দেশ্যে।’

আকুল বলেন, ২৯ মার্চের সংবাদের ফলে কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরিদউদ্দিন আমাকে নাটকের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ডেকে পাঠান। স্থানীয় চেয়ারম্যান দিদারুল ইসলাম, প্রধান শিক্ষক রেজওয়ান হারুসসহ আরো কয়েকজন নিয়ে আমি থানায় যাই।

‘ওসি’কে বিস্তারিত খুলে বলি। এ সময় সাব ইন্সপেক্টর ইহসানুর রহমান পাণ্ডুলিপিটি পড়ে শোনান এবং ওসিকে বলেন, স্যার এ গল্পটি ফাযিল ক্লাসেও পড়ানো হয়। এখানে নবীজির কোন বিকৃত উপস্থাপনা নেই। ওসি ফরিদউদ্দিনও পড়ে দেখেন।’

‘চেয়ারম্যান দিদারের ফোন থেকে মিজানুর রহমানকে ওসি ফোন দিয়ে বলেন ‘প্রকাশিত সংবাদটি ভুল বসত হয়েছে’ উল্লেখ করে একটি সংবাদ প্রকাশের। মিজান বলে, এখন রাত হয়ে গেছে সকালে যেয়ে করে দেব।’

পরদিন ৩০ মার্চ ২০১২, ছিল শুক্রবার। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিজান ফযরের নামাজের সময় মসজিদে যেয়ে মুসল্লীদের কাছে ব্যাপারটি আবারো উপস্থাপন করেন এবং একটা কিছু করা দরকার বলে কয়েকজনকে সংগঠিত করে। মিজান মুসল্লীদের উদ্দেশ্য করে বলে, মহানবীকে অবমাননা করা হয় আর আপনার ঘরে বসে থাকেন! মিছিল বের করার কথা বলেন। ফযরের নামাযের পর প্রথম একটি ছোট মিছিল বের হয়।

অন্যদিকে বর্তমানে স্থানীয় চেয়ারম্যান দিদারুল ইসলামের কাছে হেরে এলাকায় বেশ টালমাটাল অবস্থায় ছিল জাতীয় পার্টি সমর্থিত জুলফিকার সাঁপুই। স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান দিদারকে এক হাত দেখে নেয়ার সুযোগ হিসেবে এ ঘটনাকে বেছে নেয় জুলফিকার। অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেয়ায়ও ক্ষিপ্ত ছিলেন তিনি।

জুলফিকার বর্তমানে এ মামলায় জেলে রয়েছে। তিনবার জামিনে ছাড়া পেলেও তিনবারই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলফিকারই প্রথম ফতেপুরে টায়ার জোগাড় করে আগুন জ্বালায়। শুক্রবার সকালে ও বিকেলে ফতেপুরে নবীর অবমাননা হয়েছে উল্লেখ করে সাতক্ষীরাতে মাইকিং হয়, লিফলেট বিলি হয় এবং দৃষ্টিপাত পত্রিকার ওই সংবাদটির ফটোকপি বিলি করা হয়।

স্থানীয় শফিউল আলম বলেন, শুক্রবার ১১টার দিকে জুলফিকারের নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল বের হয়। ফতেপুর নয় বরং জুম্মার নামাযের পর প্রথম মিছিল বের হয় দক্ষিন শ্রীপুরে।

শুক্রবার ওসি আসেন আবার। এসে সকলকে স্কুলে ডেকে পাঠান। এ সময় আবারো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় জাতীয় পার্টি সমর্থিত দক্ষিন শ্রীপুরের মেম্বার জাফর কয়েকশ লোক মিছিল নিয়ে আসে। আমাদের ফতেপুরের লোকেরা তখনও শান্ত।

আকুল বলেন, এখানকার কেউ মামলাও করেনি। জাফর মেম্বার বাদী হয়ে এজহার করে মামলা করেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, মীর শাহীন, মীতা রানি বালা, আনোয়ার হোসাইন, স্কুল কমিটির সভাপতি দিদার চেয়ারম্যান, রাব্বানী শিক্ষকসহ ৭ জন।

তিনি বলেন, আমরা ফরিদউদ্দিনকে বলেছিলাম, স্যার এ এলাকার ঘটনা এখানকার কাউকে বলেন বাদী হতে। এখানে কি হয়েছে যারা দেখেছে, আপনি জাফরের মামলাটি নিয়েন না। ওসি সাহেব আমাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। এজহার পাওয়ার আগেই মীতা রানি ও রেজওয়ানকে গ্রেপ্তার করে, বলে আমরা উনাদের জিজ্ঞাসবাদ করে ছেড়ে দেব।

এরপর জুম্মার পড়ে বিকেলে জাতীয় পার্টির নিজাম চেয়ারম্যানের বন্ডকাটি মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে একটি মিছিল এখান দিয়ে যেয়ে থানা ঘেরাও করে।

বলতে থাকেন আকুল, ‘এরপর থানা থেকে ফোন দেয় জাহিদুল দারোগা। তিনি বলেন, আসেন চা খাই। ফোন দিয়ে অন্য একজন জানান আপনি সরে যান। আপনাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। নদীর দিকে চলে যাই সন্ধ্যায়।

পরের দিন শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা-১১টার দিকে কয়েকশ লোকের একটি বড় মিছিল আসে কৃষ্ণনগরের চেয়ারম্যান ও কালিগঞ্জ থানা জাতীয় পার্টির সেক্রেটারি কে এম মোশাররফ এর নেতৃত্বে। মিছিলটি প্রথমে এসে ভাঙ্গচুর করে ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপর আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে আসে। বাড়িতে তখন রান্না চলছিল। মহিলারা দৌড়ে বের হয়ে যান। মৌলবাদীরা ঢুকে পড়েন বাড়িতে।

সেখান থেকে মিছিলটি যায় মিতা রানীর বাড়ি। সেখানে ভাঙ্গচুর করে। এরপর পার্শ্ববর্তী লক্ষীন্দরের বাড়ি। এখানকার দোকানপাট ভেঙ্গে যায়।

পিাছিয়ে থাকবেন কেন জাতীয় পার্টির আরেক নেতা জুলফিকার! সন্ধ্যায় তিনিও আবার দলবল নিয়ে এসে মীতা রানী আর লক্ষিন্দরের বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে যান। এবার নতুন করে আগুন লাগান স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির আব্দুল হাকিম সাহেবের বাড়িতে।
সঙ্গে যোগ করে ফতেপুর সাংস্কৃতির পরিষদ ভেঙ্গে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। হামলাকারীদের তান্ডবের দৃশ্য দেখে ওই গ্রামের নারী-পুরুষ-কিশোর-কিশোরী বাড়ী-ঘর ছেড়ে দিকবিদিক ছুটতে থাকে।

পরদিন ৩১ মার্চ, শনিবার ঘটনাস্থলে আসেন এলাকার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। তাদের সামনেও চলে ভাঙ্গচুর। মীতা রানীর বাড়িতে আগুন দেয়ার সময় সামনে থেকে পুলিশ। তবে সকালের ঘটনার পরেই যদি পুলিশ শক্ত অবস্থান নিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না।

এরপর ১ এপ্রিল, রোববার থেকে প্রতিবাদ জানান এলাকাবাসী। স্থানীয় শফিউল আলমের নেতৃত্বে বের হয় শান্তি মিছিল। বহিরাগত সন্ত্রাসীদের রুখে দিতেই এ মিছিল।

সেই সকালে আবারো দক্ষিন শ্রীপুর গ্রামের কিছু মানুষ জুলফিকার এর নেতৃত্বে ফতেপুর গ্রামে আসলে স্থানীয় জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং জুলফিকরকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। তার ব্যবহ্নত মটরসাইকেলটি স্থানীয় লোকজন ভাংচুর করেছে। এ ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

আর থামিয়ে রাখা যায়নি, ধর্মান্ধতার রেশ ছড়িয়ে পড়ে ফতেপুরের পার্শ্ববর্তী কালিগঞ্জের মথুরেশপুর ইউনিয়নের চাকদাহ গ্রামে।

সরদার বাড়ির বৌ ললিতার সঙ্গে পুকুরঘাটে কথা হচ্ছিল প্রতিবেশী আবুল ফযলের স্ত্রীর। ফতেপুর গ্রামে ললিতার বাবার ঘর পুড়ে দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন প্রতিবেশীর সঙ্গে। ললিতার কথায় নবীজি সম্পর্কে কটূক্তি হয়েছে বলে মনে করেন ফযলের স্ত্রী। ঘাট থেকে বাড়ি যেয়ে স্বামী জামাত নেতা আবুল ফযলকে ললিতার আশ্পর্ধার কথা বলেন স্ত্রী। ধর্ম রক্ষায় ঝাপিয়ে পড়েন আবুল ফযল।

এ প্রচারনার ফলে বিকাল থেকেই সরদার বাড়ির সামনে ফতেপুর তান্ডবে অংশ নেয়া লোকজন জড়ো হতে থাকে। সন্ধ্যার কিছু আগে স্থানীয় নাজিমগঞ্জ বাজার কমিটির সভাপতি ফিরোজ কবীর কাজল, স্থানীয় ইউপি মেম্বারসহ সকলে ললিতার শ্বশুর বাড়িতে বসে। তাকে এধরনের কথা বলার জন্য ক্ষমা চাইতে চাপ প্রয়োগ করে। সমঝোতা বৈঠকে উত্তেজিত হয়ে ওঠে অন্য গ্রাম থেকে আসা বহিরাগতরা। তারা লাথি মেরে তাদের ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয় সংখ্যালঘু পরিবারটিকে।

দৃষ্কৃতকারীরা জড়ো হতে থাকে ললিতাদের বাড়ি থেকে প্রায় ৫শ’ গজ দূরের চৌরাস্তায়।

পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে পারে এই আশঙ্কায় সেখানে প্রায় ৩০ সদস্যের পুলিশ রাখা হয়েছিল। সন্ধ্যার পর প্রায় ৭টার দিকে মোবাইলের মাধ্যমে ডেকে আনা হয় উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয় আরো কয়েক’শ লোক। বহিরাগতরা আধাঘণ্টার মধ্যেই নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে চিৎকার দিতে দিতে জড়ো হয়। এসকল বাড়ির সামনে পুলিশের উপস্থিতিতে তারা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে।

একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে পরিবারের নারী ও শিশু সদস্যরা ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে থাকলে শুরু হয় লুটপাট। দরজা জানালা ভেঙ্গে তারা ঘরে ঢুকে টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, মূল্যবান কাপড়সহ জমির দলিল, মূল্যবান কাগজপত্র সব কিছু লুট করতে থাকে দলবদ্ধ ভাবে।

ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা সুজিতের স্ত্রীর কানের দুল খুলে নেয়। ললিতার হাতে থাকা সোনার গয়নার কৌটা কেড়ে নেয়া। কৃষ্ণপদ, শ্যামাপদ, রন সরকার, সুধীর সরদার, নিরঞ্জন, শিবু, ভবরঞ্জন, জগদীশ, বিশ্বজিতসহ ১০টি পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে সর্বস্ব লুট করা হয়। লুটের মালামাল নিরাপদ স্থানে রেখে এসে তারা পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় শ্যামাপদ সরদারের পাকা ঘরে। এ সময় পুড়িয়ে দেয়া হয় কৃষ্ণপদের ৩টি, শ্যামাপদের ২টি, রন সরকারের ৩টি ও সুধীর সরদারের ১টি বসতঘর। পুলিশের উস্থিতিতে প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে এই নারকীয় তান্ডব চললেও পুলিশ ছিল নির্বিকার ও নীরব দর্শক।

এলাকার শান্তিশৃক্ষলা নিয়ন্ত্রনে রাখতে বথ্যতার অভিযোগে গত ২০১২ সালের ২ এপ্রিল সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান খান ও কালিগঞ্জ থানার ওসি সৈয়দ ফরিদ উদ্দিন, দেবহাটার ওসি শাহজাহান খানকে ষ্টান্ড রিলিজ করা হয়।

ডিক্লারেশন বাতিল ও প্রচার বন্ধ করা হলেও হাইকোর্ট থেকে রায় নিয়ে আবারো বের হচ্ছে দৈনিক দৃষ্টিপাত।

এ ঘটনায় যে মামলাগুলো হয়েছে সেগুলো সর্ম্পকে কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী আহমেদ মাসুদ বলেন, জুলফিকার, মিজানুর রহমানসহ আরো কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন। মিজান ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত এইট (আট) মার্ডারের আসামী। সে একটি বিশেষ দলের সঙ্গে জড়িত। তার ওই রিপোর্টটিই ছিল দাঙ্গার মূল কারন।

তিনি বলেন, মামলার এজাহার ও ঘটনার বর্ণনায় মনে হয়, স্থানীয় অনেক রাজনীতিবিদ ধর্মকে পুজি করে সেদিন নায়ক বনতে চেয়েছিল। তাদের সবার মনে কাজ করেছে সে না গেলে অন্যের থেকে পিছিয়ে পড়বে।

২ thoughts on “মার্চ ২০১২, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা : সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পোস্টমর্টেম

  1. ধন্যবাদ লেখককে, উগ্রবাদীরা
    ধন্যবাদ লেখককে, উগ্রবাদীরা কিভাবে সাম্প্রদায়িক দাংগা শুরু করে তা সবার জানা থাকা উচিৎ। কিন্তু আসল সমস্যাটা হচ্ছে মানসিকতায় আর ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞানতায়।দেশের বেশিরভাগ মানুষই কোনো নাআ কোনোভাবে দূর্নীতি বা অপকর্মের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাই এই ধরনের কোনো রিউমার শুনলে সেটি সম্পর্কে খোজ-খবর না নিয়েই ঝাপিয়ে পরে ঈমানী দায়িত্ব পালন করে…পাপ মোচন করে। ধর্ম সম্পর্কে যদি তারা সঠিক জ্ঞান রাখত তাহলে জানত যে কেউ যদি ইসলাম নিয়ে কটু কথা বলেও তাহলে তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার চাইতে নামাজ পড়াটা বা যাকাত আদায় করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের মাঝেও নামাজ পড়ার নিয়ম আছে ইসলামে।যুদ্ধের ময়দানে নামাজ পরার উদাহরনও আছে। কিন্তু নামাজ-রোজা-যাকাত এগুলোর দিকে তাদের নজর নেই কারন এগুলো করতে শারীরিক শ্রম লাগে, অর্থ লাগে কিন্তু জিহাদের নামে একজন বিধর্মিকে মারতে কিছু লাগেনা,উপরি হিসাবে তাদের ধন-সম্পদ লুট করা যায়। আমার নানা বলতেন যারা অপরের ক্ষতি করে,হারাম খায় কিন্তু আবার নামাজও পরে তাদের নামাজের সোয়াব নাকি গরুর পচে-গলে যাওয়া নারীভূড়ির মতো অবস্থায় প্যাকেট করে আল্লাহ্‌ ঐ ভন্ড নামাজি লোকের দিকে ছুড়ে দিবেন। আপনাদের এই জেহাদের সোয়াবও এইভাবে ফেরত পাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *