আমাদের যৌন ধারণা ও যৌন সম্পর্কের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে-(১)

কদিন আগে ফেসবুক বন্ধু রুপা আহমদ নামের একজন তার পিরিয়ড সংক্রান্ত এক অনুভুতি শেয়ার করায় তাকে কয়েকশ পুরুষ হেন ভাষা নাই যা দিয়ে গালাগালি করে নি। অনেকে তাকে সমর্থন ও জানিয়েছেন। আশ্চর্য হল এই কয়েকশ পুরুষের বাইরে অনেক নারীরা ও তাকে গালাগালি করেছেন। পুরুষতন্ত্র এক কথায় খারাপ, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক নারী আরো ও ভয়াবহ খারাপ। পুরুষ যে ভাষায় নারীকে আক্রমণ করে সেই ভাষায় যখন একজন নারী ও নারীকে আক্রমন করে তখন পুরুষতন্ত্র শুধু পুরুষের হাত থেকে মুক্তি পাবার বিষয় না, এটা তখন নারীর হাত থেকে নারী নিজেকে রক্ষার ও প্রশ্ন। সেটা সেদিন বুঝা গেছে ভাল করে। কেন তাকে এভাবে গালাগালি করা হল? এর উত্তরটার শিকড় অনেক গভীরে। কিন্তু ব্যাপারটা একটু যদি এগিয়ে চিন্তা করা যায় যেমন-যদি রুপা আহমদ লিখতেন ‘আমি মা হলাম’ বা ‘ আমার সন্তান হল’ তখন তাকে সবাই প্রশংসা আর শুভেচ্ছার ফুলঝুড়িতে ভিজিয়ে দিতেন। যদি এটা করা যায় তবে পিরিয়ডের অনুভুতি প্রকাশের পর নয় কেন? পিরিয়ড বা রজঃস্রাব ছাড়া তো কোন নারীর মাতৃত্ব হয় না, তাহলে এই অনুভুতি কেন পুরুষতন্ত্রের আঘাত প্রাপ্ত হল ? কেন পুরুষতন্ত্র একই রজঃস্বলা নারী এবং জন্মদাতা নারীকে নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন উল্লাসে মেতে উঠে? নারী যেখানে প্রতিমাসে এই রজঃস্রাবকে নিদারুন যন্ত্রনা হিসাবে দেখে পুরুষ সেটাকে কিভাবে দেখে-রক্তাক্ত যোনিমুখে চিরায়ত পুরষতান্ত্রিকতার উল্লাস হিসাবে? কিংবা এই উল্লাসের বাহ্যিকতা যদি পুরুষতন্ত্র হয় তাহলে তার ভেতরে কি আছে? এই ভিতরটা হল আমাদের যৌন সম্পর্ক ও যৌন ধারনা গড়ে উঠার ভিত বা প্যাটার্ণ।

গড়পড়তা আমাদের দেশে ‘যৌনতা’ সম্পর্কে সবার প্রথম কথা হল এটা একটা স্পর্শকাতর বিষয়। এই যে, ‘স্পর্শকাতরতা’, আমার কাছে মনে হয় এটার দুইটা আইডেন্টিকাল দিক আছে। প্রথমটা হল-আমাদের যৌন অনুভুতির কাতরতা, যৌনাঙ্গের কাতরতা, যৌন মিলনের স্থায়িত্ব বা পুলক প্রাপ্তির কাতরতা আর দ্বিতীয়টা হল- গোটা যে সামাজিক নৈতিকতা (সমাজ, ধর্ম, প্রথা, সংস্কৃতি মিলিয়ে তৈরি হয়েছে) সেটা ভেঙ্গে পড়া বা আঘাতপ্রাপ্ত হবার কাতরতা। রুপা আহমদের ক্ষেত্রে আমরা যে উল্লাস দেখেছি সেটা হল-পুরুষতন্ত্রের যৌন অনুভুতির কাতরতা আর নারীদের যে আক্রমন সেটা হল- সামাজিক নৈতিকতা ভেঙ্গে পড়ার কাতরতা। যে নারী হাজার বছর কাল ধরে নিজের অনুভুতিকে গোপন রেখেছে সেই অনুভতি যখন আরেক নারী ভেঙ্গে প্রকাশ করে দিচ্ছে, সেটা অন্য নারীর পক্ষে মানাটা অস্বাভাবিক। এই যে নৈতিকতা এটা তৈরি করার দায়ে পুরুষ দায়ী কিন্তু সেটা নিজের চিন্তায় বহন করার জন্য এই নারী ও দায়ী। ফলে একজন নারী পুরুষতন্ত্র থেকে মুক্ত হবার সাথে সাথে পুরুষতান্ত্রিক নারী যে তার ভিতরে গড়ে উঠেছে সেটা থেকে মুক্ত হওয়া ও জরুরী।

সভ্যতার শুরু থেকে একই শারীরবৃত্তীয় কাঠামো দিয়ে নারী-পুরুষের যে যৌন সম্পর্কে গড়ে উঠেছে সেটা এখন অনেক পরিবর্তিত হয়ে বহুমাত্রিক হয়েছে। যৌনতা শুধু এখন আর নারী বা পুরুষের শরীরে বিদ্যমান নাই এটা এখন ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশে ব্যাপৃত হচ্ছে। সে জন্য আমরা দেখি নারী বা তার শরীর নয় তার একটি আচ্ছাদন যেমন- বক্ষবন্ধনী বা কটিবন্ধনী বা তার ব্যবহার সামগ্রী ও এখন পুরুষের সুখ ভোগ আহরনের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য প্রতিমুহুর্তে তার শরীর নির্মিত হচ্ছে নতুন করে। এইসব কারনে নারী বা পুরুষ কেউই এখন আর শুধু শিশ্ন বা যোনীগত অনুভূতির বিষয় না বরং এটাকে কেন্দ্র করে এমন একটা এক্সটার্নালিটি তৈরি হচ্ছে যাকে বলা যায় ‘অনুভুতির অনুভুতীকরন’। একইভাবে পুরুষ ও নারীর কামনায় নির্মিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত । বডি স্প্রে, জিমনেশিয়াম, সিনেমা, পর্ণো, চটি, বার্বিডল, রঙ ফর্সাকারী, সাহিত্য, নারীর পোষাক, আই লাইনার, আই লেন্স, আইসক্রীম, ব্রেস্ট শেই্পিং ক্রীম নামক যে নানাবিধ আইটেম তৈরি হচ্ছে সেখানে আমাদের সনাতনী নারী বহুকাল আগে হারিয়ে গেছে। সেজন্য এখানে একজন রাধা বা অপসরা বা কান্তজীর মন্দিরে অংকিত নারী নাই, একজন ক্লিওপেট্রা বা ভেনাস নাই, জোলিও বা আফ্রোদিতি বা হেলেন নাই। এখানে সবাই বড়জোড় ঐশ্বরিয়া বা কেট উইন্সলেট, এরা সবাই চেহারায় ভিন্ন কিন্তু আবেদনগত মাত্রায় অভিন্ন। পপুলার কালচার বা জনপ্রিয় সংস্কৃতি নামক বিশ্বায়নের আড়তে নারীকে যে ‘সার্বজনীন জিরো ফিগার’ বানানোর চেষ্টা চলতাছে তার ব্যপৃতি যখন আমাদের মতো দেশের প্রথাগত সমাজের যৌন ধারনার সাথে মিলে মিশে ঝাঁকালো ককটেল তৈরি হয় সেটা নিয়ে ভাবার দরকার আছে বৈকি?

আমাদের দেশে কিভাবে একজন নারী বা পুরুষের প্রাথমিকভাবে সেক্সুয়াল ওরেয়েন্টেশন বা পরিচয় ঘটে এটা বিস্তর একটা গবেষনার পরিসরে ভাবার বিষয়। আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতায় যৌনতা একটি নিষিদ্ধ বিষয়। এটা নিয়ে আলাপচারিতা, এটার পাঠ্যপুস্তকগত শিক্ষা, বাবা-মায়ের সাথে আলাপচারিতার ধরন, সামাজিক গ্রুপের সাথে আলাপের ধরনটা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক পর্যায়ে আছে। যেহেতু এটাকে সামাজিক ভাবা হয় না সেজন্য এটার সাথে আমাদের ওরিয়েন্টেশনটা ও ঘটে বিভিন্ন বিকৃত উপস্থাপনার মাধ্যম। আমরা যেসকল উপায়ে এই ওরিয়েন্টেশন খুঁজে পাই সেগুলোর মধ্যে আছে-
(১) বাবা মায়ের যৌন ক্রিয়া দেখা ।
(২) বড় ভাই-বোনদের যৌন ক্রিয়া দেখা ।
(৩) গ্রামীন বাস্তবতায় উন্মোচিত স্থানে যৌন ক্রিয়া ( রাতের অন্ধকারে ঘরের দেউড়ি, গোয়াল ঘর, পুকুর পাড়, বাশঁঝাড়। দিনের বেলা-আলখেতের পাশে, নির্জন কোন স্থানে শয্যাগত ইত্যাদি)
(৪) বন্ধু-বান্ধবীদের মধ্যে অভিজ্ঞতার বিনিময় ।
(৫) সিনেমার দৃশ্য দেখে কামনা অবলোকন করা ( যেমন-বাংলা সিনেমার বাসর ঘরে নায়কের উপরে নায়িকা শুয়ে পড়ার মত একটা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় আছে-এটা অনেক কিশোরের যৌন ওরিয়েণ্টেশনের মধ্যে থাকে)।
(৬) কোন বয়স্ক পুরুষ কর্তৃক শিশুদের সাথে সমকামিতা।
(৭) মেয়েদের সাথে মেয়েদের সমকামিতা।
(৮) মেয়েদের ক্ষেত্রে আত্মীয় স্বজন দ্বারা শ্লীলতাহানি বা ধর্ষন ।
(৯) ছেলেদের ক্ষেত্রে হস্তমৈথুন ।
(১০) মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রথম রজঃবৃত্তি দেখা ।
(১১ )কারো ক্ষেত্রে মহিলাদের সন্তান জন্মদান দেখা ।
(১২) চটি বই পড়া ।
(১৩) গল্প সাহিত্যর উপাদান থেকে অভিজ্ঞতা লাভ ।
(১৪) নারী কিংবা পুরুষ একে অপরকে স্নানরত বা অন্য কোন অবস্থায় নগ্ন দেখা ।
(১৫) শরীরে হরমোন গত উপলব্ধি থেকে বুঝা যেমন-ছেলেদের বগল বা নিম্নাঙ্গে কেশ গজানো, মেয়ের ক্ষেত্রে স্তনাগ্র স্ফীত হওয়া)।
(১৬) খেলাধুলা থেকে ( গ্রামে কিশোর কিশোরীরা অনেক গ্রামীন খেলাধূলা থেকে যৌন ধারনা প্রাপ্ত হয় যেমন-পুতুলের বিয়ে একটা অন্যতম খেলা। এই খেলার একটা সুক্ষ সমাজতত্ব আছে-তারা পুতুলের বিয়ে দিতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী সাজে। এখানে তারা যৌন সঙ্গম করছে না কিন্তু যখন বড় কেউ তাদের এই খেলার ক্রিয়া দেখছেন তারা সেটা বুঝতে পারলে লজ্জা পায়। এই লজ্জা আসে যৌন ধারনা থেকে। আর এই ধারনা সম্বভবত আমাদের নিষিদ্ধ সমাজে খুব অল্প বয়সে সহজাত হয়) ।
(১৭) পাঠ্যপুস্তক থেকে শিক্ষা লাভ ( এটা আমাদের দেশে নাই )।

উল্লেখযোগ্যভাবে এই সব বিষয় ( সাথে আরো থাকতে পারে) দিয়েই যৌনতার সাথে আমাদের প্রাথমিক ওরেয়েন্টেশন ঘটে। ১৩ বা ১৪ বছর থেকে একটা ছেলে বা মেয়ে এই সব ক্রিয়া বুঝতে সক্ষম এখানে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল সেই সাথে সে এই জায়গা থেকে পুরোপুরি প্রতিক্রিয়া গ্রহন করতে পারে । এই প্রতিক্রিয়া একটা সময় তার যৌনতাকে শেইপ দেয়, তার মধ্যে যৌনতার প্যটার্ন গড়ে তুলে। যেমন যদি এই বয়সে একটা মেয়ে তার কোন পরিচিত কারো দ্বারা ধর্ষিত হয় তাহলে সে জীবনে ও যৌনতাকে আনন্দের সাথে গ্রহন করতে পারে না, অনেকের কাছে প্রতিটি যৌন সঙ্গমকে একেকটা ধর্ষন বা নির্যাতন মনে হয়, একইভাবে যদি কেউ অনাখাংকিত অবস্থায় কারো মিলন দেখে সে ও ভীতি লাভ করে, যারা অতিরিক্ত চটি, সিনেমা, গল্প এইসব থেকে অভিজ্ঞতা লাভ করা তারা হস্তমৈথুনের মত অভ্যাসকে পরিনত করে তুলে। উপরের যে উল্লেখিত ১৭ টি ওরিয়েন্টশেন আমরা দেখলাম সেটার বিভিন্ন ধরনের যৌন অনুভূতির প্রতিক্রিয়া আছে, যা পরিনত মানুষের যৌন অনুভুতিকে শেইপ দিয়ে চলে। আমাদের দেশে এই ১৭ টার মধ্যে মধ্যে ১৬ টার সাথে কোন না কোনভাবে আমাদের পরিচয় ঘটে কিন্তু প্রধানত যে মাধ্যম দিয়ে আমাদের সাথে যৌনতার ওরিয়েন্টেশন ঘটা উচিত-পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষা লাভ সেটা ঘটে না, যার ফলে আমরা যৌনতা সম্পর্কে গড়পড়তা যে ধারনা নিয়ে যৌবনপ্রাপ্ত হই সেটা বিকৃত। আর এই বিকৃতির প্রকাশ ঘটে এইসব পিরিয়ড গত বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের বিষয় দিয়ে।

বিঃদ্রঃ- এই লিখাটা ধারাবাহিকভাবে চলবে, অনেক আগ থেকে এটা নিয়ে ভাবলে শুরু করা হয় নি। বিজ্ঞানভিত্তিক একটি যৌন শিক্ষা কেমন হওয়া চাই এই জন্য এটা নিয়ে আগাতে চাই। আমাদের যৌনতার দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা, যৌনতার মানসিকতা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যৌনতার নিপীড়নমূলক কাঠামো, এর গড়ে উঠার ধরন, আমাদের শিল্প সাহিত্যে সিনেমায় পুরানে যৌনতার প্রকাশ, ধর্ষনের মনস্তত্ব, দার্শনিক ভিত্তি (বিশেষ করে-ফ্রয়েড, মিশেল ফুকো ও যৌনতার বস্তুগত ভিত্তি) আলোচনা এই সব নিয়ে লিখা আগাতে থাকবে। সবাই মতামত বই, রেফারেন্স এবং বিভিন্ন তথ্য ও তত্ব দিয়ে সহায়তা করলে উপকৃত হবো ) ।

৩ thoughts on “আমাদের যৌন ধারণা ও যৌন সম্পর্কের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে-(১)

  1. (১৭) পাঠ্যপুস্তক থেকে শিক্ষা

    (১৭) পাঠ্যপুস্তক থেকে শিক্ষা লাভ
    ( এটা আমাদের দেশে নাই )।

    আছে আপনি জানেন না।লেখাটা ভাল দিক থেকে লেখা তাই কমেন্ট করলাম।

  2. হুম, চলুক দেখি। তবে যৌন ধারনা
    হুম, চলুক দেখি। তবে যৌন ধারনা নেই বা পায় না তা কিন্তু নয়। স্কুল পাঠ্য বই এ নারি পুরুষ এর যৌন বিভিন্ন বিষ য় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ক্লাস ৮–৯ এর শারিরিকে শিক্ষা বই এ। সেক্সুয়াল ওরেয়েন্টেশন এর কিছু বিষ য়ে আপ্ততি আছে।

  3. আপনার লেখনী মুগ্ধ করেছে।
    আপনার লেখনী মুগ্ধ করেছে। আপনার কাছ থেকে এমন বিশ্লেষণধর্মী এবং চিন্তার খোরাক জোগানো পোষ্ট আশা করছি আরো…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *