বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যের প্রভাব

(বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যের প্রভাব প্রবন্ধটি ঋত্বিক কুমার ঘটকের Bangali cinema ; Literrary In fluence প্রবন্ধের ভাষান্তর। ভাষান্তর- জোনায়েদ রশিদ)

আমার বিবেচনায় আজকালকার বাংলা উপন্যাস মুমূর্ষু দশা অতিক্রম করছে। গত বিশ বছরে লিখিত হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে এই মূহুর্তে ৫/৭ টার বেশি উল্লেখযোগ্য রচনার কথা আমার মনে পড়ছে না। বাকিগুলো সিনেমার কথা মাথায় রেখেই লিখিত হয়েছে। মোটাদাগের স্থূলতা এবং অসততা বাদে ওগুলোতে লক্ষ্যণীয় কোন বৈশিষ্ট্য নেই।


(বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যের প্রভাব প্রবন্ধটি ঋত্বিক কুমার ঘটকের Bangali cinema ; Literrary In fluence প্রবন্ধের ভাষান্তর। ভাষান্তর- জোনায়েদ রশিদ)

আমার বিবেচনায় আজকালকার বাংলা উপন্যাস মুমূর্ষু দশা অতিক্রম করছে। গত বিশ বছরে লিখিত হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে এই মূহুর্তে ৫/৭ টার বেশি উল্লেখযোগ্য রচনার কথা আমার মনে পড়ছে না। বাকিগুলো সিনেমার কথা মাথায় রেখেই লিখিত হয়েছে। মোটাদাগের স্থূলতা এবং অসততা বাদে ওগুলোতে লক্ষ্যণীয় কোন বৈশিষ্ট্য নেই।

বর্তমানে চলচ্চিত্র এবং উপন্যাসের মধ্যকার সম্পর্ক দেনা-পাওনার। সাহিত্য রচয়িতারা সিনেমায় চলে এমন সব ক্লিশে স্থূল গল্প লিখে চলেছেন এই আশায় যে ওসব তাদেরকে সিনেমার প্রোডিউসারের কাছে আদরণীয় করে তুলবে। অন্যদিকে চলচ্চিত্রেও বাছবিচারহীনভাবে ঐসব স্থূল গল্পের চিত্রায়ন হচ্ছে, ফলে এ ধরণের রচনার পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পরিণামে ভালগার ও গার্বেজ সিনেমা এবং সাহিত্য দুটোরই উৎপাদন হার ঊর্ধ্বমুখী। দুটোই বিরক্তিকর, অখাদ্য এবং স্থূল আবেগে পূর্ণ। ওগুলো বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সম্পর্কের প্যাঁচালি প্রচার করে চলেছে অব্যাহতভাবে। একঘেয়ে বাক্যবগীশ নৈতিকতায় ভর্তি- যা কেবল বাস্তবতা এবং সত্য বিবর্জিতই নয় বুদ্ধিবৃত্তির পক্ষে অপমানজনকও।

১৯শ শতক তো বটেই বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও সাহিত্যের এমন করুণ দশা ছিল না। তখন লেখকরা লিখত কারণ তাদের কিছু বলার ছিল; জীবনের গূঢ় সত্য প্রকাশের জন্য আকুলতা অনুভব করত, তা করত সর্বোচ্চ সততা এবং আন্তরিকতা দিয়েই। বাংলা প্রকৃত বিচারেই সাহিত্য ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড অর্জন করেছিল। সাহিত্যের আজকালকার ফেরিওয়ালাদের প্রাদুর্ভাব তখনো হয়নি। সত্য ও সুন্দরের প্রতি অনুরাগ এবং ত্যাগ দুই’ই তাদের ছিল, ছিল অঙ্গিকার। বাংলায় যখন প্রথম প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হল স্বাভাবিকভাবেই তাতে সাহিত্যের প্রভাব পড়ল। শুরু থেকেই বাংলা চলচ্চিত্র মহৎ সাহিত্য হতে অকাতরে গ্রহণ করেছে, এটাকে সম্মাণীয় মনে করা হত। ফলে প্রথম থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রের যাত্রাপথ একপ্রকার নির্দিষ্টই ছিল। এটা অবশ্য বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিবাচক অর্জন।

কিন্তু অচিরেই বাংলা সাহিত্যের মানের পতন শুরু হল। তাতেও সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রের আত্তীকরণ বাড়ল বৈ কমল না। আমাদের মধ্যে যারা একটু সিরিয়াস নির্মাতা তারা চলচ্চিত্র উপযোগী মাল-মশলার খোঁজে বিগত আমলের সাহিত্যে মনোনিবেশ করলেন। কিন্তু সমস্যা হল বাংলা সাহিত্যের মহৎ উপন্যাসের প্রায় সবই ৪০ বছর আগেরকার সমাজ বাস্তবতার বয়ান। ফলত বাংলা সিনেমা সমকালের সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলল। স্পন্দমান বাস্তবতা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হল। শরৎচন্দ্রের মত লেখকরা আদর্শ হয়ে উঠলেন। এই সংস্কৃতি এখনো চলছে।

এইখানে দর্শকের প্রসঙ্গটাও গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রের প্রধান ভোক্তা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। বাংলার শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর একটি শ্রেণীরূপে উত্থান সাম্প্রতিক কালের ঘটনা। এমনকি আজকের দিনেও বাংলা চলচ্চিত্রের পৃষ্ঠপোষক প্রধানত মধ্যবিত্ত শ্রেণীই। চলচ্চিত্র মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দর্শন এবং রুচিকে ধারণ করেই নির্মিত হচ্ছে। এই শ্রেণী কান্নায় আমোদ পায়। তারা কারণে অকারণে কান্না করতে পছন্দ করে। মনের কোন তন্তু ধরে টান দিলে মধ্যবিত্তের কান্না সবচে ভালো হয় তা শরৎচন্দ্রের চেয়ে ভালো কেউ জানত না! চলচ্চিত্রও এই র্ফমূলা নকল করেছে। ঐ শ্রেণী বাগাড়ম্বরপূর্ণ নৈতিক সংলাপ পছন্দ করে। সামাজিক সমস্যাবলীর স্থূল সমাধান খোঁজে। পারিবারিক গ্যাঞ্জাম, বিশেষত নারীর তীব্র ভোগান্তি, দুঃখভোগ এবং অবশেষে পরাক্রমে জয়ী হওয়া এসবই তাদের অতি পছন্দণীয়।

স্বভাবতই আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতারা এসব বিষয় নিয়েই সিনেমা করে চলেছেন। তরল আবেগসর্বস্ব মধ্যবিত্তের দর্শনই আমাদের চলচ্চিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। মোটাদাগে চলচ্চিত্র হল চিত্রের মাধ্যমে গল্প বলা। চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা আছে, একটি সতন্ত্র ভঙ্গি আছে। এটির সৃজনশীল দিক নিয়ে কখনোই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি।

অবশ্য ফর্মুলা সিনেমার ব্যতিক্রম সবসময়ই ছিল। যেমন পিসি বারৈ’র কথা বলা যায়। ত্রিশের দশকে ইনিই এই মাধ্যমটির অল্প বিস্তর সৃজনশীল ব্যবহার করতে পেরেছেন। তাঁর গৃহদাহ শুরুর দিকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের একটি, যেটার চলচ্চিত্রিক রূপায়ন প্রণিধানযোগ্য। উত্তরায়নে গল্প বলার ক্ষেত্রে তিনি সাবজেক্টিভ ক্যমেরা ব্যবহার করেছেন। মাঝারিদের ভিড়ে তাঁর ছবিতে মাঝে সাঝে প্রকৃত চলচ্চিত্রের ঝলক পাওয়া যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর কালকে অতিক্রম করতে পারেননি।

চলচ্চিত্রের এই রুগ্ন দশার প্রধান কারণ সাহিত্যের উপর অতি নির্ভরশীলতা। এই নির্ভরশীলতার ক্ষেত্রে মানের বাছবিচার বালাই ছিল না। এই জন্যই বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যের প্রভাবকে আমি ক্ষতিকর মনে করি। এই অতি নির্ভরতার কারণেই আমাদের চলচ্চিত্রে সমকালের স্পন্দন অনুপস্থিত। আমাদের মূর্খ দর্শকরাও তাদের অজ্ঞানতা নিয়ে পরিতৃপ্ত।

৫০ দশকের গোড়া পর্যন্ত এই অবস্থা জারি ছিল। ঐ দশকের শুরুতে কিছু সৃজনশীল তরুণ তুর্কী চলচ্চিত্রকে সিরিয়াস শিল্প মাধ্যম হিসেবে নিলেন। ধীরে ধীরে এই চর্চা গতি পেতে লাগল, অতঃপর সত্যজিৎ রায়ের আবির্ভাব এবং তাঁর পথের পাঁচালী এই ধারাকে উত্তুঙ্গু অবস্থানে নিয়ে গেল। সত্য যে পথের পাঁচালীও একটি মহৎ উপন্যাসের রূপায়ন কিন্তু প্রথমবারের মত বাংলা কোন ছবিতে চলচ্চিত্রের ভাষার পরিপূর্ণ প্রয়োগ হল। চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্বের নিপুন প্রয়োগে শৈল্পিক সত্য বহাল থাকল, যেখানে দুটি মাধ্যমের মৌলিক পার্থক্য সুপষ্টভাবে আলাদাযোগ্য।

তখন থেকেই সিরিয়াস চলচ্চিত্র নির্মাণের একটা ধারা বেশ পষ্ট হয়ে উঠল যদিও সমান্তরালে পুরনো ধারাটিও চলে আসছিল। দুর্ভাগ্যজনক হল দুটো ধারারই সাহিত্যের উপর নির্ভরশীলতা ছিল তীব্র। দুর্ভাগ্যজনক কেন? কারণ হল সিরিয়াস চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের কাজের জন্য মহৎ কিছু খুঁজতে লাগলেন এবং তা করতে গিয়ে তাঁরা পূর্ববর্তীকালের মহান লেখকদের কাছে ফিরে গেলেন। ফলে তাঁদের কাজেও সমকাল সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত থাকল। কিন্তু চলচ্চিত্র কি তার চারপাশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে বিকশিত হতে পারে? তা কোন কালে হয়নি, এটা সম্ভবই না। সেলুলয়েড ফিতায় কিচ্ছা বলিয়েদের কথা ভুলে যাওয়া যাক, এরা চলচ্চিত্রকার নন কিন্তু যারা চলচ্চিত্রের শক্তি এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন তারাও ভুল পথে চললেন। একদিকে তাঁরা হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ালেন এমন এক যুগে যে যুগ গত হয়েছে ইতিমধ্যে এবং প্রাসঙ্গিকতাও হরিয়েছে। ফলত তাঁদের চলচ্চিত্রগুলো হয়ে উঠল সমকাল থেকে দূরবর্তী, জীবন থেকেও। অন্যদিকে তাঁদের কাজে সাহিত্যের দাসত্ব প্রকট- যা ওসবকে প্রকৃত চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে দেয়নি। চলচ্চিত্র মাধ্যমটির নিজস্ব ভাষা এবং উপাদান ব্যবহার করে ক’টি সত্যিকার ছবি নির্মিত হয়েছে? আমাদের মধ্যে হাতেগোনা দু’একজনই এই মাধ্যমটির মৌলিক দর্শন এবং প্রকাশভঙ্গি আয়ত্ত্ব করতে পেরেছেন।

দেশ বিদেশের চলচ্চিত্রের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাব আধুনিক কালের সিংহভাগ ছবি প্রধানত মৌলিক মাল মশলায় নির্মিত হচ্ছে। চলচ্চিত্র ক্রমশ নিজস্ব শক্তি এবং শৌর্যে পুষ্ট হয়ে উঠছে। এসব বিবেচনা করলে বাংলা চলচ্চিত্রের অবস্থা আমাকে হতাশ করে। যদিও অবাক হয়ে দেখি শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা গরিমায় আচ্ছন্ন, অন্তঃসারশূন্য দর্পে তৃপ্ত বাংলা চলচ্চিত্র। এই মনোভাব উই ধরা কাঠের মত ফাঁপা করে তুলছে চলচ্চিত্রকে।

চলচ্চিত্রকে অতিঅবশ্য এর লক্ষ্যের দিকে অবিচল এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকতে হবে, এই মুহূর্তে যা আমাদের চলচ্চিত্রে একেবারেই নেই। চারপাশের বিরাজমান বাস্তবতা চলচ্চিত্রে অনুপস্থিত। চলচ্চিত্রের লক্ষ্য কি? আমি ওইসব জোচ্চোর, মূর্খ চলচ্চিত্রকারদের কথা বলছি না, তারা বাংলায় তো বটেই পৃথিবীর সব প্রান্তেই আছেন। উনারা বড় বড় আদর্শের ফাঁপা বুলি কপচান, জাতীয় বিপর্যয় নিয়ে তত্ত্ব ঝাড়েন কিন্তু আখেরে বাগীশ ফর্মুলা সিনেমাই বানান। জীবনের সূক্ষ্ম সত্যের প্রতি নিবিড় দৃষ্টিপাত, সচেতন মনোযোগ, দায়বদ্ধতা এবং প্রতিবাদ এসব আজকের সাহিত্য বর্জন করেছে, নতুন কোন জাগরণের আশাও দুর্নিরীক্ষ্য। এক্ষেত্রে চলচ্চিত্রও সাহিত্যকে অনুসরণ করছে।

অবশ্য আমি আমাদের সমস্ত সিনেমা এবং সাহিত্যকে এককথায় বাতিল করছি না। আনন্দদায়ী ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। আজকের দিনেও সাহিত্যের প্রকৃত চলচ্চিত্রিক রূপায়ন হচ্ছে, আর আমাদের সাহিত্যও পুরোপুরি মরে যায়নি এখনো। সমস্যা হচ্ছে অনুপাত নিয়ে, তা রীতিমত আতঙ্কজনক। যদিও সাহিত্যের উপর চলচ্চিত্রের নির্ভরশীলতার কিছু ইতিবাচক দিক আছে কিন্তু নানাবিধ অবাঞ্ছিত কারণে ফল বরং নেতিবাচক হচ্ছে।

যা হোক উৎসাহী এবং আশাবাদী হওয়ার মত বিষয়ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দর্শকদের একটি বড় অংশ সিনেমার সমঝদার হয়ে উঠছে। তারা চলচ্চিত্রে বাস্তবতার প্রতিফলন দেখতে চায়। চলচ্চিত্র সংসদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে সারা দেশজুড়েই। চলচ্চিত্র সংসদগুলোর কার্যক্রমের ফলে দর্শকরাও শিক্ষিত হচ্ছেন, প্রকৃত চলচ্চিত্রের রসোপলব্ধির ক্ষমতাও সাধারণ্যে বাড়ছে। এসব দেখে আমার পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছে। তখন ছাত্ররা সাহিত্য সার্কেলে যোগ দিত, লক্ষ্য ছিল কবি হওয়া, আর এখন তারা ফিল্ম সোসাইটিতে যোগ দিচ্ছে। কারণ চলচ্চিত্র সাহিত্যের স্থান দখল করছে, সংস্কৃতির পুরোভাগে ওঠে আসছে। যুবক, ছাত্র, চাকুরীজীবী প্রত্যেকেই সিনেমার জন্য আকুল; তারা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছ থেকে বিশুদ্ধ, দায়বদ্ধ চলচ্চিত্র চায়। এইসব বস্তাপচা গল্পের চর্বিত পুনরাবৃত্তি চায় না।

তাদের চাওয়াটা যৌক্তিক বটে!

২ thoughts on “বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যের প্রভাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *