টাইপ রাইটারের খট খট শব্দ

রোজকার মতোই কম্পিউটার টেবিলে বসে টাইপ রাইটারের মত খট খট আওয়াজে সামনের তারিখে কোর্টে পেশ করার জন্য একটা দলিল টাইপ করছিলো অবলাকান্ত দাসগুপ্ত । তার বাবু, মানে ব্যারিস্টার চৌধুরী নিজামুদ্দিন সাহেব কতবার তাকে বলেছে – ওটা টাইপ রাইটার নয় হে অবলাকান্ত, আধুনিক কম্পিউটারের কীবোর্ড । ওভাবে শক্তি প্রয়োগ করে টাইপ করলে দুদিনেই নষ্ট হয়ে যাবে; আর এতে করে এক ঘেয়ে শব্দ তৈরি হয় – বড়ই বিরক্তিকর । তাছাড়া নিজের বাড়ীর লাইব্রেরী কাম চেম্বারটাকেও কোর্ট পাড়ার সেই বিরক্তিকর টাইপ রাইটারদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মতো মনে হয় নিজামুদ্দিন সাহেবের কাছে । যদিও ব্যাক্তিগত সহকারী কাম টাইপিস্ট অবলাকান্তের কাছে তিনি মুখ ফুটে এই কথাটা কখনোই বলেন নি । অবলাকান্ত অবশ্য চেষ্টা করে তার বাবুর কথা মতো শব্দ না করে টাইপ করতে । কিন্তু টাইপ করতে করতে খট খট শব্দটা মনের অজান্তেই তৈরি করে কিনা, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারে না । তবে টাইপ রাইটারের খট খট শব্দটা তাকে খুব করে টানে । কেমন যেন একটা ঘোরের মাঝে সেটা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যার তার শৈশবে ।

বাবা শশীকান্ত দাসগুপ্ত কোর্ট বাজারে টাইপ রাইটারের কাজ করত । সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কোর্টের কাজ-কর্ম করে, বিকেল যেত চৌধুরী বাড়ীতে; নিজামুদ্দিন সাহেবের বাবার চেম্বারে ফরমাইশ খাটতে । রোজগার মন্দ না, খেয়ে পরে দিব্যি যাচ্ছিল । মা ননী বালা ফাইভ পর্যন্ত লেখাপড়া জানা গৃহিণী, বাসায় টুক-টাক সেলাইয়ের কাজও করত । আর ছিল হাই স্কুল পড়ুয়া বড় বোন নিরুবালা । অবলা তখনো স্কুলে ভর্তি হয় নি । স্কুল থেকে এসে নিরু তার মাকে এতে ওতে সাহায্য করে । আর সুযোগ পেলেই রুপাকে তাদের বাড়ী থেকে ডেকে এনে পুতুল-হাঁড়িপাতিল খেলে । অবলাও মাঝে মাঝে নিরুর সাথে খেলত । খেলার সময় অবলাকে নিরু শুধু বাজার করতে পাঠাত, বলত – চাল-নুন (ধুলো), তেল (পানি) নিয়ে আসতে । কিন্তু কখনো পুতুল ধরতে দিত না । এই নিয়ে অবলা কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গিয়ে নালিশ করত – নিরু তাকে পুতুল ধরতে দেয় না । এই জন্য মা নিরুকে রোজ বকত । বলত – নিরু, তুই এত্ত বড় হয়ে গেছিস, তবু তোর খেলা গেল না রে । আর নিরু তখন বলত – পড়া তো শেষ মা, এখন খেললে কি হয় ?

অবলারা থাকতো ঐ কোর্ট পাড়ায়, দু-রুমের টিনশেডের একটা ভাড়া বাড়ীতে । পাশাপাশি দুটি ঘর । ঘরের সামনে কোমর সমান উঁচু পাঁচিল ঘেরা বারান্দা, তার এক কোনায় রান্নার জায়গা । বারান্দার সামনের জায়গা খোলাই ছিল । বিয়ের পর শশীকান্ত যখন এখানে এল, তখন টিন দিয়ে ঘিরে নিয়েছে । তাতে ছোট্ট গোল মতন একটা আঙিনাও হয়েছে । বারান্দায় দাঁড়ালে নাক বরাবর বাড়ীর দরজা । দরজার সাথেই একটা পেয়ারা গাছ । তারপর দুটো পাতা-বাহার । ডান দিকে কোনায় টিন-কাঠ দিয়ে বানানো মুরগীর ঘর । উত্তর দিকে গোসলখানা, তার উল্টোদিকে দখিন দেয়ালের কাছাকাছি মাটি দিয়ে গোড়া উঁচু করে বাঁধানো একটা তুলসী গাছ । বিশ-বাইশটা বাড়ী মিলে ছোট্ট কোর্ট পাড়া । অবলাদের বাড়িটা পাড়ার একেবারে শুরুতেই, ঢোকার মুখেই । বাড়ীর পিছনে একটা ডোবা মতো যায়গা । তারপর একটা ছোট মতো আমের বাগান আর খানিকটা খোলা জায়গা । বাঁ দিক দিয়ে রাস্তা চলে গেছে পাড়ার ভিতরে । বাড়ীর মালিক, শশীকান্তের দূর সম্পর্কের খুড়ো, স্বপরিবারে ইন্ডিয়া চলে গেছে সেই ৪৭ এর দেশ ভাগের সময় । আত্মীয়স্বজন অনেকেই থেকে গেছে এপারে, আর কিছু জমি জমাও আছে । তাই বছরে এক-আধ বার আসে আর সেই সময় ভাড়ার টাকা একবারে নিয়ে যায় ।

চৌধুরী বাড়ীর কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে শশীকান্তের রাত হয়ে যেত । ছোট্ট অবলা প্রতিদিন বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ত, নিজেও টের পেত না । সকালে ঘুম ভাঙতেই শুনতে পেত টাইপিং এর খট খট শব্দ । বিছানা ছেড়ে উঠে দেখত, খোলা জানালার সামনের টেবিলের চেয়ারে বসে বাবা টাইপ করছে । আর টেবিলের উপর রেডিও টা বেজে চলেছে । অবলার বাবা খবর শুনত । খবরের সময় মাঝে মাঝে টাইপিং করা বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে শুনত । সেই থেকেই খট খট শব্দটার সাথে অবলাকান্তের নিবিড় আত্মীয়তার সম্পর্ক ।

অবলাকান্ত তার বাবার সাথে চৌধুরী বাড়ীতে বেশ কয়েক বার গেছে । কখনো পাশে বসে একমনে বাবার টাইপিং করা দেখেছে । কখনোবা বাড়ীর বিশাল ফুল বাগানে ঘুরে ঘুরে হরেক রকমের ফুল দেখেছে । আবার কখনো কাজের ঘরের দরজায় বাঁধা বড় বড় লোম ওয়ালা সাদা ছোট্ট কুকুরটির সাথে খেলেছে । যেদিন অবলা সঙ্গে যেত সেদিন তার বাবা সন্ধ্যায় একবার বাড়ী ফিরত । তাকে রেখে, হাতমুখ ধুয়ে কিছু খেতে খেতে মায়ের সাথে গল্প করে আবার কাজে ফিরে যেত । বাবা-মায়ের গল্প শুনে অবলা কিছু বুঝত না । শুধু শুনতে পেত, বাবা বলছে – দেশের অবস্থা ভালো না, ননী । শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারে, তখন অবস্থা আরও খারাপ হবে । যুদ্ধ শুরু হতে পারে । এসব শুনে মা বলত – চৌধুরী সাহেবকে বলে কাজটা নাহয় ছেড়ে দাও তুমি । আমরা অন্য কোথাও চলে যাই । শুনে বাবা চোখমুখ শক্ত করে – যাই হোক, দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না আমি, বলতে বলতে বেরিয়ে যেত । এমন শক্ত কথা শুনে মা শেষে কোনরকমে বলত – সাবধানে যেও, আরা তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে এসো ।

দুপুর থেকে মেঘ গুড় গুড় করে শেষ বিকেলে বৃষ্টি শুরু হল । খুব দ্রুত সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো । সন্ধ্যার পর বৃষ্টিও একেবারে কমে গেল । এমন সময় ৪/৫ জন মানুষ এসে ঘরে ঢুকল । অবলা তাদেরকে আগে কখনো দেখেনি । তাদের মধ্য থেকে মোটাসোটা এক লোক বলল – কই, বাড়ীতে কে আছে ? লোকজনের কথার শব্দ শুনে পাশের ঘর থেকে ননীবালা বের হয়ে এলো । পেছনে নিরু । কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু-জন মানুষ সামনে এসে মা আর বোনকে হাত ধরে টানতে টানতে বাইরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো । ভয় পেয়ে ননীবালা বলতে শুরু করলো – আরে আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ? ছাড়ুন, ছাড়ুন; আমাদের ছেড়ে দিন । নিরুও ভয় পেয়ে মাকে ডাকা শুরু করলে, লোকগুলো তাদের মুখ চেপে ধরল । অবলা কিছু বুঝতে না পেরে দৌড়ে গিয়ে মাকে ধরে কাঁদতে লাগলো । লোকগুলো টেনে হিঁচড়ে ননীবালা আর নিরুকে বাড়ীর বাইরে নিয়ে যেতে থাকল । অবলাও কাঁদতে কাঁদতে মায়ের শাড়ি ধরে পেছন পেছন যেতে লাগলো । দরজার কাছে পৌছাতেই অবলা বাইরে একটা গাড়ী দেখতে পেল, স্টার্ট দেয়াই ছিল । গাড়ির পাশে সাদা পাঞ্জাবী আর বড় কালো টুপি পড়া একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে । তার পাশে অরো একজন দাঁড়িয়ে আছে ছাতা হাতে । অন্যদিন যাও বা দু-একজন মানুষ থাকে রাস্তায়, বিকেলের বৃষ্টির কারনে আজ তাও নেই । লোকগুলো ননীবালা আর নিরুকে সেই গাড়িতে জোর করে টেনে তুলে দরজা আটকে দিল । সবাই গাড়িতে উঠলে, গাড়ী দ্রুত সামনে চলতে শুরু করল । বাবার সাথে চৌধুরী বাড়ীতে যাওয়ার কারনে, অবলা টুপি-পাঞ্জাবী পড়া সেই লোকটাকে চিনতে পারল, বাবার মালিক চৌধুরী সাহেব ।

………………………………………………………..চলবে

৪ thoughts on “টাইপ রাইটারের খট খট শব্দ

  1. ভালো হচ্ছে। চালিয়ে যান।
    ভালো হচ্ছে। চালিয়ে যান। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    গল্প, আর অনুগল্প একই সাথে ট্যাগ দিলে ক্যামনে কি? আর এতো ভালো একটা গল্প হুদাই ক্যামনে হয়? :মাথানষ্ট:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *