একুশে পদকপ্রাপ্ত কালের সেরা বাঙালি

নানা ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক জামালপুর ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। উত্তাল যমুনা,ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই জেলা।দিল্লীর সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে (১৫৪২-১৬০৫খ্রীঃ) এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হযরত শাহ্‌জামাল ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে আস্তানা স্থাপন করেন। তাঁর পুর্ণ্যাত্মার স্মরণার্থে পরবর্তীতে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছে জামালপুর।জামালপুর জেলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিই নয়,যুগ যুগ ধরে অসংখ্য যোগ্য,বরেণ্য,আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তির জন্মভুমিও।সাংবাদিক-কবি,অভিনেতা,চলচ্চিত্র নির্মাতা,ভাষা সৈনিক,সমাজ সেবকে সমাদৃত আমাদের এই জেলা।যোগ্য,বরেণ্য ও উঁচু মাপের এই মানুষগুলোর সংক্ষিপ্ত জীবন-বৃত্তান্ত তুলে ধরার জন্য আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

হাসান হাফিজুর রহমান
কবি-সাংবাদিক,মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের প্রধান
জামালপুর শহরে ১৪ই জুন ১৯৩২ খ্রীঃ জন্মগ্রহন করেন হাসান হাফিজুর রহমান। তাঁর পৈতৃক নিবাস জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার কুলকান্দি গ্রামে।তিনি একাধারে কবি ও সাংবাদিক।তাঁর পিতা আব্দুর রহমান,পেশায় স্কুল শিক্ষক।স্ত্রী সাইদা হাসান।তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক(১৯৪৬) ও ঢাকা কলেজ থেকে আই.এ(১৯৪৮) পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ(১৯৫১)এবং বাংলায় এম.এ(১৯৫৫)ডিগ্রি লাভ করেন।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দলনে তিনি এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন।তাঁর সম্পাদনায় ভাষা আন্দোলনের ওপর সর্বপ্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ (১৯৫৩) প্রকাশিত হয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক(১৯৫৪-১৯৫৫)।১৯৫২-তে বেগম পত্রিকায় ,১৯৫৩-১৯৫৪ তে সওগাত পত্রিকায় ও ১৯৫৫-১৯৫৭ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সহকারি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।মাসিক সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’ (১৯৫৭)-এ সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরের সহযোগী হন।১৯৫৭-তে জগন্নাথ কলেজের বাংলার প্রভাষক নিযুক্ত হন।১৯৬৪-র গোড়ার দিকে চাকরিচ্যুত হন।অতঃপর কয়েক মাস দৈনিক পয়গামে সহকারি সম্পাদক হিসেবে কর্ম সম্পাদন করেন।১৯৬৫-র ১জানুয়ারি দৈনিক পাকিস্থানের সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন।দৈনিক পাকিস্থান পত্রিকায় সাংবাদিকতা করলেও গন চেতনা,গন দাবির প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ(১৯৭১) শুরুর পরপরই কুমিল্লা জেলার এক গ্রামে আশ্রয় গ্রহন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গ্রামবাসীদের মনোবল চাঙ্গা করার লক্ষে কাজ করেন।
স্বাধীনতার পর ‘দৈনিক পাকিস্থান’ ‘দৈনিক বাংলা’ নামে প্রকাশিত হলে এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির পদ লাভ(১৯শে ডিসেম্বর১৯৭১)। রাশিয়ার মস্কোতে বাংলাদেশ দুতাবাসের প্রেস কাউন্সিলর (১৯৭৩-১৯৭৪)।মস্কো থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর সংস্থাপন বিভাগের ও.এস.ডি(১৯৭৪-১৯৭৫)।বাংলা একাডিমী কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য (১৯৭৬-১৯৭৯)।১৯৭৭ এ বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস প্রকল্পের প্রধান নিযুক্ত হন।তাঁর সম্পাদনায় ১৬ খণ্ডে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃদলিলপত্র’ (১৯৮২-১৯৮৩) প্রকাশিত হয়।তিনি কবি,সমালোচক ও গল্পকার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।পূর্ব বাংলার যে আধুনিক কাব্য আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে হাসান হাফিজুর রহমান তার অন্যতম স্থপতি।তাঁর সাহিত্যকর্মে জনজীবনের প্রত্যাশা,জন্ত্রনা,প্রতিবাদ এবং সংগ্রামী জীবন চেতনার প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়।সমাজ ও জীবনের অঙ্গীকারে তাঁর সাহিত্য প্রগতিশীল শিল্প পরিচর্যায় সমৃদ্ধ।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ও কবিতা
বিমুখ প্রান্তর,আর্ত শব্দাবলী,অন্তিম শরের মতো,যখন উদ্যত সঙ্গীন,বজ্রচোরা আঁধার আমার,শোকার্ত তরবারি,আমার ভেতরে বাঘ,ভাবিতব্যের বাণিজ্য তরী

প্রবন্ধ
আধুনিক কবি ও কবিতা,মূল্যবোধের জন্য,সাহিত্য প্রসঙ্গ,আলোকিত গহব্বর

গল্প
আরো দু’টি মৃত্যু

পুরস্কার ও সম্মাননাঃ-
*লেখক সংঘ পুরস্কার(১৯৬৭)
*আদমজী পুরস্কার(১৯৬৭)
*বাংলা একাডেমী পুরস্কার(১৯৭১)
*সুফি মোতাহার হোসেন স্মৃতি পুরস্কার(১৯৭৬)
*অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার(১৯৮১)
*নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক(১৯৮২)
*একুশে পদক(১৯৮৪)
*স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) (১৯৭৮)

হার্ট ও কিডনির রোগে আক্রান্ত হয়ে ১ এপ্রিল ১৯৮৩ মস্কো সেন্ট্রাল ক্লিনিক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আনোয়ার হোসেন
বাংলার নবাব খ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা
পৃথিবীতে মানুষ তাঁর কর্মগুনে সাফল্য,সুনাম,সুখ্যাতি অর্জন করে জিবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠে। আনোয়ার হোসেন তাদের একজন।অভিনয় তাকে অমর করে রেখেছে।বাংলা সিনেমা জগতের নবাব বলে তাকে সম্বোধন করলে ভুল হবে না।নবাব সিরাজদ্দৌলা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের কারনে বাংলার আপামর মানুষ ‘বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা’ বলতে আনোয়ার হোসেনকেই বুঝেন।
খ্যাতিমান এই অভিনেতার জন্ম জামালপুর জেলার সুরুলিয়া গ্রামে ১৯৩১ সালের ৬ই নভেম্বর।তাঁর বাবার নাম নাজির হসেন,মাতা-সাইদা খাতুন।সুরুলিয়াতেই তাঁর শৈশব কাটে।১৯৫১ সালে জামালপুর গভঃ হাই স্কুল(বর্তমান জামালপুর জিলা স্কুল) থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন।এরপর ভর্তি হন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে।
স্কুল জীবন থেকেই আনোয়ার হোসেন অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত এবং নাট্য অভিনেতা হিসেবে এখানেই তাঁর যাত্রা শুরু হয়।স্কুলে থাকা অবস্থায় প্রথম অভিনয় করেন আসকার ইবনে শাইখের নাটক ‘পদক্ষেপ’ এ।তারপর থেকে মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন।মঞ্চে অভিনীত বিভিন্ন চরিত্রের মাঝে তাঁর উল্লেখযোগ্য চরিত্র ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’।মঞ্চে এই নাটকে বহুবার অভিনয় করেছেন তিনি।১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকায় চলে যান।এখানে চলচ্চিত্র পরিচালক মহিউদ্দিনের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে।মহিউদ্দিনের হাত ধরেই ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান আনোয়ার হসসেন।এরপর থামেননি তিনি একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে যান বিরামহীনভাবে। আতাউর খান পরিচালিত ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ ছবিতে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য পাকিস্থান থেকে নিগার এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে অকৃত্রিম অবদানের জন্য বিভিন্ন সংগঠন থেকে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।‘লাঠিয়াল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রথম জাতিয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান,পরে আরও দুই বার পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।১৯৮৮ সালে লাভ করেন দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা পুরস্কার ‘একুশে পদক’।
রাজনীতি করেন নি তবে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন ।
খ্যাতনামা এই গুণী শিল্পী……………………

আমজাদ হোসেন
চলচ্চিত্র নির্মাতা
মানুষের ভালোবাসায় শিল্প-সাহিত্যর জীবন্ত কিংবদন্তী প্রান্তিক জনপদের প্রতি যার অপরিসীম আবেগ,সেই জীবন সংগ্রামী,কথা সাহিত্যিক,নাট্যকার,চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেন ১৯৪২ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর জামালপুর শহরের ইকবালপুরে জন্মগ্রহন করেন।তার পিতা নূর উদ্দিন,মাতা করিমাতুন নেছা।১৯৬৫ সালে জামালপুর গভঃ হাই স্কুল(বর্তমান জামালপুর জিলা স্কুল) থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৫৮ সালে আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা সিটি কলেজ এ স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন।
স্নাতক অধ্যায়ন ঢাকা বেতারর নাটকের কাজ শুরু করেন।ঢাকার ধারাপাত নাটকের মধ্য দিয়ে জামালপুরের বাইরে প্রথম নাটকের সূচনা হয়।মাঝে মধ্যে জামালপুরের নাট্যবাক্তিত্বের (কাবেশ দে,মনি বাবু,এম.এস হুদা,মোখলেছুর রাহমান ফকির,মোকছেদুর রাহমান,ফরহাদ হোসেন মানু প্রমুখ)আমন্ত্রনে জামালপুরে এসে ‘দায়ী কে?’, ‘উল্কা’ প্রভৃতি নাটক করেছেন।
‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে শ্রমিক নেতার ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম আগমন।এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রেডিও,টেলিভিশন,মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে হয়ে উঠেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় মুখ।
গোলাপী এখন ট্রেনএ,ভাত দে,জন্ম থেকে জ্বলছি এরকম অসংখ্য চলচ্চিত্র-গান লিখে তিনি ১৬টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা পুরস্কার ‘একুশে পদক’ পান।

কৃতজ্ঞতায়ঃ নাছিমা আক্তার
প্রধান শিক্ষক,জিলা স্কুল
জামালপুর

৩ thoughts on “একুশে পদকপ্রাপ্ত কালের সেরা বাঙালি

Leave a Reply to ফজলে রাব্বী সৌরভ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *