গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন ভাতার আন্দোলন এবং একজন দেলোয়ার

“অনশন ভাংলেও লাভ নাই। আগে এলাকার দোকানদারে বাকি দিত। এইহানে কাজ করি তাই বাকি চাইলে কারখানার পাশের দোকানদারেও বাকি দিত। অহনে বেতন পাইনা তিন মাস। বাকি দিব কেডা? অনশন ভাংলেওতো তো ভাই হেই অনশনেই থাকতে অইব।’’

কথাগুলো বলছিল তুবা গ্রুপের অনশনরত একজন শ্রমিক। ছেলেটার বয়স আঠারো পেরোয়নি।

“অনশন ভাংলেও লাভ নাই। আগে এলাকার দোকানদারে বাকি দিত। এইহানে কাজ করি তাই বাকি চাইলে কারখানার পাশের দোকানদারেও বাকি দিত। অহনে বেতন পাইনা তিন মাস। বাকি দিব কেডা? অনশন ভাংলেওতো তো ভাই হেই অনশনেই থাকতে অইব।’’

কথাগুলো বলছিল তুবা গ্রুপের অনশনরত একজন শ্রমিক। ছেলেটার বয়স আঠারো পেরোয়নি।
লাউডস্পিকারে তখন বিভিন্ন সংগঠনের বিভিন্ন লোকজনের সংহতি বক্তব্য। তার ফাঁকে ফাঁকে চলছে স্লোগান ‘শ্রমিক যখন না খায়ে মরে, প্রধানমন্ত্রী ঈদ করে’, ‘শ্রমিক যখন না খায়ে মরে, বিজিএমইএ ঈদ করে’। ঈদের ছুটিতে উত্তর বাড্ডায় নগরীর অন্যতম ব্যস্ততম সড়কে তখনও বাহারী পাঞ্জাবী আর পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে নগরীর উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তরা। রাস্তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে হয়ত তারা ভাবছে, ‘এ আবার কোন নাটক’। আমরা মধ্যবিত্ত- উচ্চবিত্ত চিরকালই সিভিক সেন্স নিয়ে নাক উঁচু স্বভাবের। রুচিশীলতার আড়ালে আমাদের সুশীল- ভদ্র সমাজে এই শ্রমিকদের প্রবেশাধিকার নেই কোন। আর যখনই এই শ্রমিকরা আন্দোলনে যায় বেতন-ভাতার দাবিতে, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় আমাদের এই সভ্য- সুশীলতার বুলির ফাঁপা আওয়াজটা আসলে অনেক বড় রকমের একটা মিথ্যে ছাড়া কিছুই নয়; আমরা তখন আবারও পালাই আমাদের ফাঁপা সুশীলতার পেছনে।

“আপনারা গার্মেন্টসের ভেতরে আন্দোলন করছেন কেন? রাস্তায় নেমে পড়েন। গার্মেন্টসের ভেতরে আন্দোলন করে কি হবে?” প্রশ্ন করেছিলাম ছেলেটাকে। তারপর জানলাম সরাসরি অনশনে নামেন নি তারা। অনশনের আগে বিক্ষোভ করেছেন রাস্তায়। মিছিল করেছেন। মিছিলে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস- ছররা বুলেট খেয়েছেন। প্রথমে তারা রাস্তার পাশেই অনশন করতে চেয়েছিলেন। পুলিশের তাড়া খেয়ে ঢুকেছেন গার্মেন্টসের ভেতরে। সেখানেই চলেছে অনশন।

কথা বলতে বলতে এক নারী শ্রমিক এগিয়ে এলেন ছেলেটার সাথে কথা বলার জন্য। তাঁকে দেখিয়ে ছেলেটা বলল, ইনিও ছররা খেয়েছেন। বোকার মত প্রশ্ন করে বসলাম; ‘আপনি ছররা খেয়েছেন?’ কোন উত্তর না দিয়ে চলে গেলেন তিনি। আমাকেও হয়ত তিনি ভেবেছিলেন কোন ঘোলা জলের মৎস্য শিকারী। নিজের মধ্যবিত্ত শ্রেণীচরিত্র বিশ্লেষণে বসলে বুঝি, ঘৃণার অভিব্যক্তি আমার প্রাপ্য।

২০১২ সালের ২৪শে নভেম্বর এই তুবা গ্রুপেরই মালিকানাধীন তাজরীন ফ্যাশনের কারখানায় এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে মারা যায় ১১২ জন শ্রমিক। তাঁরা হয়ত বাঁচতে পারতেন। কিন্তু আগুনের মধ্যে গার্মেন্টসের কলাপসিবল গেট আটকে রাখা হয় চেকিং এর জন্য। মালিকদের ভাবনা হচ্ছে এরকম, শ্রমিক মরলে শ্রমিক পাওয়া যাবে। তার জন্য অতিরিক্ত পয়সা লাগবেনা। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে একজন যদি একটা পার্টস খুলে নিয়ে যায়, তাহলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা লস। সভ্যতার কারিগর শ্রমিকের জীবনের থেকে একটা মেশিনের পার্টসের মূল্য অনেক বেশী।

একারণেই হয়ত মামলার প্রাথমিক চার্জশিট থেকে বাদ যায় তুবা গ্রুপের মালিক তথা ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ারের নাম। একারণেই হয়ত তাকে বাঁচানোর জন্য তদবির করে গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। আর বিজিএমইএর আকূল মানবিক আহবানে সাড়া দিয়েই হয়ত তাকে বাঁচানোর জন্য তৎপর হয়ে পড়ে সরকার।

নইলে দেলোয়ারকে গ্রেফতার করতে কেন সাড়ে চৌদ্দ মাস সময় লাগবে? আর গ্রেফতারের পর ছয় মাসও জেলে রাখা গেলনা তাকে। ঈদের ছুটিতে অনশনরত শ্রমিকের বেতন হয় না। কিন্তু ঈদের ছুটিতে ‘বিশেষ জামিন’ এর আদেশ নিয়ে বের হয়ে আসে দেলোয়ার।

কয়েকটা সূত্রে জানা যায় দেলোয়ারের মুক্তির জন্য শ্রমিকদের আন্দোলনে নামাতে চেয়েছিল মালিকপক্ষ। শ্রমিকরা অস্বীকৃতি জানায়। তারপর ইচ্ছে করেই শ্রমিকদের বেতন- ভাতা আটকে রাখা হয়। যাতে করে এরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি করে তার সুযোগে দেলোয়ারকে ছাড়ানো যায়। এ নিয়ে শ্রমিকদের অভিযোগও আছে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এই অভিযোগের জন্য কোথাও দুই থেকে এক লাইনের বেশী বরাদ্দ নেই। শ্রমিকদের জন্যই করা সরকারি তহবিল থেকে শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ থাকেনা। বেসরকারি জায়গা নিয়ে আহাজারি করে লাভ আছে?

অনশন শুরুর পর বিজিএমইএ’র হর্তাকর্তারাতো সরাসরিই বলেছেন, মালিক জেলে থাকাতেই এত কিছু। তাদের আরো বক্তব্য হচ্ছে, মালিক না থাকলে ব্যাংক লোন দেয়না, তাই বেতন হয়না। কিন্তু, মালিক না থাকায় তুবা গ্রুপের একটা শিপমেন্টও কিন্তু বন্ধ হয়নি। এইতো এই বিশ্বকাপের সময়েও জার্সির একটা বড় কনসাইনমেন্ট গেল। দেলোয়ার জেলে থাকায় মেসি- নেইমারের খেলা বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়ে গেছে পাঁচটি গার্মেন্টসের ষোলশত শ্রমিকের বেতন। দেলোয়ার সেখান থেকে ছাব্বিশ কোটি টাকা পেয়েছে। শ্রমিকরা কিছুই পায়নি।

এদিকে দেলোয়ারের মুক্তিতে কিন্তু মোটেও খুশি নয় শ্রমিকরা। এই খবর পাওয়ার সাথে সাথে রাস্তায় নেমে এসেছে তারা। বেতন পাক বা না পাক; শ্রমিকের খুনীকে মুক্ত দেখতে চায়না কোন শ্রমিক। পুঁজির এটা একটা দূর্বল দিক। নিজের অগোচরেই শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি করে অলিখিত বন্ধন।

আমরা মধ্যবিত্ত। অন্তত এখানে অধিকাংশই। এই মধ্যবিত্ত নিজে পুঁজিপতি হতে পারুক আর না পারুক; পুঁজির দালালিতে কার্পণ্য করেনা। মাঝে মাঝে আমরা আসল পুঁজিপতিদের চেয়ে হয়ে উঠি বড় পুঁজিবাদী। কারণ, তার যেমন হারানোর আছে অনেক; পাওয়ারও আছে অনেক। আর স্বীকার করতে চাই বা না চাই, এটাই আমাদের শ্রেণীচরিত্র।

তাই এই মুহুর্তে বেশী কিছু করতে পারব কিনা জানিনা; তবে আমার মনে হয় শ্রমিকশ্রেণীর এই সংকটময় মুহুর্তে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালে আমাদের সুশীল সিভিক সেন্সের রুচিশীলতার গায়ে কোন আঘাত পড়বেনা।
আমার কথাগুলো একটু ঔদ্ধত্যপূর্ণ। কারো গায়ে যদি ঘা লাগে ক্ষমা করবেন। না করলেও আমার কিছু যায় আসে না। নিজে মধ্যবিত্ততো! আমি আমাকে চিনি। সুতরাং, নিজের শ্রেণীটাকেও চিনি বললে ভুল হবেনা। তাই নিজেকে শুদ্ধ সবার গায়ে একটু নুনের ছিটা দেয়ার চেষ্টা করলাম। ঘা এর অনুভূতি না এলে অনতিবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া দরকার। কুষ্ঠ একটি নিরাময়যোগ্য ব্যাধি।

যাই হোক, গণ- অধিকার সংগ্রাম কমিটি আজ বিকেল পাঁচটায় শাহবাগ চত্বরে খুনি গার্মেন্টস মালিক দেলোয়ার হোসেনের জামিনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মশাল মিছিল করতে যাচ্ছে। সেখানে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি সবাইকে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে এই ফেসবুক ইভেন্টটা দেখতে পারেন। শুভরাত্রি।

৭ thoughts on “গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন ভাতার আন্দোলন এবং একজন দেলোয়ার

  1. খুনি দেলোয়ারের জামিনের জন্য
    খুনি দেলোয়ারের জামিনের জন্য ভালোই কাহিনী চলতেছে। শ্রমিকদের জিম্মি করে মুক্ত হবে খুনি। কার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে এই আইডিয়া বাইর হইছে তারে আগে খুঁজে বাইর করা দরকার। তারে মমি বানায়া রাখা হোক ফার্মগেটে চৌরাস্তায়। এই চিজ দেখার সৌভাগ্য পাক মানুষ যুগ যুগ ধরে।

  2. এই অনশনে নতুন মাত্রা যোগ করলো
    এই অনশনে নতুন মাত্রা যোগ করলো শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু। বিভিন্ন সময় শ্রমিক নেতাদের উস্কানী দিয়ে, মালিকপক্ষের সাথে আঁতাত করে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক বনে যাওয়া এই নেত্রী এবার কোন নাটক রচনা করতে চলেছে সেটা নিয়ে সন্দিহান।
    সিইপিজেডে ইয়ংওয়ান ফ্যাক্টরীতে অসন্তোষ লাগানোর পেছনে মূল কলকাঠি নেড়েছে এই মহিলা। একসময় হেল্পার হিসেবে চাকরী করেছে, পরবর্তীতে শ্রমিক আন্দোলনের সাথে জড়িত হয়ে অচিরেই প্রভূত সম্পত্তির মালিক বনে যায়। ইয়ংওয়ানে কর্মকর্তা হত্যা এবং লাশ ক্যামিকেলের ড্রামে গুম করার মতো ঘটনা যখন ঘটছিলো, তখন এই নেত্রী আগ্রাবাদ হোটেলে অবস্থান করছিলো। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যাওয়ার পরেই চুপিসারে চট্টগ্রাম ছাড়তে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের নজরে পড়ে যায়।

    দেলোয়ারের উপযুক্ত শাস্তি হোক, যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায় করে গার্মেন্টসটি নিলামে তুলে বিক্রয় করে দেয়া হোক। তবুও এই মালিকপক্ষের হাতে যেন না পড়ে।

      1. এই ন্যাতা খ্যাতা কিন্তু
        এই ন্যাতা খ্যাতা কিন্তু স্যালাইনের পর স্যালাইন লাগিয়ে শুয়ে আছে শ্রমিকদে সাথে। কিন্তু আঁতাত করা যেহেতু তার স্বভাব, তাকে চোখে চোখে রাখা উচিত সবারই।

    1. আপনি বোধহয় নাজমা আকতারের সাথে
      আপনি বোধহয় নাজমা আকতারের সাথে মোশারেফা মিশুকে ঘুলিয়ে ফেলছেন। আমি যতদূর জানি, মোশারেফা মিশু ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা। এক সময় বদরুদ্দীন উমরদের সাথে ছিলেন।

      আপনার বর্ণনার সাথে নাজমা আক্তারেরই মিল পাওয়া যাচ্ছে।

      আপনার কথার স্বপক্ষে কোন যুক্তি বা ভেরিফাইড তথ্য- উপাত্ত দিলে খুশী হব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *