একটি ঈদ এবং স্বপ্নের অপমৃত্যু!

১.
বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে।
গাড়ির জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোটা গুলো আঁকা বাকা হয়ে নেমে আসছে।
ঝাপসা জানালায় জমে যাওয়া বাষ্পে তর্জনী দিয়ে দুটো নাম লিখল মোহাম্মদ জয়নাল। মোবারক, ঝুমুর।
মোবারক তার বড় ছেলে। বয়স ৭ বৎসর। ক্লাশ টু তে পড়ে। আর ঝুমুর তার ছোট মেয়ে। একমাত্র মেয়ে। বয়স দেড় বৎসর।
জ়য়নাল ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছে। ঢাকায় সে একটা ছোট খাটো ব্যবসা করে। পুরাতন বইয়ের ব্যবসা। বিভিন্ন স্ক্র্যাপের দোকান থেকে পুরাতন বই সংগ্রহ করে সে। তারপর ফুটপাতে গামছা বিছিয়ে বসে পড়ে।


১.
বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে।
গাড়ির জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোটা গুলো আঁকা বাকা হয়ে নেমে আসছে।
ঝাপসা জানালায় জমে যাওয়া বাষ্পে তর্জনী দিয়ে দুটো নাম লিখল মোহাম্মদ জয়নাল। মোবারক, ঝুমুর।
মোবারক তার বড় ছেলে। বয়স ৭ বৎসর। ক্লাশ টু তে পড়ে। আর ঝুমুর তার ছোট মেয়ে। একমাত্র মেয়ে। বয়স দেড় বৎসর।
জ়য়নাল ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছে। ঢাকায় সে একটা ছোট খাটো ব্যবসা করে। পুরাতন বইয়ের ব্যবসা। বিভিন্ন স্ক্র্যাপের দোকান থেকে পুরাতন বই সংগ্রহ করে সে। তারপর ফুটপাতে গামছা বিছিয়ে বসে পড়ে।

রমজানে তার তেমন একটা ব্যবসা হয় নি। মানুষ রমজানে বই কিনে না। কিনে শাড়ি চুড়ি। তবে টি.এস.সি’র দিকে গেলে কিছু বই বিক্রি হয়। পুরো রমজানে যা বিক্রি হয়েছিল তার সিংহ ভাগ দিয়ে ছেলে মেয়ে, বউ এবং মায়ের র জন্যে ঈদের পোশাক কিনে ফেলেছে। তার ছেলেটা অনেক করে তাকে বলেছে নূতন জামা কাপড়ের কথা। জয়নালও কথা দিয়েছে মোবারককে। তার জন্য সুন্দর দেখে কাপড় চোপড় নিয়ে যাবে।

কিছুদিন আগে মোবারকের সাথে কথা হয়েছিল জয়নালের।
-হ্যালো বাবা, আমার লাইগা নতুন কাপড় কিনছ?
-হ বাপজান। তোমার লাইগা নতুন কাপড় চোপড় কিনছি।
-কী কী কিনছ?
-এখন তো বলা যাইত না। বাড়িত আইলেই দেখবা।
-বাবা, আমার লাইগা কি পেলাস্টিকের জোতা কিনছ? চালওয়ালা পেলস্টিকের জোতা?
-হ কিনছি। পাতা রংগের পেলাস্টিকের জোতা। তোমার বইনের লাইগাও কিনছি, পেলাস্টিকের পিচ পিচ জোতা। পায়ে দিয়া হাটলেই পিচ পিচ কইরা আবাজ করে। আবার রাইতের বেলা বাত্তিও জলে।
-বাবা, সত্য কইতাছ? মা’র লাইগা কিছু কিন নাই?
-হ সইত্য কইতাছি। তমগো মা’র লাইগ্যাও কিনছি। তমগো দাদীর জন্যেও কিনছি।
-বাবা,তুমি কত্ত বালা। তুমি তাড়াতাড়ি কইরা বাড়িত চইলা আস বাবা। মা তোমার লাইগা নাইরকেল পুলি পিডা বানাইছে।
-ঠিকাছে বাপধন। আমি ঈদের আগে আগেই চইলা আমু।
গাড়িটা একটু ঝাকড়া দিয়ে উঠল। কম ভাড়ার লোকাল বাস। জায়গায় জায়গায় থামে। অনেক মুলামুলি করে জয়নাল বাসটাতে উঠেছে।

৩.
গাড়িটা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে একটা স্টপেজের সামনে। অনেক প্যসেঞ্জার নেমে গেছে, আবার অনেকে উঠছে। কেউ কেউ গাড়ির হেল্পারের সাথে ভাড়া নিয়ে তর্ক করছে। খুব বিরক্ত লাগছে জয়নালের কাছে। এমনিতেই রোজা। তার উপর বাড়ি যাওয়ার জন্যে তাড়া।
জয়নাল তার হাতে রাখা ব্যাগের চেইনটা খুলে দেখল। ছেলে মেয়ের জন্যে কেনা কাপড় চোপড় গুলো একটু এদিক ওদিক করে দেখে নিল। আবার চেইন মেরে ব্যগটা হাতের সাথে খুব শক্ত করে চেপে ধরল।

পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে নিল জয়নাল। তার বাড়ির পাশের এক চাচাতো ভাইয়ের কাছে ফোন করল।
-হ্যালো কবির, হ্যালো??
-কে, জয়নাল ভাই?
-হ রে কবির। বাড়িত আইতাছি। তর ভাবিরে একটু খবরটা দিস।
-জয়নাল ভাই, আমিতো বাড়িত নাই। কিছু সদাই পাতির জন্যে বাজারে আসছি। বাড়িত গেলে ভাবিরে খবর দিমু নে।
-খবর দিবি কিন্তু!
-আইচ্ছা দিমু নে।
গাড়িটা ধীরে ধীরে চলা শুরু করেছে।
ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। হাতের ব্যগটাকে আরও শক্ত করে ধরে বাসের সিটে হেলান দিল জয়নাল। লোকাল বাস, এই সিট থেকে ঐ সিটে জায়গা খুবই কম। কোন মতে পা দুইটা মেলে চোখ বুজলো জয়নাল।

৩.
-ভাবী, ও ভাবী, কই গেলা?
-কে রে? কবির?
-হ ভাবী। ভাইসাব বাড়িত আইতাছে।
-কস কী? কাইল রাইতেও তো হ্যার লগে তোর মুবাইল দিয়া কতা কইলাম। তখন তো কিছুই কইল না। তুই কী সত্য কইতাছস?
-হ ভাবী। হ্যায় তো তাই কইল। ঘন্টা দেড়েক আগে মুবাইলে কইছিল।

কবির খবরটা দিয়ে চলে গেল।
জয়নালের বউ, সুমি’র মনটা কেমন যেন খুশিতে ভরে উঠল। দৌড়ে গিয়ে তার শ্বাশুড়িকে খবরটা দিল।
তাড়াতাড়ি করে ঘর দোর পরিষ্কার করা শুরু করল। ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে মোবারককে ডাকতে লাগল।
-মোবারক, অ মোবারক, কই গেলি বাব? তর বাপ আইতাছে।
কোত্থেকে যেন মোবারক দৌড় দিয়ে উঠোনে চলে এলো।
-কও কী মা? বাবা আইতাছে?
-তর বাবা আইতাছে। তর কবির কাকা আইসা খবর দিয়া গ্যাছে। যা তাড়াতাড়ি গুসল কইরা ল। তুই আগুসইল্যা, তর বাপ আইসা দেখলে রাগ করব।
-আইচ্ছা মা। তুমি আমারে সাবান দেও। আমি এক দৌড়ে পুকুর থেইক্যা ডুব দিয়া আসি।
মোবারকের হাতে একটা বাংলা সাবানের টুকরা দিয়ে সুমি বলল, বেশি কুদাকুদি করিস না বাবা
-আইচ্ছা মা।

গোসল শেষে মাথায় সরিষার তেল দিল মোবারক। আগে তার মা’ই তাকে তেল দিয়ে দিত। আজ সে নিজে নিজে দিচ্ছে। তার খুব আনন্দ হচ্ছে। তার বোন ঝুমুরকে সে বলছে, ঝুমুর, জানস, বাবা আইতাছে? আমি রাস্তার দিকে যামু বাবারে আগাই আনতে। তুই যাবি আমার লগে?
ঝুমুর কিছু বলে না। সে শুধু তার ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে। তার চোখেও স্পষ্ট আনন্দের রেখা বুঝা যাচ্ছে।
মোবারক একটা মান কচুর পাতা জোগাড় করল।
এক হাতে কচু পাতা মাথায় ধরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে ঝুমুরকে কোলে নিয়ে রাস্তার দিকে রওয়ানা দিল মোবারক।
তার মা’কে কিচ্ছু বলে নি সে।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুই ভাই বোন। লক্ষ্য থেমে যাওয়া বাস গুলোর দিকে। কখন তার বাবা বাস থেকে নামবে।
অনেক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুই ভাই বোন। মাথায় কচু পাতা। কচু পাতা থেকে ফোটা ফোটা বৃষ্টি পড়ে ঝুমুরকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সে ঝুমরকে আগলে নিল।
অনেক বাস এসে থামল। কিন্তু কোনটা থেকেই তার বাবা নামল না। বিরক্ত হয়ে সে বাস গোনা শুরু করল। ১,২,৩….

৪.
ঢাকা কুমিল্লা মহাসড়কের ক্যান্টনমেন্ট নামক জায়গার একটু কাছে একটা দূর্ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রামের দিক থেকে আসা নাক লম্বা একটা মালবাহী ট্রাক এবং একটা যাত্রীবাহি বাসের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বাসটার সামনের দিকটা দুমড়ে মুছড়ে গেছে। ড্রাইবার সহ ১২ জন স্পট ডেড। ২১ জন আহত। তাদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা গুরুতর। তাদেরকে পার্শ্ববর্তী ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দূর্ঘটনার জায়গায় বৃষ্টির পানিতে লাশগুলোর রক্ত চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। উৎসুক জনতার ভিড় ঠেলে পাশের থানার ওসি সাহেব এসে জায়গাটা পর্যবেক্ষন করছেন। অনেক পত্রিকার সাংবাদিক এসেছেন। ওসি সাহেব তদন্তের কথা বলে চলে গেলেন।

হাসপাতালে একজন আহত প্যাসেঞ্জারকে বাঁচানোর খুব চেষ্টা চলছে। তাকে ইমার্জেন্সি রক্ত দেয়া হয়েছে। লোকটার আবার বিরল রক্তের গ্রুপ। B-,বি-নেগেটিভ। হাসপাতালের ফাইনাল ইয়ারের এক ছেলেরও একই গ্রুপের রক্ত। ছেলেটা হিন্দু হওয়ায় ইমার্জেন্সি লোকটাকে রক্ত দিতে পেরেছে। আরেক ছেলেরও একই রক্তের গ্রুপ। কিন্তু সে রোজা থাকায় রক্ত দিতে পারছে না। লোকটার প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে। রক্ত বন্ধের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তরুন ডাক্তাররা। শরীরের অনেক জায়গায় কেটে যাওয়ায় লোকটাকে অনেক জায়গায় সেলাই দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। অবাক করা কান্ড। লোকটার কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ। তা ছিঁড়ে ভেতর থেকে কাপড় চোপড় বেরিয়ে এসছে। ভেতরে একটা সবুজ রংগের প্লাস্টিকের জুতো দেখা যাছে। রক্তে ব্যগটা ভিজে গেছে। ডাক্তাররা ব্যগটাকে যত্ন করে তুলে রাখল।

প্রচুর রক্তের প্রয়োজন। যে হিন্দু ছেলেটা রক্ত দিয়েছে সে বিভিন্ন জায়গায় ফোন দিচ্ছে। ফেইসবুকে একটা রক্তের গ্রুপে পোস্ট দেয়া হয়েছে। কোন সাড়া পাওয়া যাছে না। রমজানের দিনে কেউই রক্ত দিতে চায় না। তার উপর B- রক্তের গ্রুপ।
নাহ! লোকটাকে বাঁচানো সম্ভব হল না। ইফতারে ঠিক কিছুক্ষণ পরেই লোকটা মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে সে একটু চোখ খুলেছিল। তার ঠোট দুটো কাঁপছিল। সে যেন কিছু বলতে চাচ্ছিল। কথা গুলো না বলা’ই রয়ে গেল। হয়ত সে তার ব্যগটার কথা জিজ্ঞেশ করতে চাচ্ছিল। তার ছেলে মেয়ে বউ মায়ের জন্যে কেনা কাপড় চোপড় গুলো ঠিকঠাক আছে কিন জানতে চাচ্ছিল। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার নিষ্ঠুর নিয়ম মেনেই সে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল।

৫.
সারা বিকেল রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থেকে হতাশ হয়ে ইফতারের আগে মোবারক বাড়িতে চলে গিয়েছিল।
সন্ধ্যার দিকে তার মা’কে জিজ্ঞেশ করছে, বাপ কী আইজ আইব না?
তার মায়েরও কেমন কেমন জানি লাগছে। সেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। লোকটার এত দেরি অইতাছে ক্যান? মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই বারবার আসছে। ভেতরের রূম থেকে জয়নালের মা কিছুক্ষণ পর পর জিজ্ঞেশ করছে জয়নাল এসেছে কিনা? রাত ১০টার দিকে কবিরের মোবাইল থেকে জয়নালের মোবাইলে কল করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ঢুকল না।
প্রিয় না আসার চাপা বেদনা নিয়ে সে রাত যেন পারই হচ্ছিল না মোবারকদের।

পরের দিন সকালে মোবারকদের বাড়িতে একটা গাড়ি ঢুকল। সাদা গাড়ি। সামনে একটা লাল রঙের উল্টো লেখা। এম্বুল্যান্স। কিছু ছেলেও এসছে গাড়িটার সাথে। একটা কফিন নামানো হল সাদা গাড়িটা থেকে। সাথে বের করা হল একটা ছেঁড়া রক্তের ছোপ ছোপ দাগওয়ালা কাপড়ের ব্যাগ। মোবারকের বাবা বাড়ীতে এসেছে। ছেলে মেয়ের জন্যে ঈদের নূতন জামা কাপড় জুতো নিয়ে এসেছেন।

কফিনে একটা নিথর দেহ শোয়ান আছে। সাদা কাফনের ফাঁকে নাকে তুলো দেওয়া, একটা রক্তাক্ত মুখ দেখা যাচ্ছে। এ যে জয়নালের লাশ! মোহাম্মদ জয়নালের লাশ!
গগন বিদারি কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সুমি কাঁদছে। বুক চাপড়ে চাপড়ে কাঁদছে। ঘর থেকে জয়নালের মা’ও কাঁদছে। মোবারক কফিনের পাশে বসে আছে। অবিরাম ধারায় তার চোখ দিয়ে কান্না গড়িয়ে পড়ছে। একটি নিষ্পাপ শিশু ঝুমুর, চারদিকে কি হয়েছে বুঝতে পারছে না। সে রক্তে ভেজা কাপড়ের ব্যগটি নিয়ে খেলা করছে।

৫ thoughts on “একটি ঈদ এবং স্বপ্নের অপমৃত্যু!

  1. মন খারাপ করা কাহিনী। রোজা
    মন খারাপ করা কাহিনী। রোজা রাখলে রক্ত দেওয়া যায় না এটা ভুল। ধর্মীয় কোন বাঁধা নাই। আর শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করলে রোজা ভেঙে হলেও রক্তদান করা উচিৎ। এটাই আপাতত এই গল্পের ম্যাসেজ বলে ধরে নিচ্ছি।

  2. মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ ডাঃ
    মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ ডাঃ আতিক ভাইয়া। :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:
    আমাদের সবার মধ্যে এই ধারনাটি এখনও আছে যে, রোজা রাখা অবস্থায় রক্ত দেয়া যায় না। এই ব্যপারে আমি নিজেও ভালো কিছু জানি না। ইফতারের পরেও অনেকে অসুস্থ হয়ে যাবেন ভেবে রক্ত দেয় না।

    1. এই ভেবে রক্ত না দিলে যখন
      এই ভেবে রক্ত না দিলে যখন নিজের প্রয়োজন পড়বে তখন রক্ত পাবে না। রোজা রেখে রক্ত দিলে রোজা ভাঙ্গে না। জেনেই বলছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *