রোহিঙ্গাঃ পরিচয়হীন পরিচয়ধারীদের সময়ের গল্প ০৫ ( শেষ পর্ব)

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের শুরু সুপ্রাচীন হলেও প্রথম ধাক্কাটা লাগে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৮ সালে। । সেই সময়ে নিজের ইসলামী সেন্টিমেন্ট জনগনকে দেখানোর জন্য এবং পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অনুরোধে প্রবেশের অনুমতি দেন। দুই লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমানকে।
এছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে নানা সময়ে আরো রোহিঙ্গারা এসেছেন। ১৯৯২,২০১০ এবং ২০১৩ সালে উল্লেখযোগ্য পরিমানে তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। কেন এসেছেন তা আগের পর্বগুলোতে উল্লেখ করেছি।


রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের শুরু সুপ্রাচীন হলেও প্রথম ধাক্কাটা লাগে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৮ সালে। । সেই সময়ে নিজের ইসলামী সেন্টিমেন্ট জনগনকে দেখানোর জন্য এবং পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অনুরোধে প্রবেশের অনুমতি দেন। দুই লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমানকে।
এছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে নানা সময়ে আরো রোহিঙ্গারা এসেছেন। ১৯৯২,২০১০ এবং ২০১৩ সালে উল্লেখযোগ্য পরিমানে তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। কেন এসেছেন তা আগের পর্বগুলোতে উল্লেখ করেছি।

বিপুল পরিমান মানুষ আসার ফলে এখানে নানা ধরনের সমস্যা তৈরী হয়েছে। আর্থ সামাজিক অনেক সংকট যেমন তৈরী হয়েছে তেমনি কক্সবাজার অঞ্চলে তাদের মধ্যে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবনতার শংকা তো থেকেই যায়। স্থানীয় মানুষের মতে, রোহিঙ্গাদের শ্রম তাদের চাইতে অনেক সস্তা। একজন স্থানীয় ক্ষেতে মজুরের কাজ করলে মজুরি নেন ৩০০ টাকা। অন্যদিকে, একজন রোহিঙ্গাকে দিয়ে সেই একই কাজ ১৫০ টাকায় করিয়ে নেয়া যাচ্ছে। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে দিনে দিনে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষ নানা কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিংবা বলা চলে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের চাহিদা বেড়ে চলেছে। একই অবস্থা অনান্য কাজেও। একজন স্থানীয় রিকশাচালক কোন নির্দিষ্ট দুরত্বে পারিশ্রমিক ৪০ টাকা নিলে সে একই দুরত্বে একজন রোহিঙ্গা রিকশাচালক নেন ৩০ টাকা কিংবা আরো কম। কক্সবাজারের অনেক শ্রমজীবী মানুষ এই কারনে তাদের উপরে বিরক্ত। ক্ষেত্রেবিশেষে সংঘর্ষের ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে। দিন গড়ানোর সাথে সাথে উত্তপ্ত হচ্ছে পরিস্থিতি।

নানা প্রকার কায়িক শ্রমে জড়ানোর সাথে খুব উল্লেখযোগ্য একটি পেশা হচ্ছে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা। টেকনাফ এবং উখিয়ায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। সমুদ্র আহরন করে আনছেন আমাদের জন্য সামুদ্রিক মাছ। বর্তমানে আমাদের সামুদ্রিক মাছের চাহিদা পুরনে একটা বড় অংশের জোগান দিচ্ছেন তারা। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিও হচ্ছে।

বিশালাকারে শরনার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়ার ফলে তৈরী হচ্ছে নানা ধরনের সামাজিক জটিলতা। বাড়ছে অপরাধ প্রবনতা। স্থানীয়দের বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ আছে, তারা রোহিঙ্গাদের অসহায় পেয়ে স্বর্বস্ব লুটে নিয়েছে। ধর্ষনের মত গুরুতন অনেক অভিযোগও আছে। আবার অভাবের তাড়নায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগনের বাড়ি ঘরে এবং ক্ষেতে ফসল চুরির অভি্যোগ আছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্ব ক্ষেত্রবিশেষে অনেক জায়গায় মুনাফার বিশাল ক্ষেত্র হিসেবে পরিনত হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে অসৎ উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাদের ব্যাবহার করতে। অভিযোগ আছে, অনেক রোহিঙ্গাকে মাদক আনা নেয়ায় বাধ্য করা হয়। তবে হিউম্যান ট্র্যাফিকিং- এ চলে সব চাইতে বড় বানিজ্যটা। মানবপাচার বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পরিমান বার্ষিক বিলিয়ন ডলারের উপরে। একজন রোহিঙ্গাকে এপাড়ে নিয়ে আসতে এবং ক্যাম্পে পৌছে দিতে কাজ করে বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের মাফিয়ারা। দুই দেশে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ কাজ সমাধা করা হয়। এ কাজে দুই দেশের অনেক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা টাকার বিনিময়ে সহায়তা করেন বলে জানা গেছে।

একটু স্বচ্ছল যেসব রোহিঙ্গা যখন মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসেন, তাদের অনেকের প্রস্তুতি থাকে বাংলাদেশের টেকনাফ হয়ে মালয়েশিয়া যাবেন। অনেক রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে এভাবে মালয়েশিয়া পৌছাতে সক্ষমও হয়েছেন। চারটি দেশের মাফিয়ারা এই হিউম্যান ট্র্যাফিকিং এ জড়িত। মায়ানমার, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়া। থাইল্যান্ডকে মূলত ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া সমুদ্রপথে অনেক দূরে অবস্থিত হবার কারনে সেখানে ট্রলারকে তেল, খাদ্য, ইত্যাদি নানা প্রয়োজনীয় জিনিস পুনঃসংগ্রহ করে নিতে হয়। এরপরে সেখান থেকে সরাসরি মালয়েশিয়া। মাথাপিছু মালয়েশিয়া পৌছে দিতে নেয়া হয় দুই হাজার ডলারের সমপরিমান অর্থ। প্রতি ট্রলারে গড়ে ৪৫ জন করে যাত্রী পরিবহন করা হয়। এরকম অনেক ট্রলার প্রতি সপ্তাহে টেকনাফ, উখিয়া এসব অঞ্চল থেকে ছাড়ছে। মায়ানমার সেনাবাহিনীর অনেক বড় বড় জেনারেল এই ধরনের হিউম্যান ট্র্যাফিকিং এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের অবৈধ আয়ের বড় একটা অংশ আসে মাদক এবং মানবপাচার খাত থেকে। মাফিয়াদের সাথে তারা সরাসরি যোগাযোগ রাখেন বলে নানা সময়ে পত্র পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।

মায়ানমার রাষ্ট্রের অমানবিক চরিত্রের দরুন রোহিঙ্গারা চরমভাবে বিপন্ন। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ ভাবছে না বলে তাদের অভিযোগের আঙ্গুল পশ্চিমা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে সব সময়ে তাক করে রাখেন। আদতে, যা ভীষনভাবে সত্য। মায়ানমারের বিশাল খনিজ এবং বনজ সম্পদের লোভে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের কড়া ভাষায় কিছু বলতে কিংবা করতে খুব একটা রাজি নয়। তারা মাঝে মধ্যে এটা সেটা বলেন বটে। তবে তা শুধু বলার জন্য বলা। বিবৃতি ছাড়া কার্যকর কোন ব্যাবস্থা তারা এখন পর্যন্ত নেয়নি। এমনকি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী অং সান সুচি যখন রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের কেউ নন বলে অস্বীকার করেন, তখনো আন্তর্জাতিক মহলের নির্লিপ্ততা ছিল লক্ষ্যনীয়। কেউ কেউ প্রতিবাদ করেছে বটে, তবে সেটা করা হয়েছে শুধু আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা জন্য। এ সমস্যার সমাধান কবে, কিভাবে হবে, তা কেউ জানে না। মায়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। ফিরিয়ে নেয়া অনেক দুরের ব্যাপার। আন্তর্জাতিক মহলের নিশ্চুপত এ সমস্যাকে ক্রমান্বয়ে আর দীর্ঘ করছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে। দেশহীন রোহিঙ্গাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের কুটনীতিক তৎপরতা দ্রুতগতিতে চালানোর দরকার হলেও তা মন্থর গতিতেও চলছে না। সবার অবহেলায় দমকা বাতাসে জীবন প্রদীপ নিভু নিভু একটি জাতিগোষ্ঠীর।

পর্ব-১ দেখুন
পর্ব-২ দেখুন।
পর্ব-৩ দেখুন
পর্ব-৪ দেখুন

৩ thoughts on “রোহিঙ্গাঃ পরিচয়হীন পরিচয়ধারীদের সময়ের গল্প ০৫ ( শেষ পর্ব)

  1. রোহিঙ্গাদের নিয়ে চমৎকার একটা
    রোহিঙ্গাদের নিয়ে চমৎকার একটা পর্ব শেষ করলেন। আপনার এই লেখাগুলো ভবিষ্যতের রেফারেন্স হিসাবে থাকবে।

  2. দাওয়াত দিয়া এতো অল্প খাওয়াইলে
    দাওয়াত দিয়া এতো অল্প খাওয়াইলে কি চলবো মামা? খিদা মিটে নাই কইলাম। মাত্র খিদা জাগছে ভালো কইরা, টেস্ট পাইলাম কেবল আর এখানেই যদি থাইমা যান তাইলে কি চলবো? আরো কয়েকটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হইলে ভালো হইতো। অন্তত আপনার কাছ থেইক্যা এইটা আশা করা সামান্যই ব্যাপার।

  3. চমৎকার লিখসেন ভাই।
    চমৎকার লিখসেন ভাই। রোহিঙ্গাদেরকে নিয়ে সরেজমিন তথ্যভিত্তিক পোষ্ট এর আগে চোখে পড়েনি আমার। গুড জব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *