শ্যামলীর আর আকাশের কান্না

অনেকক্ষণ ধরে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্যামলী। ঢুকতে পারছেনা। দারোয়ান ঢুকতে দিচ্ছে না। সে অনেক অনুরোধ করেছে দারোয়ান কাকাকে। কাকার মন গলেনি। কাকার মন গললেও লাভ হতো না। সুপারভাইজারের কড়া নির্দেশ। পরপর তিন দিন কাজে না আসলে তার চাকরি নট। শ্যামলীকে বলা হয়েছে আইডি কার্ড নিয়ে পরে মাসের শেষে বেতন নিয়ে যেতে। শ্যামলী বেতন আনতে যাবেনা। কারণ সে জানে এই বেতন সে পাবেনা। উল্টো অপমানিত হতে হবে। বেতনটা পেলে হয়তো অপমান সহ্য করতো। অপমান সহ্য করা কোন কঠিন কিছুনা। ফ্লোরে কাজ করার সময় তাদের প্রায়ই চড় থাপ্পড় খেতে হয়। মাঝেমধ্যে লাথি। নানা প্রকারের অশ্লীল গালি গার্মেন্টস কর্মীদের নিত্য সঙ্গী। তাই মারধর, গালিগালাজ তার কাছে কোন ব্যাপারই না। তবু মাগনা(চাকমায় মাগনার অর্থ) গালি খেতে কে যাবে।
নাহ! শুধুশুধু দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। আশেপাশের ছেলে ছোকড়ারা তাকে নিয়ে রসালো মন্তব্য করছে। তাকে দেখলে অনেকেই “চাম্মা-চাম্মা” বা “চুংচাং” বলে। যা শ্যামলী একদম সহ্য করতে পারেনা। কেমন গায়ে বিঁধে! এসব একটা শব্দের চাইতে সে হাজারটা গালি খেতে রাজি আছে কিন্তু “চাম্মা-চাম্মা” শুনতে রাজি নয়। সে চাকমা নয়, ত্রিপুরা। চিটাঙয়ে চোখ ছোট, নাক বোচা কাউকে দেখলেই “চাম্মা-চাম্মা” করে। তাদের কাছে এমন সবাই চাকমা। বড় অদ্ভুত! মাটিরাঙ্গায় থাকতে তাকে এসব কিছুই শুনতে হতো না। মাঝেমাঝে সেটেলার গ্রামগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অবশ্য “শুয়োরখেকো-উপজাত” বলে গালি শুনতে হতো। কিন্তু সে গায়ে মাখতো না। শুয়োরতো সে খায়ই। আর উপজাতের অর্থ সে বুঝেনা।
শ্যামলী হেটেই রওয়ানা হলো। বাসা তার ইপিজেডের কাছেই। ব্যারিস্টার কলেজের গলিতে। এখানে অনেক পাহাড়িরা থাকে। বলা যায় মিনি জুম্ম পল্লী। তার সাথে আরও ৪ টা মেয়ে থাকে। এদের মধ্যে দুজন চাকমা, দুজন মারমা। সে একলা ত্রিপুরা। মেয়ে গুলা ভালোই। শুধু একা ত্রিপুরা হওয়াতে তার সমস্যা হয়েছে। সে বাঙলা ভালো পারেনা। আর চাকমা, মারমা বুঝে না। তবু একটু একটু শিখছে।
রাতের বাসে মাটিরাঙ্গা থেকে রওয়ানা দিয়েছে সে, পৌঁছেছে অনেক ভোরে। ব্যাগটা ঘরে রেখেই সে দৌড়ে এসেছে গার্মেন্টসে। সকাল থেকে কিছুই খায়নি। খিদে পেয়েছে খুব। প্রতিবার মা কিছু না কিছু রেঁধে দেয়। দাদারা কিছু টাকা গুঁজে দেয়। এবার তারা কিছু দিতে পারেনি। উল্টো শ্যামলীকে দিয়ে আসতে হয়েছে সব । সেটেলাররা তাদের বাড়িটা পুড়িয়ে দিয়েছে। চাল যা ছিল সব পুড়ে ছাই। দুদিন ধরে রান্না হয়নি। মার জন্য তার খুব মায়া লাগছে। বুড়িটা কাঁদতে কাঁদতে শেষ। এমনিতেই বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে কঙ্কালসার শরীরটা আরও শুকিয়ে গেছে। শ্যামলার এসব মনে পড়লেই মনটা বিষন্নতায় ভরে ওঠে। বুড়ি মা টার জন্য চোখে পানি জমা হয়। শেষ বয়সে মানুষ চায় একটু শান্তি। মাকে কতো কষ্ট সইতে হচ্ছে! তার কাছে যা ছিল সব দিয়ে এসেছে সে। বাস ভাড়ার টাকাটা অনেক কষ্টে ধার করে এনেছে। কারো কাছেই টাকা নেই। পুরো গ্রামটা জ্বালিয়ে দিয়েছে। অনেকে ভয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গিয়েছে। সবার খুব খারাপ সময়। কয়েকজন এসে কিছু চাল দিয়ে গেছে। যদিও তাতে মাত্র কয়েক ঘরের একবেলার খাওয়া হয়েছে। জন্মের পর থেকে সে এসব দেখে আসছে। তাদের ঘর যে এই প্রথমবার জ্বলেছে তা নয়।বছর সাতেক আগে একবার জালিয়ে দিয়েছিল। শ্যামলা তখন ছোট। ক্লাস ফাইভে পড়ে। নতুন বই পেয়েছিল সেদিনই। আর সবকিছুর সাথে তার বইগুলোও পুড়ে যায়। খুব কষ্ট পেয়েছিল শ্যামলী। বইগুলো সে শুকেও দেখতে পারেনি। পরদিন সে কী নিয়ে স্কুলে যাবে। শ্যামলিকে অবশ্য আর স্কুলে যেতে হয়নি। তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় চিটাগঙে। তার দুঃসম্পর্কের মাসির বাসায়।

শ্যামলার মাথায় টুপ করে এক ফোঁটা পানি পড়লো। আকাশটা যে তার মনের মতো এত গুমোট হয়ে ছিলো সে টেরই পায়নি। অমনি ঝরঝরিয়ে কেঁদে উঠলো পুরো আকাশ। সে সাথে শ্যামলীর চোখের লোনা পানির সাথে আকাশের পানিও যে মিশে একাকার হলো সেটা আর কেউ বুঝতে পারেনি।

“আনি মাচাং মানই পর কাইসা
ব-আংখা মানি আচাইমা-হা”
(আমার প্রিয় একটি জিনিস
সেই যে আমার জন্মভূমি)

১ thought on “শ্যামলীর আর আকাশের কান্না

  1. কমন পরিস্থিতি। সর্বত্রই একই
    কমন পরিস্থিতি। সর্বত্রই একই অবস্থা। শ্যামলীর জায়গায় রূপালী, সোনিয়া অনেকের নাম বসালেও ঘটনা একই থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *