মানুষের পরিচয় হবে মানুষ হিসেবে, ধর্ম দিয়ে নয়

পুজোর চাইতে রমযানেই ভালো বিক্রি-বাট্টা হয় চক্রবর্তী রেস্টুরেন্টের। আশে-পাশের এলাকা জুড়ে চক্রবর্তী রেস্টুরেন্টের সুনাম ব্যাপক। রমযান মাসে চক্রবর্তীদের পেঁয়াজু, বেগুনী, চপ, জিলাপী এইসব ছাড়া যেন ইফতার করাটা পূর্ণ হয়ে ওঠে না অনেকেরই। চক্রবর্তীরা ভাবে, ভাগ্যিস ইসলাম ধর্মে অন্যধর্মের হাতের রাঁধা কোন কিছু খাওয়ার নিষেধাজ্ঞা নেই, নইলে তাদের এই বিক্রি বাট্টা সব চলে যেতো মোহাম্মদীয়া রেস্টুরেন্টে। পণ্যের মানের ব্যাপারে চক্রবর্তীদের কোন ছাড় নেই আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে তো কোন কথাই হবে না। তাই তো এলাকাবাসীর ভীষণ পছন্দ চক্রবর্তী রেস্টুরেন্টের পণ্য। এদিকে মোহাম্মদীয়াদের অবস্থার কোন নড়চড় নেই, বন্ধু-বান্ধব আর দুই চারজন আত্মীয় ছাড়া তেমন একটা কাস্টমার নেই বললেই চলে। কিন্তু এইবারের রোজাতে ভালো বিক্রি-বাট্টা করতে না পারলে ঈদটা কাটাতে পারবে না ভালো করে, গতবছরও এমন হয়েছে। এইবার কিছু একটা করতেই হবে, মনে মনে ভাবলেন মোহাম্মদ আলী। প্রথমে গেলেন এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে, গিয়েই জানতে চাইলেন ইসলামে কি এমন কোন বিধান আছে যেখানে বিধর্মীদের থেকে ইফতার সামগ্রী খাওয়া নিষেধ। ইমাম সাহেব জানালেন এমন কোন বিধান তো ইসলামে নেই। ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন আলী সাহেব। দুশ্চিন্তাগ্রস্থ আলী সাহেবকে দেখে ইমাম সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন কেন তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখাচ্ছে। তখন আলী সাহেব সমস্ত কিছু খুলে বললেন। সব কিছু শুনে ইমাম সাহেব বললেন, দেখেন সুনাম তো আর একদিনে আসে না, অনেক কিছুর বদলে আসে। আপনি আপনার পণ্যের মান ঠিক রাখুন, আপনার ব্যবসায়িক সততা অর্জন করুন। দেখবেন আল্লাহতালার রহমতে একদিন আপনার ব্যবসার সুনাম বাড়বে। আলী সাহেব বললেন এতো সময় কই? আর কয়দিন পরেই তো ঈদ এই মুহুর্তে দ্রুত কোন ব্যবস্থা বাতলে দিন হুজুর। ইমাম সাহেব প্রতি উত্তরে বললেন, কোরানে বর্ণিত আছে আল্লাহতালা ধৈর্য্য ধারণকারীদের অবশ্যই পুরষ্কৃত করেন। আপনি ধৈর্য্য ধারণ করুন, আগামী বছর যাতে আপনার বিক্রি-বাট্টা ভালো হয় সেই লক্ষ্যে কাজ করুন। ভাঙ্গা মন নিয়ে আলী সাহেব ফিরে আসলেন ঘরে। ঘরে উপস্থিত ছিলেন তার শ্যালক নিজামী, দুলাভাইয়ের এমন চেহারা দেখে মনখারাপের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আলী সাহেব খুলে বললেন সমস্ত কিছুই। শুনে হাসি হাসি মুখে নিজামী সাহেব বললেন, আরে দুলাভাই এইটা কোন ব্যাপারই না। এই এলাকায় কি মসজিদ কম আছে? এক ইমামে মানে তো কি হইছে? আপনি অন্য মসজিদের ইমামের কাছে যান, তারে গিয়া বুঝান, না মানলে তারে সরাসরি খুলে বলুন আপনি তার জন্য অবশ্যই কিছু করবেন। বুঝেনই দুলাভাই কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। আপনি একজন ইমামকে ম্যানেজ করতে পারবেন অবশ্যই। ঐ ইমাম সাহেবকে বলুন ফতোয়া দিতে….।

গল্পের পরের অংশটুকু না হয় নিজেরাই ভেবে নিন কেমন হতে পারে। অভাব নেই দেশে লোভী, ধর্ম ব্যবসায়ী লোকের। যারা ছদ্মবেশ ধারণ করে, ধর্মকে পুঁজি করে মোটামুটি নিজের গোছা গুছিয়ে নেয়ার ধান্ধায় রত থাকে। এভাবেই দেশে এই হাট না হয় ঐ বাজারে ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা চলে। হাত বদল হয় ধর্ম, আর ধর্ম ব্যবসায়ীরা হয়ে উঠে বিশাল বিশাল ধার্মিক। অন্যদিকে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এই সকল ধর্মব্যবসায়ীদের জ্ঞানের জন্য, কুপথ থেকে সরে আসার জন্য লাখো লাখো ধর্মপ্রাণেরা প্রার্থনা করতেই থাকে। কিন্তু চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী…..।

গল্পটা অফিসের রোজাদারদের জন্য ইফতার তৈরী করতে গিয়ে মাথায় এসেছিলো। বারবার ভাবছিলাম, যদি এরা হিন্দু হতো আর আমি যদি মুসলিম হতাম তাহলে কি এরা উপোস শেষে আমার হাতের তৈরি করা খাবারগুলো খেতো? বাকী কথাগুলো নাইবা বললাম, সেগুলোও নিজের দেখা থেকে ভেবে নিন। অবশ্য এটা সত্য যে, এখন আর তখনে অনেক পার্থক্য। দিনে দিনে আমরা নানা গন্ডী থেকে বেরিয়ে এসে গাইছি মানবতার জয়গান, মনে প্রাণে বিশ্বাস করি একদিন সকল ধরণের ভেদাভেদ দূর হয়ে এক হয়ে উঠবে মানুষ। সকলে হাতে হাত রেখে গাইবে মানবতার জয়গান। সেইদিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মানুষের পরিচয় হবে মানুষ হিসেবে, ধর্ম দিয়ে নয়। জয় হোক মানবতার।

৮ thoughts on “মানুষের পরিচয় হবে মানুষ হিসেবে, ধর্ম দিয়ে নয়

  1. মানুষের পরিচয় মানুষ হিসাবেই
    মানুষের পরিচয় মানুষ হিসাবেই আছে সবখানে। শুধু কিছু ধর্মান্ধ আর উগ্র জাতিয়তাবাদির কাছে মানুষের পরিচয় নির্ভর করে নির্দ্দিষ্ট দল করা বা ধর্মীয় পরিচয়ের উপর।

    1. শুধু কিছু ধর্মান্ধ আর উগ্র

      শুধু কিছু ধর্মান্ধ আর উগ্র জাতিয়তাবাদির কাছে মানুষের পরিচয় নির্ভর করে নির্দ্দিষ্ট দল করা বা ধর্মীয় পরিচয়ের উপর।

      মৌলবাদী রাজাকারকে মানুষ বলবেন নাকি?

  2. খাদ্যের স্বাদই কথা বলে। সেটা
    খাদ্যের স্বাদই কথা বলে। সেটা চক্কোত্তিরাই বানাক বা মহম্মদের চ্যালারাই বানাক। কিন্তু ধর্মবাজদের কারনে স্বাদ নেয়ার সুযোগ কোথায়। সবখানে তাদের ব্যবসাটাই আসল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *