পার্বত্য চট্টগ্রাম ও হুমায়ুন আজাদ (প্রথম পর্ব)

হুমায়ুন আজাদ। প্রথিতযশা এই লেখক তার নিজ গুনে সমাদৃত অনেকের কাছেই। তার লেখা, কবিতা, উক্তি অনেককাল ধরে স্মরণিয় হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে। তবে দেশের একটি বিশেষ শিক্ষিত সমাজের কাছে তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত। সেটি ধর্ম, সামাজিক আচার, প্রথা ও নিয়মের বিপরীতে তার অবস্থানের জন্যই হয়তো। এই বিশেষ শিক্ষিত সমাজ আবার পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি বিশেষ ধরণের মনোভাব পোষন করেন। বিদ্রোহ মানেই শোষিতের পক্ষে, শাসকদের বিরুদ্ধাচরন বলে তারা মনে করেন এবং রোমাঞ্চিত হন। তাই তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘আদিবাসী’দের উপর শাসকশ্রেণির ‘নির্মম-অত্যাচার’ নিয়ে ব্যাপক চিন্তিত। সেই ‘আদিবাসী’দের নেতা হিশেবে কেবল একজন মাত্রই লোককেই মনে করেন তারা, যিনি আবার সাম্রাজ্যবাদী ভারতেরই সহযোগীতায় এই দেশের বিরুদ্ধেই নিম্নমাত্রার বিদ্রোহ (ইন্টারজেন্সি) করেছিলেন। অথচ, ইন্টারজেন্সির যে কোন ভবিষ্যৎ থাকে না, মূলত বিশেষ সুবিধা আদায়ের জন্যই যে এসব বিদ্রোহ করা হয়, সেসব তারা বুঝেন না। বিশেষ করে উদীয়মান তরুন শ্রেণি, যারা চে’ গুয়েবারার ছবি সংবলিত টি-শার্ট পরে নিজেকে বিপ্লবী ভাবেন, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে নিজেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ‘অসীম-পথচারী’ সম চিন্তা করতে পুলকিত হন, কানের হেডফোনে লিংকিন পার্ক আর মেটালিকার মেটালের শব্দে নিজেকে আধুনিক জ্ঞ্যান করেন, যাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানাশোনার পরিধি কেবল সংবাদপত্র ও সুশীল সমাজের বক্তৃতা, তারা এই ‘আদিবাসী’দের কিউট চেহারাখানা অবলোকন করে ও তাদের উপর এতদিন যাবৎ ধরে চলে আসা ‘অত্যাচারে’র কথা শুনে তীব্র দরদ ও মায়া লালন করতে শুরু করেন।

আমি নিশ্চিত, এরা সবাই হুমায়ুন আজাদের ভক্ত। তার উক্তি, মানবতাবাদী লেখা ও কবিতা মাঝেমাঝেই তারা ভক্তি সহকারে আওড়ান। আজও হয়তো অনেকে, ‘ভালো থেকো ফুল’, ‘আমি শুয়োরের সঙ্গে সহবাসের ফতোয়া অস্বীকার করি’, ‘একজন রাজাকার চিরদিনই রাজাকার, একজন মুক্তিযোদ্ধা চিরকালই মুক্তিযোদ্ধা নন’ লিখে স্ট্যাটাস দেবেন।

কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে হুমায়ুন আজাদের ভাবনা কী ছিল, হুমায়ুন আজাদ এই সমস্যা সম্পর্কে কী বলেছিলেন, সেটি নিয়ে তারা খুব উৎসাহ বোধ করেন না। অথচ, হুমায়ুন আজাদ যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এই সমাজের মত কেবল পত্র-পত্রিকার উপরই নির্ভরশীল ছিলেন, তখন উপজাতিদের পক্ষে বিগলিত ও আবেগভারাতুর হয়ে লিখেছিলেন ‘রক্তাক্ত বিপন্ন পাহাড়’। কিন্তু অনেকদিন পরে, যখন তিনি স্বচক্ষে অনেকদিন থেকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে দেখলেন পাহাড়কে, তখন তিনি লিখলেন তথ্যবহুল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম : সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা’। একই সাথে নিজেও যে এই পাহাড়িদের প্রচারের প্যাঁচে ধরা পড়েছিলেন, তা পরোক্ষভাবে স্বীকারও করে নিলেন। হুমায়ুন আজাদের অনেক মতের সাথে অমিল আমার আছে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তার লেখা পড়ে আমি একবাক্যে স্বীকার করে নিলাম আর দশটা মানুষের মত নিজের মতকে প্রাধান্য বা প্রতিষ্ঠা করতে এই বই লিখেননি তিনি। বরং বাস্তব চিত্র দেখে নিজের ভুল স্বীকার করার মত সৎসাহস এই লোকের ছিল এবং তার বইয়ের অধিকাংশ তথ্যে ও বিশ্লেষনের সাথে একমত আমি। আমি এও বিশ্বাস করি, এই ব্যাক্তি যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর ঢালাও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠতেন তিনি। হয়তো কমে যেত, প্রগতিশীলদের মাঝে মিথ্যা ধারনাগুলো। আজ তার সেই বইয়ের কিছু কথা তুলে ধরব আমি, যার বিপরীতটাই হয়তো আপনাদের জানা।

এই বইয়ের ভূমিকায় হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘খটখটে রাষ্টবিজ্ঞান বা নিম্নতীব্রতার বিরোধের তত্ব আমি লিখি নি; গবেষণাগারে ব’সে তৈরি করি নি অব্যার্থ শান্তির সূত্র; আমি লিখেছি রাষ্ট্রবিজ্ঞানসাহিত্য। জানতে চেয়েছি আমি পার্বত্য চট্টগ্রামকে, এবং জানাতে চেয়েছি দেশবাসীকে, যা তারা জানে না, কিন্তু জানা দরকার।’ পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা ও পাহাড়িদের দাবী সম্পর্কে তিনি লিখেছেন,

‘পাহাড়িরা চান স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন, আঞ্চলিক পরিষদ, এবং আরো অনেক কিছু; তাঁদের চাওয়ার মাত্রা একটু বেশিই; তাঁরা যা চান, তাতে বাঙলাদেশ অখন্ড থাকে না। একটি রাষ্ট্রের অধিবাসী হিশেবে তাঁরা এমনকিছু চাইতে বা পেতে পারেন না, যা রাষ্ট্রের অন্য অংশের মানুষ চাইতে বা পেতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সমস্যা স্বাধীনতা বা স্বায়ত্বশাসনের অভাব নয়; প্রধান সমস্যা হচ্ছে ঐ অঞ্চলের সামন্ত প্রভুরা সাধারন সাধারন মানুষদের বিকশিত হ’তে দেয় নি, তাঁদের দাসে পরিণত ক’রে রেখেছে ১৯০০ সালের বিধিমালা দিয়ে, অঞ্চলটিকে ক’রে রেখেছে ও রাখতে চাচ্ছে এক নিষিদ্ধ দেশ, এবং এটা বুঝতেও দেয় নি পাহাড়ের সরল শান্ত দরিদ্র মানুষদের।’

প্রথমেই হুমায়ুন আজাদ মনে করেছেন, তিনি নতুন কিছু জেনেছেন বা বুঝেছেন, যেটি দেশবাসী জানে না, কিন্তু জানা দরকার। সুতরাং এখানেই স্পষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশবাসীর কাছ থেকে লুকানো হয় অনেক কিছু। আবার সেখানে যে স্বায়ত্বশাসন বা স্বাধীনতার অভাব রয়েছে, বা সেখানে কাউকে পরাধীন অবস্থা বা শৃঙ্খলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা নয়। বরং পাহাড়িদের নেতারাই পাহাড়িদের ব্যাবহার করে আসছে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য।

এরপর বইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন অসাধারণ ভাবে। এরপর দিয়েছেন চমকে উঠা এক তথ্য।

‘এই সীমানার (পার্বত্য চট্টগ্রাম সংলগ্ন) দীর্ঘ এলাকায় বাঙলাদেশের কোনো পুলিশ বা প্রহরী বা সৈনিক নেই; নাড়াইছরি থেকে সাজেক (১২২ কিমি), আঁধারমানিক থেকে মৌদক (১৩২ কিমি), মৌদক থেকে লেম্বুছড়ি (১০২ কিমি) সম্পূর্ন অরক্ষিত, সেখানে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারও নামে না।’ তার কথায়ই স্পষ্ঠ, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও কতটুকু অরক্ষিত। ‘

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে পাহাড়িদের ধারনা ও অভিজাত পরিবারসমূহ সম্পর্কে তিনি বললেন,

‘পাহাড়িরা, বিশেষ করে চাকমারা, মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম তাঁদের; তবে অনেকে প্রশ্ন করেন দেশের বিশেষ একটি এলাকা কি একান্তভাবে বিশেষ কোনো গোত্রের হতে পারে? দিনাজপুর বিক্রমপুর সিলেট বরিশাল আর সব এলাকার বাঙালি প্রশ্ন করতে পারেন : পার্বত্য চট্টগ্রাম কি আমার দেশ নয়? আমি কি সেখানে বাস করার অধিকারী নই? আমার কি সেখানে কোনো অধিকার নেই? অনেকে প্রশ্ন করে যে, বাঙলাদেশের মত একটি ঘনবসতিপূর্ন দেশের দশভাগের এক ভাগ কি সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে ৬৬, ৩০৭৭ জন বা শতকরা অর্ধেক মানুষের জন্যে? এর উত্তরেও চাকমারাও বলতে পারবেন না যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালির দেশ নয়, তাঁরা সেখানে বাস করার অধিকারী নয়। কিন্তু মুখে না বললেও তাঁরা মনে করেন ঐ পাহাড়ি এলাকা একান্তভাবে তাঁদের; এবং তাঁরা বাঙলাদেশেরও অধিবাসী। তাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীনতা বা স্বায়ত্বশাসন ভোগ করতে চান, এবং চান বাঙলাদেশের স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতে। আর যদি তা না হয়, তাহলে তাঁরা চান, অন্তত মনে মনে, স্বাধীন জুম্মল্যান্ড।’

‘যে তেরোটি উপজাতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করেন, তাঁরা সবাই সমান সংখ্যক যেমন নন, তেমনি সমান অগ্রসরও নন; এবং সবাই একাত্নও নন। তাঁদের সমাজ স্তরে স্তরে বিন্যাস্ত; সবার উপরে রাজারা (রাজা তিনজন- চাকমা, মং, বোমাং), আর সবার নীচে সাধারন মানুষ। এই সাধারন মানুষদের উপরে আছেন পাড়া/ গ্রামের প্রধান ‘কারবারি’রা, তাঁদের উপরে মৌজার প্রধান ‘হেডম্যান’রা; এবং তাঁদের উপরে আছেন অভিজাতমন্ডলী, যারা রাজা, রাজপূত্র, রাজকণ্যা, দেওয়ান, এবং চেয়ারম্যান, সাংসদ, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, ইত্যাদি। অভিজাতমন্ডলী ধনী, এবং তাঁরা নানাভাবে সম্পর্কিত;- একই পরিবারের কেউ হয়তো স্থানীয় পরিষদের চেয়ারম্যান, কাকী হয়তো প্রাক্তন সাংসদ, মামা হয়তো বেশ গুরুত্বপূর্ন কিছু। তাঁরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সম্মান বেশ ভোগ করেন, সরকারী পার্টিতে সুন্দরভাবে যোগ দিয়ে সুন্দরভাবে কথা বলেন, চমৎকারভাবে কাঁটা চামচে খান, ইংরেজিতে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করেন। রাজারা ছিলেন বিশেষ গোত্রের প্রধান বা গোত্রপতি; তাঁদের প্রধান কাজ ছিল খাজনা আদায় করা, এবং এ-কাজটি তাঁরা করতেন ‘দেওয়ান’দের দিয়ে। ১৯০০ সালের দেওয়ানি প্রথা লোপ করা হয়। তাঁদের সমাজে সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে উচ্চপর্যায়ের লোকেরা; আর তাঁরা নিজেদের সুবিধার জন্য উপজাতিদের রেখেছে রাজনীতি, শিক্ষা, ও পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ক’রে। উপজাতীয়ত্ব ও অসহায় দাসত্ব ছাড়া রাজারা তাঁদের আর কিছু দেয় নি; তাঁদের মনেও আর কিছু পাওয়ার বাসনা জাগে নি অনেক শতক।’

চাকমারা নিজেদের আদিবাসী দাবী করা প্রসঙ্গে বলেন,

‘পৃথীবির বিভিন্ন এলাকায় এখন যারা আছে, সেগুলো যে তাঁদের চিরবাসভূমি, তা নয়; বরং এটাই বেশি চোখেপড়ে যে আদিবাসীরাই বিতাড়িত বা গৌন হয়ে গেছে, আর সেখানে আধিপত্য করেছে আগ্রাসনকারীরা বা অভিবাসীরা। চাকমা রাজা মো’আন তস্‌নি পনের শতকে বহ্মদেশ থেকে তাড়া খেয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন রামু ও টেকনাফ এলাকায়। এবং ওখান থেকে বিতাড়িত হয়েছিল আদিবাসী কুকিরা’।

এই লেখাগুলো খুঁজে পাবেন তার বইয়ে। কিন্তু আমি এখনও জানি, তার কথা, তার গবেষনা মানতে চাইবেন না তারই অনেক অনুসারী। তাদের জন্য করুণা।

(চলমান…)

৪ thoughts on “পার্বত্য চট্টগ্রাম ও হুমায়ুন আজাদ (প্রথম পর্ব)

    1. ধন্যবাদ। আমিও পাহাড় সম্পর্কে
      ধন্যবাদ। আমিও পাহাড় সম্পর্কে জানতে আগ্রহী সবাইকে এই বইটি সবার আগে পড়তে বলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *