ছুটি ছাড়া পাবলিক পরীক্ষাঃ ধ্বংসযজ্ঞের শেষ ধাপ

অধম এক ছাত্র হিসেবে এসব ব্যাপারে বেশি কিছু বলতে চাই না।কিন্তু না বলেও পারছি না।আমাদের দেশে এখন লাখের ওপর ছাত্র-ছাত্রী জিপিএ ৫ পায়।এরকম একটা অবাস্তব ব্যাপার প্রতিবছর ঘটছে আর সরকার দাবি করছে শিক্ষার মান বাড়ছে।ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এ+ এর সংখ্যা আর এমন এক সময় আসবে যখন হয়তো দেখা যাবে ১০০% শিক্ষার্থীই এ+ প্রাপ্ত!লাখো ছাত্র কিভাবে এ+ পায়?সে ব্যাপারেও সবার একটা ধারণা আছে।স্যারদের খাতা দেখতে দেওয়ার সময় নির্দেশ থাকে ১৫ পেলে ৩০ করার মত।কোন ছাত্রকে ফেল করানো একটা গর্হিত অপরাধ আর ভালোমতো খাতা দেখে উপযুক্ত নম্বর বসানোও একটা অপরাধ।তাহলেই দাঁড় করানো হয় কাঠগড়ায়।স্যারেরা তাই আর ঝামেলা করেন না।বেশি বেশি নম্বর দিয়ে দেন।স্যারেরা চাইলেও খাতা দেখার সময় পান না।এক সপ্তাহের মধ্যে দেখতে হয় ৩০০-৪০০ খাতা।এই হল ভালো রেজাল্টের প্রথম রহস্য।এরকম মূল্যায়ন পদ্ধতির বিভিন্ন ধরণের কুফল আছে,সেটা বর্ণনা না করলেও ধারণা করা যায়।

আচ্ছা,এসব না হয় মেনেই নেওয়া গেল!কিন্তু ক্লাস ফাইভের শিক্ষার্থীদের দুর্নীতি শেখানোর বিষয়টা কিভাবে মেনে নেওয়া যায়?সকল পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়।অনেকেই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এই প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষা দেয়।ক্লাস ফাইভে যেই শিশু প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষা দেয়,তাকে কিভাবে সততার শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে?তার মানে দেশ এমনিতেই দুর্নীতিবাজে ভর্তি,এখন পাবলিক পরীক্ষাও দুর্নীতিবাজ প্রজন্ম তৈরিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়!সাধু!এর মাঝেও অনেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নেয় না,তাদের সততার কারণে তাদেরকে কষ্টই ভোগ করতে হবে।কারণ,এই প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারটা সরকার বহুদিন ধরে অস্বীকার করে আসছে।এবার উচ্চ মাধ্যমিকে মহামারী আকারে প্রশ্ন ফাঁস হলেও সরকার উট পাখির মত মাথা ঢুকিয়ে বসেছিল।শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা এত ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াল যে,ইংরেজি ২য় পরীক্ষা বাতিলে বাধ্য হল সরকার আর স্বীকার করল যে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।তারপর বহুদিন ধরে তদন্ত হল,সেই সময়েও অনেকগুলো পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।সরকার হাঁ করে বোকার মত দেখেছে আর অস্বীকার করেছে।

এর মাঝে আমাদের অনেকের প্রাণপ্রিয় জাফর ইকবাল স্যার এ ব্যাপারে কলাম লিখেছেন।রোদ,বৃষ্টি উপেক্ষা করে খালি পায়ে শহীদ মিনারে তিন সপ্তাহ অবস্থান করেছেন এই সমস্যার প্রতিকার চেয়ে।তার সাথে কায়কোবাদ স্যার,ইয়াসমিন ম্যাডামসহ আরও অনেক গণ্যমান্য মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। সাথে ছিলেন বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়ররা।তারপর ১১ জুন শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটা মিটিং হয় আর শিক্ষামন্ত্রী আকারে ইঙ্গিতে সেখানে স্বীকার করেন প্রশ্ন ফাঁসের কথা আর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করতে বাধ্য হন।

খুব ভালো কথা।কিন্তু তারপর আবার সংসদে তিনি বলেছেন,”গত পাঁচ বছরে প্রশ্ন ফাঁস হয়নি।”তারপরই আবার প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারে তদন্তের রিপোর্ট পেয়েছেন এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার সর্বশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।এতদিন তদন্ত করেও তদন্ত কমিটি প্রশ্ন ফাঁস কে করেছে সেটা বের করতে পারেনি!তার মানে,অপরাধীরা মুক্ত!এত করিৎকর্মা তদন্তকারীদের আমরা কিভাবে সম্মানিত করব?!শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন,পাবলিক পরীক্ষার মধ্যে আর কোন ছুটি থাকবে না!টানা পরীক্ষা হবে!পারলে একদিনে দুইটা পরীক্ষা হবে!

প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হবে না,বরং এমন একটা অবাস্তব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন নিতে বাধ্য করা হবে!কারণ,২০ ঘণ্টার মধ্যে পুরা বই একবার দেখে আসা আইনস্টাইনের পক্ষেও সম্ভব হত না!তাই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সমাধান করাই সমীচীন হবে।এসব না করে প্রশ্ন ফাঁসের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দিলে আর প্রশ্ন ফাঁস নাও হতে পারে।

এরপরেও আমার মত কোন বেকুব যদি প্রশ্ন না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে,তাহলে সম্ভবত আমাদের এদেশে পড়ালেখা করে কোন লাভ হবে না।কারণ,একদিনের মধ্যে পড়ে পরীক্ষা দিয়ে ভালো করা অসম্ভব।তাই,এই ব্যবস্থা চালু হলে জীবনে টিকে থাকার অন্য কোন রাস্তা দেখতে হবে।

৪ thoughts on “ছুটি ছাড়া পাবলিক পরীক্ষাঃ ধ্বংসযজ্ঞের শেষ ধাপ

  1. যত সব ফালতু লোকের হাতে
    যত সব ফালতু লোকের হাতে মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
    সবাই তো পুঙ্গা মারা খাচ্চেই সাথে এখন তার খাওয়াটাই বাঁকি!

    খুব বেশি দেরি নাই!

  2. গ্যাপ অবশ্যই দরকার। রিভাইস
    গ্যাপ অবশ্যই দরকার। রিভাইস দেয়ারও তো সুযোগ থাকা উচিত। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে না পারার দায়ভার পরীক্ষার্থীদের ওপর বর্তাবে কেনো? ফালতু সব পরিকল্পনা, বলদ মন্ত্রী এবং তার আমলাদের এসব উদ্ভট চিন্তা ভাবনার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া উচিত। প্রকৃত শিক্ষাবিদদের সাথে মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে উঠে আসুক সমাধান।

    1. শিক্ষাবিদদের সাথে আলোচনা
      শিক্ষাবিদদের সাথে আলোচনা হয়।কিন্তু তাদের পরামর্শ বাস্তবায়ন হয় না,হলেও হয় বিকৃতভাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *