সার্টিফিকেটও যদি টাকায় পাওয়া যায় তবে বাকি রইল কী ?

বাল্যকালে মায়ের কাছে গল্পে শুনেছিলাম, মিশরের বাদশাহ ফেরাউনের শখ হলো নিজেকে খোদা বলে দাবী করবে । এ বিষয়ে তার প্রধান পরামর্শক হামানের কাছে পরামর্শ চাইল কিভাবে তার অভিপ্রায়কে বাস্তবায়ন করা যায় । হামান ছিল যথার্থ প্রজ্ঞার অধিকারী । তিনি ফিরাউনকে পরামর্শ দিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়ার জন্য । হামান যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করল, যদি রাজ্যের সকল লোক শিক্ষার অভাবে মূর্খ হয়ে যায় তখন আপনি তাদেরকে যা আদেশ করবেন তাই তারা পালন করবে । যেই ভাবা সেই কাজ । পরের দিন প্রভাতেই রাজ ফরমানের মাধ্যমে তার শাসানাধীন ভূখন্ডের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে খিলানবদ্ধ করে দেয়া হল । হামানের পরামর্শ সুফল দিতে বেশি সময় নেয়নি । মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই ফেরাউন তার ইচ্ছানুযায়ী খোদায়ী দাবী করল । তার শক্তিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে তার প্রজারা তাকে খোদা বলে মেনে নিল । যা দু’একজন তার বিরোধিতা করেছিল তাদেরকে হত্যা করা হল । এর পরের ইতিহাস অনেকেই জানেন । ফেরাউন এবং তার স্ত্রী আছিয়া (রহঃ) এর পালিত পুত্র হযরত মূসা (আঃ) এর মাধ্যমে নীলনদে ডুবে ফেরাউনসহ তার সাঙ্গপাঙ্গদের সলিল সমাধি হয় । আল্লাহ তার শক্তি দেখানোর জন্য ফেরাউনের লাশটিকে নষ্ট করেননি । মিশরের জাতীয় যাদুঘরে ফেরাউনের মৃত্যুর হাজার বছর পরে আজও অক্ষত অবস্থায় তার লাশটি সংরক্ষিত আছে । কোন রাজশক্তি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে না চাইলেও এক শ্রেণীর কুচক্রী মনোবৃত্তির পেশাদার ব্যবসায়ী ভাবাপন্ন শিক্ষক নামের দালালের রাহুগ্রাসে আজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে । এ শ্রেণীর লোকেরা এতই শক্তিশালী যাদেরকে শাস্তির মুখোমূখি হতেও দেখা যাচ্ছে না । বরং প্রতিনিয়ত এদের সাম্রাজ্য বিস্তৃতি হয়ে চলছে । ৩০ শে জুন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে উপস্থাপিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে তারা দাবি করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের পাশ করিয়ে দেয়া পর্যন্ত পদে পদে বিপুল পরিমান অর্থের অবৈধ লেনদেন হয় । গবেষণার তথ্য মতে, বাংলাদেশে অবস্থিত ৭৯টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ টির উপর ২০১২ সালের জুন থেকে ২০১৪ সালের মে পর্যন্ত এ গবেষণা চালানো হয়েছে । ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে অবস্থিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২২টিতে দৈবচয়ন ভিত্তিতে যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে তা সত্যিই উদ্ধেগের ।

টিআইবি কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে কয়েক ধাপের দুর্নীতির কথা । বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের জন্য এক-তিন কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয় । উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ অনুমোদনের জন্য লেনদেন হয় ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা । বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসংক্রান্ত পরিদর্শনে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা, অনুষদ অনুমোদনের জন্য ১০-৩০ হাজার টাকা, বিভাগ অনুমোদনের জন্য ১০-২০ হাজার টাকা, পাঠ্যক্রম অনুমোদনের জন্য ৫-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয় । প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ পায়, ভূয়া সনদের জন্য ৫০ হাজার থেকে তিন লাখ, নিরীক্ষা করানোর জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লেনদেন করতে হয় । এছাড়াও শিক্ষার্থীদেরকে পাস করিয়ে দেওয়া এবং নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দামী উপহার সামগ্রী ছাড়াও নগদ অর্থের লেনদেন হয় । টিআইবি কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে দুর্নীতির যে খসড়া প্রকাশ পেয়েছে তার সবগুলোর ব্যাপারে উদ্ধিগ্ন হওয়ার কোন কারন নেই । কেননা বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি প্রবেশ করেছে । কাজেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ইট-কাঠ-পাথরও যে ঘুষ গ্রহন করতে শুরু করেছে তা মিথ্যা নয় । গত উপজেলা নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত কলামিষ্টের একটি লেখায় তিনি লিখেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের চৌকাট-খুঁটিতেও ঘুষ খায় । তার লেখায় অবাক হওয়া অপ্রাসাঙ্গিক । যারা অফিস আদালতে দু’চারবার কোন কাজে ঢুঁ মেরেছেন তাদের সকলের ধারনা প্রায় এক ।

দেশ দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়ছে আর আমরা উদ্ধিগ্ন না হয়ে স্বাভাবিক কর্মকান্ড পরিচালিত করে যাচ্ছি । এক শ্রেণীর মানুষ ঘুষ নিতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে বাকীরা ঘুষ প্রদানে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি । কারো মধ্যে কোন অপরাধ বোধ কাজ করছে না । এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা । জাতিকে শিক্ষিত করার উপায় যিদি হয় অনৈতিক কর্মকান্ড তাহলে আমরা দুর্নীতিমুক্ত হব কীভাবে ? শিক্ষার্থীদের পাশের হার গাণিতিক কিংবা জ্যামিতিক সকল পদ্ধতিকে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে মুহুমুর্হ করে বেড়ে চলছে । পাশের হারের আকাশমূখীতার পেছনে অনেকেই প্রশ্নফাঁসকে দায়ী করছে । মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য দাবী করেছেনে দেশে গত পাঁচ বছরে কোন প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে নি । মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দাবী অমূলক নয় কেননা তিনি পরীক্ষার্থী নন কিংবা পরীক্ষার আগের রাতে তিনি ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র খোঁজেন না । কিন্তু যারা পরীক্ষার এক কিংবা দুই দিন পূর্বে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র খোঁজ করে তারা ঠিকই প্রশ্ন পত্র পেয়ে যায় । কেউ যদি অভিজ্ঞতাকে জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায় হিসেবে ধারনা করেন তবে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের দাবী অমূলক নয় । শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের এ দাবীর সাথে দেশবাসীর একাংশ বিশেষ করে সচেতন অভিভাবক এবং শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা একমত হতে পারে নি । তবে মন্ত্রীমহোদয় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ মূখে অস্বীকার করলেও বিভিন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে আসল সত্যতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন ।

প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর টিআইবির প্রকাশিত রিপোর্টটি যেন শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ‘মরার উপর খড়ার ঘাঁ’ । অন্তত যে দেশে টাকায় সনদপত্র পাওয়া যায় এবং উপহার কিংবা উপরির মাধ্যমে পরীক্ষার খাতায় নম্বর বাড়ানো যায় কিংবা পাশ করা যায় সে দেশের ভবিষ্যত খুব বেশি আলোকিত নয় । টিআইবির এ রিপোর্টের উপর যাদের আস্থা নাই তাদের ধারনা যদি ভূল প্রমাণিত হয় তবে নিঃসন্দেহে দেশের আগামী নিকষ আাঁধারে ঢাকা । বিভিন্ন সময় সরকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে কঠোর হতে গিয়েও কোন এক দৈব আকর্ষণে ফিরে এসেছে । এ সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যথেচ্ছা কাজ করে গেছে । এখন স্পষ্ট হল প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে কথা বলেও কেন কোন পদক্ষেপ নেয় নি । দেশের শিক্ষার স্বার্থেই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রয়োজন । কেননা দেশে পাবলিক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সংখ্যক আসন আছে তা শিক্ষার্থীর তুলনায় অপ্রতুল । এ দূর্বলতাকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছে । নৈতিকতা-অনৈতিকতা তাদের কাছে কোন বাধা নয় । এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর হতে হবে । দেশের সকল মানুষকে উচ্চশিক্ষিত হতে হবে এরকম কোন কথা নাই তবে যারা উচ্চশিক্ষিত হবে তারা যেন বৈধভাবেই শিক্ষিত হয় তারা ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে । যোগ্যতার চেয়ে সনদের ওজন যদি বেশি হয়ে যায় তবে সে সনদ শিক্ষার্থীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে । যে বোঝা বইবার ক্ষমতা কারো নেই । এ অবৈধ বোঝা বইতে গিয়ে নিজেকে নিজেই শুধু প্রতারিত করে না বরং তা গোটা জাতির জন্যও বোঝা হয়ে যায় । কাজেই সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হওয়া প্রয়োজন । অন্তত জাতি এবং শিক্ষার স্বার্থেই শিক্ষা ক্ষেত্রের সকল দুর্নীতি উচ্ছেদ করা আশু আবশ্যক । সব ব্যাপার স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া গেলেও কোন দেশে যদি সার্টিফিকেট টাকায় পাওয়া যায় তবে সে দেশের সামগ্রিক অবস্থা কত নি¤œপানে চলে গেছে তা সহজেই অনুমেয় । টিআইবির রিপোর্ট প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে । হয়ত শীঘ্রই এ ব্যাপারে কমিটি তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করবে । যে কোন অবস্থাতেই যেন সত্য উম্মোচিত হয় এবং অপরাধীরা শাস্তি পায় তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হোক । অশুভ ভূতের হাত থেকে যেন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা পায় । শিক্ষা ব্যবস্থা যদি কালো হাতের ছায়ায় আটকে যায় তবে জাতি মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়বে । জাতির ভবিষ্যতে যদি তেমন কিছু হয় তবে তা মৃত্যুসম হবে ।

রাজু আহমেদ । কলাম লেখক ।
facebook.com/raju69mathbaria/

৭ thoughts on “সার্টিফিকেটও যদি টাকায় পাওয়া যায় তবে বাকি রইল কী ?

  1. গতকাল এটিন বাংলায় ইউজিসির এক
    গতকাল এটিন বাংলায় ইউজিসির এক কর্তার কথা শুনে আমি তো অবাক। তিনি বলছেন দু-চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি গুলো ভাল।এইখানে কোন সার্টিফিকেট বাণিজ্য হয় না।
    #আমার নিজের জানা মতে দেশে বড়জোর ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বাকি গুলোতে ব্যাপক অনিয়ম হয়।

    1. মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়
      মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় আজকে বলে দিয়েছেন টিআইবির বক্তব্য উদ্দেশ্য প্রনোদিত । এখন আর কি বলার আছে ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *