কোচিং ব্যবসা শয়তানি শিক্ষাব্যবস্থা

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমিত আসন সংখ্যার কারণে দিনে দিনে ভর্তি প্রতিযোগিতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবক সবাই যেন দিশেহারা। আর এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে চলে আসছে কোচিং ব্যবসা। নামে-বেনামে সারাদেশে চলছে হাজারো কোচিং সেন্টার। কোচিং শিক্ষার নামে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা পকেট কাটা পড়ছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের। বিপুল পরিমাণ টাকা কোচিং সেন্টারগুলো আয় করলেও সরকারের কোনো মনিটরিং নেই। কোচিং বন্ধেও নেই কোনো পদক্ষেপ। এ প্রসঙ্গে আমি কথা বলেছি কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের সঙ্গে। দেশের এই গুণী মানুষগুলো কোচিং সম্পর্কে কী বলে তা প্রত্যেকের জানা থাকা দরকার। যারা স্বজনকে কোচিং করাতে চান, তারা এই মানুষগুলোর কথা একটা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন।

‘কোচিং ব্যবসা আরও ভয়াবহ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে’
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

শিক্ষাবিদ

সরকার মাঝে মাঝে কোচিং ব্যবসা বন্ধ করার কথা বলে। শিক্ষামন্ত্রীও দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ নিলেন বলে জানতে পারলাম। কিন্তু সেই উদ্যোগের কোনো কার্যকর ফলাফল দেখতে পাচ্ছি না। কোচিং ব্যবসা আরও ভয়াবহ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। স্কুল-কলেজের বিপরীতে শিক্ষার্থীরা এখন কোচিংমুখী হচ্ছে। এর শেষ কোথায়, তা বলার কোনো উপায় নেই। অনেক শিক্ষকও এখন এই ব্যবসায় সম্পৃক্ত হচ্ছেন বলে প্রকাশ পাচ্ছে। শিক্ষার এই অবনতি কেন, তা খুঁজে বের করতে হবে। অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু কথায় নয়, অবিলম্বে কোচিং ব্যবসা বন্ধ করার জন্য সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। কেন এমন শিক্ষা-ব্যবস্থা গুরুত্ব পাচ্ছে, কেন কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না, তার মূল কারণ বের করতে পারলেই সমাধানের পথ বের হবে বলে মনে করি।

‘শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে কোথাও না কোথাও গলদ আছে’
হাসান আজিজুল হক

কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ

দেশে অশিক্ষার প্রসার হচ্ছে। কোচিং ব্যবসা কখনোই শিক্ষার প্রসারে সহায়ক হতে পারে না। এখানে শুধুই ব্যবসা। অন্য আর দশটি ব্যবসার মতোই কোচিং ব্যবসা। কোনোই তফাত নেই। শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে। এই পণ্য এখন যে টাকার বিনিময়ে কিনতে পারছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছে। একে শিক্ষার পদ্ধতি বলা যেতে পারে না। এই শিক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায় বটে, কিন্তু জ্ঞান বা বিবেকের কোনো উন্নয়ন হয় না। আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক কঠিন। কিন্তু তাই বলে এইভাবে। অবিলম্বে কোচিং ব্যবসা বন্ধ করা উচিত। অবশ্য এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। যারা বন্ধ করবেন তারাই এখান থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। এবারে এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এইচএসসিতেও তাই পাবে বলে মনে হয়। ফলাফল যদি এত ভালো হয়, তাহলে কোচিং করার আর দরকার কী? এইভাবে একটি ছাগলকে কোচিং করিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে কী শিক্ষার উন্নয়ন হবে। আমি মনে করি, শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে কোথাও না কোথাও গলদ আছে। এই গলদ আগে খুঁজে বের করতে হবে।

‘কোচিংনির্ভর এই শিক্ষা পুরো জাতির জন্য সর্বনাশ নিয়ে আসবে’
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন

শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার নামে কোচিং ব্যবসায়ীরা শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের পকেট কাটছে। একটি জাতির উন্নয়নের মাপকাঠি হচ্ছে তার শিক্ষা ব্যবস্থা। কোচিংনির্ভর এই শিক্ষা পুরো জাতির জন্য সর্বনাশ নিয়ে আসবে। ছকবাঁধা নিয়মে লেখাপড়া করে শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো রেজাল্ট করছে। এতে আসল শিক্ষা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েও শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে না। এইভাবে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে কোনো লাভ নেই। শিক্ষাকে পণ্যের সঙ্গে তুলনা করা হলে তাকে শিক্ষা বলা যায় না। আজ টাকা যার, শিক্ষা তার। রাষ্ট্র নিজেই এই নীতি অনুসরণ করে চলছে। গ্রামের গরিব মেধাবীরা তাদের মেধার সাক্ষর রাখতে পারছে না। সর্বত্রই বৈষম্য। সরকার সর্বজনীন শিক্ষার কথা বলছে। কিন্তু সুবিধা পাচ্ছে ধনিক শ্রেণী।
দৃশ্যত লাখ লাখ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাচ্ছে। এই শিক্ষার্থীরা যখন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করেন, তখন বুঝতে হবে তারা সঠিক পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। জোড়াতালি দিয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে বটে, কিন্তু পুরো বইয়ের ধারণা তাদের কাছে নেই। ব্যবসার হাত থেকে শিক্ষাকে বাঁচাতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার, অভিভাবক, মিডিয়ার সবারই এ ব্যাপারে দায় আছে।

‘ভর্তি পরীক্ষায় পরিবর্তন আনা জরুরি’
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কোচিং ব্যবসা প্রতারণার ব্যবসা। এর মাধ্যমে শিক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। এই শিক্ষার কোনো উদ্দেশ্য নেই। শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছে। একে কোনোভাবেই সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ বলা যায় না। আমি মনে করি, কোচিং ব্যবসা বন্ধ করতে হলে ভর্তি পরীক্ষায় পরিবর্তন আনা জরুরি। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে আমরা ইতোমধ্যেই দ্রুত পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা এই নীতি অনুসরণ করে চলছি। আরও যত দ্রুত সম্ভব পরীক্ষা নিতে পারলে শিক্ষার্থীরা কোচিং নামের প্রতারণা থেকে রেহাই পাবে। একই নীতি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও নেয়া উচিত। শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হলে কোচিং সেন্টারগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এর জন্য অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সরকার আইন করছে কিন্তু সেই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। আমরা সরকারের আইনের যেমন বাস্তবায়ন দেখতে চাই, তেমনি সন্তানের শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদেরও ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

‘কোচিং ব্যবসা শিক্ষাকে পুরোপুরি পণ্য বানিয়ে ছাড়ছে’
অধ্যাপক আবুল বারকাত

অর্থনীতিবিদ

সঠিকভাবে হিসাব করলে দেখা যাবে, সারা দেশে কোচিং সেন্টারগুলোর শাখা প্রশাখা থেকে হাজার কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য হচ্ছে। কারও কাছেই এই বাণিজ্য নিয়ে সঠিক হিসাব নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই ব্যবসা? কেন সরকার এই শিক্ষাবিরোধী কোচিং ব্যবস্থা বন্ধ করতে পারছে না। সরকার আইনের কথা বলছে। শিক্ষামন্ত্রী অনেক বড় বড় কথা বলছেন। কিন্তু কই, আমরা তো কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখলাম না।
শিক্ষা পণ্য হতে পারে না। কোচিং ব্যবসা শিক্ষাকে পুরোপুরি পণ্য বানিয়ে ছাড়ছে। আমি মনে করি, শিক্ষার উন্নয়নের বাধা এখন কোচিং ব্যবস্থা। কোচিং ব্যবসা শয়তানি শিক্ষা ব্যবস্থা। এর সঙ্গে শিক্ষকরা সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এতে শিক্ষকরা তাদের মূল্যবোধ হারাচ্ছেন। শিক্ষকরা যদি তাদের মূল্যবোধ হারান, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ কোথায়? জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। আগামী বিশ্ব অর্থনীতি এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। এশিয়ায় শিক্ষায়, জ্ঞানে যারা ভালো করছে, তাদের কোনো কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে হয় না। জাপান, কোরিয়া, ভারত অর্থনীতিতে ভালো করছে। তারা সত্যিকার শিক্ষার দিকে আছে। পরনির্ভর শিক্ষায় তারা বিশ্বাসী নয়। বাংলাদেশের জিপিএ-৫ রপ্তানি করা যেতে পারে কিন্তু এই জিপিএ দিয়ে দেশের তেমন উপকারে আসবে না। আগামী বিশ্বে তারাই টিকে থাকবে যারা জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবে।
এর জন্য প্রথমত যে বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে, শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে হবে। যারা মানুষ গড়ার কারিগর তাদের কোনো মূল্যায়ন নেই। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবমূল্যায়নের কারণেই জাতির এই অবস্থা। শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষকদের মূল্যায়ন খুবই জরুরি। আমি মনে করি, বিসিএস ক্যাডারের চেয়ে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের এক টাকা হলেও বেশি বেতন পাওয়া উচিত। একজন সচিবের চেয়ে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন বেশি মূল্যায়িত হবেন, তখনই শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আসবে।

[লেখাটি এখানেও প্রকাশিত হয়েছে।]

১০ thoughts on “কোচিং ব্যবসা শয়তানি শিক্ষাব্যবস্থা

  1. আসলে দুঃখজনক হলেও সত্য যে
    আসলে দুঃখজনক হলেও সত্য যে ছাত্রছাত্রীদের এই কোচিং নির্ভরতার জন্য শিক্ষকেরা অনেকাংশে দায়ী। আমি অনেকগুলো কলেজে দেখেছি শিক্ষকেরা ছাত্রদেরছাত্রীদেরকে ঠিকমত বোঝাতে পারেন না। এমন কলেজও আছে যেখানে বিবর্তনবাদ ভাল করে পড়ানো হয়না ঈমান চলে যাওয়ার ভয়ে। পদার্থবিজ্ঞানের মত বিষয়গুলো ছাত্রছাত্রীরা একটি অক্ষরও বুঝতে পারে না প্রাইভেট টিউটর ছাড়া। অনেক ছাত্রছাত্রী শুধু পরীক্ষায় আসার মত প্রশ্নগুলোই মুখস্ত করে , বুঝে অথবা না বুঝে।
    এত সব সমস্যায় ছাত্রছাত্রীদের আসলে কোচিং না করে কোন উপায় থাকে না।

  2. এসব বুদ্ধিজীবি সরকারকে কেন
    এসব বুদ্ধিজীবি সরকারকে কেন বলছেনা শিক্ষার বাণিজ্যকরণের ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার কি রকম ক্ষতি হচ্ছে!

  3. শাসকশ্রেণি শয়তানী শাসন
    শাসকশ্রেণি শয়তানী শাসন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করলে সব সেক্টর ধিরে ধিরে শয়তানি ব্যবস্থায় ঘুরপাক খাবেই। শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে এখনো জাতিকে উদ্ধার করতে পারেনি। কোচিং বাণিজ্য হচ্ছে শিক্ষাকে বাণিজ্যকরনের একটা ধাপ। এটার সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশ আছে। সর্ষের ভুত না তাড়াতে পারলে কিচ্ছু হবে না।

    1. এটার সাথে সরকারের

      এটার সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশ আছে।

      হ, হক কতা কইচেন।
      প্রধানমন্ত্রী থেকে সরকারের মন্ত্রী আমলারা পর্যন্ত কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত!
      থ্যাঙ্কু, ভেরি ভেরি থ্যাঙ্কু।

      1. ক্যাক করে উঠলেন যে? বেশি
        ক্যাক করে উঠলেন যে? বেশি লেগেছে নাকি?
        এসব নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব কার? সরকারের নাকি সাধারণ মানুষের?

        1. ক্যাক করে উঠলেন যে? বেশি

          ক্যাক করে উঠলেন যে? বেশি লেগেছে নাকি?

          “……” করা দেখেই বুঝতে পারলাম আমার চাইতে আপনারেই বেশি লেগেছে!
          দায়িত্বের কথা উঠলে বলি, এটা আমার আপনার আমাদের সবার দায়িত্ব।
          শুধু সরকারের দায়িত্ব বলে নিজের দায় এড়াবার যারা চেষ্টা করে আমি তাদের অন্ধ বলি।

          1. আমাকে আপনাকে কি করতে হবে?
            আমাকে আপনাকে কি করতে হবে? দলবলসহ গিয়ে লাঠি দিয়ে সব কোচিং সেন্টার ভেঙে দিতে হবে। জনগণনের কার্যকর যেটা করার দরকার সেটা কিন্তু করছে, সরকারই চুপ করে বসে আছে। এই যে এই পোস্টের জন্ম, এটা হচ্ছে আমাদের কাজ। কিন্তু আপনারা বলবেন কি? সরকারের বিরুদ্ধে বলছে। নিয়ন্ত্রন কখনো জনগন করতে পারেনা। করতে হবে সরকারকে।

          2. কোচিং সেন্টার ভাঙার কি দরকার?
            কোচিং সেন্টার ভাঙার কি দরকার? বাইরে সময় না দিয়ে ঘরেও কিছুটা সময় ব্যয় করুন ছেলে মেয়ের পড়ালেখার খোঁজ খবর নিতে। তাদের পড়ালেখার তদারকি করুন, কোচিং সেন্টারে পাঠাতে হবে না। আপনার মতো অন্যরাও যদি একই কাজ করে, কোচিং সেন্টারঅলারা বসে বসে মশা মাছি মারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *