জুতার মর্যাদা

বাচ্চারা স্কুলের ইউনিফর্ম পড়ে স্কুলে যায়। শার্ট প্যান্টের মতো জুতাও তার অংশ। পুলিশ তার ইউনিফর্ম পড়ে যার মধ্যে বুটও আছে। জামা কাপড়ের মতোই জুতাও এক ধরনের আচ্ছাদন। বর পাগড়ি শেরওয়ানীর সাথে নাগরা জুতাও পড়ে। প্যান্ট যত দামিই হোক গায়ে দেয়া যাবে না,এমন কি শার্ট মাথায়ও দেয়া যাবে না। তেমনই জুতা পায়েই দিতে হয়। শরীরের কোন অংশে কোন আচ্ছাদন ব্যবহার হবে সেটার উপর ভিত্তি করে কোন কিছুর দাম নির্ধারন হয়না। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো জুতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। যদিও বাজারে জুতার দাম একে বারে কম না। স্যান্ডেল কিনতে গেলেও হাজার টাকা দরকার। আর পা ঢাকা শো কিনতে চাইলে তো সর্বনিম্ন কয়েক হাজার লেগে যায়। এত দাম থাকার পরেও আমরা কেন এই জুতাকে এত তাচ্ছিল্য করি?

সামন্তবাদী সময়ে প্রজারা রাজা,জমিদারের বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পড়ে যেতে পারতো না।এমন কি সাধারণ কৃষকরা জুতা পায়ে দিতে দেখলেও তাদের অপমান করা হতো। এই দেশের শ্রমজীবি মানুষের খুব কমই এখনো দিনের বেলায় জুতা পড়ে। এক কথায় জুতা পড়ে কাজ করার পরিবেশ আমাদের দেশে এখনো চালু হয় নাই।প্রতিদিন সকালে কিছু মানুষ কামলা যাওয়ার জন্য মোড়ে জড়ো হয়।আমি এদের বেশির ভাগের পায়ে কখনো কোন জুতা দেখি নাই। দুইচাকার ভ্যান গাড়ির বেশির ভাগ চালকের পায়ে কখনো জুতা দেখি নাই। তপ্ত দুপুরে যে পিচে আমি পা দিতে পারিনা, সেই রাস্তায় তারা মালামাল ভর্তী ভ্যান টেনে নিয়ে যায় খালি পায়ে। জুতা এখনো তাদের কাছে সহজ লভ্য হয় নাই।

ইউরোপে নাকি অন্তবাস দিয়ে প্রতিবাদ হয়।ইন্ডিয়াতেও অন্তবাস খুলে প্রতিবাদের ছবি দেখেছি।শাহবাগেও একবার ছেঁড়া জুতা নিয়ে একটি প্রতিবাদ করা হয়েছিল।আমি জুতার মর্যাদার কথাই বলতে চাইছি। গ্রামে এখনো কোন অপরাধীর গলায় জুতার মালা দিয়ে অপমান করা হয়। জুতার বাড়ি দেয়াটা যতটা ব্যথা দেবার জন্য তার চেয়ে বেশি অপমান করার জন্য। বুশকে জুতা মেরে তো একজন রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে গেছে। তার পর এই জুতা ছুড়াছুড়ি আরো কিছুদিন অব্যহত ছিল। মহাত্মা গান্ধি একবার ট্রেনে ভ্রমন করছেন। ট্রেনে উঠার সময় তার পা থেকে এক পাটি জুতা পড়ে গেল, তিনি সাথে সাথে আর এক পাটি জুতা বাইরে ফেলে দিলেন।সাথের লোকেরা জানতে চাইলে বললেন, একপাটি নিয়ে তো একজন কোন কাজে লাগাতে পারবে না, তাই বাকিটা ফেলে দিয়েছি, যদি কুড়িয়ে পায় তবে কাজে লাগবে।

ছেলে এবং মেয়েদের জুতার পার্থক্য নিয়ে নানা রকমের গল্প চালু আছে। ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা জুতায় একটু উঁচুতে থাকেন।জুতা নিচে যেমন নামায় উঁচুতেও তেমনই তুলে। অন্তত মেয়ের জুতায় উঁচুতে উঠতে,ঠিক আমি উঁচু জুতার কথাই বলছি। সাইকেল চালানো আর হাইহিল পড়ে হাটার মধ্যে যথেষ্ট মিল আছে, একটু দক্ষ না হলে পা ভেঙ্গে পঙ্গু হাসপাতালে থাকতে হবে। সাইকেল দুই চাকার উপর কিভাবে বিষ্ময়কর ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে,হাইহিল পড়তে দেখে সেই বিষ্ময় আর নাই।এই দেশের প্রগতিবাদীদের কাছে একটা গল্প চালু আছে, মেয়েরা যাতে দ্রুত ছুটতে না পারে সেই জন্য এই হাইহিল তাদের পড়ানো হয়। এই যুগে তো মেয়েদের দৌড়ে ধরতে হয় না তবু কেন হাইহিল এত জনপ্রিয়। আমার কিন্তু দেখতে মন্দ লাগে না।

মাথার ক্যাপ দিয়ে যেমন জুতার কাজ চলে না, জুতা দিয়েও ক্যাপের কাজ চলে না।কোনটা মাথায় থাকবে কোনটা পায়ে থাকবে এটা প্রয়োজনের বিষয়,মর্যাদার ব্যপার না। কিন্তু আমরা ক্যাপকে পবিত্র মনে করি কিন্তু জুতাকে নিকৃষ্ট মনে করি।জুতার চেয়ে ক্যাপের প্রভাব বেশি,তার জন্য ধর্মও অনেক দায়ী।সব ধর্মই শরীরের অংশ পা কে অমর্যাদাকর বলে আসছে। পশ্চিম দিকে মাথা দেয়া যাবে কিন্তু পা দেয়া যাবেনা,পশ্চিমে পা দিলে গুনাহ হবে ইত্যাদি।পদবীর জোর অবশ্যই মাথা থেকে বেশি। হুমায়ুন আজাদ বলেছেন “

পা, বাঙলাদেশে, মাথার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পদোন্নতির জন্যে এখানে সবাই ব্যগ্র, কিন্তু মাথার যে অবনতি ঘটছে, তাতে কারো কোনো উদ্বেগ নেই।”

ধর্মের কারনেও মাথার আচ্ছাদন পায়ের আচ্ছাদনের তুলনায় বেশি মর্যাদা পাচ্ছে।যদিও শার্টের সাথে প্যান্টের তুলনা করলে কিন্তু আমরা উপরেরটা নিচেরটার থেকে বেশি মর্যাদা দিচ্ছিনা।কিন্তু জুতার বেরায় এত পক্ষপাতিত্ব কেন?

জুতাকতটা গুরুত্বপূর্ণ এটা জুতার সহজ লভ্যতার কারনে হয়তো বুঝতে পারছিনা। কিন্তু হবুচন্দ্র রাজার গবোচন্দ্র মন্ত্রীকে এর জন্য কম কষ্ট করতে হয়নি।

কহিলা হবু, ‘শুন গো গোবুরায়,
কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র—
মলিন ধূলা লাগিবে কেন পায়
ধরণী‐মাঝে চরণ‐ফেলা মাত্র!
………………
তখন ধীরে চামার‐কুলপতি
কহিল এসে ঈষৎ হেসে বৃদ্ধ,
‘বলিতে পারি করিলে অনুমতি,
সহজে যাহে মানস হবে সিদ্ধ।
নিজের দুটি চরণ ঢাকো, তবে
ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।’
জুতা-আবিষ্কার – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছোট কালে চিন জাপানের শিশুরা গল্পে শুনেছি, শিশুদের পা ছোট রাখতে লোহার জুতা পড়িয়ে রাখা হয়। জুতা মনে হয় জাপানিরা ভাল তৈরি করে।সেই গানটার কথা মনে আছে না

মেরা জুতা হে জাপানি…

৫০এর দশকের সাড়া জাগানো সিনেমা ” শ্রী ৪২০।চিলড্রেসন হ্যাবেন সিনেমায় পিচ্চিটার পা থেকে জুতা পড়ে যায় ড্রেনে, পিচ্চিটা তা তুলতে কত চিষ্টা করে। এক জোড় জুতা দুই ভাই বোন মিলে পায়ে দেয়, ছোট মেয়েটা স্কুল থেকে ফিরার অপেক্ষায় বড় ভাই দাঁড়িয়ে থাকে ফিরার পর সেই জুতা নিয়ে সে স্কুলে যায়। এক জুড়া জুতার জন্য প্রতিটা দর্শকেরই নিশ্চয় আমার মতো চোখে পানি চলে এসেছে!

প্রশ্ন আমার দীর্ঘ দিনের। কিন্তু উত্তর আজো মিলেনি।আমরা যে সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছি,সেই ধর্মের প্রভাবে বড় হচ্ছি,যেই সমাজে বড় হচ্ছি তার প্রভাব আমাদের মধ্যেও নিজের অজান্তে পড়ছে।আমাদের এত বড় শিক্ষিত সমাজেও জুতার চেয়ে টুপিকে বেশি মর্যাদা দিচ্ছে। ব্যপারটা কি বিশ্বাস যোগ্য মনে হচ্ছে না?

আমাদের দেশে আমরা কিছু জায়গাকে পবিত্র মনে করি। ধর্মীয় পবিত্রতার মধ্যে আছে,মসজিদ,মন্দির,মাজার। আর কিছু পবিত্রতা আছে রাষ্ট্রিয়, যেমন বিভিন্ন শোক স্তুম্ভ,বিখ্যাত কোন মানুষের কবর অথবা ঐতিহাসিক কোন স্থাপনা বা স্তম্ভ।ধর্মের মতো আমরা এই সব স্তম্ভেও জুতা নিয়ে যাওয়াটা অশোভন মনে করি। আমিও রাষ্ট্রের এই নিয়ম গুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় জুতা খুলাকে কেন মর্যাদা হিসেবে ধরা হবে? কেন আমরা জুতাকে অন্যান্য ইউনিফর্মের মতো চিন্তা করতে পারছি না।ধরুন আমাদের মহান একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে সকল বাহিনীর লোকেরা দায়িত্ব পালন করেন তারা কি জুতা খুলে দায়িত্ব পালন করবেন? ব্যপারটা দেখতে হাস্যকর মনে হচ্ছেনা? আমরা অবশ্য একটা গোজামিল বের করে নিয়েছে এটা হচ্ছে মূল বেদি। মূল বেদিতে না গেলই হলো, যদি নিচের বেদিতে জুতা নিয়ে যাওয়া যায় তবে উঁচুটাতে সমস্যা কি?

জুতার যে একে বারে মর্যাদা হয়না এটা ঠিক বলা হয়নি। শ্রী রাম চন্দ্রের জুতা জুড়া সিংসাহসে বসিয়ে ভরত চন্দ্র বহু বছর রাজ্য শাসন করেছিল। সেই ভরত চন্দ্র থেকেই নাকি ভারতের নাম হয়েছে।বিমান বন্দরে যদিও কিছু জুতার ভেতর থেকে স্বর্ন বের হওয়ার খবর শুনেছি,তবু সেই জুতার মর্যাদার ব্যপারে কোন পত্রিকার খবর দেখি নাই। এই কালেও জুতার মর্যাদা অনেক এমন কি সেটা এক পায়ের হলেও। একটা জুতার জন্যও কত বড় লড়াই যে হচ্ছে সেটা তো জানেন।আরে হ্যা আমি তো সেই বিশ্বকাপ ফুটবলে বুট জুতার কথাই বলছি। যদিও তা সোনা দিয়ে তৈরি তবু জুতা তো জুতাই।

বি.দ্র: ভাবছিলাম জুতার ছবি দেই। পরে আবার ভাবলাম জুতা! এর ছবি কি ব্লগে দেয়া যায় ছিঃ

১২ thoughts on “জুতার মর্যাদা

  1. চমৎকার লিখেছেন। নির্মল বিনোদন
    :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে:
    চমৎকার লিখেছেন। নির্মল বিনোদন পেলাম।

  2. দারুণ লিখছেন। মজা পাইলাম,
    দারুণ লিখছেন। মজা পাইলাম, অনেক কিছু জানলামও। :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে:

  3. জুতা নিয়ে এত কাহিনী লেখা
    জুতা নিয়ে এত কাহিনী লেখা যায়?
    এক কথায় বলব, অসাধারণ একটা পোস্ট পড়লাম। এ ধরনের লেখা আরো চাই। আর হ্যাঁ, ইস্টিশনে আপনাকে স্বাগতম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *