স্যরি.. আই ডিডনট ফাইন্ড এনি টাইটেল টু ম্যানশন!

তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। আগেই স্কুলের প্রাইমারী শাখায় পড়াতে নতুনত্ব বলতে তেমন কিছুই চোখে পড়তো না। শুধু শিক্ষকগুলো আলাদা আর কিছু নতুন ছাত্র-ছাত্রী ছিলো। তো একদিন ক্লাস টিচার কি এক সমীক্ষা/রিপোর্ট টাইপের কাজে ক্লাসের সবাইকে জিজ্ঞেস করলো এমন কেউ কি আছে নাকি যার বাবা বা মা বেঁচে নেই। তখন দেখলাম সবাই চুপ। আমার পাশে বসা এক ছেলে আরেক ছেলেকে গুতাচ্ছে, কিন্তু ওই ছেলে সায় দিচ্ছিলোনা। তো আমার পাশের ছেলেটি বলবো যে ম্যাডাম.. মামুনের বাবা নেই। কিন্তু বেচারা মামুনের চেহারায় স্পষ্ট হচ্ছিল বিমর্ষতার ছাপ। মাথা নিচু করে দাড়িয়ে সায় দিলো। ম্যাম তাকে মন খারাপ না করে সান্তনামূলক কথাবার্তা বলে শান্ত করার চেষ্টা করলো, তার পরিবারের খোঁজ খবর নিলো। ক্লাস সিক্সের একটা ছেলে তখন কিভাবে পিতৃহারা হয়ে পড়াশোনা চালাচ্ছে বা তার কেমন ফিল হয় সেটা নিয়ে আমার অতটা ইন্টারেস্ট জন্মায়নি। তবে সেই ক্লাসমেট মামুনেরর চেহারায় সেদিন যে বিমর্ষতার ছাপ দেখেছিলাম তা আমার মনে ভালভাবেই দাগ কেঁটে যায়। ক্লাসের সেই ম্যাডামটা ছিল আমার আম্মু, তাই বাসায় আসার পর ওই ছেলের ব্যাপারে আম্মুর সাথে আলাপ করলাম। আম্মু বললো পিতা-মাতা হারানোর পরও সব মেনে নিতে হয়। তারপর ওনার আরেক ছাত্রের কথা বললেন যার বাবা থেকেও নেই। বরং তার ওই ছাত্রের কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলে দীর্ঘশ্বাস নিচ্ছিলেন। আর আমাকে বললেন যার কপালে আল্লাহ্ যা লিখে রেখেছেন তা মেনে নিতে হয়। পৃথিবীটা এমনই।

কিন্তু কে জানতো এর কয়েক বছর পর একই দীর্ঘশ্বাস আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে, সেই একই অপূর্ণতার কথা লিখতে হবে নিজেকে নিয়ে। আমার সেই ক্লাস সিক্সের সহপাঠী মামুন কোথায় আছে, কিভাবে আছে জানিনা। তবে এটুকু জানি, তার সেই অনুভূতি এখন আমার মাঝেও আছে। খুব ভাল করেই বুঝতে পারি তখন সে কেন মুখ কালো করে ছিলো.. কেন তার দৃষ্টিতে স্পষ্ট হচ্ছিল ছলছল কিছু চোখের জল। কেউ যদি বলে তোমার অপূর্ণতা কি? আমি বলবো এই একটাই অপূর্ণতা। এই একটা অপূর্ণতা কতটুকু বিশাল তা হয়তো বলে বোঝাতে পারবোনা। একে একে অপূর্ণতার চার বছর পূর্ণ হয়ে গেল আজ। বিশাল এই পৃথিবীতে অনেকেই আছে, তার মাঝেও কারো কারো অনুপস্থিতি পৃথিবীটাকে অপূর্ণ করে দেয়। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজ জীবনে এসে পিতৃহীন হওয়ার স্বাদ পেয়েছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে অনেক ধরণের মানুষের সাথে পরিচয় হচ্ছে, অনেক অনেক বন্ধু হচ্ছে। অনেকের সাথে অনেক আড্ডাবাজি হয়, অনেক গল্প করা হয়। কিন্তু হঠাৎ কারো বাবার ব্যাপারে গল্প শুরু করলে আমি এড়িয়ে যেতে চাই, অনেকে ব্যাপারটা ধরতে পেরে প্রশ্ন করে বসে। আমি জানি স্বাভাবিক মৃত্যুর ব্যাপার হলে এক কথায় উত্তর দিয়ে ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এক উত্তরের বিপরীতে সবার অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস আসবে ভেবে আমি স্বার্থপরের মতো এড়িয়ে যাই। আর কারো বাবার ফোনে উৎফুল্ল হয়ে কথা বলার সময় একটু মিলিয়ে দেখি আর ভাবি.. “আমিও কি আব্বুর সাথে এমনভাবে কথা বলতাম?” কেউ গর্ব করে বলে আমার আব্বু এই গিফট দিয়েছে, এই করেছে.. সেই করেছে.. আমারও ভাল লাগে.. নিজেই নিজে বলি.. “আমার আব্বু সততার প্রশ্নে কখনো আপোষ করেনি।” তবু দিনশেষে কখনো কখনো একাকীত্বের কাছে হেরে হিসেব মিলাতে বসি। তবু এখনো শেষরাতে তাকে স্বপ্ন দেখে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ভাবি.. এইতো আব্বু! কে বলেছে সে নেই! নিশ্চই একদিন ওপার থেকে এপারে এসে বলবে.. “এইতো আমি ফিরে এসেছি!” অসম্ভব আর অবাস্তব জেনেও নিজের ফোন চেঞ্জ করেও সবার আগে আব্বুর নাম্বারটা সেইভ করি। আর আশায় থাকি কোন সকালে না জানি আচমকা ফোন করে বলে..

বাবা দেখ.. বিটিভিতে প্যারেড দেখাচ্ছে.. আমাদের বি.ডি.আরের একটা টীম আছে ওখানে! তোর আম্মুকেও বল দেখতে..

—0—-
২৬.০৫.১৩
উত্তরা, ঢাকা।

২ thoughts on “স্যরি.. আই ডিডনট ফাইন্ড এনি টাইটেল টু ম্যানশন!

  1. আপনার বাবা বিডিআর নাকি
    আপনার বাবা বিডিআর নাকি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন?
    তিনি কি পিলখানায় শহীদ হয়েছিলেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *