টাকা

আজ সকালে প্রাতঃ ভ্রমণে বের হওয়ার সময় অনুভব করলাম গত এক মাসে কোমর কমে গেছে এক ইঞ্চির বেশি। যে হাফ পেন্ট পরে প্রাতঃ ভ্রমণ করি, তাতে বেল্ট বাধতে গেলে টের পাই সেটি ঝরে যাচ্ছে শরীর থেকে! বেল্টের শেষ ছিদ্রটিতেও আটকাচ্ছে না, কী মুশকিল! কোনোক্রমে রান্নাঘরে নেমে ড্রয়ার থেকে চাকু বের করে দেড় ইঞ্চি দূরত্বে আরেকটি ফোঁড় করলাম। তাতেই পেন্ট আটকালো। ওজন মেপে দেখি ১৫০ পাউন্ড, প্রায় ৬৮ কেজি। ১৬০ পাউন্ড থেকে নেমে গেছে প্রায় ১০ পাউন্ড! একেই বলে টাকার খেলা।

আজ সকালে প্রাতঃ ভ্রমণে বের হওয়ার সময় অনুভব করলাম গত এক মাসে কোমর কমে গেছে এক ইঞ্চির বেশি। যে হাফ পেন্ট পরে প্রাতঃ ভ্রমণ করি, তাতে বেল্ট বাধতে গেলে টের পাই সেটি ঝরে যাচ্ছে শরীর থেকে! বেল্টের শেষ ছিদ্রটিতেও আটকাচ্ছে না, কী মুশকিল! কোনোক্রমে রান্নাঘরে নেমে ড্রয়ার থেকে চাকু বের করে দেড় ইঞ্চি দূরত্বে আরেকটি ফোঁড় করলাম। তাতেই পেন্ট আটকালো। ওজন মেপে দেখি ১৫০ পাউন্ড, প্রায় ৬৮ কেজি। ১৬০ পাউন্ড থেকে নেমে গেছে প্রায় ১০ পাউন্ড! একেই বলে টাকার খেলা।
টাকার জন্য যখন হা পিত্যেশ করার কথা, তখন করিনি বলে আজ এই অসময়ে টাকার গরম টের পাচ্ছি। তবে সব দেশে, সব কালে, সবাই যে টাকার জন্যে জান বাজি রাখে তা কিন্তু নয়। টাকা মানুষের প্রয়োজন, টাকা না হলে বিমানে উড়া যায় না, রেস্তোরাঁয় নাস্তা করা চলে না, বন্ধু-আত্মীয়ের দেখা মেলে না- সবই ঠিক! এমনকি টাকা পকেটে না থাকলে একা নিরালায় মরে পড়ে থাকবে, কেউ খোঁজও নেবে না! এতো সুন্দর পৃথিবীটা তৈরি করে বিধাতা যে দিনে দিনে এতো কঠিন কঠোর নিয়মের জালে আমাদের জড়িয়ে দিয়েছে তা কে জানত?
আমেরিকায় এখন টাকার নিশানা পাওয়া সত্যি শ্রমসাধ্য ব্যাপার। এমনকি ২০০১ সালে প্রথম যখন আসি, তখনও ভাবিনি বারো-চৌদ্দ বছর পর সবকিছু এতোটা ওলট পালট হয়ে যাবে! গ্যাসোলিনসহ খাদ্য দ্রব্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। কিন্তু আয় বাড়েনি, বরং মধ্যবিত্তের আয় কমেছে বিশাল ব্যবিধানে। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো অর্থনীতির এই নিম্নগতি যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কেউ জানে না। ইন্টারনেটসহ তথ্য প্রযুক্তির অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে এই আমেরিকা। কিন্তু আজ এখানেই সম্ভাবনার সব দুয়ার যেন বন্ধ হতে চলেছে।
বছর আটেক আগে মন্দাদশা শুরুর সময় এক রেডিক্যাল অর্থনীতিবিদের কথা এখনো সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। তিনি বলেছিলেন- যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যখনই কোনো মন্দা এসেছে, তার দায় পড়েছে সব সময় সমাজের মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের কাঁধে। কিভাবে? ছোট্ট একটি উদাহরণ টেনে তিনি বলেছিলেন- যেমন শহরগুলোতে, যেখানে সাধারণ নাগরিকরা বিনে পয়সায় গাড়ি রাখতে পারে, সেখানে কর্ত্রিপক্ষ টোল বসাবে। কথাটি একশত ভাগ সত্যি। নিউইয়র্ক শহরের অলিগলিতে এখন গাড়ি পার্ক করতে গেলে টোল দিতে হয়। অথচ বছর দশেক আগে ব্যস্ততম জ্যাকসন হাইটসেও গাড়ি পার্ক করতে টোল দিতে হত না। একই উদাহরণ- আমাদের এই ছোট্ট শহর পুকেপ্সিতেও। গত সপ্তায় এখানের রাস্তাগুলোতেও কর্ত্রিপক্ষ টোল বসিয়েছে। সাধারণের আয় কমছে, সেদিকে মনোযোগ নেই। অথচ করের বোঝা বেড়েই চলেছে!
যে আশা জাগিয়ে ওবামা প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, আজ সবই দুরাশা। ফারেনহাইট নাইন এলিভেন তথ্য চিত্রে মাইকেল মূর বলেছিলেন- আমেরিকা চালানোর জন্য কোনো প্রেসিডেন্টের প্রয়োজন নেই। কথাটা একেবারে অযৌক্তিক নয়। বড় বড় সব কর্পোরেটই যখন জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করবে, তখন রাস্ট্রের নির্বাহী সংস্থাটির আর প্রয়োজন কেন? একবার মনে হয়- আমেরিকা কেন বাংলাদেশের মত হয়ে যায় না, যেখানে প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিদিন সাধারণ নাগরিকদের মুখোমুখি হতে হয়। প্রবোধ, অথবা নিদেন পক্ষে মিথ্যে আশ্বাসের ফুলঝুরি ঝরাতে হয়! ২০০৮ সালে টিভিতে ওবামার ভাষণ শুনে আমি যখন মুগ্ধ, তখন সার্ধ মাইকেল ডুলুকা পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল- “দে অল আর বুল শিট”। সেদিন তাকে বিশ্বাস করতে কস্ট হচ্ছিল, কিন্তু আজ আর বিশ্বাস করতে কোনো অসুবিধে নেই!
বলছিলাম টাকার কথা। টাকার জন্য এই দেশে যে কাজগুলো করতে কখনো কুন্ঠিত হইনি, বাংলাদেশে সেসব কাজ করতে কুন্ঠায় জর্জরিত ছিলাম। আমাদের শিক্ষা, আমাদের সমাজ, আমাদের পারিপার্শিকতা যে মূল্যবোধে আমাকে বড় করেছে, তার জরিমানা আমাকে যে শোধ করতেই হবে!
ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী মূল্যবোধে বড় হওয়া এই আমি পরের কাঁধে বন্দুক রেখে জীবন পার করার আদর্শে বড় হয়েছি। সমাজের দরিদ্র মানুষের শ্রমকে অল্প দামে কেনার চাতুর্য শিখেছি মায়ের কোল থেকে। নির্বল মানুষকে ছলে বলে কৌশলে দমিয়ে রাখার, মিথ্যে আশ্বাস অথবা প্রবোধ দেয়ার সব কলাকানুন শিখেছি বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে। আমার ধর্ম-দর্শন সবই ছিল কেবল আমাকে বড় করার, আরো বড় করার। আমার আমিত্বে সকলকে ভাসিয়ে দেয়ার। সেই আমি আজ এমন দর্শনের মুখোমুখি- যা আমার অতীতকে নর্দমার আবর্জনার মত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। প্রতিদিন আমি জেগে উঠি, প্রতিদিন নিজেকে বলি- আমি চিনেছি তোমাকে, আমার অস্তিত্ব আর প্রতিদিনের সংগ্রামে।
নিউইয়র্ক, ২৯ জুন ২০১৪

১ thought on “টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *