আমি এবং সে

The Soul of Man is Sevenfold, yet but One in essence; Man’s Spiritual Unfoldment has as its end the Discovery of Himself beneath the Sevenfold Veil.
– The Secret Doctrine of the Rosicrucians, by Magus Incognito



The Soul of Man is Sevenfold, yet but One in essence; Man’s Spiritual Unfoldment has as its end the Discovery of Himself beneath the Sevenfold Veil.
– The Secret Doctrine of the Rosicrucians, by Magus Incognito
(১)
আমার প্রায়ই মনে হয় আগের জন্মে আমি সম্ভবত জমিদার টমিদার টাইপ কিছু একটা ছিলাম। কারণ সবকিছুতেই হালকা জমিদারির ছোঁয়া না থাকলে সেটা আমার কিছুতেই মনে ধরে না। এজন্য অবশ্য আমাকে, বিশেষ করে আমার চারপাশে যারা আছে তাদের ব্যাপক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়। যেমন, ঠাণ্ডা ভাত আমি খেতে পারি না, ভাত হতে হবে গরম, ধোঁয়া উঠছে – এরকম। ভাত আবার বেশী গরম হলে হবে না। গরম ভাত আমি হাত দিয়ে ধরতে পারি না। ধরতে না পারলে সেটা খাব কিভাবে? গরম ভাত সামনে রেখে একটু অপেক্ষা করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু আমি জমিদার, ভাত সামনে রেখে অপেক্ষা করা আমাকে মানায় না। অতএব, ভাতের ব্যাপারে আমার জমিদারি নিয়ম হচ্ছে – ভাত হতে হবে সুগন্ধি চিকন চালের এবং ফকফকা সাদা। তাপমাত্রা হতে হবে সহনীয়, এবং সেটা পাতে ঢালার পর ধোঁয়া উঠতে থাকবে। ভাত একটার সাথে আরেকটা জড়াজড়ি করে থাকলে হবে না, ভাত হতে হবে ঝরঝরা।
দুঃখের কথা, রন্ধন শিল্পে এখন আকাল চলছে। তাছাড়া লোকজনের সেই ধৈর্যও নাই দক্ষতাও নাই। বাসায় একবার ভাত ভর্তা (ভাত জাউ হয়ে গিয়েছিল) খেতে খেতে আমি আপন মনেই বলে ফেলেছিলাম যে ভাত কেমন হওয়া উচিৎ। আর যায় কোথায়? আমি যে ভাতই রান্না করতে পারি না – সেটা নিয়েই সবাই আমার উপর হামলে পড়ল। যতক্ষণ খেলাম ততক্ষণ আমার সম্পর্কে যা-না, তা বলে, বলল, জমিদারী ভাত খেতে হলে নাকি নিজেকেই রান্না করে খেতে হবে! কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। টিনের চালে কাক, আমি তো অবাক! বলে কি লোকজন! ভাত রান্না করবে নাভিদ কায়সার? হা হা হা!
(২)
পূর্বজন্মের কথা যাদের হুবহু মনে থাকে তাদের জাতিস্মর বলা হয়। উইকিপিডিয়া বলে, প্রায় ২০ শতাংশ মার্কিনীই নাকি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে। অবাক করা ব্যাপার। জাতিস্মরদের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া মানে পূর্বজন্ম এবং পুনর্জন্মে বিশ্বাস করা। যাঁরা জাতিস্মরদের সন্দেহের চোখে দেখেন তাঁরা বলেন যে এই পূর্বজন্ম মনে রাখা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। ইসলাম ধর্মে এই ধরনের কনসেপ্ট আছে কিনা আমি ঠিক জানি না। থাকার কথা না।
ক্যারল ব্যোমানের বইয়ে জাতিস্মরদের বিবরণ আছে। ক্যারল মনে করেন জাতিস্মরদের পূর্বজন্মের বিবরণ কল্পনা প্রসূত নয়। ওনার মতে কল্পনা মনের ব্যাপার। জাতিস্মরদের কাছে পূর্বজীবন হল সত্যি ঘটনার পূণাঙ্গ মানসিক চিত্র। একমাত্র একজন সূক্ষ অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের পক্ষেই এর তফাৎ করা সম্ভব।
ক্যারল ব্যোমানের মতে জাতিস্মর বোঝার চার রকম উপায় আছেঃ
(ক) স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে পূর্বজন্ম বিষয়ে তথ্য দেওয়া।
(খ) কয়েক দিন/সপ্তাহ/মাস/বছর ধরে পূর্বজন্ম বিষয়ক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
(গ) অভিজ্ঞতার বাইরে জ্ঞান।
(ঘ) সেইমত ব্যবহারিক এবং শারীরিক বৈশিষ্টের প্রকাশ।
এইবার আসি আমার আগের জন্মের জমিদারী প্রসঙ্গে। প্রথমত ব্যোমানের মতে আমি যদি জাতিস্মর হয়ে থাকি তাহলে সেই সময়কার তথ্য আমার কাছে থাকার কথা। ভালো পয়েন্ট ধরেছে। জমিদারী মানেই আরাম। আর আরাম সম্পর্কে যদি আমার কাছে জানতে চান তাহলে আরাম কাকে বলে, সেটা কত প্রকার ও কি কি আমি তার বিস্তারিত বিবরণ স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতেই দিতে পারবো।
দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন ঘুম ভাঙলেই আমার মনে হয় এই যে চূড়ান্ত কষ্টের একটা জীবন যাপন করছি – সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হয়, নানা রকম উটকো কাজ করতে হয় – এসব আসলে আমার জন্য না। আই অ্যাম বিল্ট ফর দ্যা কিল। যেমন ধরেন জেমস বন্ড। এইসব ছেনি, হাতুড়ি, ঢালাই, ইঞ্জিনিয়ারিং – এই সব আমার জন্য না।
তৃতীয়ত, অভিজ্ঞতার বাইরে জ্ঞান। এটা নিয়ে বলার কিছু নাই। ভাত সম্পর্কে আমার যে জ্ঞানের বাহার দেখালাম তার পর আমার অভিজ্ঞতার বাইরের জ্ঞান সম্পর্কে প্রশ্ন করার কোন মানে হয় না।
চতুর্থ ব্যাপারটাতেই আমার জমিদারীর আসল বৈশিষ্ট্যটা ফুটে উঠেছে।
(৩)
হিন্দু ধর্মে পূর্বজন্মের ব্যাপারে বহু মিথ প্রচলিত আছে। সঠিক তথ্য উপাত্ত দিতে পারবো না। তবে আমার জানা মতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে একজন ব্রাহ্মণ পূর্বজন্মে পুণ্যবান ছিল বলেই এখন ব্রাহ্মণরূপে জন্মলাভ করেছে এবং একজন অস্পৃশ্য পূর্বজন্মে পাপী-জীবন যাপন করেছে বলেই এখন অস্পৃশ্য হয়ে জন্মেছে। শাস্ত্রানুসারে ব্রাহ্মণকুলজাত ব্যক্তিগণ বিপ্র (অর্থাৎ জ্ঞানী) এবং দ্বিজ (অর্থাৎ দু’বার জাত) হিসেবেও অভিহিত হয়ে থাকেন।
তবে বৌদ্ধ ধর্মে আছে। যেমন কপিল।
এই বৈদিক ঋষিকে সাংখ্য দর্শনের অন্যতম প্রবর্তক মনে করা হয়। হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, তিনি ব্রহ্মার পৌত্র মনুর বংশধর। ভগবদ্গীতায় কপিলকে সিদ্ধযোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্দে কপিলের জীবনের বর্ণনা পাওয়া যায়। এখানে তাঁকে কর্দম মুনি ও দেবাহুতির পুত্র বলা হয়েছে। তিনি সতী অনুসূয়ার ভ্রাতা ও গুরু। কপিলকে সর্বোচ্চ দেবতা বিষ্ণুর একটি অবতার বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ভাগবত পুরাণে অবতারদের তালিকায় তাঁর নামও পাওয়া যায়। পিতা গৃহত্যাগ করলে কপিল নিজের মা দেবাহুতিকে যোগ ও বিষ্ণু-ভক্তি শিক্ষা দেন। এর ফলে দেবাহুতি মোক্ষ লাভ করেন। ভাগবত পুরাণের একাদশ অধ্যায়ে কপিলের সাংখ্য দর্শন কৃষ্ণ উদ্ধবকে শিখিয়েছিলেন। এই অংশটি উদ্ধব গীতা নামে পরিচিত।
কোনো কোনো বৌদ্ধ পণ্ডিত দাবি করেন, গৌতম বুদ্ধ পূর্বজন্মে কপিল ছিলেন। অশ্বঘোষ তাঁর বুদ্ধচরিত গ্রন্থে লিখেছেন বুদ্ধ সাংখ্যবাদী শিক্ষকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর মতবাদের কিছু অংশ সাংখ্য প্রভাবিত।
(৪)
এখন কথা হচ্ছে, আমি হঠাৎ করে জাতিস্মর বা পূর্বজন্ম নিয়ে পাগলামি শুরু করলাম কেন। ঘটনা কিছুই না। ছুটির দিনগুলোতে নিজেকে আমার জমিদার জমিদার লাগে। আর সেখান থেকেই এত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের সূত্রপাত। কথা যেহেতু শুরু হয়েছেই, সেহেতু এই প্রসঙ্গে আর কিছু কথা যোগ করা যেতে পারে।
১৯শে সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩ শিকাগো। সেখানে ধর্ম-মহাসভা উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত একটি সন্মেলনের নবম দিবসের অধিবেশনে স্বামী বিবেকানন্দ যে প্রবন্ধটি পাঠ করেন তার একটি অংশ তুলে ধরছিঃ

“আমি এখানে দাঁড়াইয়া আছি। যদি চক্ষু মুদ্রিত করিয়া আমার সত্তা সম্বন্ধে চিন্তা করিবার চেষ্টা করি-‘আমি’ ‘আমি’ ‘আমি’,তাহা হইলে আমার মনে কি ভাবের উদয় হয়? এই দেহই আমি-এই ভাবই মনে আসে। তবে কি আমি জড়ের সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নই? বেদ বলিতেছেন : না, আমি এই দেহ নই। দেহ মরিবে,কিন্তু আমি মরিব না। আমি এই দেহের মধ্যে আছি, কিন্তু যখন এই দেহ মরিয়া যাইবে তখনও আমি বাঁচিয়া থাকিব এবং এই দেহের জন্মের পূর্বেও আমি ছিলাম। আত্মা শূন্য হইতে সৃষ্ট নয়, কারণ ’সৃষ্টি’ শব্দের অর্থ বিভিন্ন দ্রব্যের সংযোগ; ভবিষ্যতে এগুলি নিশ্চয়ই আবার বিচ্ছিন্ন হইবে। অতএব আত্মা যদি সৃষ্ট পদার্থ হন, তাহা হইলে তিনি মরণশীলও বটে। সুতরাং আত্মা সৃষ্ট পদার্থ নন।”

“অতএব দেখা গেল, হিন্দু নিজেকে আত্মা বলিয়া বিশ্বাস করে।
‘সেই আত্মাকে তরবারি ছেদন করিতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না, জল আর্দ্র করিতে পারে না এবং বায়ু শুষ্ক করিতে পারে না।’
হিন্দু বিশ্বাস করে :
সেই আত্মা এমন একটি বৃত্ত, যাহার পরিধি কোথাও নাই, কিন্তু যাহার কেন্দ্র দেহমধ্যে অবস্থিত, এবং সেই কেন্দ্রের দেহ হইতে দেহান্তরে গমনের নামই মৃত্যু। আর আত্মা জড়নিয়মের বশীভূত নন, আত্মা নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত-স্বভাব। কিন্তু কোন কারণবশতঃ জড়ে আবদ্ধ হইয়াছেন ও নিজেকে জড় মনে করিতেছেন।”

আমার জমিদার আত্মা ভুল করে এই দুর্বল রক্ত মাংসের খাঁচায় বন্দী হয়েছেন। তার আদর যত্নের কোন অভাব যাতে না হয় সেদিকে আমার সজাগ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। গ্রীষ্মের দীর্ঘ দাবদাহে আক্রান্ত এই নগরে আজ অঝোরে বৃষ্টি নেমেছিল। বৃষ্টিতে ভিজে আমার শরীর এবং আত্মা দুই-ই আরাম পেয়েছে। আমার দেহ এখন তন্দ্রচ্ছন্ন। সে ঘুমাক, আত্মা জেগে থাকুক।

১) কপিল সংক্রান্ত তথ্য এখান থেকে ধার করাঃ Click this link

১৪ thoughts on “আমি এবং সে

  1. “গ্রীষ্মের দীর্ঘ দাবদাহে
    “গ্রীষ্মের দীর্ঘ দাবদাহে আক্রান্ত এই নগরে আজ অঝোরে বৃষ্টি নেমেছিল। বৃষ্টিতে ভিজে আমার শরীর এবং আত্মা দুই-ই আরাম পেয়েছে। আমার দেহ এখন তন্দ্রচ্ছন্ন। সে ঘুমাক, আত্মা জেগে থাকুক।”

    চরম বলেছেন ভাই…
    😀

  2. হুম! অফিসেওর কাজে বাইরে
    হুম! অফিসেওর কাজে বাইরে ছিলাম। বৃষ্টিতে ভিজে আমার শরীর আর মন দুটোই কষ্ট পেয়েছে! :মনখারাপ: :মনখারাপ:

  3. চমৎকার রসবোধ সম্পন্ন লেখা
    চমৎকার রসবোধ সম্পন্ন লেখা নাভিদ ভাই। সত্যিই মুগ্ধ হলাম লেখাটা পড়ে। এমন খটমটে সাবজেক্ট যে এভাবে রস দিয়ে টইটম্বুর করে লেখা যায় ভাবাই যায় না। অবশ্য আমি এখনও নিশ্চিত নই, লেখার মূল বিষয় কোনটা? জাতিস্মর? নাকি আপনার জমিদারী মনোভাব? 😀

    জমিদারী মনোভাব আমার মাঝেও প্রবল। সেটা সবচেয়ে বেশী টের পাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়। উইত্তেরি কে যে আমার জমিদারী কাইড়া নিলো? :মাথানষ্ট:

    1. লেখার বিষয় আমার জমিদারী মন
      লেখার বিষয় আমার জমিদারী মন তবে গবেষণার বিষয় জাতিস্মর।
      নিজের এই আরাম প্রিয় স্বভাবটা অনেকভাবেই আমাকে বিব্রত করে এবং করছে। সেই বিষয় নিয়েই লেখা শুরু করেছিলাম। তারপর লেখা প্রসংগে জাতিস্মর এলো। খানিকটা পড়ালেখা করলাম। যা পড়লাম তা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম আর কি।
      কথায় আছে না – জ্ঞান বিতরন করলে বাড়ে…

  4. অনেকদিন পর ইস্টিশনে কিছু
    অনেকদিন পর ইস্টিশনে কিছু ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা পড়লাম। রায়ান ভাই, চালায় যান। :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *