পথে পাওয়া ডায়েরী

আকাশের মেঘ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। মাঝে মাঝে সূর্যটাকে একটু আধটু উঁকি মারতে দেখা গেলেও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পরছেই অনবরত। আমি উদাস চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। একটা নিঃসঙ্গ কাককে প্রায়ই বসে থাকতে দেখা যায় কারেন্টের তারের ওপর। আজও দেখা যাচ্ছে; চুপচাপ বসে আছে এক জায়গায়। বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে যাচ্ছে তবুও নড়ছে না; দিব্যি বসে বসে ঝিমুচ্ছে। কাকটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর সাথে আমার একটা মিল খুজে পেলাম। না না, আমি ওর মত অতোটা কালো নই। তবে ওর মত আমিও নিঃসঙ্গ।

আকাশের মেঘ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। মাঝে মাঝে সূর্যটাকে একটু আধটু উঁকি মারতে দেখা গেলেও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পরছেই অনবরত। আমি উদাস চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। একটা নিঃসঙ্গ কাককে প্রায়ই বসে থাকতে দেখা যায় কারেন্টের তারের ওপর। আজও দেখা যাচ্ছে; চুপচাপ বসে আছে এক জায়গায়। বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে যাচ্ছে তবুও নড়ছে না; দিব্যি বসে বসে ঝিমুচ্ছে। কাকটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর সাথে আমার একটা মিল খুজে পেলাম। না না, আমি ওর মত অতোটা কালো নই। তবে ওর মত আমিও নিঃসঙ্গ।
স্কুলে ডজন পাঁচেক সহপাঠি আছে ঠিকই, কিন্তু ঘনিষ্ট বন্ধু কাকে বলে জানি না। ওদেরকে দেখি; চার পাঁচজন এক সাথে দল বেধে ঘুরছে, খাচ্ছে, গান গাইছে, ঝগড়া করছে। কখনো বা মারামারি করে একে অপরের ছায়া মাড়ানো পর্যন্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। আবার চার পাঁচজন মিলে নতুন করে দল বানাচ্ছে। এই করে ওরা বেশ আছে। শুধু আমারই তেমন কেউ নেই। আমাকে কেউ বুঝতে চেষ্টা করে না। সেজন্য কারও সাথে বন্ধুত্বও হয় না। আমি তাই নিঃসঙ্গই রয়ে গেছি। চির কুমারের মত যদি চির নিঃসঙ্গ বলে কিছু থাকে তাহলে আমি তাই।
রান্নাঘর থেকে ভূনা খিচুড়ির ঘ্রাণ আসছে। মেঘলা দিনে আমাদের বাড়িতে এই সুস্বাদু খাবারটা রান্না করা হবেই। ঘরে মাংস না থাকলে প্রয়োজনে প্রতিবেশী বাড়ি থেকে মাংস এনে মা খিচুড়ি রান্না করেন। আটানব্বই সালের বন্যায় দীর্ঘ একমাস এই খিচুড়ি খেতে খেতে এমন অরুচি এসে গিয়েছিল যে, সেই থেকে এই জিনিষে সবার জিহ্বে পানি এসে গেলেও আমার আসে না। না খেয়ে থাকা যায় না বলেই কোন রকমে গিলতে হয়।
আবার তাকালাম আকাশের দিকে। মেঘ ভেদ করে যত দূরে তাকানো যায় তাকিয়ে রইলাম। এসময় রান্নাঘর থেকে কাজের মেয়েটার কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। ওর নাম নাছিমা। সুযোগ পেলে চুরি করে এটা ওটা খাওয়া ওর ‘ফেবারিট হবি’। এমনিতে শতবার জিজ্ঞেস করলেও চুরির কথা স্বীকার করবে না। কিন্তু দু-চারটা চর থাপ্পর দিলেই সব স্বীকার করে। এবারও বোধহয় তেমনই কিছু ঘটেছে।
দোতলার ঘর থেকে ভাইয়া আমাকে ডাকছে। আমাদের বাড়িটা দোতলা। আমি থাকি নিচ তলার এই দক্ষিণ কোনের ঘরে। আর ভাইয়া থাকে আমার ঠিক মাথার ওপড়েরটায়।
এখন দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওপড়ে উঠতে মন চাইছে না। তবুও যেতে হবে। গিয়ে হয়তো দেখব কোন কাজ নেই; ফাও প্যাঁচালের জন্য ডেকেছে।
আমরা পরিবারে দুই ভাই। বাবা দেশের বাইরে থাকেন। দুই বছর পর পর একবার করে আসেন; দুই মাস থেকে আবার চলে যান। মা, কাজের মেয়েটা আর আমরা দুই ভাই থাকি এই বাড়িটাতে। ভাইয়ার ফাও প্যাঁচাল শোনার মানুষ বলতে আমি একাই। বলতে গেলে ভাইয়াও এক রকম নিঃসঙ্গ। তবে ওর ক্ষেত্রে ‘চির’ শব্দটা প্রজোয্য নয়। কলেজে ওর একটা বন্ধু আছে; মুকুল ভাই। ভাইয়ার সাথে বেশ খাতির। মাঝে মাঝে এসে আমাদের বাড়িতে থেকে যান। ভাইয়াও যায় তাদের বাসায়; কখনো কখনো রাতও কাটিয়ে আসে। আর যখন বাড়িতে থাকে তখন আমাকে ডেকে নিয়ে নানা রকম গল্প জুড়ে দেয়। এই যেমন: আজ মুকুল কি করছে; বাসের কন্ট্রাকটরের সাথে ভাড়া নিয়ে কি কথা কাটাকাটি হলো- এইসব।
ওর গল্পে আমি আগ্রহ দেখালে তো ভালই। কিন্তু যদি বলি: বাদ দাও তো তোমার প্যাঁচাল। শুনতে ভাল লাগে না।
তাহলেই হয়েছে; ভাইয়া কিছুক্ষণ আমার দিকে বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর মুখ গোমড়া করে বিড়বিড় করে বলে: এই জন্যেই তোকে আমি দেখতে পারি না। তুই কারও মন-মানুষিকতা বুঝিস না। তোর মত বলদের সাথে কথা বলার চেয়ে দেয়ালের সাথে কথা বলা অনেক ভাল।
আমি বলি: তাহলে দেয়ালের সাথে কথা বললেই তো পারো! দেয়ালেরও নাকি কান আছে! তবে দরজাটা বন্ধ করে নিও; নয়তো লোকে তোমায় পাগল ভেবে পাবনা পাঠিয়ে দেবে।
ভাইয়া তখন রাগে চিৎকার করে বলে: যা ভাগ এখান থেকে।
আমি তখন চুপচাপ চলে আসি। হয়তো ভাইয়া ঠিকই বলে, আসলে আমিই কাউকে বুঝতে পারি না!
সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই আবার ভাইয়ার চিৎকার শোনা গেল: কিরে, আসতে বললাম না একবার!
গলার স্বর শুনলে মনে হয় ওর ঘরের একটা অংশ আমি বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছি। সে জন্য আমাকে এখন ডেকে নিয়ে কড়া করে একটা ধোলাই দেয়া হবে। কিন্তু কে বুঝবে, ভাইয়া এরকম হুংকার দেয়া স্বরে আমাকে ডাকছে শুধু মাত্র কতক্ষণ বকবক করার জন্য?
দরজা খোলাই ছিল; আমি ভেতরে গিয়ে বললাম: ডেকেছো কেন?
ভাইয়া গলার স্বর একটু নরম করে বলল: বলছি, আগে চুপ করে বোস এখানে।
আমি লম্বা একটা বকবকানি শোনার জন্য প্রস্তুত হলাম।
কিন্তু ভাইয়া কোন কথাই শুরু করলো না। বরং এক দৃষ্টিতে আমার দিকে স্নেহের চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর ভ্রু জোড়া নাচিয়ে বলল: গেমস্ খেলবি?
আমি এতোটাই অবাক হলাম যে কিছুক্ষণ আমার মুখ দিয়ে কথা বেরুলো না। কারণ, ভাইয়া নিজে তো গেমস্ পছন্দ করেই না, আমাকেও খেলতে দেয় না কখনো।
আমতা আমতা করে বললাম: গেমস্!
ভাইয়া একটু হেসে কম্পিউটারটা চালু করে দিল। গেমসের নাম “হাউজ অফ ডেথ্”। গুলি করে ভুত মারতে হয়।

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক খেলার পর যখন চোখ ব্যথা হয়ে গেছে, তখন ঘুরে তাকিয়ে দেখি ভাইয়া এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে কি যেন ভাবছে।
আমি মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম: খেলাটা দারুণ! তাই না ভাইয়া?
ভাইয়া হাসলো: খেললি তুই, দারুণ কিনা সেটা বলব আমি? ঠিক আছে যা, তোর যদি ভাল লেগে থাকে যখন কোন কাজ থাকবে না তখন এসে খেলিস।
আমি মনে মনে ভাবলাম স্বপ্ন দেখছি না তো! আগে যে ভাইয়া ওর কম্পিউটার ভাল করে ছুঁয়েও দেখতে দিতো না। বলতো- তুই আন্তাজে টিপাটিপি করে নষ্ট করে ফেলবি। সেই ভাইয়াই কিনা আজকে গ্রীন কার্ড দিচ্ছে! সত্যি সত্যিই স্বপ্নে দেখছি কিনা বোঝার জন্য হাতে একটা চিমটি কাটলাম। আশ্চর্য, ঠিকই ব্যথা লাগলো! বরংচ এতো জোরে চিমটি কেটেছি বলে হাতটার জন্য একটু মায়াই লাগলো। তাহলে যা দেখছি তা সত্যি। নাকি ইদানিং স্বপ্নেও চিমটি কাটলে ব্যাথা লাগে!
আমি খুশিতে ডগমগ হয়ে চলে যাচ্ছিলাম। ভাইয়া গম্ভীর স্বরে বলল: এই শোন, তুই রাতে একা একা ঘুমাস, তোর ভয় করে না?
আমি ভ্র“কুচকে বললাম: কিসের ভয়?
: ভুতের?
: যাহ্, ভয় করবে কেন? আর তাছাড়া ভয় করলেই কী? তুমি কি আমার ঘরে হুজুরের কাছ থেকে তাবিজ পড়া এনে দেবে নাকি?
: না মানে, তোর যদি একা থাকতে ভয় লাগে তাহলে আমার ঘরে এসে ঘুমাতে পারিস।
আমি হতবাক হয়ে গেলাম এবার। কেননা এক সময় আমি সত্যি সত্যি ভয় পেতাম। তখন ভাইয়ার সাথে ঘুমানোর জন্য অনেক কান্নাকাটি করেছি কিন্তু আমাকে ভাইয়া পাত্তা দেয়নি। তার কারণ হচ্ছে- রাতে ঘুমালে নাকি আমি ভাইয়ার গলায় ওপর পা উঠিয়ে দিতাম। তাছাড়া মাঝে মধ্যে বিছানাও ভিজিয়ে ফেলতাম। সেসব অবশ্য চার-পাঁচ বছর আগের কথা। আজ এতোদিন পরে হঠাৎ এরকম নিমন্ত্রন করে তার ঘরে ফিরিয়ে আনার কারণটা কী?
ইদানিং ভাইয়ার আচার আচরন বেশ সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ বলে একটা কথা আছে না। ভাইয়ার ক্ষেত্রেও কেমন একটা চোর চোর ভাব। সব সময় মনে হয় কী যেন লুকোচ্ছে।
কিছুটা সন্দেহজনক আচরন আম্মুও করছে। যেমন আগে স্কুলে যাবার সময় যদি ঝড়ও হতো তবুও আম্মু একটা ছাতা ধরিয়ে দিয়ে বলতো- এ আর এমনকি বৃষ্টি। আমরা আরও কতো বৃষ্টিতে কচু পাতা মাথায় দিয়ে স্কুলে গেছি!
আর আজ ক’দিন ধরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলেও বলে: থাক, আজ আর মেঘ-কাদা মাড়িয়ে স্কুলে যাবার দরকার নেই। ঘরে বসে হোম ওয়ার্ক কর।
স্কুলের মিসরাও ইদানিং আমাকে আগের তুলনায় বকাঝকা কম করেন। স্কুল কামাই করলেও তেমন কিছু বলেন না। এতো আদরে আমার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। কিন্তু তা প্রকাশ করি না। কারণ, দিনতো কেটে যাচ্ছে বেশ আরামেই।
বিকেলের দিকে জানালার পাশে বসে ছিলাম। কিছুদিন ধরে সেই কাকটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। তাতে অবশ্য প্রকৃতির কোন কিছু আটকে থাকছে না। কিন্তু আমার কাছে কেন যেন মনে হয় কারেন্টের তারের ওপর কী যেন একটা ছিল। ওটাকে ছাড়া তারটা কেমন খালি খালি লাগছে।
এমন সময় হঠাৎ ভাইয়া এসে হাজির। আমার হাতে র‌্যাপিং প্যাপারে মোড়ানো একটা ডায়েরী গুজে দিয়ে বলল: অ্যা সিম্পল গিফট্ ফর ইউ। বলেই ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
আমি ভাবলাম আজ কি আমার জন্মদিন? কই নাতো! তাহলে গিফট্ কী মনে করে? তাহলে কী আজ গিফট্ ডে? এই দিনে প্রিয়জনকে গিফট্ দিতে হয়! হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশে যে হারে এই দিবস সেই দিবস হচ্ছে তাতে গিফট্ ডে হলেও অবাক হব না।
তবে ভাইয়াকে একটা ধন্যবাদ দেয়া দরকার। আমি ডায়েরীটা বগল দাবা করে ভাইয়ার ঘরের দিকে রওয়ানা হলাম। সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই হঠাৎ মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠলো। এমনটা মাঝে মধ্যেই হয়। ডাক্তারের পরামর্শে ব্রেনের এক্স-রে করানো হয়েছে। রিপোর্টও নাকি ভালই। তবুও ইদানিং প্রায়ই এমন হয়। বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা অস্বস্তি। ঠিক মত নিঃশ্বসও নিতে পারছি না। চারপাশের জিনিষগুলো ঘুরতে ঘুরতে আবছা হয়ে যাচ্ছে। আমি রেলিং ধরে বসে পড়লাম। হাত থেকে ডায়েরীটা খসে পড়লো। তারপর আর কিছু মনে নেই।

কতক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলো বলতে পারবো না। তবে নিজেকে আবিষ্কার করলাম হাসপাতালের বেডে। একজন নার্স আমার পাশে বসে আছেন। একপাশের দুইটা চেয়ারে নিথর হয়ে বসে আছে ভাইয়া আর মা। আমি বুঝতে পারলাম না আমার কী হয়েছে। বুঝবার সুযোগও পেলাম না। নার্স আমাকে ঘুমাতে বলল। আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম। শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছে। ঘুম কী আরামের!

আবার যখন ঘুম ভেঙ্গেছে তখন ঘরের ভেতর কেউ নেই। দরজায় একজন ডাক্তার নার্সের সাথে নিচু গলায় কথা বলছে। কিন্তু আমি সবই শুনতে পেলাম। ডাক্তার বলছে- ব্রেন টিউমার তো, যেকোন সময় পেইন হতে পারে। বেশি সমস্যা মনে করলে আমাকে ডাকবে।
আমি আবার চোখ বন্ধ করলাম। কিন্তু ঘুম এলো না। মাথার কাছে একটা ভোঁতা যন্ত্রণা। কানে বেজে উঠলো ডাক্তারের কথাগুলো। আচ্ছা ব্রেন টিউমার কোন রোগির? নার্সটাতো আমার কেবিনেই থাকে। তাহলে কি আমিই ব্রেন টিউমার পেসেন্ট? যাহ্ তা কী করে হয়।
কিন্তু ধীরে ধীরে আমার সবকিছু মিলে যেতে থাকে। মাঝে মধ্যেই তিব্র মাথা ব্যথা, হঠাৎ করে সবার আচরনে পরিবর্তন, আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা, সবকিছুর পেছনেই যেন ডাক্তারের কথার একটা যুক্তি খুঁজে পাই। আর সেই যুক্তিটা হচ্ছে- আমার মাথায় ব্রেন টিউমার হয়েছে। এবং সেটা সম্ভবতঃ লাস্ট স্টেজে পৌছেছে; অপরেশন করেও এখন আর কিছু করার নেই। নয়তো আমাকে নিশ্চয়ই জানানো হতো।
এর অর্থ হচ্ছে খুব শিগগির আমি মারা যাচ্ছি। খুব ভয়াবহ এই অর্থটি বুঝতে আমার একটুও কষ্ট হলো না। এমনকি খুব একটা ভয়ও করছে না। বরং ভেতরে ভেতরে একটা আনন্দ অনুভব করছি। রহস্য সমাধান করতে পারার আনন্দ। অনেকক্ষণ কষ্ট করে একটা জটিল অংক মেলাতে পারলে যেমন আনন্দ হয়, অনেকটা তেমনি।
আচ্ছা মারা যাবার সময় কি খুব কষ্ট হয়? টিভিতে কতো দেখেছি- গুন্ডারা কাউকে গুলি করলে সে কিছুক্ষণ ছটফট করে। তারপর নায়ককে ভিলেনের নাম বলার আগেই মারা যায়। তখন কী খুব কষ্ট? মনে তো হয় না।
ভয়ের বদলে বরংচ কেন যেন খুব হাসি পাচ্ছে। শাহানা মিস আমাকে সব সময় বলতো- তোর মাথায় গোবর।
তাকে এখন পেলে বলতে পারতাম- আমার মাথায় গোবর না মিস; আমার মাথায় টিউমার। টিউমারের কথা মনে হতেই হঠাৎ আমার ভীষণ বাঁচতে ইচ্ছা করলো। যেন আমি এখনই মারা যাচ্ছি। বুকের ভেতর একটা চাপা অস্বস্তি। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। অচেতন হওয়ার আগে শুনতে পেলাম নার্স চিৎকার করে ডাক্তারকে ডাকছে। এতো জোড়ে চিৎকার করছে যে আমার কানেই তালা লেগে যাচ্ছে।

আজ সকাল থেকে বেশ ভাল লাগছে। মাথাটা অনেক হাল্কা মনে হলো। তবুও মুখের ওপর থেকে অক্সিজেন মাক্সটা সরানো হয়নি। রিতিমত অস্বস্তি লাগছে এটার জন্য। কাউকে বলতেও পারছি না খুলে দিতে। হাতে যদি শক্তি পেতাম তাহলে নিজেই খুলে ফেলতাম। হাতে স্যালাইন দেয়া হয়েছে। কব্জির কাছে টনটনে ব্যথা। বেশি নড়াচড়াও করতে পারছি না। নড়াচড়া করলেই ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে দেয়। তাই নড়াচড়া না করে পড়ে আছি চুপচাপ। কিন্তু এভাবে কতোক্ষণ থাকতে পারবো জানি না।

দু’দিন ধরে শরীরটা অনেক ভাল। এরই মধ্যে দুনিয়ার আত্মীয় স্বজন এসে আমাকে দেখে যাচ্ছে। এমনকি আব্বুও বিদেশ থেকে ফোন করেছিলো। অনেক্ষণ পর্যন্ত কথা বলেছে। কী খেতে ইচ্ছে করে, কী কী করতে ইচ্ছে করে সব জানতে চেয়েছে। সবগুলোই ফালতু প্রশ্ন। কারণ, সারাদিনে আমাকে প্রায় কিছুই খেতে দেয়া হয় না। স্যালাইন দিয়ে রাখে। আর যা যা করতে ইচ্ছে করে আর কোনটাই এরা করতে দেবে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে করা সম্ভবও না। আব্বু সাধারণতঃ ফোনে আমাদের সাথে কথা বলতেন না। চিঠির মাধ্যমেই যোগাযোগ ছিল এতোদিন। কয়েকদিন ধরে ভাইয়ার হাতে একটা নতুন মোবাইল দেখছি। দিনের মধ্যে তিন-চারবার করে আব্বু তাতে ফোন করে। আগামী মাসে নাকি ছুটি নিয়ে দেশে চলে আসছেন। ততদিন বাঁচবো কিনা কে জানে?

বেডে শুয়ে থাকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছি আজ। এখন বারান্দায় হুইল চেয়ারে করে ঘুরতে দিচ্ছে। আমার ইচ্ছে করছে হাসপাতালের সামনের বাগানটাতে কিছুক্ষণ দৌড়াদৌাড়ি করতে। কিন্তু কাউকে বলি না। বললেও এই চেয়ার থেকে উঠতে দেবে না।
ভাইয়া সারা দিন আমার পাশে পাশে থাকে। ইচ্ছে করে ভাইয়ার বকবকানি শুনি। কিন্তু ভাইয়া আজকাল একদম কথা বলে না। চুপচাপ পাশে বসে থাকে। আমিও তাই চুপচাপ বসে বসে দিগন্ত দেখি। যেখানে সারাদিন ব্যস্ততার পর সূর্যটা অস্ত যায়, সেই দিগন্ত। আর মাঝে মাঝে ভাইয়ার দেয়া এই ডায়েরীটাতে নানা কথা লিখি। যেমন এখন লিখছি।

গতকাল মুকুল ভাই এসেছিল। আমার জন্য একটা পাখির খাঁচা কিনে এনেছে। খাঁচা ভর্তি সবুজ রংয়ের ছোট ছোট পাখি। নাম জানি না। আমার কেন যেন ইচ্ছা হলো পাখিগুলোকে ছেড়ে দিতে। আমি খাঁচার দরজা খুলে দিলাম। আশ্চর্য পাখিগুলো তবুও উড়ে গেল না। বোধহয়, খাঁচায় থাকতে থাকতে উড়তে ভুলে গেছে। কিংবা হয়তো ওদেরকে কেউ কোনদিন এই খাঁচা থেকে মুক্তি দেবে ভাবতেই পারেনি। আমি তখন একটা একটা করে সবগুলো পাখি বের করে উড়িয়ে দিলাম। পাখি যতদিনই খাঁচায় থাকুক না কেন, ছাড়া পেলে সে একদিন উড়ে যাবেই।
আমিও খুব শিগগিরই উড়ে যাব। উড়ে কোথায় যাব? ছোট বেলায় শুনেছিলাম মানুষ নাকি মরে গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। আমিও কি উড়ে গিয়ে কোন একটা তারা হয়ে যাব?
সবচে’ মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি এই সহজ সত্যটাকে যত সহজভাবে নিচ্ছি বাকিরা কেউ তা পারছে না। সবাই এমন ভাব করছে যেন আমার কিছুই হয়নি। অথচ তাদের আচার আচরনই বলে দিচ্ছে এই হাসপাতাল থেকে আমি কোন দিনই বাড়ি ফিরবো না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সত্যি কথাটা সবাইকে বলে দিই। আমার কী হয়েছে, সেটা যে আমি জানি তা বলে দিই। কিন্তু বলি না। কী হবে বলে? শুধু তারা কষ্ট পাবে। মানুষকে শুধু শুধু কষ্ট দেয়া ঠিক না। কে যেন বলেছিল? মনে পড়ছে না। আজকাল অনেক কিছু মনে করতে পারি না। সাধে কি আর শাহানা মিস বলে- তোর মাথায় গোবর!
একা আমি এগিয়ে চলছি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। তাতে কী হয়েছে? পৃথিবীর তাতে এতোটুকু লোকসান হবেনা। যেমনটি প্রকৃতির এতোটুকু ক্ষতি হয়নি কারেন্টের তারে সেই কাকটিকে আর দেখা না যওয়ায়। তাতে আমার কোন দুঃখ নেই। দুঃখ শুধু একটাই, শাহানা মিসকে কোনদিন বলতে পারব না- আমার মাথায় গোবর না মিস; আমার মাথায় টিউমার।
নাহ্ মিথ্যা কথা। আমার কোন দুঃখ নেই। একটা দুঃখও নেই। একটাও নেই। একটাও না।
*** *** ***
ডায়েরীটা পড়া শেষ করে নিজের অজান্তেই আকাশের দিকে তাকায় শিবলু। সে জানে না ডায়েরীটা কার। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে নিজের অজান্তেই পড়ে ফেলেছে অজানা কারও একান্ত কিছু কথা। আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে অনেকগুলো তারা। সেই সব তারাগুলোর মধ্যে এই ঠিকানাহীন পথে পাওয়া ডায়েরীর মালিককে খুঁজে বেড়ায় শিবলুর দু’চোখ।

———- ০ ———-

-সফিক এহসান
(৯ সেপ্টেম্বর ২০০৪ইং)

[পদটিকাঃ দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় এরকম একটা বিষয় নিয়ে কেন লিখেছিলাম এতো দিন পর তা আর মনে পড়ছে না। অনেকদিন পর নিজের গল্প পড়ে নিজেরই ভাল লাগলো… সবার সাথে তাই শেয়ার করলাম।]

৮ thoughts on “পথে পাওয়া ডায়েরী

    1. হে হে হে… সে আর বলতে!
      হে হে হে… সে আর বলতে! 😀
      গোখরা সাপের বাচ্চাও ছোটবেলায় গোখরাই থাকে। 😛

      ধন্যবাদ নাভিদ ভাই… :বুখেআয়বাবুল:

      1. কোন রহস্যের কথা বুইলছেন আকাশ

        কোন রহস্যের কথা বুইলছেন আকাশ দাদা

        উনার সব কিছুতে রহস্য খোঁজার অভ্যাস। উনি ক্যামনে এতো রহস্য খোঁজেন সেটাও একটা রহস্য।
        যাহোক, ভাল লেগেছে। খুব ভাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *