জুয়া

রাফসান আর অপেক্ষা করতে চাচ্ছে না।

‘দোস্ত, কল দে তো। কতক্ষণ লাগে.. উফ্!’, বিরক্তিমাখা মুখ নিয়ে আবিদ কে বললো।

রাফসানের চেহারায় যথেষ্ঠ বিষাদের ছাপ। রাফসান ঘুণক্ষণেও ভাবেনি সে আবিদের কাছে হেরে যাবে, যে আবিদকে সে গত তিন বছর ধরে ‘বিলাই আবিদ’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতো।

‘দিচ্ছি দোস্ত। এখনো পাঁচ মিনিট বাকি ক্লাস ওর ক্লাস শেষ হওয়ার।’, স্থিরচিত্তে আবিদ বললো।


রাফসান আর অপেক্ষা করতে চাচ্ছে না।

‘দোস্ত, কল দে তো। কতক্ষণ লাগে.. উফ্!’, বিরক্তিমাখা মুখ নিয়ে আবিদ কে বললো।

রাফসানের চেহারায় যথেষ্ঠ বিষাদের ছাপ। রাফসান ঘুণক্ষণেও ভাবেনি সে আবিদের কাছে হেরে যাবে, যে আবিদকে সে গত তিন বছর ধরে ‘বিলাই আবিদ’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতো।

‘দিচ্ছি দোস্ত। এখনো পাঁচ মিনিট বাকি ক্লাস ওর ক্লাস শেষ হওয়ার।’, স্থিরচিত্তে আবিদ বললো।

কোন কিছুতেই আবিদ এতটা স্থির না। সামান্য কিছু অর্জনেই সে প্রচন্ড রকম উচ্ছাস প্রকাশ করে। সামান্য কুইজ টেস্টে ফুল মার্কস্ পেয়ে তার যে কি উচ্ছাস.. পারলে ডেকে ডেকে সবাইকে বলে। মিড কিংবা ফাইনালে একটু ভাল করলে তো তার খুশির সীমা ছাড়িয়ে যায় কয়েকগুণ। আচমকা আড্ডার মাঝে এসে এমন জোরে টেবিল থাপড়ায় যে মনে হয় বিশ্বজয় করে এসেছে। টেবিল ভেঙ্গে সে ক্যান্টিন জয় করে ফেলবে! আশে-পাশের সবাই উৎসুক চোখ নিয়ে তখন ওর দিকে তাকায়। স্বয়ং নীল আমস্ট্রং চন্দ্রজয়ের পর এমন আনন্দের বহিঃপ্রকাশ করেছিলেন কিনা – এ ব্যাপারে রাফসানের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু এমন একটা বিরাট ব্যাপারে রাফসানকে হারানোর পরও আবিদের অদ্ভূত নির্লিপ্ততা অবাক করছে রাফসানকে।

‘দোস্ত.. সন্ধ্যা হয়ে এলো। কাল মিড তো আমার! অনেক পড়া বাকী। তাড়াতাড়ি আসতে বল। মেসেজ দে।’, অস্থির রাফসান আবিদকে বললো।

‘ওইতো চলে এসেছে। ঠুকুস ঠুকুস শব্দ হচ্ছে।’, আবিদ বললো।

পেছন ফিরে রাফসান অবন্তীকে দেখে আবিদকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘বাহ্! এ ক’দিনে একদম জুতার শব্দও মুখস্ত হয়ে গেছে! না জানি আরো কি কি মুখস্ত হয়ে গেছে তোমার..’

রাফসানের এসব বলার মাঝে একরাশ হতাশা মেশানো আছে। হেরে যাওয়ার হতাশা। ক্রিকেট ম্যাচে নামিবিয়ার মতো মিনোসদের কাছে হারার পর অষ্ট্রেলিয়ার ক্যাপ্টেনও বোধহয় এ চেয়ে কম হতাশ হতেন।

আবিদ কিছু বলে না। স্মিত হাসে। এর মধ্যেই অবন্তী এসে তার পাশে বসে। চমৎকার লাগছে আজ তাকে। নীল শাড়িতে ভালই মানিয়ে অবন্তীকে। সে বি.বি.এ.-তে পড়ে। মাত্রই প্রেজেন্টেশন দিয়ে আসলো। রাফসান আর আবিদ ফার্মাসীতে।

‘উফ্.. টুয়া স্যার যে কি.. এত প্যারা দেয়..’, অবন্তী আবিদের পাশে বসেই বলে উঠে।

‘অবন্তী, কিছু কথা বলার জন্যে ডেকেছি তোমাকে। আমার মনে হয় এটাই বলার বেস্ট টাইম।’, রাফসান বলে।

‘ও মা। এসে বসলাম মাত্র.. এখনই সিরিয়াস কথা! চা-কফি কিছু তো খাওয়াবেন.. নাকি?’, অবন্তী বললো।

‘না মানে সন্ধ্যার টাইম। ক্যান্টিনে ভাল খাওয়ার পাবে না। চা-কফি চাইলে খাওয়াতে পারি। ফিউচার পার্কে গেলে ভাল কিছু খাওয়াতাম। তবে কাল আমার মিড। তাই তাড়াহুড়ো করছি। কফি খাবা?’, এক নাগাড়ে রাফসান বলে গেল।

‘না ভাইয়া.. দুষ্টুমি করলাম। খাবো না। চারটার দিকে লাঞ্চ করেই ক্লাসে গিয়েছিলাম।’, অবন্তী বললো।

রাফসান তার ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে আবিদের উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দিলো।

‘দোস্ত, এটা নে। শর্ত অনুযায়ী যা দেয়ার সবটাকা এখানে আছে।’,রাফসান কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা জড়িয়ে যাচ্ছিলো। টাকার জন্য না। হয়তো একটু কান্নাও পাচ্ছে। হয়তো হেরে যাওয়ার জন্যে। খরগোস হয়ে কচ্ছপের কাছে হেরে যাওয়ার জন্যে। অবন্তী কিছুই বুঝতে পারছে না। একবার আবিদের দিকে তাকায় তো অন্যবার তার বিপরীতে বসা রাফসানের জন্যে।

‘দোস্ত। টাকাটা মেইন ফ্যাক্ট ছিলো না। বাজিটাই মেইন ছিলো। আমি শুধু আমাকে অবজ্ঞার জবাবটা দিতে চেয়েছিলাম।’,আবিদ বললো।

‘চেয়েছিলি মানে। পেরে গেছিস!’,রাফসান বললো।

‘মানে কি?’, রাফসানকে মাঝ থেকে থামিয়ে অবন্তী বললো।

‘মানে ব্যাপারটা অভিনয় ছিলো।’, আবিদ বললো।

অবন্তী বললো, ‘কোন ব্যাপার। আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।’

‘এই যে, তোমাদের রিলেশনশিপ। আবিদের সাথে গত মাসে আমি বাজি ধরেছিলাম আগামী ছয় মাসেও সে চাইলে তোমাকে পটাতে পারবে না। তুমি তো জানো-ই সে তোমাকে গত দু’বছর ধরেই খুব পছন্দ করে। বলতে পারছিলো না। আমি সেদিন ওকে বললাম.. আর সেও হুট করে জেদ করে আমার সাথে বাজিতে রাজি হয়ে গেল। আমি ঘুণক্ষণেও কল্পনা করিনি তার মতো একটা হাবলা ছেলে এই এক মাসের মধ্যে তোমাকে প্রপোজ করে রাজি করিয়ে ফেলবে! চুক্তি অনুযায়ী এই পনের হাজার টাকা ওকে আজ দিয়ে দিলাম।’, আবিদকে দেয়া প্যাকটটার দিকে ইঙ্গিত করে রাফসান বললো।

আবিদের মুখও ধীরে ধীরে মলিন হতে শুরু করেছে। গত পনের দিনে কি না হয়েছে। প্রথম দশদিন তো বেহায়ার মতো অবিরত টেক্সট পাঠানো.. ফোনের পর ফোন করা.. ফেসবুকে ইনবক্সিং.. কিছুই বাদ রাখেনি। অবন্তী আগে ব্যাপারটা জানতো যে তার চেয়ে এক বছরের সিনিয়র আবিদ তাকে পছন্দ করে। মুখ ফুঁটে কখনো বলেনি। এমন তো কত ছেলেই ভার্সিটিতে আসার পর থেকে পছন্দ করে। কেউ কেউ মিলিয়ে কোর্স নেয়, গ্রুপ প্রজেক্টে পার্টনার বানায়। সাহস করে দু’একজন ছাড়া কেউ বলেনি। বললেও তাকে পাবার জন্য আবিদের মতো এমন ক্রেজি কেউ ছিলো না। যে যাই-ই বলুক, তার একটাই কথা ছিলো সে কোন রিলেশনশিপে যাবে না। কিন্তু এই ছ্যাবলা আবিদ তাকে অবিশ্বাস্যভাবে রাজি করিয়ে ছেড়েছে। ভালই হলো, রাফসান ভাইর সাথে বাজি না ধরলে তো তার আবিদকে পাওয়া হতো না। রিলেশনশীপের মজাটাই হয়তো পাওয়া হতো না। হঠাৎ করে দুনিয়াটা কেমন রঙ্গীন মনে হচ্ছে, এটাও সাদাকালো থেকে যেতো। যদিও তার ধারণা অতি আত্মবিশ্বাসী রাফসান আবিদকে এসব বলে পথের কাঁটা সরানোরই চেষ্টা করছিলো। অবন্তীকে রাফসান ভার্সিটিতে ভর্তির দু’মাস পরই প্রপোজ করেছিলো। কিন্তু, একথা এখনো আবিদকে বলেনি। আবিদকে কেন, সে ভার্সিটির কোন ফ্রেন্ডকেও বলেনি। তার ধারণা হ্যান্ডসাম রাফসান এভাবেই মেয়ে পটায়। না হয় কেন গত দু’বছরে দুইটা মেয়ের সাথে তার দু-দুবার ব্রেক আপ হবে! কে জানে.. আড়ালে হয়তো আরো কয়টার সাথে লাইন মেরেছে সে।

‘এবার তোর পালা আবিদ।’, রাফসান বললো।

‘হুম। আমাদের শর্তমত আমি এখন অবন্তীকে সব বলে দিচ্ছি। এ নিয়ে তুই চিন্তা করিস না।’, আবিদ বললো। অবন্তী উৎসুক হয়ে আবিদের দিকে ফিরে তাকালো।

‘স্যরি অবন্তী। আমি আসলে এমন না। কারো সাথে বাজি ধরে অন্যকে কষ্ট দেয়ার মানসিকতা কখনোই ছিলো না। তুমি জানো রাফসান আমার ওয়ান অব দ্যা বেস্ট ফ্রেন্ড। কিন্তু দিনকে দিন ওর অবজ্ঞা আমাকে ত্যাক্ত করে তুলেছিলো। শেষমেষ ওকে দেখিয়ে দিলাম। আমি পারি।’,গড়গড় করে আবিদ বলে গেল।

‘প্রবলেম নেই। আমি সত্যিই তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি। ক্ষমা তোমাকে চাইতে হবে না।’,অবন্তী বললো।

‘আমার কথা এখনো শেষ হয়নি অবন্তী। আমাদের চুক্তি অনুযায়ী আজই আমি তোমাকে বুঝিয়ে আগের জীবনে ফিরে যাবো। একাকীত্বটাই আমাকে টানছে। এ ক’দিনের মিথ্যে অভিনয় আমাকে বিষিয়ে তুলেছে। আমি বোধহয় কখনোই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।’, মলিন মুখে আবিদ বললো।

‘তার মানে তুমি টাকার জন্যে এমনটা করলে?’, এবার একটু উত্তেজিত হয়েই বললো অবন্তী। চেহারায় লাল আভা, রেগে যাচ্ছে। বোধহয় কান্না পাচ্ছে ওর। হঠাৎ আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পড়ার কষ্ট। এ কষ্টে মানুষ কাঁদে না। পাথর হয়ে যায়। অবন্তীও বোধহয় জলজ্যান্ত পাথর হয়ে যাচ্ছে। সবচে প্রিয় মানুষটা মুহুর্তেই সবচে ঘৃণিত মানুষে পরিণত হচ্ছে। পাথর শোক বোধহয় কাবু করে ফেলছে।

‘না অবন্তী। আমি আমাকে অবজ্ঞার জবাবটা দিলাম। রাফসানকে। পাশাপাশি তোমাকেও। মনে আছে তোমারা সবাই যখন ফাল্গুনে গ্যালারীর সামনে ছবি তুলছিলে। আমি গিয়ে দাঁড়ানোর পর তুমি কি বলেছিলে? ছ্যাবলা বলে আমাকে তুমি কি বুঝিয়েছিলে?’, আবিদ বললো।

অবন্তী একদম চুপসে গেল। খুব তর্ক করতে চাইছে। কিন্ত করছে না। আর দুই’চারটা কথা বললেই সে কেঁদে ফেলবে। এ অমানুষগুলোর সামনে কান্নার কোন মানে হয় না। রাফসান মাথা নিচু করে রইলো।

সান্ধ্য ক্যান্টিনে হঠাৎ করেই অনেক স্টুডেন্ট ঠুকতে শুরু করেছে। চার টা দশ টু পাঁচ টা পঞ্চাশের ক্লাসটা শেষ। অধিকাংশের বাসায় ফেরার তাড়া। তার আগে চায়ের কাপে একটু চুমুক। একটু আড্ডা। কেউ মেতে উঠবে সিরিয়াস পড়াশোনার আলাপে, আর কেউ বৈশ্বিক চিন্তাভাবনা, দেশীয় রাজনীতি, বন্ধুদের প্রেম, হিন্দি-ইংলিশ সিরিয়াল, গান, কনসার্ট, ফেসবুক, নতুন মুভী কোন কিছুই বাদ থাকে না। বাংলা ফুড আর ম্যাকডোনাল্ডসের মাঝামাঝি পিলারগুলোর মাঝের টেবিলের সারিগুলোর প্রথমটিতেই বসে আছে আবিদ, রাফসান আর অবন্তীরা। আবিদ পিলারে পিঠ ঠেঁকে বসে আছে। অবন্তী মাথা নিচু করে টেবিলে মুখগুঁজে আছে। আর রাফসান এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। চারপাশে এতো হৈ-চৈ। তবু তাদের মাঝে পিনপতন নীরবতা। পরিচিত কাউকে দেখছে না। দেখলেই কথা বলার ভান করে উঠে চলে যাবে রাফসান। টাকাগুলোর জন্যে মায়া হচ্ছে যে তা না, জীবনে প্রথমবার সে এমন বাজিতে হেরে গেল। তাও আবিদের কাছে। এর আগে সে বুঝে শুনে বাজি ধরতো, মজা করার জন্যই। প্রতিবারই সে জিতেছে। এবার যে কি হলো, এক কথায় কল্পনাতীত!

অবন্তী মুখ গুঁজে কান্না লুকোচ্ছে। তাহলে কি আবিদের সব সত্যিই মিথ্যে ছিলো? এতো আবেগ নিয়ে কেউ মিথ্যে বলতে পারে? সেই রাত বারোটায় তার বাসার নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। খুব যত্নে আংটি পরিয়ে সারাজীবন ধরে রাখার প্রতিজ্ঞা। দুদিন আগের পহেলা বৈশাখে সারাদিন তাকে নিয়ে ঘুরলো। কত স্বপ্ন দেখা, কত স্বপ্ন বোনা.. সবই কি তাহলে মিথ্যে? নিজের কানকে তার বিশ্বাসই হচ্ছে না। এখনই উঠে চলে যাওয়া দরকার। আঙ্গুলে জড়ানো আংটিটা আবিদের মুখের উপর মেরে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয় কি করে?

আবিদ হতভম্ব। কি করবে বুঝতে পারছে না। কাল আবার সবাইকে পার্টি দিবে সে। রাফসানকে নিষ্ঠুরভাবে হারিয়েছে জিতেছে সে। এ উপলক্ষ্যে গ্রুপের সবাইকে বুমার্সে খাওয়াবে সে। অবন্তীকে ও কি বলবে সে? কাঁটা গায়ে নুনে ছিঁটা একটু বেশী-ই হয়ে যাবে না? থাক.. গরু মেরে জুতো দানের কি দরকার। এখন ক্যান্টিন ছেড়ে গ্যালারীতে গিয়ে বসা যায়। একদম উপরের সিড়িগুলোতে। ওখানে গেলে নির্মলদের অবশ্যই পাওয়া যাবে। এ সময়ে ওরা প্রতিদিন ওখানে গান করে। মাঝে মাঝে প্রায় অন্ধকার ফাঁকা গ্যালারীতে তাদের গলা জুড়ানো গান তার বেশ ভাল লাগে। মন খারাপ থাকলে সে ওখানে গিয়ে বসে। নির্মলকে বলবে আজ যেন এল.আর.বি-র হাসতে দেখো গানটা গায়। নির্মল বেশ গায় এ গান। বাকী ছেলেগুলোও বেশ গায় আর অ্যাকুস্টিক বাজায়। অবন্তী আর রাফসানকে বিদায় জানিয়ে ওদিকে দ্রুত যাওয়া দরকার। অবন্তী মাথা উঠাচ্ছে না। অবন্তী তাকে ক্ষমা করবে না- এটাও সে বুঝে গেছে। কিছুই করার নেই। সে বাজীতে জিতেছে। অবন্তীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে। বাজীর শর্ত দু’টোই পূরণ হবে। সম্পর্ক করা ও সম্পর্কচ্ছেদ করা। দুটোই হলো। রাফসানের যথেষ্ট শিক্ষা হবে। ‘বেটা.. আমাকে অনেক অপমান করেছিলে..’ মনে মনে ভাবছে সে।

এভাবে চুপচাপ চললো দু মিনিট।

‘এই নে তোর টাকা। টাকা মেইন ফ্যাক্টর না আগেই বলেছি। মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলিস। আশা করি বুঝতে পেরেছিস তুই। মুখ গুঁজে ছিলাম অনেক। আর পারলাম না বলে দুঃখিত।’, আবিদ বললো।

রাফসান অবাকই হলো। আবিদ এতটা উত্তেজিত হয়ে কথা বলে না কখনো। হেসে উড়িয়ে দিতো সব কিছু। হেসে হেসেই সে ক্ষোভ জমিয়েছে। পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। রাফসান প্যাকেটাটা হাতে নিলো না। অবন্তী মুখ তুলে ওদের কথাবার্তা শুনছে। চেহারা পাল্টে গেছে। নীল শাড়িতে একটা মেয়ে কেঁদে মুখ ভাঁসিয়ে ফেলেছে। একটুও ‘টুঁ’ শব্দ হয়নি। আবিদ অবন্তীর দিকে ফিরে বললো, ‘দুঃখিত অবন্তী.. যে অপরাধ করলাম তার জন্যে ক্ষমা চাওয়ার ভাষা আমার জানা নেই.. তোমার কাছে চিরকালের জন্যে ছোট হয়ে গেলাম। তোমার কাছে হেরে আমি রাফসানের সাথে জিতে গেলাম.. এখানেই আমাদের সব সম্পর্ক সমাপ্ত হচ্ছে।’

আবিদ কোন দিকে না ফিরে টেবিলের পাশে রাখা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ছুটছে। পেছনে ফিরলো না। অদ্ভূত এক অনুভূতি হচ্ছে। যতই সামনে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে সে পাহাড় থেকে নামছে। যতই সমতল ফ্লোরে পা রাখছে মনে হচ্ছে ফ্লোরটা ইচ্ছে করেই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। ক্যান্টিন পেরিয়ে রিক্রিয়েশন সেন্টার আর ক্যান্টিনের মাঝের করিডোর দিয়ে হেঁটে সে গ্যালারীর দিকে যাচ্ছে। কি রোমাঞ্চকর দিনই না সে কাঁটিয়েছে। সারাজীবনে সে যেসব কথা বলারসাহস পায়নি একদিনে সে এসবই করে বেরিয়েছে। নিজেরই মনে হচ্ছে ঘোঁর কেটে গেছে। নিজেকে ভেঙ্গে নিজের রোমাঞ্চকর রূপটা যেমন অবন্তীকে দেখিয়েছে সে, ঠিক তেমনি নিষ্ঠুর রূপটা রাফসানকে দেখিয়েছে সে। শুধুই কি রাফসান? নাকি অবন্তীকও দেখিয়েছে। রাফসানের চেয়েও বেশী নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে। সে এখন মুক্ত বিহঙ্গের মতো গ্যালারীর দিকে যাচ্ছে। এ মুক্ত বিহঙ্গ কি আসলেই মু্‌ক্ত? নাকি একগাদা পাপের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে? অদৃশ্য শেকলে বাঁধা এক অদ্ভূত মুক্ত বিহঙ্গ! বিহঙ্গ না, সে তো মানুষ। আর মানুষ নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না। যেমন পারে নি চিরকাল নাক উঁচা অবন্তী, চির আত্মবিশ্বাসী রাফসান কিংবা চিরকালের ভীতু সে নিজে। পরিস্থিতি মানুষকে বদলে দেয়। মানুষ সত্যিই অদ্ভূত!

বড় করিডোরটার প্রায় শেষ প্রান্তে আবিদ। হাঁটছে তো হাঁটছেই। পথই শেষ হচ্ছে না! পনের-বিশ সেকেন্ডের পথ সে পেরুতে মনে হচ্ছে মিনিট না ঘন্টা পার করে দেবে। হাবিযাবি কত কিছুই যে সে ভাবছে। দু’চোখে বাষ্প জমেছে। মুছে ফেলা দরকার। না থাক। আরেকটু গিয়ে আড়ালে মুছবে সে। সব কিছু কেমন যেন কাল্পনিক মনে হচ্ছে। সেই ‘ঠুকুস ঠুকুস’ শব্দ। অবন্তী কি তার পেছন পেছন আসছে? নাকি অযথা নিজে ভেবে নিচ্ছে! পেছন ফিরে দেখবে সে? না থাক.. অতীতকে ফিরে দেখতে নেই। অবন্তী এখন অতীত। দেখা গেল পেছনে ফিরে দেখল সে, আর অবন্তী নেই সেখানে! অন্য কোন মেয়ে। কিংবা কেউই নেই। কি হবে? নিজের মধ্যে হাহাকার জেগে উঠবে। স্ট্রং থাকতে হবে তাকে, যেমন নিজের স্ট্রং মেন্টালিটিটা সে রাফসানকে দেখিয়েছে। হাই হিল জুতোর ‘ঠুকুস ঠুকুস’ শব্দ ক্রমাগত বেড়েই চলছে। মনে হচ্ছে পেছন থেকে এসে অবন্তী জড়িয়ে ধরবে। সে কি একটু স্লো হবে? না.. আবিদ জোরে পা বাঁড়ায়। আড়ালে গিয়ে চোখটা মুখতে হবে। জলদি।

হঠাৎ করে ‘ধপাস’ করে পড়ে পড়ে যাওয়া শব্দ শুনতে পায় সে। অবন্তী কি তাহলে দ্রুত হাঁটতে গিয়ে পড়ে গিয়েছে? আর পারলো না সে.. ফিরে তাঁকালো.. আবচা অন্ধকার আর চোখের কোনে জলকণা.. আবিদ স্পষ্ট করে দেখলো না। শুধু দেখলো নীল শাড়ী পরা একটা মেয়ে হোঁচট খেয়ে কিংবা ঘুরে পড়ে গেছে। কেউ তুলে ধরার জন্যে একটা হাত বাড়ানো। এই হাতে কি সেই আংটি টা আছে? সে স্পষ্ট কিছুই দেখছে না। চোখের জল মুছবে নাকি হাতটা ধরে টেনে তুলবে পারে না সে। হতভম্ব হয়ে হাতটা টেনে ধরে সে।

এ কার হাত? অবন্তীর? নাকি অন্য কারো? জানে না সে। ঝাপসা চোখে আরেকটা জুয়া খেলে ফেলে!

১০ thoughts on “জুয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *