আগে মানুষ হ !

বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে ‘খ্যাপা পাগলা’ হিসেবে খ্যাত প্রয়াত নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা এস এম সোলায়মানের একটি পথনাটক দেখার সুযোগ হয়েছিলো ২০০৩ বা ২০০৪ সালের দিকে টিএসসির সামনের উম্মুক্ত মঞ্চে । যদিও নাটকের নামটা স্মরন করতে পারছিনা, ভাসা ভাসা যতোটুকু স্মরনে আসছে, নাটকের গল্পটা ছিলো অনেকটা এরকম-


বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে ‘খ্যাপা পাগলা’ হিসেবে খ্যাত প্রয়াত নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা এস এম সোলায়মানের একটি পথনাটক দেখার সুযোগ হয়েছিলো ২০০৩ বা ২০০৪ সালের দিকে টিএসসির সামনের উম্মুক্ত মঞ্চে । যদিও নাটকের নামটা স্মরন করতে পারছিনা, ভাসা ভাসা যতোটুকু স্মরনে আসছে, নাটকের গল্পটা ছিলো অনেকটা এরকম-

একজন পাগল ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে বিড়বিড় করে কী যেন বলে হঠাত মূর্ছা গেছে তার পরে আর নড়াচড়া করছেনা , শ্বাসপ্রশ্বাসও বূঝা যাচ্ছেনা । লাশের পরিচয় খুঁজে না পেয়ে উপস্থিত সকলে সিদ্ধান্ত নিলেন বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে যতো দ্রুত সম্ভব দাফন কাফনের ব্যাবস্থা করা । বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছায় এগিয়েও এলেন লাশের সৎকারের জন্য , কেউ গোছলের ব্যাবস্থা করতে কেউ কাফনের কাপর আনতেও প্রস্তুতি নিলেন ।

কিন্তু বাঁধ সাধল উপস্থিত হিন্দুরা, তাঁরা বললো এই লাশ আমাদের হিন্দু ভাইয়ের, আমাদের না জানিয়ে আমাদের ভাইয়ের লাশ বিধর্মীদের হাতে দাফনকাফন হলেতো চৌদ্দপুরুষ নরকে যাবেরে দাদা । কে কোথায় আছো, দুনিয়ার হিন্দু ভাইয়েরা এক হও । চতুর্দিক থেকে দলে দলে হিন্দুরা জমায়েত হতে লাগলো ।

মুসলিমেরাও ছেড়ে দেবার পাত্র নন, তারাও এক মুসলিম ভাইয়ের লাশ বিধর্মীদের হাতে শ্মশানে উঠলে তারাও চৌদ্দপুরুষ দোজখে যাবে । কিছুতেই এমন কাজ হতে দেয়া যাবেনা । তারাও তাদের মুসলিম ভাইদের ডাক দিলেন, দুনিয়ার মুসলিম ভাইয়েরা এক হও । দলে দলে মুসলিম ভাইয়েরা জড় হতে লাগলো ।

উপস্থিত দুই দলেই বহুলোকের সমাগম । যে যার পক্ষের দাবী জোড়ালো করছে, পরস্পর বচসা, অনিয়ন্ত্রিত বচসা থেকে ধ্বস্তাধস্তি হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াচ্ছে । কেউ আবার লড়াই লড়াই লড়াই চায়, লড়াই করেই বাচতে চায় । বোঝাই যাচ্ছে ধর্মের ভাইয়ের জন্য এদের দরদ কতোটা উথলে উঠেছে । উপস্থিত কেউ একজন বললো, মরার আগে পাগল কি আল্লাহ বা হরি বলে কিছু বলেছিলো ? প্রত্যক্ষদর্শীকে ডেকে আনা হলো, সে জানালো পাগল মরার আগে “হ্যা-চ্ছো” বলেছিলো । কিন্তু হ্য-চ্ছো কি আল্লাহ না হরির নাম, ডেকে আনা হলো দুই দলেরই ধর্মগুরু মৌলভী এবং ব্রাহ্মণকে । না তাঁরা অনেক ঘেটে ঘুটেও প্রমান করতে পারলেন না, হ্যা-চ্ছো কুরানিক না কি বৈদিক শব্দ । আবার উত্তেজনা, আবার কলহ, হাতাহাতি, কেউ স্লোগান দিচ্ছে-আমার ভাইয়ের লাশ কবর দেয়া চলবেনা । অপরপক্ষে পরক্ষনেই স্লোগান তুলছে, আমার ভাইয়ের লাশ শ্মশানে তুলতে দেবোনা । উভয়পক্ষেই রনপ্রস্তুতি-টানটান উত্তেজনা

এবার নিরুপায় হয়ে সনাক্তকরণের শেষ প্রচেষ্টা, লাশ বিবস্ত্র করে তার লিঙ্গ কর্তনের প্রমান দেখে পরিচয় নির্ধারণ । যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ-

এবার লাশ নড়েচড়ে উঠলো, উপস্থিত উভয়পক্ষই তাতে ভড়কে গিয়ে নিরাপদ দুরত্বে সরে দাড়ালো । লাশ বসা থেকে সটান দাঁড়িয়ে, একবার ডানে থুথু আরেকবার বামে থুথু ছিটিয়ে বললো, “ধিক তোদের হিন্দু-মুসলিম, তোরা মানুষ হলিনা, হিন্দু আর মুসলিমই রয়ে গেলি ! ধিক!”

উপস্থিত দুই দল চরম ঘৃণায় থুথু ছেটানো প্রস্থানোম্মুখ হেটে যাওয়া পাগলের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো । আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করা শুরু করলো, আসলেই আমরা হিন্দু আর মুসলিমই রয়ে গেলাম । পাগল আজ আমাদের মুখে থুথু ছিটিয়ে তা দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা এখনও মানুষ হতে পারি নাই, নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে, রাম-রহিম, কৃষ্ণ-করিম, লক্ষন আর লোকমান পরস্পর আদ্রচোখে কোলাকুলি করতে লাগলো ।

=====================================================

রাজধানীর পল্লবীর কালশী, শবে বরাতের দিন আতশবাজির তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই(ত্রি) পক্ষের অনাকংখিত আক্রমনে সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী অগ্নিদগ্ধ এবং গুলিতে ১০ জন নিহত । এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠ তদন্ত এবং বিচার দাবী না করে এই মৃত্যুদেহে বাঙ্গালী-বিহারী পরিচয়ের ট্যাগ লাগিয়ে আনন্দোল্যাস করতে যারা আগে লাশের কর্তিত লিঙ্গ উদ্ঘাটনে আগ্রহী, তাদের জন্য সেই পাগলের আগমন কামনা করা ছাড়া হয়তো তেমন কিছুই করার নেই-কারন একজন পাগল হওয়ার আগ পর্যন্ত হয়তো আমি ভবঘুরেও পারছিনা, এই ধর্মকানা, জাতকানা, দলকানাদের মুখে থুথু ছিটিয়ে বলতে, আগে মানুষ হ ! মানুষের পরিচয় সে মানুষ, একজন মানুষের এমন নির্মম অপমৃত্যুতে আরেকজন মানুষ তার বিনোদনের উপাদান খুঁজতে পারেনা ।

পাগল হতে আগ্রহীঃ ভবঘুরে বিদ্রোহী (ভবদ্রোহী)

১ thought on “আগে মানুষ হ !

  1. একজন নাগরিকের ব্লগের প্রথম
    একজন নাগরিকের ব্লগের প্রথম পাতা দু’য়ের অধিক পোস্টকে ইস্টিশনের নীতিমালা অনুযায়ী ফ্লাডিং বলে গণ্য করা হয়। পোস্টটি প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে আপনার ব্যক্তিগত ব্লগে সংরক্ষণ করা হল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *