ছবির হাট

না ছবির হাট নেই, এখানে দেশের ভয়ঙ্করসব মানুষের আনাগোনা, যে কোন মুহূর্তে তাঁরা একটা জঙ্গি-মঞ্চ বা সন্ত্রাস-জাগরণ ঘটিয়ে ফেলতে পারে, তাই মদিনা সনদের আজ্ঞাবাহী গণপূর্ত বিভাগের বুল্ডোজার বাহিনী গুঁড়িয়ে দিয়েছে ছবির হাটের সকল ছবি ।


না ছবির হাট নেই, এখানে দেশের ভয়ঙ্করসব মানুষের আনাগোনা, যে কোন মুহূর্তে তাঁরা একটা জঙ্গি-মঞ্চ বা সন্ত্রাস-জাগরণ ঘটিয়ে ফেলতে পারে, তাই মদিনা সনদের আজ্ঞাবাহী গণপূর্ত বিভাগের বুল্ডোজার বাহিনী গুঁড়িয়ে দিয়েছে ছবির হাটের সকল ছবি ।

তাদের আক্রোশ মূলতঃ এখানে যারা অঘোষিতভাবে রোজ জমায়েত হয় তাদের উপর । তাঁরা কারা ? তাদের হাতেতো লাঠি-সোঁটা নেই, কোমরে চাক্কু-ছুড়ি-চাপাতি বা আগ্নেয়াস্ত্র নেই, শরীরে বোমা-বারুদ ঠাসা নেই ; তারপরেও তাঁরা ভয়ঙ্কর । ছবির হাট থেকে লালন চর্চাকেন্দ্র পর্যন্ত শিল্পী, সাহিত্যিক, চিত্রকর, ব্লগার, আউল-বাউল, ছড়াকার, গীতিকার নবীন প্রবীন সকলের সাথে দেশের বিভিন্ন শ্রেনীপেশার মানুষের মিলন মেলা । তাদের শক্তি সামর্থ্য বা সংখ্যাও তেমন ভয়ংকরভাবে উল্লেখযোগ্য নয় । যদিও তাদের সকলের একটি জায়গায় অদ্ভুতভাবে মিল আছে, মানবতার বিশুদ্ধ চর্চায় ধর্ম নিরপেক্ষ মুক্তচিন্তায় একটি শক্তিশালী যুক্তিবাদী মানবিকচেতনা , যা তাঁরা সার্বক্ষণিক আপাদমস্তক বহন করে চলে । যেই চেতনার মহাবিস্ফোরণ ঘটলে, প্রচলিত মিথ্যের মিথ আর ফ্যাসিবাদের ভিত দুটোই তাসের ঘরের মতো মুহূর্তেই উবে যেতে পারে, ভয়টা আসলে সেখানেই । এদের নেতৃত্বে বিশেষ এমন কেউ হোমরা চোমরা নেই যার টুঁটি চেপে ধরা যাবে সত্য তাই নিরবস্তুক চেতনা্র বায়বীয় অবয়ব ছুঁতে না পেরে তাঁরা আস্ত জায়গাটিকেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে, লে হালুয়া ।

অথচ একজন প্রবীন অধ্যাপক বাদল ভাইয়ের ভাষায়, পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝে শুধু ছবির হাট থেকে লালন চর্চা কেন্দ্রটুকুই নিরাপদ তার কারন চারুকলা সংলগ্ন ছবির হাটের আপাত নীরিহ সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিবৃন্দের সার্বক্ষণিক পদচারনা । তাহলে সোহরাওয়ার্দীর বাকি অংশটুকু কাদের জন্য অনিরাপদ, কাদের জন্য বেহাতে ? সেটা বুঝতে সাবালক হতে হয়না, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সাম্প্রতিক সময়ের খবরের দিকে নজর দিলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে । এখানে একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠনের ছত্রছায়ায়, হত্যা এবং অপহরনের মতো ঘটনাও ঘটেছে , ছিন্তাই যেখানে অহরহ ঘটনা সেই সাথে প্রতিপক্ষের কাউকে টর্চার করতেও উদ্যানের দক্ষিন এবং পূর্ব দিকটাই বেশি ব্যবহার হচ্ছে । আর মাদক বা গাঁজার প্রসঙ্গ যদি আসে তাহলে বলবো, শাহবাগ থানার নাকের ডগায় বসে যারা মাদক বা গাঁজা ব্যবসা করছে, তার দায়দায়িত্ব সাধারণ মানুষের নয় প্রশাসনের , আবার নির্বিঘ্নে বিক্রিকারী অনেকে স্থানীয় থানা-প্রশাসনকে কেয়ারও করেনা, কারনটা অজানা নয়, সাদা পোশাকের দু’একজনকে মাসোয়ারা তোলার জন্য অদুরেই তীর্থের কাকের মতো ধর্না দেখলেই বোঝা যায় ।

তাহলে ? সোহরাওয়ার্দীর তথা সারাদেশের অবাধ মাদক বানিজ্যের সমস্যা বা দায় শুধু ছবির হাটের উপর কীভাবে বর্তায় ? হ্যা এখানে কয়েকদিন আগেও গণজাগরণের অনেকের সাথে বসে বিশেষ ছাত্রসঙ্গঠন যারা উড়ে এসে মঞ্চ জুড়ে বসেছিলো, তাদের অনেকেই জানতে পেরেছে ছবির হাটে কাদের যাতায়াত, তাদের চেতনার বলিষ্ঠ শক্তি সম্পর্কে এবং নিজেদের ইতর সংকীর্ণতা । তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্ন করতেই ছবির হাটে ভাংচুর চালানো হয়েছে-যাতে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ একত্র হতে না পারে । তাই আজ বুর্জোয়াতন্ত্রী আপাত বিপরীত ফ্যাসিবাদ আর মৌলবাদ একাট্টা, একই উদরের দুই সহোদর গোপন আঁতাত করে যাচ্ছে, সেটা যেন ফাঁস না হয়ে যায়-ভিতরে তাদের এই আশংকা কারন শাহবাগ বেশি দূরেও নয় ।

অথচ পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চরম অব্যবস্থাপনা, নোংরা ময়লা-আবর্জনা, দোকান-পাট, অপর্যাপ্ত আলোক এখনও রয়ে গেছে, সে ক্ষেত্রে ইদুর-বিড়াল খেলা চলবেই, কারন তার পিছনে অনাদিকাল পর্যন্ত অন্যহেতু বহাল থাকবেই-

অন্যহেতু অনুসন্ধানবিমুখঃ ভবঘুরে বিদ্রোহী (ভবদ্রোহী)

(বিঃদ্রুঃ বুলডোজারকে কীভাবে বোঝাবো যে, লালন চর্চা কেন্দ্র ভাঙ্গলেই যেমন লালনকে ভাঙ্গা যায়না, লালনকে গুঁড়িয়ে দেয়া যায়না, লালন মুছে যায়না তেমনি ছবির হাটের ছবি ভাঙচুর করলেই তার আত্মিক চেতনাকে গুঁড়িয়ে দেয়া যায়না । আমি চিত্রশিল্পী নই সত্য, তবে ছবির প্রতি আজীবন মমত্ববোধ আছে, ২০০১ সালের পরে যখন এলাকা ছাড়তে বাধ্য হই, তখনও নিজের আঁকা একটি অসম্পূর্ণ ছবি এবং রংপেন্সিল নিয়েই পালিয়ে বেরিয়েছি, গতকাল ছবির হাটের ভাঙ্গাচুরো ছবিগুলোর স্তুপ দেখে কান্না সামলাতে পারিনি, অদুরেই ভাঙ্গা লালন চর্চা কেন্দ্রের পাশে উদ্যানের ঘাসে কাঁদে ভাঙ্গা একতারা ; সেই সাথে সঙ্গিতশীল্পিদের মৌন প্রতিবাদের আবহ সুর যেনো দূর থেকে ভেসে আসা কোন অসহায় মায়ের কান্নার আহাজারি, তার অক্ষম সন্তানেরা আদ্রচোখে শিয়রে অপলক বসে আছে সারি সারি ।)

৬ thoughts on “ছবির হাট

  1. ছবির হাট যে কোন অগনতান্ত্রিক
    ছবির হাট যে কোন অগনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য আতংক। এটা সরকার হাতেনাতে প্রমাণ করলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *