শবে বরাত এবং তাহাদের বরাত

টিএসসি হয়ে ফুলার রোড ধরে পদব্রজে দুইবন্ধু যখন পলাশীমোড়ে পৌছালাম তখন রাত দশটা, পলাশী থেকে আজিমপুরের দিকের রাস্তা বন্ধ, কোন রিক্সা-ভ্যান-বাস-হলার চলছেনা, সামনেই ধাতব ব্যারিকেড দিয়ে একজন দারোগার নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে । আজ শবে বরাত, ভাগ্য রজনী, আজ রাতে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং সাত আসমানের উপরের আরশ ছেড়ে নিজেই তার বান্ধাদের আর্জি শুনতে সর্বনিম্ন আকাশে নেমে আসবেন ।আল্লাহ পাক মানবজাতির জন্য তাঁর অসীম রহমতের দরজা এ রাতে খুলে দেন। পরম করুণাময়ের দরবারে নিজের সারা জীবনের দোষ-ত্রুটি, পাপকাজ ও অন্যায়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার রাত। এ রাতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ পরবর্তী বছরের জন্য বান্দার রিজিক নির্ধারণ করে সবার ভাগ্যলিপি লেখেন এবং বান্দার সব গুনাহ মাফ করে দেন। বান্ধাদের মধ্যে যে যা কামনা-বাসনা-পানাহ চাইবে মহান রাব্বুল আলামিন, সর্বোৎকৃষ্ট পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা, রিজিকদাতা সকলের মনোঃকামনা পরিপূর্ণ করবেন, উদারহস্তে তার বান্ধাদের বরাত লিখে দিবেন আগামী শবে বরাত পর্যন্ত । ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির এই স্থুল কথাগুলো শুনতে খুবই ভালো লাগে, আশান্বিত করে, প্রার্থনামুখী করে তোলে, তাই এ রাতে বিশ্বের শতকোটি মুসলিমের সাথে বাংলাদেশী মুসলিম নরনারীরাও সারারাত জেগে নামাজ-জিকির-দোয়া-কালাম পড়ে, রোজা রেখে উপোস থেকে, হালুয়া-রুটি বিলিয়ে মহান আল্লাহর কাছে ব্যাক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক সার্বিক মঙ্গলকামনা , প্রার্থনা বা মোনাজাত করে কান্নাকাটি করবে এবং আল্লাহ তাহা যথাদ্রুত পূরণও করে দিবেন বলে অঙ্গিকারাবদ্ধ । নিশ্চয় আল্লাহ ভঙ্গ করেনা অঙ্গীকার !

এরাতে ঢাকাস্থ যেকোন বিশেষ মসজিদের চেয়েও বেশী লোকের ঢল নামে, আজিমপুর কবরস্থানের দিকে, কারন দুনিয়াবাসী বান্ধাদের পাশাপাশি যারা কবরবাসী তাদেরও আজাব মুক্তির জন্য তাদের রেখে যাওয়া স্বজনেরা কবর জিয়ারত বা প্রার্থনা করবে এটাই স্থানীয় কবর সাংস্কৃতি, তাদের চলাচল নির্বিঘ্ন করে দিতেই দায়িত্বশীল স্থানীয় প্রশাসনের রাস্তা বন্ধ করে যথাতৎপরতা প্রশংসার দাবিদার । যেহেতু কবরবাসীরা নিজেদের জন্য নিজেরা দোয়া বা প্রার্থনা করতে পারেনা বা তাদের দোয়া কবুল হওয়ার কোন সুযোগ নাই, তাই তাদের দুনিয়াবাসী স্বজনদের উপরই এ দায়িত্ব বর্তায় । যদিও এই ধারাবাহিকতা মৃত্যুর পরে নিয়মিতভাবে কয়েক সপ্তাহ এবং শবে-বরাত শবে-কদরে প্রথম কয়েকবছর ধারাবাহিকভাবে চললেও একসময়ে তা অনিয়মিত এবং ম্লান হয়ে আসে ।

বন্ধ রাস্তা নয়, ঘুমন্ত(!) কবরবাসী বা তাদের জিয়ারতগামী স্বজনদের আগত ঢলও নয়, আমার দৃষ্টি রাস্তার দুপাশে দান-খয়রাতপ্রার্থী সারিসারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, বাকপ্রতিবন্ধী, শ্রবনপ্রতিবন্ধি, শারীরিকপ্রতিবন্ধি সর্বোপরি অর্থপ্রতিবন্ধীদের প্রতি । আজিমপুর কবরস্থানের নিয়মিত ফকির-মিস্কিন-ভিখিরি-খয়রাতিদের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগতরাও আজকে এখানে রাস্তার দুপাশে সারারাতের জন্য থিতু হয়ে বসেছে, বসতে গিয়ে পরস্পর বচসাও হচ্ছে, কিন্তু বচসায় উপার্জনে ক্ষতি হচ্ছে জেনে আবার নিজেরাই মিটিয়ে ফেলছে । পলাশী থেকে আজিমপুর নতুন-পুরাতন উভয় গোরস্তান হয়ে প্রায় মেডিক্যাল স্টাফ-কোয়ার্টার পর্যন্ত কয়েক হাজার ভিখিরির অবস্থান । বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র দেখে আসছি, ফি বছর শবে বরাত হয়, ঈশ্বর অন্যের ভাগ্য লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে যান, দেশে সরকার বদলায়, বার্ষিক উন্নতির (ফর)মুলা আর ফিরিস্তি দেয় , দারিদ্রমুক্তির বরাদ্দ বাড়ায় তবু এদের সংখ্যা ফি বছর বেড়ে যায় সত্য কিন্তু ভাগ্যবিতারিতদের ভাগ্য বদল হয় না; না অর্থে- না প্রতিবন্ধীর শরীর কিংবা স্বাস্থ্যে ।

শবে বরাতের রাতে নতুন করেও আর এদের বরাত লেখন হয়না, তাই এরা নিজের জন্য ইবাদত-বন্দেগী মোটেই করেনা এ রাতে । তাঁরা জানে মসজিদে বসে ইবাদত করলে তাদের কিছুই বদল হবেনা, তাঁরা মসজিদে মুখথুবড়ে পড়ে নেই তাই তাঁরা কবরস্থান প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে ভিক্ষার বিনিময়ে অন্যের জন্য দোয়া করে, তাতে তাদের ভাগ্য বদল না হলেও আগামী একসপ্তাহ হয়তো তাদের খাদ্য বদল হবে, তাঁরা খাদ্যকেই ভাগ্য জানে আর ভাগ্য মানে খাদ্য বুঝে কারন ক্ষুধার্তের খাদ্যই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান । তাহলে এই সকল ক্ষুধার্তের ঈশ্বর কীভাবে আল-রাজ্জাকুন নাম ধারন করে শবে-বরাতের বরাতদাতার গর্বিত আসনে বসে থাকে ? না-কি এই সর্বহারা শ্রেনীদের কোন বরাতের ঈশ্বর নেই অথবা এরা কেউই আল্লাহর বান্ধা নয় । তাহলে আল্লাহ তামাম জাহানের সকলের প্রতিপালক নন অথবা ধর্মের ঈশ্বর প্রতিপালক হিসেবে মারাত্মকভাবে ধনীদরিদ্র পক্ষপাতদুষ্ট ।

যারা দোয়ার বিনিময়ে ভিক্ষা বা রুটি-হালুয়া দান করছেন তাদের উদ্দেশ্যের প্রতিও আমি সন্দিহান, যারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্যই বদলাতে পারেনি তাদের দোয়ায় কীভাবে দানকারীর ভাগ্যবদল হবে ? সেটা আমার বোধগম্য নয় । নিশ্চয় বিনিময়ের এ দান মুক্তহস্তে নয় বা তার বিবেক তাড়িত মানবিক দায় থেকেও এ উদারহস্ত সাহায্যপ্রদান নয় । আসলে এইসব বিত্তহীন শিকড়হীন মানুষগুলোর উপস্থিতি না থাকলে আপনি কীভাবে বুঝবেন যে, আপনি বদলে যাওয়া ভাগ্যবান । এরা না থাকলে আপনি কীভাবে বুঝবেন যে, নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তরা কিন্তু এখনও ভিখিরি নয় । আপনার উপরতলাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাঁরা আজ মসজিদে বা কবরস্থানে ইবাদতে বন্দেগীতে ছিলোনা বা যতোটুকু ছিলো তা-ও লোকদেখানো । তাদের কাছে আর পাঁচটা সাভাবিক ঠান্ডা-গরম-রোদ্দুর-বৃষ্টি সম্ভাব্য দিন বা রাতের মতোই শবে বরাত, তাঁরা এরাতের মহীমায় অতোটা গদগদ নয়, যাদের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স বছর শেষে স্বতঃস্ফূর্ত স্ফীত হয় তাদের নিজস্ব কৌশলী কর্মচঞ্চলতায় । তাঁরা জানে ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি বিশেষ রাতে বিশেষ স্থানে মাথাঠুকাতে নয়, ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি তাদের হাতে, মাথা সটান করে দাড়ানোর মাঝে নিহিত । তাই যাদের ভাগ্য তাদের কর্মকৌশলে বদলে যায় অথবা যাদের ভাগ্য আদৌ বদলায় না তাদের জন্য শবে বরাত আলাদা কোন মাহাত্ম্য প্রকাশ করেনা । এটা শুধু আমজনতার এমন এক সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেনীর জন্য, যারা এখনও মানতে নারাজ আপনি ভাগ্যবঞ্চিত এক পার্থিব মানুষ, পার্থিব পরিবর্তনের জন্য ঈশ্বর বা আল্লাহ নামক অদৃশ্য কেউ পুরস্কারের বা বাজেটের ডালা খুলে এ রাতে পায়ে হেটে অবশ্যই নিম্ন আসমানে চেয়ারে বসে আছে, তারাই এরাতে অসার ইবাদতে বসে আছে । যারা অদৃশ্যের হাটা-চলা-বসার মতো স্বাভাবিক প্রশ্নজ্ঞান বিশ্বাসে জলাঞ্জলি দিয়ে বসে আছে, তাদের কাছে ভবঘুরের যুক্তি উলুবনে মুক্তা সমান ।

কিন্তু ভাগ্যতাড়িত দরিদ্র ভিখিরিদের ভাগ্য বদল না হলেও এদের উপর ভর করে অনেকের ভাগ্য বদল হয়ে গেছে, একজন তো দেশের দারিদ্র দূর করার (ফর)মূলা আবিস্কার করে নোবেল বাগিয়ে নিয়েছেন, সেই নোবেলের বদৌলতে দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছেন, পৃথিবীজুড়ে দারিদ্রমুক্তির তত্ব প্রচার করে যাচ্ছেন, তার ভাষায় দেশে কোন দরিদ্র নেই, উনার যাদুর কাঠি মাইক্রোক্রেডিটের ছোয়ায় সব দারিদ্র উবে গেছে অথবা দরিদ্রের সংজ্ঞা বদলেছে । তবে ভাগ্যহীন দরিদ্রদের উপর ভর করে তাদের ঘাম শুষে নিয়ে উনার নিজের ভাগ্য সুপারসনিক গতিতে যে বদলে গেছে সেটা নিশ্চিতভাবে বুঝতে সাবালকত্বের প্রমান দেখাতে হয়না । নোবেল সাহেব যদি এই রাতে কষ্টকরে একটু আজিমপুরে আসতেন তাহলে আপনাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার ঝুকিটা নগন্য ভবঘুরেকে নিতে হয়না । আপনিতো আবার ঝান্ডুদার মতো আন্তর্জাতিক ব্যাস্তমানুষ, কখন বিদেশ যান আর কখন দেশে থাকেন বোঝা যায়না । কারন দেশের চেয়ে বিদেশপ্রীতিই তার একটু বেশি, জানিনা আমাদের ভাগ্যবদলে তার সকল প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কতো কানাকড়ি বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সাথে যোগ করতে পেরেছে আর কতো হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করতে সক্ষম হয়েছেন সেটা তার একমাত্র গ্রামীন ফোনের ক্রয়সংক্রান্ত বিদেশনীতির আড়ালেই চাপা পড়ে থাকবে, বাকিটা আর এই মহিমান্বিত রাতে না-ই বা ঘাটলাম ।

যেদিন থেকে মুদ্রা আবিস্কার হয়েছে আমাদের ভাগ্য অর্থের সাথে মারাত্মকভাবে সম্পর্কিত হয়ে গেছে, কারন আমাদের ভাগ্যই অর্থ আর অর্থই ভাগ্য । তাই আমাদের অর্থমন্ত্রী যেন রাষ্ট্রীয় ভাগ্যমন্ত্রী । উনি এই বাজেটেই আমাদের আশার বানী শুনিয়েছেন, “আগামী তিনবছর পরে দেশে অতিদরিদ্র কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা”-সরল উক্তি সন্দেহ নেই যদি না তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে বা মিউনিসিপালিটির ভিখিরিনিধন কার্যক্রমের আওতায় না হয় । ইতিমধ্যে ঈশ্বর যদি অবিশ্বাসীর উপর চুড়ান্তভাবে নাখোশ না হয় এবং ততোদিন যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আমি ঠিক তিন বছর পরে শবে বরাতের প্রথম প্রহরে আজিমপুরের কবরস্থানের সামনের সড়কে দৃষ্টি রাখবো । আমি বিশ্বাস করতে চাইনা আমাদের ভাগ্যমন্ত্রী ভাগ্যের ঈশ্বরের মতোই জনতা জনার্দন আশ্বস্ত করতে শুধুই “কথার কথা” শুনিয়েছেন,…

বরাত অবিস্বাসীঃ ভবঘুরে বিদ্রোহী (ভবদ্রোহী)

২ thoughts on “শবে বরাত এবং তাহাদের বরাত

  1. শবে বরাত মানেই উত্তমরূপে
    শবে বরাত মানেই উত্তমরূপে হালুয়া-রুটি-মাংস-খিচুড়ি খাওয়া… বাকিগুলো অর্থহীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *