বিশ্বব্যাংক সংস্কারের দায় মেটাচ্ছে বাংলাদেশ?

বিশ্বব্যাংক সংস্কারের ঘোষণাটা এসেছিল ২০১২ সালের মাঝামাঝি। ২০১৩ সালের এপ্রিলে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে সংস্কারের রূপরেখা নির্দিষ্ট হয়। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় হ্রাস তথা সংকোচন নীতিতে প্রবেশ করে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে এমনিতেই অভিযোগের শেষ নেই। বড় ধনী দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা ও দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব পোষণের অভিযোগ আছে সংস্থাটির বিরুদ্ধে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের খবর বাইরে খুব কমই আসে। কীভাবে বিশ্বব্যাংকের সংস্কার সাধিত হচ্ছে, কোন খাতে ব্যয় কমাচ্ছে তারা, কোন দেশে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে- এসব খবরের কোনোটিই চাউর হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে সংস্কার সম্পর্কে কিছু কার্যক্রমের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, সব পক্ষের অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করা, ঋণদানের ঝুঁকি কমানো এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সুশাসন জোরদার করা বিষয়ে কিছু প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক কীভাবে তার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিয়েছে, তার কিছুই এতে বলা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রমের ওপর অনুসন্ধান চালিয়ে আমরা এমন কিছু বিষয় জানতে পেরেছি, যা উদ্বেগজনক।

খড়গের শিকার বাংলাদেশ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় ব্যয় সঙ্কোচনের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সেই পরিকল্পনায় অঞ্চল ভিত্তিতে ঠিক করে দেয়া হয়েছে, কোন অঞ্চলে কী করতে হবে! বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তথ্য দিতে রাজি না হলেও জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে তারা সব ধরনের ব্যয় ১০ ভাগ হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যার মধ্যে ১০ ভাগ কর্মী ছাঁটাইও অন্তর্ভুক্ত।

জানা গেছে, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, ভারত ও পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে এ অঞ্চলের দরিদ্র দুটি দেশ নেপাল ও বাংলাদেশের ওপর সংস্কারের পুরো খড়গটা চাপিয়ে দিয়েছেন সংস্থার আঞ্চলিক নীতিনির্ধারকরা। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের যে ১০ ভাগ কর্মী ছাঁটাইয়ের কোটা ঠিক হয়েছে, তা বাংলাদেশ ও নেপালে অবস্থিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরিরত কর্মীদের ছাঁটাই করে পূরণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত চাকরি হারিয়েছেন ৬ জন বাংলাদেশি ও ৪ জন নেপালি। আরও কিছু কর্মী অপেক্ষায় আছেন হারানোর।

মূলত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশনের (IFC) ওপর দিয়েই যাচ্ছে ব্যয় সঙ্কোচনের এই ঝড়-ঝাপটা। এ প্রতিষ্ঠান থেকেই অল্প দিনের ব্যবধানে দুই দেশ থেকে ১০ জন চাকরি হারিয়েছেন। ঢাকা আইএফসির সাম্প্রতিক এক অফিস মিটিং সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ প্রধান কাইল এফ কেলোফার বলেছেন, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশ ও নেপাল আইএফসি থেকে আরোও কিছু কর্মকর্তার চাকরি যেতে পারে। অর্থাৎ, তার ঘোষণা অনুযায়ী চাকরি ঝুলছে আরও ৬ বাংলাদেশির। এ ঘোষণা প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরিরতদের ভীতি ও অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।

নাম না প্রকাশের শর্তে সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মূলত নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের দক্ষ লোক কমছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে যে পরিমাণ লোক কমানোর কথা, তা বাংলাদেশ আর নেপাল থেকে কমিয়ে হিসাব মিলিয়ে দেয়া হচ্ছে। ভারতে একটা অফিস বন্ধ হলেও তাদের অন্য অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে কোনো ছাঁটাই হয়নি। সংস্কারের খড়গটা মোটাদাগে যাচ্ছে বাংলাদেশের ওপর দিয়েই।

ঘোষণার উল্টো কাজ
আইএফসি লোকবল ছাঁটাই করলেও বাস্তবে তারা এর উল্টো ঘোষণা দিয়ে নিজেদের বাংলাদেশে ব্যবসা চালাচ্ছে। বাংলাদেশে কর্মকাণ্ড আরও প্রসারিত করার বিষয়ে সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। বিশ্বব্যাংক প্রধান জিম কিম কিছুদিন আগে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশসহ দরিদ্র দেশগুলোতে সহায়তা কার্যক্রম আরও প্রসারিত করার লক্ষ্যে সম্পূর্ণ নতুন করে ১০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ঘটছে এর উল্টোটা।

আইএফসি ঢাকাস্থ কর্মীদের ছাঁটাই করতে গিয়ে বলেছে যে, তিন কারণে তারা এই কর্মকর্তাদের চুক্তি আর নবায়ন করতে পারছেন না। কারণ তিনটি হচ্ছে-
১) বাংলাদেশের জন্য দাতাদের প্রদেয় তহবিলের ঘাটতি
২) বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চান নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা কমানো হোক
৩) বাণিজ্যিক কারণ

উল্লেখিত তিন কারণের সবগুলোই বিশ্বব্যাংক প্রধানের ঘোষণার পরিপন্থী। ১০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন তহবিল গঠনের অর্থ হচ্ছে পুরোনো প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়বে এবং নতুন অনেক প্রকল্প চালু হবে। সেক্ষেত্রে লোকবল আরও বাড়ানো দরকার। অর্থাৎ বাণিজ্যিক কারণ হিসেবে যা বলা হয়েছে তা মেনে নেয়া যায় না। ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের পরও কীভাবে বলা যায় যে, দাতারা তহবিল দিচ্ছে না! শুধু এই কারণটাই যথার্থ যে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চান বাংলাদেশি কর্মকর্তা কমানো হোক। অর্থাৎ যৌক্তিক কারণের চেয়ে বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ বা গরিব দেশবিষয়ক বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিই এসব ছাঁটাইয়ের প্রধান কারণ।

বৈষম্য ও ফাঁকি
চাকরি গেলেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী কিছুই করার নেই ছাঁটাই হওয়া কর্মকর্তাদের। কারণ শুধু বিশ্বব্যাংকই নয়, দাতাদের অর্থায়নে চালিত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এদেশে কোনো কর্মকর্তাকে স্থায়ী নিয়োগ দেয় না। নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিত্তিতে নিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয়। তিন মাস থেকে শুরু করে দুই বছর বা সর্বোচ্চ তিন বছর মেয়াদ ধরে চুক্তি হয়। মুখে বলা হয় যে, আমরা এই পদ্ধতিতেই কাজ করি। মেয়াদ বাড়তে থাকবে, কিন্তু কাগজে কলমে এটা উল্লেখ করা যাবে না।

ফলে যে কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে ‘ছাঁটাই’ শব্দটা ব্যবহার করা কঠিন। কারণ সেক্ষেত্রে আইএফসির সোজা বক্তব্য হবে, চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হয়েছে। তারপর আমরা আর নবায়ন করতে চাচ্ছি না। সেক্ষেত্রে আইনগতভাবে কিছু বলার সুযোগ খুবই কম। যদিও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছুকাল আগে প্রমোশন পাওয়া, ভালো কাজ করে প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের কর্তৃক অভিনন্দিত হওয়া কর্মকর্তাদেরও চুক্তি নবায়ন হয়নি। অর্থাৎ যোগ্যতার জন্য বা কাজ ভালো না বিধায় চুক্তি নবায়ন হচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়। বরং এটা পরিকল্পিতভাবেই করা হচ্ছে। আর এটা তো তাদের দেখানো কারণগুলোর মধ্যেই স্পষ্ট।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানা রকম বৈষম্য বিদ্যমান। আইএফসিও তার বাইরে নয়। বাংলাদেশিরা এখানে যোগ্যতার মূল্য পায় না। তাদের নিয়োগ হয় নিম্ন গ্রেডে। সাদা চামড়ার কর্মকর্তা, ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান থেকে আসা কর্মকর্তাদের সঙ্গে একই মাপের বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের দেয়া সুযোগ সুবিধার মধ্যে রয়েছে বিরাট তারতম্য। এ সম্পর্কে আমরা তাদের কাছে সরাসরি জানতে চেয়েছি। কিন্তু তারা কোনো তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেননি।

অনুসন্ধানে আমরা জেনেছি, ঢাকাস্থ আইএফসি অফিস থেকে যে ৬ জন কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে, তাদের কাছাকাছি গ্রেডে চাকরিরত একজন বিদেশির (ইতালিয়ান একটি মেয়ে) বেতন এই ছয়জনের মোট বেতনের চেয়ে বেশি। স্বাভাবিক নিয়মে যদি ব্যয় কমানোই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তাদের উচিত বিদেশি কর্মকর্তা কমানো। কারণ তাদের পেছনে ব্যয়ই বেশি। একজন বিদেশি কর্মকর্তাকে বাদ দিলে যেখানে সমস্যা মিটে যায়, সেখানে তারা ৬ জন বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে বাদ দিয়েছে। তা-ও আবার দক্ষ, তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বাদ দেয়া হচ্ছে।

চাকরি হারানো এই ছয় কর্মকর্তা কারা? আমরা জানতে চেয়েছিলাম আইএফসি কর্তৃপক্ষের কাছে। কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। আমরা অনুসন্ধান করে ছয়জনের নাম-পরিচয় জেনেছি। এরা হচ্ছেন-
সারাহ করিম, জাভিদ আহসান, জাহিদ পারভেজ, এস আমাল আহমেদ, রশীদ জয় এবং লুৎফুল কবীর। তাদের দু’একজনের কাছ থেকে বিষয়টি জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা কোনো কথা বলতে, তথ্য দিতে ভয় পাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের ওপরের দিকের ম্যানেজমেন্ট এমন একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্কজনক পরিবেশ তৈরি করে রেখেছেন। তারা নিজেরা কোনো তথ্য দেন না। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের অন্য কেউ কোনো তথ্য দিতে সাহস করেন না।

এ বিষয়ে আমরা কথা বলেছি অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা এসবের কিছুই জানতাম না। আপনারা জানিয়ে ভালো করেছেন। লোকবল কমানো একটা সাধারণ প্রক্রিয়া। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার কোটা বাংলাদেশকে দিয়ে পূরণ করাটা তো কোনো কথা হতে পারে না। তা-ও আবার শুধু বাংলাদেশি কর্মকর্তাদেরই সরানো! আর, তথ্য তারা দেবে না কেন? বাংলাদেশে কাজ করতে হলে বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইন মানতে হবে। এই আইন সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য। আমি বিষয়টা নোট রাখলাম।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর মোহাম্মদ এ. (রুমী) আলী বলেন, ‘যেকোনো সংস্থাতেই লোক কমানো-বাড়ানো হতে পারে। এটা একটা সাধারণ প্রক্রিয়া। তবে এক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকা উচিত। বিশ্বব্যাংক বা আইএফসি কাজ করছে বাংলাদেশে। তারা যদি বাংলাদেশের স্থানীয় দক্ষ, যোগ্য বিশেষজ্ঞদের না ধরে রাখে, তাহলে তারা এখানে কী সেবা দিবে! তাছাড়া সবখানেই ভারসাম্য রাখতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার কোটা পূরণের দায় যদি বাংলাদেশের কাঁধে চাপে, তাহলে তো ভারসাম্য থাকল না। আবার শুধু বাংলাদেশি স্টাফ কমানো হলে তো অফিসের মধ্যকার ভারসাম্যটাও নষ্ট হয়ে গেল। আমি জানি না, তা আগে আদৌ ছিল কিনা! কীভাবে তারা লোক ছাঁটাই করছে! এটা করে তারা একটা রং সিগন্যাল দিল! আমাদের সরকারকে এগুলো বুঝে একটা পরিকল্পনা দাঁড় করিয়ে এগোতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা একেবারেই সঠিক আচরণ হচ্ছে না। আমাদের সঙ্গে যে ন্যায্য আচরণ হচ্ছে না, এটা কেন, কিসের প্রেক্ষিতে, তার জবাব চাওয়া দরকার। বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে গেলে তো এদেশের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। এরা কখনোই তা করে না, এটা আমরা জানি। কিন্তু সেখানে এভাবে দেশি কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করা হবে, এটা তো মানা যায় না। চুক্তি নবায়ন না করার অর্থটা তো আমরা বুঝি। সকল আইএনজিও এবং দাতাদের প্রতিষ্ঠানেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হয়। কিন্তু যদি তারা যুক্তি দেখায় যে, ব্যবসায়িক কারণে, তহবিল সঙ্কটের করণে চুক্তি নবায়ন করা যাচ্ছে না, তাহলে তো এটা অবশ্যই ছাঁটাই।’

বার্তা চালাচালি!
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এহেন বৈষম্যমূলক আচরণের কারণ কী তা জানতে আমরা গত মার্চে যোগাযোগ করি বিশ্বব্যাংক গ্রুপ এবং তার অধীনস্থ আইএফসির সঙ্গে। ঢাকায় নিযুক্ত সংস্থাটির যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহেরিন এ মাহবুবের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা তখন বাংলাদেশ সফরে আসা বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক সহ-সভাপতি ফিলিপ লি হররোর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করি। তিনি জানান যে, এই মুহূর্তে তার শিডিউল পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। একদিন বাদেই তিনি দেশত্যাগ করবেন।

এরপর আমরা আবারও যোগাযোগ করি এই কর্মকর্তার সঙ্গে। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জোহানেস জুটের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করি। তিনি সে সময় পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান। সবকিছু খুলে বলা হলে তিনি এ বিষয়ে আইএফসিতেই কথা বলতে হবে বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আইএফসিতে কী হচ্ছে, না হচ্ছে, এটার জবাব তারাই ভালো দিতে পারবে। আপনি বলছেন বটে, বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রমের কথা। কিন্তু তার আওতায় আইএফসিতে কী হচ্ছে, এটা আইএফসি ও বিশ্বব্যাংকের হেড অফিস ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না। সুতরাং বাংলাদেশ থেকে তথ্য পেতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই আইএফসিতেই যেতে হবে।’

এরপর আমরা সরাসরি আইএফসির বাংলাদেশ ব্যবস্থাপক কাইল এফ কেলোফারকে একটি ই-বার্তায় (ই-মেইল) এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার আহ্বান জানাই। তিনি অদ্যাবধি বার্তাটির কোনো জবাব পাঠাননি। এরপর আমরা যোগাযোগ করি আইএফসির যোগাযোগ কর্মকর্তা তৌহিদ ফিরোজের সঙ্গে। তিনি অফিসে গিয়ে সাক্ষাতে আলাপ করার আহ্বান জানান। আমরা গুলশানস্থ আইএফসির অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। অফিসিয়ালি তিনি তখন একটি ই-বার্তায় প্রশ্নগুলো পাঠানোর অনুরোধ করেন। সেইমতে আমরা তাদের যে প্রশ্নগুলো পাঠাই-
১) কেন বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ছাঁটাই করা হচ্ছে?
২) কোনো বিদেশি কর্মকর্তা কি ছাঁটাই হয়েছে?
৩) আইএফসিতে দেশি ও বিদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে কি ধরনের বৈষম্য রয়েছে?
৪) দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে কিভাবে সংস্কার কার্যক্রম চলছে?
৫) ছাঁটাই হওয়া কর্মকর্তাদের নাম পরিচয় ও তথ্যাবলি দিন।
এই বার্তা পাঠানোর পর তিনি প্রাপ্তিস্বীকার করে বলেন যে, ‘আমি মেইলটি দেখেছি। আমি স্যারকে এটা দেখাবো। এবং তার বক্তব্য কিংবা প্রতিক্রিয়া আমি আপনাকে জানাব।’

এরপর একটি ই-বার্তায় তারা তাদের কোম্পানির বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড ও তার চালচিত্র বিষয়ক বিরাট এক ফিরিস্তি দেয়। সেখানে আমাদের প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব ছিল না। অথচ জনাব তৌহিদ ফিরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটাই আমাদের জবাব।’ প্রতিক্রিয়ায় আমরা আবারও তাদের একটি বার্তা পাঠিয়ে বলি যে, আমরা আপনাদের ফিরতি ই-বার্তাটি দেখে খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা আবারও প্রশ্নগুলো উল্লেখ করে এর সুনির্দিষ্ট ও সঠিক উত্তর দাবি করি। এখনো তার কোনো জবাব পাইনি।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
দাতারা সারা বছরই আমাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার শিক্ষা দেয়। এদেশে তাদের যত লোক আসে, সবার মুখেই এই কথাগুলো লেগে থাকে। তাদের এখানকার বন্ধু ও অংশীদার এনজিও মহলও আমাদের সব সময় এ বিষয়গুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, আসলে দাতাদের নিজেদের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা একেবারেই নেই।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশস্থ কর্মী ছাঁটাই প্রসঙ্গে কথা বলতে আমরা মার্চের শেষের দিকে যোগাযোগ শুরু করি। এখনো তাদের কারও কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া গেল না। কোনো বিষয় নিয়ে তথ্য চাইতে গেলে তারা সব সময়ই প্রথমে কিছুদিন ঘোরায়। তারপরও যদি কেউ লেগে থাকে তখন তাকে নিউইয়র্ক দেখিয়ে দেয়া হয়।

এখানে বিশ্বব্যাংকের একাধিক অফিস আছে। অসংখ্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আছেন। এমনকি জনসংযোগের আলাদা বিভাগ আছে সবখানেই। অথচ তাদের কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কেন ছাঁটাই হচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাবে তারা পাঠান কোম্পানির চালচিত্রবিষয়ক প্রতিবেদন।

বিশ্বব্যাংক এবং তার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে সাধারণ কিছু তথ্য চাইতে গিয়ে আমাদের মাসের পর মাস ছুটে বেড়াতে হলো। স্বাভাবিকভাবেই এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিলে আর তাদের কিছু বলতে হয় না। আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই বলছে, আসলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা বা জবাবদিহিতা বলে কিছু নেই।

১১ thoughts on “বিশ্বব্যাংক সংস্কারের দায় মেটাচ্ছে বাংলাদেশ?

  1. বিশ্ববব্যাংক ও তার সকল
    বিশ্ববব্যাংক ও তার সকল অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে স্বভাবত কারনেই অনেকে বেশ্যা ব্যাংক বলেন। আসলেই তাই, এদেরকে নব্য ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীও বলা যায়। আমাদের কুটনৈতিক অসফলতা ও আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক কোন্দলের সুযোগ নিয়ে এরা এসব অনৈতিক কাজকর্ম করে যাচ্ছে। এসব বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক একটা চাকুরীবিধি বা নিয়োগবিধি থাকা উচিত। আমি যতটুকু জানি ভারতে এই ধরনের নিয়ম আছে। বাংলাদেশের মাটিতে তাদের অফিস থাকবে, বিভিন্ন ধরনের সুদি বাণিজ্য করে যাবে, টাকা আয় করবে; অথচ কতজন কর্মী বা কর্মকর্তা এদেশ থেকে নিয়োগ দিতে হবে তার কোন দিক নির্দেশনা নাই দেখেই ওদের ইচ্ছে মাফিক যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে।

    যদি দক্ষিণ এশিয়া থেকে ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাংক ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমুহের মধ্যে হয়েই থাকে, সেটা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করা উচিত। না হলে এটা হবে বিরাট অন্যায়। সরকারের এখানে একটা ভুমিকা রাখা প্রয়োজন। রির্পোটে অর্থ প্রতিমন্ত্রী যদিও আশ্বাস দিয়েছে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার, তারপরও আমাদের মাস লেভেলে বিশ্বব্যাংকের এই ধরনের বিমাতাসূলভ আচরনের প্রতিবাদ করা উচিত।

    বাংলাদেশের সাথে যদি বিশ্বব্যাংক এ ধরনের আচরণ বন্ধ না করে, তাহলে এদেশ থেকে তাদের গুটিয়ে চলে যাওয়া উচিত। সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রইলাম।

    পোস্টদাতাকে ধন্যবাদ বিশ্বব্যাংকের চরিত্র উন্মোচণের জন্য।

    1. অর্থ প্রতিমন্ত্রী নাকি এ
      অর্থ প্রতিমন্ত্রী নাকি এ বিষয়ে কিছুই জানেনা না। তিনি বলেছেন-

      এ বিষয়ে আমরা কথা বলেছি অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা এসবের কিছুই জানতাম না। আপনারা জানিয়ে ভালো করেছেন। লোকবল কমানো একটা সাধারণ প্রক্রিয়া। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার কোটা বাংলাদেশকে দিয়ে পূরণ করাটা তো কোনো কথা হতে পারে না। তা-ও আবার শুধু বাংলাদেশি কর্মকর্তাদেরই সরানো! আর, তথ্য তারা দেবে না কেন? বাংলাদেশে কাজ করতে হলে বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইন মানতে হবে। এই আইন সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য। আমি বিষয়টা নোট রাখলাম।’

      দেখা যাক সরকারের পক্ষ থেকে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা আশা করছি এই রির্পোটটি প্রকাশ হওয়ার পর সরকার থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

      মন্তব্যে অংশ নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

    2. দুলাল ভাইয়ের সাথে একমত। এইসব
      দুলাল ভাইয়ের সাথে একমত। এইসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমাদের সরকার স্পষ্ট বিধিমালা তৈরি করুক। ব্যবসা করবি, আর ছিটে ফোঁটার ভাগও দিবিনা কেমুন কথা?

  2. গরীব দেশের কিন্তু খুবই
    গরীব দেশের :bum: কিন্তু খুবই তুলতুলে হয়। সবারই কুপিত দৃষ্টি পড়ে ওটার ওপর। সারাক্ষণ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কখন মেরে দেয়া যায়। বাংলাদেশও সেই ক্যাটাগরীতে পড়েছে। যখন তখন যে কেউ এসে উঠে পড়ে বাংলাদেশের পিঠে।

  3. যারা সরকারের সিদ্ধনের
    যারা সরকারের সিদ্ধনের অপেক্ষায় থাকবেন আমার মনে হয়না ভালো কোন উত্তর পাবেন। উল্টো অর্থমন্ত্রীর মুখে রাবিশ শব্দটাও শুনতে পেতে পারেন।

    এই অবস্থা দেখে একটা অবস্থার কথাই মনে পড়ে সেটা হল মৎসন্যায়। ছোট মাছ বড় মাছকে খায় আর রাক্ষস মাছ বড় মাছকে খায়।

    শাসকরা বরাবরই সাদা চামড়ার মানুষগুলোর প্রতি নীরব থেকেছে আর মনে হয় পরেও থাকবে কারণ বর্তমানে কিছু বড় প্রকল্প বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ পেলে ভালোভাবে শুরু হবে।

    1. শাসকরা বরাবরই সাদা চামড়ার

      শাসকরা বরাবরই সাদা চামড়ার মানুষগুলোর প্রতি নীরব থেকেছে আর মনে হয় পরেও থাকবে কারণ বর্তমানে কিছু বড় প্রকল্প বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ পেলে ভালোভাবে শুরু হবে।

      :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
      চমৎকার বলেছেন।

  4. আমরাই তাদের ব্যবসা করতে দিতে
    আমরাই তাদের ব্যবসা করতে দিতে চাই—– কারণ তা না হলে নেতাদের ্পকেট ভ্রবে কেমতে

  5. লাভ নাই এসব প্রতিষ্ঠানের
    লাভ নাই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লিখে। ক্ষমতাবানরা এদের তোষামোদ করে চলে। ওদের খুশি ওরা কাকে রাখবে, আর কাকে ছাটই করবে? কারো কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নয়। অর্থপ্রতিমন্ত্রী না বুইঝা কথা কইছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *