স্থানীয় সরকারগুলো গণতান্ত্রিক করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বহু সমস্যার সমাধান সম্ভব

বিভিন্ন রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যত উজ্জ্বল সম্ভাবনাময়ী। ভৌগলিক, প্রাকৃতিক অনূকলতার কারনে দেশের আর্থ-সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নে সফলতা লাভ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র । মাত্র ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের ছোট্ট একটি রাষ্ট্রে ১৬ কোটির অধিক মানুষের বসবাস হওয়ার পরেও দেশ ঝুঁকিতে নেই । কেননা দেশের অধিক জনসংখ্যাকে যদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করা যায় তবে অচিরেই দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হবে । যে কাজ সফলতা আছে সে কাজে বিফলতার সম্ভাবনাও শতভাগ । দেশের পরিচালকবৃন্দ যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করতে ব্যর্থ হন তবে অচিরেই দেশে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটবে । অনাকাঙ্খিতভাবে এমন কোন দূর্ঘটনা যদি বাংলাদেশের মানুষকে মোকাবেলা করতে হবে তবে তা দেশবাসীর জন্য চরম দূর্ভাগ্যের হবে এবং এ দূর্ভাগ্যের বোঝা বইতে না পেরে দেশটা সুদান কিংবা সিরিয়ার মত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত হবে । যা একজন মনে প্রাণে বাংলাদেশী হিসেবে কেউ কামনা করে না । দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৩ বছর পার হয়েছে অথচ দেশটি অর্থনৈতিকভাবে এখনো স্বাবলম্বী হতে পারে নি । জীবযাত্রার মানও বাড়েনি । দেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তর করা যায় নি । বিদেশে কিংবা দেশের শ্রম বাজারে বাংলাদেশের যে শ্রমিকরা শ্রম বিক্রি করে তাদেরকে অদক্ষ কিংবা অল্প দক্ষ শ্রমিক হিসেবে ঠিকমত মূল্যায়ণ করা হয়না এমনকি অন্যদেশীয় শ্রমিকদের তুলনায় সামান্য পরিমানে পারিশ্রমিক দেয়া হয় । বাংলাদেশের শ্রমিকরা যদি বিভিন্ন পেশায় দক্ষতা অর্জন করতে পারত তাহলে বাংলাদেশের প্রায় ৭ কোটি শ্রমিক তাদের শ্রম বিক্রি করে বিশ্বের বুকে অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেত । এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার তুলনা করা যেতে পারে । আশির দশকের পর মূলত আধুনিক মালয়েশিয়ার রুপকার মাহাথির মোহাম্মদ বিশ্ববাসীর কাছে মালয়েশিয়াকে প্রতিষ্ঠা করেন । যে দেশটির মানুষগুলো আশির দশকের মাঝামাঝি তাদের শ্রম বিক্রি করার জন্য বাংলাদেশে আসত সেই তারা একবিংশ শতাব্দীতে যেভাবে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াল তা সত্যিকারার্থেই বিস্ময় । কিছু অপিরনামদর্শী সিদ্ধান্তের কারনে কিংবা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারনে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা প্রাপ্তির দীর্ঘ চার দশক পরেও তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রের কাতারে দাঁড়িয়ে আছে । রাষ্ট্রের পরিচালকবৃন্দ জনগনের মনে দিনের পর দিন রঙিন রঙিন স্বপ্নের ছবি অঙ্কিত করলেও তার বাস্তবায়ন হওয়ার কোন লক্ষন আপাতত দেখা যাচ্ছে না ।

বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বের ১৯২টি স্বাধীন রাষ্ট্রের অনূকরণ কিংবা অনুসরন করা সম্ভব নয় । যদিও সম্ভব হয় তবে বিশ্বের এমনকতগুলো রাষ্ট্র আছে যার অনুসরন করলে নিজেদের অবস্থার বর্তমানের আরও অবনতি হবে । বাংলাদেশের উৎপত্তিগত পরিচয় হিসেবে বৃটিশদের অনুসরন কিংবা বৃটিশদের প্রণীত অনেক নিয়ম কানুন এখনো আমাদের দেশের কয়েকটি বিভাগকে পরিচালিত করে । আমরাও মনে প্রানে বৃটিশদের প্রণীত নিয়ম কানুনকে আমাদের জন্য মঙ্গলের মনে করে তা এখনো অনুসরণ করি । এছাড়া আমাদের বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত । যে দেশটির সংস্কৃতি তাদের দেশে যেটুকু চর্চা হয় তার চেয়ে ঢের বেশি চর্চা হয় আমাদের দেশে । আমাদের অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতিসহ দেশের সকল বিভাগ এবং অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মূলত ভারত নির্ভর হয়ে পড়েছে । ভারত যেমন বাংলাদেশকে তার ‘সেকেন্ড হোম’ কিংবা দ্বীতিয় আশ্রয় স্থল মনে করে তেমনি আমরাও আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল বলে ভারতকেই মনে করি । বাংলাদেশের বিপদে-আপদে, সূখে-দুঃখে ভারতই শেষ কান্ডারী । বিশ্বের বর্তমান পরাশক্তি আমেরিকা তাতে কারও কোন সন্দেহ নাই । আমেরিকা শুধু বাংলাদেশকে নয় বরং বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেকেই কম বেশি প্রভাবিত করে । সে কারনে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতিসহ প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই আমেরিকার কমবেশি বিচরন আছে । আমারাও মনে প্রানে আমেরিকাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্ধারক বলে মনে করি । উপরে উল্লেখিত তিনটি দেশকেই বাংলাদেশে অনুসরন করে এবং এ দেশগুলোর সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের জন্য যথার্থ বলে মনে করা হয় ।

ইংল্যান্ড, ভারত কিংবা আমেরিকার সাথে বাংলাদেশে কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে । এ তিনটি দেশেই কেন্দ্রীয় সরকারের মত স্থানীয় সরকারের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মত স্থানীয় সরকারকেও স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবেই প্রদান করা হয় । এ সকল রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের সদস্যরা যেমনি ক্ষমতা রাখে তেমনি স্থানীয় সরকারের সদস্যরাও কোন ভীতির প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কর্মকান্ড পরিচালনা করতে পারে । যার কারনে বাংলাদেশের তুলনায় সে সকল দেশে অপরাধ সংঘঠিত হয় কম । বাংলাদেশ উল্লেখিত তিনটি দেশকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে হুবহু অনুসরন করলেও যে ক্ষেত্রটিতে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ভাবে চলে সেটা স্থানীয় সরকারকে স্বাধীনতা ভোগ করতে না দেয়া । বাংলাদেশে নামে মাত্র স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতা প্রদান করা হলেও বিভিন্ন বাধার কারনে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা তাদের জন্য প্রদত্ত সামান্য ক্ষমতা টুকুকে কাজে লাগিয়েও তাদের কাজ করতে পারে না । কেননা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের সদস্যদের সম্পর্ক ‘সাপে-নেউলে’ হওয়ার কারনে দেশের অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ‘হিতে বিপরীত’ হতেও দেখা যায় । যার কু-প্রভাব সরাসরি জনগনকে বহন করতে হয় । যে কারনে দেশের মানুষ পদে পদে বিপথগ্রস্থ হয়ে পড়ে । সম্প্রতি দেশের সকল উপজেলায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল । এর কিছু দিন আগে দেশের কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং তারও কিছুদিন আগে দেশের অনেকগুলো পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল । উপজেলা, পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশনে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও রাষ্ট্রের বা সমাজের উল্লেখযোগ্য কোন উপকারে আসছে না । এ সকল স্থানের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রের জন্য কাজ করতে চাইলেও স্থানীয় সাংসদদের কিংবা ক্ষমতাশীন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের কর্তৃত্বের কারনে তারা তাদের কাজ সঠিকভাবে করতে পারে না অধিকন্তু কিছু কিছু স্থানে তারা হয়রানির শিকার হয় ।

বাংলাদেশে যতগুলো অপরাধ হয় তার প্রত্যেকটিই কোন না কোন মানুষের সামনে ঘটে । মূলত এ সকল অপরাধ সংগঠিত হয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা সিট কর্পোরেশনের কোন না কোন স্থানে হয় । বাংলাদেশের ৩৫০জন সাংসদ আইন প্রনয়নের কাজে কিংবা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপালনের জন্য বছরের কিছু সময় বিদেশে, অধিকাংশ সময় সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য রাজধানীতে, কিছু সময় ব্যক্তিগত কাজে বিভিন্ন ব্যস্ততায় এবং খুব অল্প সময় নির্বাচনী এলাকার মানুষকে সময় দিতে পারেন । যার কারনে তাদের সাথে এলাকার মানুষের সম্পর্ক আহামরি ভালো থাকে না । কাজেই এলাকার মানুষ তাদের সমস্যা নিয়ে এমপি মহোদয়ের কাছে যেতে চাইলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারনে এমপি মহোদয়দের সাক্ষাতলাভ সম্ভব হয় না । সুতরাং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যদি সাংবিধানিকভাবে পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হয় যেভাবে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে আমেরিকা, ভারত কিংবা ইংল্যান্ডে তাহলে দেশের বর্তমান সময়ে যতগুলো সমস্যা আছে তার সিংহভাগ স্থানীয় সরকারকার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব । যেমনটি ভারত তার বিধানসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা , বৃটিশরা তাদের কমন্সসভার প্রতিনিধিদের দ্বারা সমাধান করতে পারছে । বাংলাদেশ যেহেতু রাষ্ট্রপরিচালনার প্রায় সকল ক্ষেত্রে ভারত, আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডকে অনুসরন করে কাজেই তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারকে গণতান্ত্রিকীকরনের মাধ্যমে দেশের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব । এ ব্যাপারে কেন্দ্রিয় সরকার যতদ্রুত আন্তরিকতার সাথে সিদ্ধান্ত নিবে ততদ্রুত বাংলাদেশের প্রধান কতগুলো সমস্যার সমাধান করা যাবে ।

রাজু আহমেদ । কলাম লেখক ।
raju69mathbaria@gmail.com

৫ thoughts on “স্থানীয় সরকারগুলো গণতান্ত্রিক করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বহু সমস্যার সমাধান সম্ভব

  1. আপনার আগে অনেকে এই সংক্রান্ত
    আপনার আগে অনেকে এই সংক্রান্ত লিখা পত্রিকায় অনেক লিখছে কিন্তু লাভ নাই। সবাই ক্ষমতা লোভী তাই এই দুর্যোগ চলতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রকৃতি এই দেশের দুঃশাসনের কারিগরদের ধ্বংস না করে।

  2. স্থানীয় সরকার গনতন্ত্রমুখী
    স্থানীয় সরকার গনতন্ত্রমুখী করলে রাজনীতিবিদদের ধান্ধাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। যে রাজনীতির লক্ষ্য থাকে টু-পাইস ইনকাম, সেখানে ইস্টিটিউশনকে কখনই গণমুখী করবেনা এদেশের রাজনীতিবিদরা।

  3. সুবিধা অসুবিধা দুই-ই আছে। তবে
    সুবিধা অসুবিধা দুই-ই আছে। তবে প্রাশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ অনেক দীর্ঘসূত্রিতা কমে যাবে।

Leave a Reply to আকাশ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *