ট্রয় যুদ্ধ

[প্যারিস পর্ব]
ট্রয়ের রাজা ছিলেন প্রায়াম। রাণীর নাম হেকুবা।
তাঁদের কোলজুড়ে জন্ম নিল দ্বিতীয় রাজপুত্র। প্রথম পুত্র বিখ্যাত তীরন্দাজ হেক্টর। দ্বিতীয় সন্তান জন্মানোর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে রাণী হেকুবা স্বপ্নি দেখলেন, “এই শিশুটি ট্রয় নগরীতে একটি অগ্নিশিখা আনতে যাচ্ছে।” জোতির্বিদদের কাছে সম্ভাব্য পরিণতির কথা জানতে পেরে রাজা ও রাণী সন্তানটিকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, কিন্তু তাকে হত্যা করতেও দ্বিধান্বিত ছিলেন। তাই রাজা প্রায়াম সন্তানটিকে “আইডা পর্বতে” রেখে এলেন। এক কৃষক সন্তানটিকে পান। সে আকর্ষণীয় ও সুদর্শন এই শিশুটিকে লালন-পালন করতে থাকে। শিশুটির নাম হয় “প্যারিস।”


[প্যারিস পর্ব]
ট্রয়ের রাজা ছিলেন প্রায়াম। রাণীর নাম হেকুবা।
তাঁদের কোলজুড়ে জন্ম নিল দ্বিতীয় রাজপুত্র। প্রথম পুত্র বিখ্যাত তীরন্দাজ হেক্টর। দ্বিতীয় সন্তান জন্মানোর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে রাণী হেকুবা স্বপ্নি দেখলেন, “এই শিশুটি ট্রয় নগরীতে একটি অগ্নিশিখা আনতে যাচ্ছে।” জোতির্বিদদের কাছে সম্ভাব্য পরিণতির কথা জানতে পেরে রাজা ও রাণী সন্তানটিকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, কিন্তু তাকে হত্যা করতেও দ্বিধান্বিত ছিলেন। তাই রাজা প্রায়াম সন্তানটিকে “আইডা পর্বতে” রেখে এলেন। এক কৃষক সন্তানটিকে পান। সে আকর্ষণীয় ও সুদর্শন এই শিশুটিকে লালন-পালন করতে থাকে। শিশুটির নাম হয় “প্যারিস।”

প্যারিস যখন টগবগে যুবক, মারমিডনসের রাজা পেলাউস ও সমুদ্রদেবী থেটিসের বিয়েতে যুদ্ধদেবী এরিস ছাড়া সবাই আমন্ত্রিত হয়। দেবতাদের পিতা জিউস, তার স্ত্রী হেরা, জ্ঞানদেবী অ্যাথিনা, প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী “অ্যাফ্রেদিতি” বিয়েতে উপস্থিত। যুদ্ধদেবী এরিসকে আমন্ত্রণ না করায় ক্ষুব্ধ হন তিনি। তিনি সংকট তৈরি করার কথা ভাবতে থাকেন। এবং এক পর্যায়ে একটি সংকট সৃষ্টি করার জন্যই যুদ্ধদেবী এরিস একটি সোনালি আপেল ভোজের টেবিলে নিক্ষেপ করল; আপেলের গায়ে উৎকলিত ‘সুন্দরতম রমণীর জন্য’। আপেলের দাবি তিনজনেরই হেরা, অ্যাথিনা ও আফ্রোদিতি সৌন্দর্যে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব কেউ ছাড়তে সম্মত নয়।
তাদের কলহ মেটাতে পিতা জিউস বার্তাদূত আইরিসকে বললেন, আপেলটি আইডা পর্বতের রাখাল প্যারিসকে দিতে। তার বিবেচনায় যে সুন্দরী শ্রেষ্ঠা, তাকেই যেন আপেলটি হস্তান্তর করে।
প্যারিস তখন মেষ চড়াচ্ছিলো। তিন দেবী আবির্ভূত হলেন। হেরা বলল, ‘আমি তোমাকে সবচেয়ে ধনী এবং সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজা বানিয়ে দেব।’ অ্যাথিনা বলল, ‘আমি তোমাকে সবচেয়ে জ্ঞানী ও সবচেয়ে খ্যাতিমান মানুষে পরিণত করব।’ মিষ্টি হেসে আফ্রোদিতি বলল, ‘আমি তোমাকে দেব পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী, যে তোমার স্ত্রী হবে।’ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেনি প্যারিস; তার চাই সুন্দরী রমণী। আপেল পেল আফ্রোদিতি। সন্তুষ্ট দেবী আফ্রোদিতি তার জন্য বরাদ্দ করল হেলেনকে আর ক্ষুব্ধ দেবী হেরা দিল সংকট।

দেবী হেরার কাছে নিজ পরিচয় পেয়ে প্যারিস পিতা প্রায়াম ও মাতা হেকুবার কাছে ফিরে গেল এবং রাজপুত্র হিসেবেই আবির্ভূত হলো। এখন সে ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস। আফ্রোদিতি-প্রতিশ্রুত সুন্দরীর সন্ধানে প্যারিস সাগর পাড়ি দেবে। বোন ক্যাসান্ড্রা তাকে সতর্ক করল এবং অনুনয় করে বলল, এ যাত্রা ট্রোজানদের জন্য দুঃখ বয়ে আনবে।
১২৩০ সালের দিকে ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস ও হেক্টর আসেন স্পার্টায় ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য। স্পার্টার রাজা মেনেলাউস প্যারিস ও হেক্টরকে সাদরে সম্ভাষন জানান। তাদের আগমনে রাজ্যকে লাল-নীল বাতিতে চমৎকারভাবে সাজানো হয়। নৈশভোজের বিপুল সমারোহের পর প্যারিস ও হেক্টরকে সবার সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেন রাজা মেনেলাউস। প্রাসাদেই রাজপুত্র প্যারিসের দেখা হয় হেলেনের সঙ্গে। তার শরীরী রসায়নই তখন বলে দিল, এই সেই রমণী, মর্ত্যের সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি, তাকে দেওয়া আফ্রোদিতির সেই প্রতিশ্রুত উপহার। প্যারিস ও হেলেনের প্রণয় ঘটে।
গোপনে গ্রীস ছেড়ে ট্রোজান জাহাজে করে এজিয়ানের নীল সমুদ্র পাড়ি দেন হেলেন আর প্যারিস।

[হেলেন পর্ব]
দেবতাদের সর্দার, দেবতাধিরাজ জিউসের কন্যা হেলেন। গ্রীক ও রোমান পুরাণের সর্বাধিক আলোচিত নারীচরিত্র। মূলত বলতে। গেলে গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে উল্ল্যেখযোগ্য চরিত্রগুলোর মধ্যে “হেলেন” একজন। মর্ত্যলোকে সবচেয়ে সুন্দর নারী। যাকে প্যারিসের পুরষ্কার স্বরূপ অ্যাফ্রেদিতি বেছে রেখেছিলেন। ট্রয় যুদ্ধের সবচেয়ে বড় এবং’ মূল কারণ এই হেলেন। আগের পর্বে লিখেছিলাম, প্যারিস স্পার্টায় গিয়ে হেলেনের সাথে প্রণয়ে আবদ্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত হেলেনকে নিয়ে লুকিয়ে ট্রয়ে চলে আসে।
স্পার্টার রাজা টিনডারেউস এবং তার স্ত্রী লেডার ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। রাজকীয় জ্যোতিষ সেই শিশুটার নাম রাখেন হেলেন। পৌরণিক মহাকবি “হোমার”,”ভার্জিল” এর মতে। টিনডারেউস হেলেনের জনক হলেও প্রকৃত জনক দেবতাধিরাজ জিউস।

কোন একদিন, জিউস তখন রাজহাঁসের বেশে ছিলেন। একটি ঈগল তাকে তাড়া করে। জিউস তখন লেডার আশ্রয় প্রার্থনা করেন। রাজহাঁস লেডার উষ্ণ সান্নিধ্যে আসে এবং শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ফলশ্রুতিতে লেডা প্রসব করেন একটি ডিম। সেখান থেকে খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে হেলেন। ভ্যাটিকানের পুরাণ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজহাঁস ও লেডার সঙ্গমে দুটো ডিম প্রসূত হয়। একটি জন্ম দেয় দুই বোন ক্লাইটেমেনেস্ত্রা এবং হেলেন; অন্যটি দুই ভাই; ক্যাস্টর এবং পুলক্স। অনেকে মনে করেন, এক ডিম থেকে বের হয়েছে তিনজন: দুই ভাই এবং বোন হেলেন।
কালের পরিক্রমা ক্রমাগত এগিয়ে চলে অনন্ত এক মহাপরিক্রমার অনিঃশেষ পথে। ধীরে ধীরে স্বর্গীয় রূপ-লাবন্য আর অসাধারণ মোহনীয় নারীত্বের পূর্ণতা নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকেন ট্রয় অব হেলেন। এই সময় আরেক চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে। তার নাম প্যারিস। মিথোলজির সুবিখ্যাত এজিয়ান সাগরের ওপারের এক নগরী ছিলো ট্রয়।

এরপরের কাহিনী আমাদের সবার জানা। আগের পর্বে লেখা হয়েছে। হেলেন ছিল প্রতাপশালী স্পার্টান সেনাপতি “অ্যাগামেমনন” এর স্ত্রী। তাদের সম্পর্কে কোন প্রেম ছিল না। উপরন্তু যেখানে হেলেন মর্ত্যের সবচেয়ে সুন্দরি এবং যার যৌবন তখনো পার হয়নি। তখন “অ্যাগামেমনন” পঞ্চাশার্ধ বৃদ্ধ। যার ফলে সহজেই প্যারিস আর হেলেনের প্রণয় ঘটে। হেলেনের বিপরীতে প্যারিস ছিল মর্ত্যের সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ। এই ঘটনার ফলে স্পার্টান অর্থাৎ গ্রিকরা ক্রুদ্ধ হন এবং ট্রোজানদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক নষ্ট হয়। ফলে অনতিবিলম্বে বাঁধে সংঘর্ষ। বেজে উঠে যুদ্ধের দামামা…

[অ্যাকিলিস পর্ব-১]
গ্রীক বীর, মহান অ্যাকিলিসকে নিয়ে ইলিয়াড মহাকাব্যের প্রথম পংক্তিদুটি নিম্নরূপ:
“μῆνιν ἄειδε θεὰ Πηληϊάδεω Ἀχιλῆος
οὐλομένην, ἣ μυρί’ Ἀχαιοῖς ἄλγε’ ἔθηκεν,”
– গাও, দেবী, পেলিউস-তনয় অ্যাকিলিসের দুর্বার ক্রোধের গাথা
যে অভিশপ্ত ক্রোধ সহস্রাধিক এচিয়নের দুঃখের নিমিত্ত হয়।

গ্রিক পুরাণের প্রধান চরিত্র বীর অ্যাকিলিস। সে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাও ছিল। সমুদ্রদেবী থেটিস এবং মিরমিডন বাহিনীর সর্দার পেলানাউসের সন্তান অ্যাকিলিস। শোনা যায়, অ্যাকিলিসের জন্মের সময় দেবতারা থেটিসকে দুটো শর্ত দিয়ে হিলেন। প্রথমটি ছিল- অ্যাকিলিস অনেকদিন বেঁচে থাকবে কিন্তু নাম পাবে না। আর দ্বিতীয়টি ছিল- অ্যাকিলিস কম আয়ু পাবে কিন্তু অমর হয়ে থাকবে। মা থেটিস দ্বিতীয় শর্তটি বেছে নেয়।

ট্রয় যুদ্ধে অ্যাকিলিস তাঁর বিখ্যাত মিরমিডন বাহিনীকে নিয়ে যুদ্ধে নামে। এবং সবার প্রথমে ট্রয়ে পৌছায়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে অ্যাকিলিসের যুদ্ধোপহার “ব্রিসেইসকে ক্রিসেইস” নামে এক নারীকে নিয়ে সেনাপতি অ্যাগামেমনন এর সাথে অ্যাকিলিসের বিরোধ বাঁধে। ফলে অ্যাকিলিস যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধ গ্রিকদের বিপক্ষে চলে গেলে, নেস্টর ঘোষণা করেন যে ট্রোজানরা যুদ্ধে জয়লাভ করতে চলেছে। কারণ অ্যাগামেনন অ্যাকিলিসকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছেন। তিনি বলেন যে অ্যাগামেননের উচিৎ অ্যাকিলিসকে শান্ত করে ফিরিয়ে আনা। অ্যাগামেনন রাজি হন। তিনি ওডিসিয়াস ও অন্য দুই গ্রিক প্রধানকে ব্রিসেইস ও অন্যান্য উপহার অ্যাকিলিসের কাছে পাঠান। কিন্তু অ্যাকিলিস প্রত্যাখ্যান করেন। হেক্টরের নেতৃত্বে ট্রোজানরা সত্যসত্যই গ্রিক বাহিনীকে হঠিয়ে সৈকত পর্যন্ত নিয়ে আসে। সেখানে তাঁরা গ্রিক জাহাজগুলি লুণ্ঠন করেন। ধ্বংসের মুখোমুখি গ্রিক বাহিনীকে রক্ষার জন্য মিরমিডন বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে আসেন প্যাট্রোক্ল্যাশ। অ্যাকিলিস কিন্তু তাঁবুতেই রয়ে যান। প্যাট্রোক্ল্যাশ ট্রোজানদের সৈকত থেকে হঠিয়ে দিতে সমর্থ হন। কিন্তু ট্রয় নগরীকে যথার্থভাবে জয় করার আগেই হেক্টরের হাতে তিনি নিগত হন।
অ্যাকিলিস নেস্টরের পুত্র অ্যান্টিলোকাসের নিকট হতে প্যাট্রোক্ল্যাসের মৃত্যুসংবাদ পেলেন। ঘণিষ্ঠ সহচরের মৃত্যুতে শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়লেন তিনি। মা থেটিস শোকার্ত অ্যাকিলিককে সান্ত্বনা দিতে এলেন। তিনি হেফাস্টাসকে বলে একটি বর্ম নির্মাণ করালেন। কারণ অ্যাকিলিসের যে বর্মটি পরে প্যাট্রোক্ল্যাস যুদ্ধে গিয়েছিলেন, সেটি হেক্টর নিয়ে যান।

প্যাট্রোক্ল্যাসের মৃত্যুতে ক্রোধান্বিত অ্যাকিলিস মন পরিবর্তন করেন এবং যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ক্রোধের বশে তিনি অনেককে হত্যা করেন এবং হেক্টরকে খুঁজতে থাকেন। এমনকি অ্যাকিলিস নদীদেবতা স্ক্যামান্ডারের সঙ্গেও যুদ্ধে লিপ্ত হন। স্ক্যামান্ডার ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কারণ অ্যাকিলিস নরহত্যা করে মৃতদেহ দিয়ে নদীপথ রুদ্ধ করে দিচ্ছিলেন। স্ক্যামান্ডার অ্যাকিলিসকে ডুবিয়ে দিতে গেলে হেরা ও হেফাস্টাস তাঁকে বাধা দেন। জিউস স্বয়ং অ্যাকিলিসের ক্রোধে বিচলিত হয়ে ওঠেন এবং দেবতাদের পাঠিয়ে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন, যাতে তিনি ট্রয় নগরীকে আক্রমণ না করে বসেন। কারণ, ট্রয় ধ্বংসের উপযুক্ত সময় তখনও আসেনি। অবশেষে অ্যাকিলিস তাঁর শিকারের সন্ধান পান। অ্যাথেনা তিন বার হেক্টরের প্রিয় ভাই ডেইফোবাসের ছদ্মবেশে হেক্টরকে অ্যাকিলিসের সঙ্গে সম্মুখসমরে যেতে নিষেধ করেন। অ্যাকিলিস ট্রয়ের প্রাচীরের চারিধারে তিন বার হেক্টরকে ধাওয়া করেন। অবশেষে অ্যাকিলিসের রণকৌশলটি ধরতে পেরে হেক্টর বুঝে যান যে মৃত্যু অনিবার্য। তিনি নিজের নিয়তিকে মেনে নেন। সম্মুখ সমরে এসে কেবল একটি তরবারি নিয়ে অ্যাকিলিসকে আক্রমণ করেন তিনি। অ্যাকিলিস হেক্টরের ঘাড়ে একটিমাত্র আঘাত করে তাঁকে বধ করেন এবং নিজের প্রতিশোধ তোলেন। তারপর হেক্টরের দেহ নিজের রথের সঙ্গে বেঁধে নয় দিন ধরে যুদ্ধক্ষেত্রময় তা হেঁচড়ে নিয়ে বেড়ান।

দেবতা হার্মিসের সহযোগিতায় হেক্টরের পিতা প্রিয়াম অ্যাকিলিসের তাঁবুতে গিয়ে অ্যাকিলিসকে অনুরোধ করেন হেক্টরের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে দিতে। যার পর ট্রয়ের পতন ছিল সময়ের অপেক্ষামাত্র।

[অ্যাকিলিস পর্ব-২]
প্রিয়ামের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর অ্যাকিলিস আমাজনীয় যুদ্ধনায়িকা পেন্থেসিলিয়াকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেন। প্রথমে পেন্থেসিলিয়ার রূপে মুগ্ধ অ্যাকিলিস তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাননি। পরে তিনি বুঝতে পারেন পেন্থেসিলিয়ার রণকৌশল তাঁর অপেক্ষাও উন্নত এবং তাঁর প্রতি আকর্ষণ অ্যাকিলিসের কাছে মারাত্মক হতে পারে। এই কারণে তিনি যুদ্ধ করেন ও পেন্থেসিলিয়াকে হত্যা করেন। কিন্তু এমন সুন্দরী নারীকে হত্যা করে তিনি শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং বিলাপ করতে থাকেন। এতে থেরসিটাস নামে এক কুখ্যাত গ্রিক উপহাসকারী হেসে তাঁকে উপহাস করলে তার মুখে এক ঘুষি মেরে অ্যাকিলিস থেরসিটাসকে হত্যা করেন।

প্যাট্রোক্ল্যাসের মৃত্যুর পর, অ্যাকিলিসের নিকটতম সহচর হন নেস্টরের পুত্র অ্যান্টিলোকাস। ইথিওপিয়ার রাজা মেমন অ্যান্টিলোকাসকে বধ করলে আর একবার ক্রোধের বশে প্রতিশোধকল্পে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন অ্যাকিলিস। অ্যান্টিলোকাসকে নিয়ে অ্যাকিলিস-মেমন যুদ্ধ ছিল প্যাট্রোক্ল্যাসকে নিয়ে অ্যাকিলিস-হেক্টর যুদ্ধেরই অনুরূপ। কেবল হেক্টর মেমনের মতো দেবীপুত্র ছিলেন না।

অনেক হোমার-বিশেষজ্ঞের মতে, এই পর্বটি ইলিয়াড মহাকাব্যে প্যাট্রোক্ল্যাসের মৃত্যু ও তারপর অ্যাকিলিসের প্রতিক্রিয়ায় অনেক বিস্তারিত বর্ণনাকে অনুপ্রাণিত করে। এই পর্বটিই পরে মহাকাব্য চক্রের ইথিওপিস গ্রন্থের ভিত্তি রচনা করে, যা ইলিয়াড-এর পর সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে রচিত হয়। বর্তমানে এই গ্রন্থটি হারিয়ে গেছে। কেবলমাত্র পরবর্তীকালের লেখকদের রচনা থেকে উদ্ধার করা এই গ্রন্থের বিভিন্ন উল্লেখ থেকে এর কথা জানা যায়।

মৃত্যুকালে হেক্টর যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেন, সেই অনুযায়ী প্যারিসের তীরের আঘাতে (স্ট্যাটিয়াসের মতে গোড়ালিতে) অ্যাকিলিসের মৃত্যু হয়। কাহিনির কোনো কোনো পাঠ অনুসারে অ্যাপোলো এই তিরটিকে পরিচালনা করেছিলেন। এই দুই পাঠেই লক্ষ্যনীয়ভাবে হত্যাকারীকে বীরের সম্মান দিতে অস্বীকার করেছে। সাধারণভাবেও মনে করা হয়, প্যারিস ছিলেন ভিতু এবং অ্যাকিলিস যুদ্ধভূমিতে অপরাজেয়ই থেকে যান। তাঁর দেহাবশেষ প্যাট্রোক্ল্যাসের দেহাবশেষের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। আয়োজিত হয় অন্ত্যেষ্টি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। হারিয়ে যাওয়া ট্রয়যুদ্ধকেন্দ্রিক মহাকাব্য আর্কটিনাস অফ মিলেটাস-এর মতে, মৃত্যুর পর অ্যাকিলিস ড্যানিউব নদীর মোহনায় লিউক দ্বীপে বাস করতে থাকেন। অ্যাকিলিসের মৃত্যুসম্বন্ধিত অন্য একটি কাহিনি অনুসারে, তিনি ট্রয়ের রাজকুমারী পলিজেনার প্রেমে মজেন। অ্যাকিলিস প্রিয়ামের কাছে পলিজেনার পাণিগ্রহণের অনুমতিও চান। প্রিয়াম রাজি হয়ে যান। কারণ তাঁক কাছে এই বিবাহের অর্থ ছিল যুদ্ধের অন্ত ও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বীরের সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন। তিনি গোপনে অ্যাকিলিস ও পলিজেনার বিবাহের আয়োজন করেন। এদিকে অ্যাকিলিস প্যারিসের ভগিনীকে বিবাহ করলে তাকেও হেলেনের উপর থেকে দাবি প্রত্যাহার করতে হবে, এজন্য প্যারিস ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে দিব্য তিরের সাহায্যে অ্যাকিলিসকে হত্যা করেন। পরে ফিলোকটেটস হেরাক্লেসের বিশাল ধনুকের সাহায্যে প্যারিসকে হত্যা করেছিলেন।

ইলিয়াডে অ্যাকিলিসের একটা মহান বাণী পাওয়া যায়। সেটা দিয়ে অ্যাকিলিসের বীরত্বের গল্প শেষ করি-
“Look at me
I’m the son of a great man.
A Goddess was my mother.
Yet death and inexorable destiny are waiting for me.”

[ট্রোজান হর্স পর্ব]
এপিয়াস নামে একজন দক্ষ ছুতার বা মুষ্টিযোদ্ধা সুবিশাল এই ঘোড়াটি তৈরি করেন। পলায়নের ভান করে গ্রিকরা জাহাজে করে নিকটবর্তী টেনিডোস দ্বীপে চলে গেলেন। যাবার সময় তারা সাইননকে সেখানে রেখে গেলেন। আর ঘোড়াটি রেখে গেল ট্রয় নগরীর সুবিশাল ফটকের সামনে। সাইনন ট্রয়বাসীকে বোঝাল যে, এই ঘোড়াটি এথিনাকে উপহার দেওয়া হয়েছে ট্রয় নগরকে অপরাজেয় করে তোলার জন্য।

ট্রয়বাসী আনন্দ-উল্লাস করতে করতে ঘোড়াটিকে নগর-দেয়ালের অভ্যন্তরে নিয়ে এলো। তার ভেতরে আত্মগোপন করে থাকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রিক যোদ্ধা। বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে গ্রিক বাহিনী। কিন্তু, এ সকল কূটচালের কিছুই আঁচ করতে পারেনি ট্রয় অধিবাসী কিংবা ট্রয়ের কর্তাব্যাক্তিরা। তাদের এই অদূরদর্শিতাই মূলত ধ্বংস ডেকে এনেছিলো ট্রয় নগরীর।
মহা-আনন্দে আর উৎসাহে সেই ঘোড়াটিকে রাজ্যের ভেতরে নিয়ে আসে ট্রয়বাসী। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, রাতের গভীরে ঘোড়া থেকে বের হয়ে ট্রয়বাসীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায় গ্রিকরা। খুলে দেয় নগরতোরণ। ট্রোজান যুদ্ধ ডেকে আনে অশেষ দুর্গতি। ঘোড়া থেকে একে একে নেমে আসে অ্যাকিলিস, ওডেয়াসিস, প্যান্থেক্লাউস এর মত যোদ্ধারা। শুরু হয় দুর্বার যুদ্ধ।

স্পার্টানদের এ অতর্কিত আক্রমণে বিহ্বল হয়ে পড়ে ট্রোজান সৈন্যরা। শুরু হয় তাঁদের পরাজয়ের পালা। গ্রিক সৈন্যরা ট্রয় রাজ্যে আগুন ধরিয়ে দেয় । মুহূর্তের মধ্যে লকলকে আগুন গ্রাস করে নেয় ট্রয়নগরী। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় এককালের সাজানো সুন্দর ট্রয়নগরী।

সমাপ্ত

(লেখাটা গ্রিক মহাকবি “হোমার”-এর “The Iliad” গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে লেখা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উইকিপিডিয়ার সাহায্য নেয়া হয়েছে)

৫ thoughts on “ট্রয় যুদ্ধ

  1. কাহিনীগুলো আমাদের জানা। আবার
    কাহিনীগুলো আমাদের জানা। আবার পড়ে ভালো লাগলো। যাদের এই কাহিনী জানা নেই, তাদের নিশ্চয় আরও ভালো লেগেছে।

  2. অনেক ভাল লাগলো আবারো পড়ে
    অনেক ভাল লাগলো আবারো পড়ে :খুশি: আমার ছোট ভাই এর নাম প্রিয়াম/প্রায়াম (priam) ট্রয় এর রাজার নামেই নাম :খুশি: ইচ্ছে আছে সময় আর সুযোগ পেলে প্রাচীন ট্রয় নগরীর ধ্বংসাবশেষ দেখে আসার

  3. গ্রীক পুরাণের কাহিনীর সাথে
    গ্রীক পুরাণের কাহিনীর সাথে অন্যকিছুর তুলনাই চলে না…. ভিতরে যেতে পারলে খুবই ইন্টারেস্টিং একটা জগৎ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *