সমাপ্ত বন্ধুতা

লম্বা রাস্তাটা ধরে কিছুক্ষণ হেঁটে ডানে মোড় নিয়ে দোতলা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালো সে । বাড়িটার ঝুল বারান্দাটায় একটা ইজি চেয়ার দুলছে । এইমাত্র কেউ চেয়ার ছেড়ে উঠে গেছে । চেয়ারের সামনের টি টেবিলটায় একটা কফির মগ দেখা যাচ্ছে । তার পাশেই নীল মলাটের একটা বই । বইটা যে হূমায়ুন আহমেদ এর তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই ।


লম্বা রাস্তাটা ধরে কিছুক্ষণ হেঁটে ডানে মোড় নিয়ে দোতলা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালো সে । বাড়িটার ঝুল বারান্দাটায় একটা ইজি চেয়ার দুলছে । এইমাত্র কেউ চেয়ার ছেড়ে উঠে গেছে । চেয়ারের সামনের টি টেবিলটায় একটা কফির মগ দেখা যাচ্ছে । তার পাশেই নীল মলাটের একটা বই । বইটা যে হূমায়ুন আহমেদ এর তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই ।

আশেপাশে একটু চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে সে । মানুষজন কাছেধারে খুব একটা নেই । দূরে রাস্তার ওপাশে এক টোকাইকে দেখা যাচ্ছে কাধে একটা প্লাস্টিকের বস্তা নিয়ে টুকিটাকি টোকাচ্ছে । উল্টোদিকের বাড়িটার সামনে একটা কুকুর লেজ উঁচু করে মাথা বুক মাটির সাথে মিশিয়ে শুয়ে আছে । সামনের আগুন্তুককে নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যাথা নেই । মাথাটা একটু উঁচু করে এক পলক দেখেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে গিয়েছে ।

কোনো এক কারণে এটাকেই উপযুক্ত সময় মনে করে সে কাধে গিটার ঝুলিয়ে গান শুরু করে দিলো –

“শ্যাম বালিকা
তুমি জানো কি ?
তোমার জন্য দিতে পারি
আমার এ হৃদয়টি ”

হয়তোবা অনিকের গানের আওয়াজ শুনেই আবার বারান্দায় ফিরে এসেছে শ্যামা । অনিক গানটা শেষ করা পর্যন্ত রেলিং এ ভর দিয়ে দুই গালে দুই হাত রেখে পুরোটা গান শুনে গেছে সে ।

গান শেষ করে শ্যামার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে অনিক বললো – “সুন্দর হয় নাই ?”

শ্যামা কিছু না বলে ভেতরে চলে গেলো । অনিক একটু পর পর উঁকি দিচ্ছে । কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে দোতালার বারান্দা দিয়ে ঘরের ভিতর উঁকি দিয়ে যে কোনো লাভ হবে না তা সে বুঝতেই পারলো না । কিছুক্ষণ পর শ্যামা নিচে নেমে এল ।

অনিক আবারো দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে শ্যামাকে জিজ্ঞেস করলো -“গানটা সুন্দর হয় নাই ?”

শ্যামা কোনো কথা না বলে অনিকের হাতে একটা পিতলের প্লেট হাতে ধরিয়ে দিল ।

-“এইটা কেনো দিলা ?”

শ্যামা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উল্টো ঘুরে পা বাড়ালো ।

-“আরে এই কই যাও ?”

-“উপরে যাচ্ছি । বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলবো ।”

-“আচ্ছা”
অনিক আবারো দাঁত বের করে শ্যামার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল ।

-“মুখ বন্ধ করো প্লিজ । তোমার দাঁতে মাংস আটকে আছে”

অনিক পিতলের প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে । এখন আর ওর দাঁত দেখা যাচ্ছে না । শ্যামাকে বারান্দায় আসতে দেখে একবার দাঁত বের করে হাসি দিয়ে ফেলতে নিয়েছিলো । কিন্তু শেষ মুহুর্তে সে নিজেকে কন্ট্রোল করেছে ।

শ্যামা বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে । কোনো কথা বলছে না । তাই অনিক তৃতীয় বারের মতো আবার প্রশ্নটা করলো –
“গানটা সুন্দর হয় নাই ?”

-“হুম খুব সুন্দর হয়েছে । তাইতো পিতলের প্লেটটা দিলাম তোমাকে । এটা হাতে নিয়ে প্রতিদিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে এই গানটা গাবা । দিনে ইজিলি দুই তিন’শ টাকা ইনকাম করতে পারবা ।”

অনিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো – “আচ্ছা যাই তাহলে আমি”
শ্যামাও অনিককে না বললো না ।

পিতলের প্লেট হাতে অনিক হেটে যাচ্ছে । শ্যামা জানে অনিকের এখন মন খারাপ । সে আজ ইচ্ছে করেই অনিককে এতোগুলো মিথ্যে বলেছে । অনিকের দাঁত দেখানো হাসিটা অসম্ভব সুন্দর । কিন্তু তবুও শ্যামা তাকে এই হাঁসির জন্য কড়া কথা বলে । অনিকের গাওয়া গানগুলোও সত্যিই খুব পছন্দ করে শ্যামা । কিন্তু তবুও কখনো সে অনিকের গানের প্রশংসা করে না । অনিকও তার মিথ্যেগুলোকে সত্য বলে মেনে নেয় । ইচ্ছে করেই শ্যামা অনিককে কষ্ট দেয় । কারণ সে সবসময় এই অনিককেই দেখতে চায় । বাধ্য শিশুর মতো যে সবসময় তার পাশে থাকবে , তার প্রত্যেকটি কথাকে বিশ্বাস করবে ।

তাড়াহুড়ো করে আজ ঘুম থেকে উঠেছে শ্যামা । এতো সকাল পর্যন্ত কীভাবে ঘুমিয়ে ছিলো সেটাই বুঝতে পারছে না সে । আরেকটু দেরি করে উঠলেই আজকের ক্লাসটা মিস করতে হতো । চটজলদি রেডি হয়ে নাস্তা করা ছাড়াই বেরিয়ে পড়লো সে । দশটা পাঁচ বাজে । সাড়ে দশটায় ক্লাস শুরু । তাই রিকশাওয়ালাকে একটু জোড়ে চালাতে বললো শ্যামা । ক্লাসটা কিছুতেই মিস করা যাবে না ।

বড় রাস্তার মোড়টা পেরুনোর সময় একটা ছোটোখাটো জটলার উপর চোখ পড়লো তার । অনেকগুলো টোকাই গোল করে ঘিরে রেখেছে অনিককে । তাদের সবার কাধে বস্তা ঝুলানো । অনিক গিটার হাতে গান গাইছে । পায়ের কাছে শ্যামার দেয়া পিতলের প্লেট ; শূণ্য । দুই একটা রিকশাওয়ালাকে দেখা যাচ্ছে সিটের উপর এক পা তুলে আয়েশ করে গান শুনছে । পরনের লুঙ্গিটা তাদের বিশ্রী রকমভাবে ঝুলে রয়েছে ।

রিকশায় শ্যামার পাশে গা ঘেষে বসে আছে এখন অনিক । কেউ কোনো কথা বলছে না । রিকশার গতিও এখন কম । শ্যামা ক্লাস মিস করেছে । ভিতরে ভিতরে সে রাগে জ্বলছে । নীরবতা ভাঙ্গলো অনিক ।

-“আমাকে ওখান থেকে এভাবে নিয়ে আসলা কেনো ? কত্তোগুলা মানুষ হা করে আমার গান শুনছিলো”

-“ওরা হা করে তোমার গান শুনছিলো না । ওরা হা করে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলো”

-“আমি দেখতে এতোই সুন্দর ?”

-“হুম্ম তুমি দেখতে এতোটাই সুন্দর যে সেখানে টোকাই আর রিকশাওয়ালা ছাড়া আর কেউ ছিলো না ।”

অনিক চুপ হয়ে গেলো । অনেক প্রশংসা শুনে ফেলেছে । এরপর আর কোনো কথা বলার মানে হয় না । শ্যামা রিকশাওয়ালাকে জোড়ে চালাতে বললো । মটর চালিত রিকশা দ্রুত ছুটে চলছে । বাতাসে শ্যামার খোলা চুল উড়ে এসে অনিকের মুখে লাগছে । অনিক সেগুলোকে সরিয়ে দিচ্ছে না । বরং সে শ্যামার সাথে আরেকটু ঘেষে বসেছে । শ্যামাও সরে যায়নি ।

সেদিন অনেক সুন্দর একটা দিন কাটিয়েছিলো ওরা । শরৎ এর নির্মল আকাশের নিচে কাশবনে গা এলিয়ে দিয়েছিলো দুজনেই । সূর্যাস্তের লাল আলোয় নদীর দিগন্ত রেখার দিকে তাকিয়ে পাখিদের উড়ে চলা দেখে কেটে গিয়েছিলো ওদের বিকাল ।

নাক ডাকার শব্দে বাস্তব জগতে ফিরে এলো শ্যামা । মাঝরাতে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় পুরনো স্মৃতিগুলোর ভীড়ে হারিয়ে গিয়েছিলো সে । পাশে নিন্ময় গভীর ঘুমে অচেতন । খানিক পর পর নাক ডেকে যাচ্ছে । ইদানিং ওর নাক ডাকার পরিমাণটা বেড়ে গিয়েছে । শ্যামা হাজার বলেও ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারছে না । “ও কিছু না । সবাই ত নাক ডাকে” এই বলে নিন্ময় শ্যামার আশংকাকে উড়িয়ে দিয়েছে । কিন্তু শ্যামা তবুও জোড় করে । এ মানুষটার কাছে সে ঋণী । অনিকের হঠাৎ করে চলে যাওয়ার পর শ্যামার জীবনে যে কালো অধ্যায়টা নেমে এসেছিলো সেখান থেকে নিন্ময়ই তাকে ফিরিয়ে এনেছে । শ্যামা তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহন করলেও কখনো তাকে ভালোবাসতে পারবে না একথা জানার পরও সে বিয়েতে রাজি হয়েছে । তাদের বিয়ের এতোগুলো বছর পার হয়ে গিয়েছে কিন্তু তবুও একটি বারের জন্যও নিন্ময় শ্যামার কাছে অনিকের কথা জানতে চায়নি । এজন্য শ্যামা নিন্ময়ের কাছে কৃতজ্ঞ । অনিকের কথা জানতে চাইলে হয়তো এতোবছর ধরে বানিয়ে রাখা পাথড় মনটাকে ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করে ফেলতে হতো শ্যামার ।

নিন্ময়ের নাক ডাকার শব্দ আরো বেড়েছে । এখন বোধহয় ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । শ্যামা হাত দিয়ে নিন্ময়কে একটু ধাক্কা দিয়ে ঘুমটা হালকা করানোর চেষ্টা করলো । এতে বোধহয় কাজ হলো । শব্দটা একটু কমেছে । বুকটাও এতো উঠানামা করছে না এখন নিন্ময়ের । শ্যামা মাথার নীচে হাত রেখে একপাশ ফিরে শুলো । হঠাৎ করে কোথা থেকে যেনো একবিন্দু পানি শ্যামার গাল বেয়ে ঠোঁটে গড়িয়ে পরলো । উৎস হিসেবে শ্যামা তার টলটলে চোখ দুটোকেই আবিষ্কার করলো ।

-“আচ্ছা তুমি আমাকে কতোটা ভালোবাস ?”

নদীর পানিতে একটা ঢিল ছুড়ে মেরে অনিকের দিকে ফিরে তাকালো শ্যামা – “আমি তোমাকে ভালোবাসি !! তাই নাকি ?”

-“হুম্ন বাসতো । কতটা ভালোবাসো ওটা জানতে চাচ্ছি ?”

-“বাসি না ভালো আমি তোমাকে”

-“সত্যিই ?”

-“সত্যিই”

অনিক আর কোনো কথা বলছে না । ঘাসের উপর দু’পা ভাজ করে বসে সে এখন ঘাসে হাত বুলাচ্ছে । শ্যামা নদীতে ঢিল ছুড়ে যাচ্ছে একের পর এক । ঢিলগুলো বেশীদূর নিতে পারছে না । নদীটা দেখতে ছোট লাগলেও ঢিলগুলো নদীর তিনভাগের একভাগও পেরুচ্ছে না ।

-“অভিনয় করে হলেও তো বলতে পারো ‘ভালোবাসি’ ”

অনিক শ্যামার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । শ্যামা কিছু বলতে পারছে না । ঢিল হাতে সে অনিকের টলটলে চোখ দুটো দেখছে । ছেলেটার চোখ দুটোতে অসম্ভব মায়া কাজ করছে । শ্যামার ইচ্ছে করছে ঢিলগুলোর মতো ঐ চোখ দুটোতে ডুবে যেতে ।

কর্মব্যস্ততায় কেটেছে সারাদিন শ্যামার । আজ ঈপ্সিতার জন্মদিন । পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে ঈপ্সিতা । বন্ধুদের মাঝে হারিয়ে গিয়েও দূর থেকে যখন মা’র ক্লান্ত দুটো চোখ দেখে তখন সে এসে মাকে বলে -“মা প্রমিস , আমি আর কখনো জন্মদিনের অনুষ্ঠান করবো না”

শ্যামার মন হু হু করে উঠে । পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটির কাছ থেকেও সে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারছে না । ঘরজুড়ে সে সকলের দিকে তাকায় । সবার কাছেই কী সে ধরা পরে যাচ্ছে ? সবাই কী বুঝে যাচ্ছে গতরাত থেকেই সে অনিকের স্মৃতিতে ক্লান্ত হয়ে আছে ? সবাই কী তার মনের কথা পড়তে পারছে ?

রাত অনেক হয়েছে । ঈপ্সিতা ঘুমিয়ে পড়েছে । নিন্ময় বেলকনিতে । পেছন থেকে শ্যামা নিন্ময়কে দেখছে । আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেনো খোঁজার চেষ্টা করছে সে । চাঁদের নীচে মেঘেদের ছুটে চলাতে আলো-ছায়া পরছে নিন্ময়ের মুখের উপর । শ্যামা নিন্ময়ের পাশে এসে দাঁড়ালো । নিন্ময় শ্যামার উপস্থিতি টের পেয়ে ছোট্ট একটা হাসি উপহার দিলো তাকে ।

শ্যামার মন হাহাকার করে উঠলো । কেনো সে অতীতকে ভুলতে পারছে না ? কেনো সে বর্তমানকে আপন করে নিয়ে নিন্ময়কে ভালোবাসতে পারছে না ?

ঘন কাশবনের মাঝ দিয়ে পথ করে হাঁটছে দু’জন । অনিক খানিকটা পিছিয়ে আছে ; শ্যামা সামনে । প্রচন্ড বাতাসে যখন পুরো কাশবন দুলে উঠছে তখন শ্যামার কাছে মনে হচ্ছে সেও বুঝি কাশফুলগুলোর মতোই দুলছে । অনিক কাশফুলগুলোতে হাত বুলিয়ে হাঁটছে । শুভ্রতার কোমলতা তাদেরকে বিমোহিত করছে ।

-“এই শ্যামা”
হঠাৎ করে অনিক শ্যামাকে ডেকে উঠলো ।

-“বলো”

-“আমরা দু’জন এভাবে হাঁটছি কেনো ? তুমি ওখানে আর আমি এখানে । চলো আমরা পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটি”

-“পারবো না । যেভাবে হাঁটছো সেভাবেই হাঁটো”

-“তোমার হাত না ধরে হাঁটলে আমি এখানে হারিয়ে যাবো”

-“হারিয়ে যাও তাহলে । আমার তাতে কী ?”

-“আমি হারিয়ে গেলে তোমার কিছুই না ?”

-“না”

-“তাহলে আমি হারিয়ে যাচ্ছি”

-“যাও”

-“সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছি কিন্তু”

-“যাও । আমি ত না করছি না তোমাকে”

-“দেখো আমি ঠিকই একদিন হারিয়ে যাবো…”

“এই কোথায় হারিয়ে গেলে ?”
শ্যামা আবারো স্মৃতিতে ডুবে গিয়েছিলো । নিন্ময়ের ডাকে তার দিকে ফিরে তাকালো ।

-“না….এইতো চাঁদটা দেখছিলাম । হারাইনি কোথাও”

-“মাটির দিকে তাকিয়ে কেউ চাঁদ দেখতে পারে না শ্যামা !”

-“না…মানে…ইয়ে”

-“তুমি অনিকের কথা ভাবছিলে ? তাইতো ?”

-“হু”
ছোট্ট করে উত্তর দিলো শ্যামা ।

-“আচ্ছা অনেক রাত হয়েছে । বেশি রাত করো না । ঘুমিয়ে পড়ো ।”

শ্যামা প্রচন্ড অবাক হলো নিন্ময়ের কথা শুনে । সে আজ লজ্জিতও । নিন্ময় আজও অনিকের ব্যাপারে কিছুই জানতে চায়নি ! নিজের কৌতূহলকে দমিয়ে রেখে সে কী সাবলিলভাবেই বলে ফেললো “ঘুমিয়ে পড়ো” ! আর এই মানুষটাকেই কিনা সে প্রত্যেকটি দিন ঠকিয়ে আসছে । এই মানুষটিকে ভালো না বেসে সে এখনও তার অতীতকে নিয়ে পড়ে আছে ।

নিন্ময় বেলকনি থেকে চলে যাচ্ছে । তার চলার পথে চেয়ে শ্যামার চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পরছে । মেঘদলের ছুটোছুটিতে রাতের ঐ আলো ছায়ার খেলায় শ্যামার সে অশ্রু নিন্ময় পেছন ফিরে দেখেনি ।

অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছে । শ্যামার মাথায় এখন দুই একটা পাকা চুল দেখা যায় মাঝে মাঝে । বয়স বাড়ার সাথে সাথে অনিকের স্মৃতিগুলোও তাকে খুব একটা নাড়া দেয় না এখন আর । ঈপ্সিতা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে । নিন্ময়ও আগের মতোই আছে । এখনও ঘুমালে নাক ডাকে । শ্যামা সারাদিন ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে । ঈপ্সিতার পড়াশুনার ব্যাপারটাও তাকেই দেখতে হয় । অতীত রোমন্থন করার সময় এখন কোথায় ? তবুও শ্যামাকে এখনও মাঝে মাঝে বিষন্নভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় ।

আজ সকাল থেকেই শ্যামা খুব ব্যস্ত । নিন্ময়ের কলেজ জীবনের বন্ধু আসবে বাসায় । নিন্ময়ের কাছে কখনো এ বন্ধুটির কথা শোনেনি শ্যামা । নিন্ময় শুধু বলেছে ভার্সিটিতে দু’বছর পড়ার পর হঠাৎ করে বিদেশে চলে গিয়েছিলো সে । এতো বছর কোনো যোগাযোগ হয়নি তাদের । আপনজন কেউ নেই তাই নিন্ময়ের বন্ধুটির এতোগুলো বছরে একবারের জন্যও আসা হয়নি দেশে । সেদিন হঠাৎ করেই নিন্ময় ফেসবুকে খুঁজে পায় তাকে । নিন্ময়ের সাথে যোগাযোগ হবার পরই দেশে একবার বেড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে ।

রান্না বান্না শেষ করে এখন রেডি হচ্ছে শ্যামা । যতরকমের বাঙ্গালী খাবার রান্না করতে জানে সবগুলোই রেঁধেছে সে । এখন সে বাঙ্গালী গৃহিণী সাজতে ব্যস্ত । নিন্ময় হঠাৎ ফোন করে জানিয়েছে অফিসের কাজে আটকে পড়েছে সে । তাই শ্যামাকেই এয়ারপোর্ট যেতে হবে তার বন্ধুকে রিসিভ করার জন্যে ।

তৈরী হয়ে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা বড় স্বচ্ছ আয়নাটায় নিজেকে দেখছে শ্যামা । এতো সাজার কী দরকার ছিলো তাই বুঝে উঠতে পারছে না সে ! যত্ন করে সবুজ শাড়িটা পড়েছে । অনেক বছর পর আজ শাড়ি পড়েছে শ্যামা । বিয়ের সময় এ শাড়িটা গিফ্ট পেয়েছিলো । কিন্তু অন্যান্য গিফ্টগুলোর মতো এটাতে কোনো নাম লিখা ছিলো না । তাই বেওয়ারিশ গিফ্ট হিসেবে ফেলে রেখেছিলো এ শাড়িটাকে । আজ হঠাৎ আলমারির এক কোণে শাড়িটার উপর চোখ পড়তেই এটাই পড়তে ইচ্ছে হলো তার । শাড়ি পড়ে চোখে কাজল দিয়ে কপালে ছোট্ট একটা টিপ পড়েছে শ্যামা । এতোই ছোট যে টিপের রংটাও ঠিকভাবে বোঝা যাচ্ছে না ।
আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছে শ্যামা । কেউ দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস করবে না যে তার বয়স এখন ত্রিশ পেরিয়েছে ।

গাড়ির জানালা বেয়ে তীব্র বাতাসের ঝাপটা লাগছে শ্যামার মুখে । চুলগুলো খোপা করে বাঁধা । তাই সেগুলো মুক্তভাবে উড়তে পারছে না । কিন্তু মনটা ঠিকই মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে চলেছে । শ্যামা আবারো হারিয়ে যাচ্ছে বর্তমান থেকে অনেক দূরে ; ফেলে আসা অতীতে ।

বড় ডালপালা দিয়ে ঢাকা গাছটার নিচে বসে রয়েছে শ্যামা আর অনিক । শ্যামার হাতে মেহেদি টিউব । সে হাতে মেহেদি দিয়ে নকশা করছে । অনিক তার পাশে টিস্যু হাতে বসে রয়েছে । একটু এদিক ওদিক হলেই সে টিস্যু দিয়ে আলতো করে মুছে দিচ্ছে শ্যামার হাত । কিন্তু এ কাজটাতে অনিক বিরক্ত । এতোদিন পর দেখা হয়েছে কিন্তু শ্যামা তার সাথে কথা না বলে হাতে মেহেদি লাগাতে ব্যস্ত । তাকেও বসিয়ে রেখেছে টিস্যু বক্স হাতে ।

-“এভাবেই কী চলতে থাকবে ?”

-“কী এভাবেই চলতে থাকবে ?”

-“এই যে তুমি হাতের মধ্যে কীসব হাবিজাবি আঁকছো । এভাবেই চলতে থাকবে ?”

-“হাবিজাবি আঁকছি না । মেহেদি দিচ্ছি হাতে । একধরনের রূপচর্চা”

-“এইটা এখন করার কী দরকার পরলো ? বাসায় গিয়েও ত করতে পারো”

-“নাহ বাসায় অনেক কাজ । আর তাছাড়া বাসায় ত তোমার মতো কাউকে পাবো না যে আমার জন্য টিস্যু বক্স হাতে নিয়ে বসে থাকবে”

-“না এভাবে কিছুতেই চলতে পারে না”
এই বলেই অনিক শ্যামার হাতে লাগানো মেহেদি বিচ্ছিরি রকমভাবে লেপ্টে দিলো । তারপর বিড়ালের মতো পিটপিট চোখে তাকিয়ে থাকলো শ্যামার দিকে ।

-“এইটা কী করলা তুমি ?” রাগত স্বরে চিৎকার করে উঠলো শ্যামা ।

“ম্যাডাম এয়ারপোর্ট চইলা আসছি”
সামনে তাকিয়ে দেখলো ড্রাইভার তার দিকে তাকিয়ে আছে । আপন মনেই পুরনো কথা ভেবে হাসছিলো শ্যামা । হঠাৎ করেই তার ঠোটের কোণ থেকে হাসিটা উবে গেলো ।

বহুবছর পর দেশের মাটিতে পা রেখেছে অনিক । একটা কষ্ট মেশানো আনন্দের অনুভূতি ছুয়ে যাচ্ছে তাকে । কিন্তু ভয় হচ্ছে প্রচন্ড । এতোগুলো বছর পর তাকে আবার শ্যামার সামনে দাঁড়াতে হবে । শ্যামা কী তাকে চিনতে পারবে ? চিনলে কী বলবে সে শ্যামাকে ? কেনো পালিয়ে গিয়েছিলো তা তো সে নিজেই জানে না !

পাশের ঘরে নিন্ময় তার ছোটোবেলার বন্ধুর সাথে গল্প করছে । শ্যামা দাঁড়িয়ে আছে বেলকনিতে । আজ এতোগুলো বছর পর শ্যামা তার উত্তর পেয়েছে । নিন্ময় কেনো অনিকের কোনো কথা জানতে চায়নি তা আজ শ্যামা জানে । সবুজ রংএর শাড়িটাতে কেনো নাম লিখা ছিলো তাও সে জানে । শুধু পাশের ঘরে বসে থাকা অনিক জানতে পারেনি শ্যামা তাকে আজ চিনতে পেরেছে ।

৬ thoughts on “সমাপ্ত বন্ধুতা


  1. “শ্যাম বালিকা
    তুমি জানো কি

    “শ্যাম বালিকা
    তুমি জানো কি ?
    তোমার জন্য দিতে পারি
    আমার এ হৃদয়টি “

    রুমির এই গানটা আমার এখনো জোস লাগে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *