বাংলার মাটিতে বারবার ঘুরে ফিরে আসে পলাশীর প্রান্তরে উড়া ভয়াল শকুনেরা

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন বাংলা থেকে শুরু হয়েছে কথাটা একদম ভুল। এটা আসলে ইতিহাসের প্রতি আমাদের একটা গড়পড়তা মিস জাজমেন্ট। ভারতে ব্রিটিশদের দৌরাত্ম শুরু ১৭৪৮ সাল থেকে যেদিন ফ্রেঞ্চরা ইউরোপের যুদ্ধ ভারতের মাটিতে টেনে এনে ইংরেজদের ঘাঁটি মাদ্রাজ আক্রমন করে দখল করে নেয়। দুর্বল ব্রিটিশরা আশ্রয় খুঁজা শুরু করলো। কর্নাটকের নবাব আনোয়ারুদ্দিন মোহাম্মদ খান গোটা কয়েক গোরা মেয়ে উপঢৌকন পেয়ে ইংরেজদের পক্ষ অবলাম্বন করলেন। এইখানে অবশ্য একটা পুরাতন হিসাব ছিল। ফ্রেঞ্চরা নাকি কবে তার বানিজ্যিক জাহাজ ডুবায়ে দিছিলো। যদিও এ ধরনের কাজকর্মের জন্য তখন পর্তুগীজ দস্যুরা বিখ্যাত ছিল এবং ফ্রেঞ্চরা এ ধরনের অভিযোগকে অস্বীকারও করেছিল। ইংরেজ এবং কর্নাটকের নবাবের যৌথ বাহিনী মাদ্রাজ আক্রমন করেন। তাদের সেনাবাহিনীর বিশাল আকার নিয়েও ফ্রেঞ্চদের কাছে শোচনীয় পরাজয় বরন করে। কোনভাবে মাদ্রাজ দখল করতে না পেরে অবশেষে উত্তর আমেরিকার লুইসবার্গ আর ক্যাপে ব্রেটন দ্বীপের বিনিময়ে ফের দখল নেয় ব্রিটিশরা। বিনিময় চুক্তিতে আরো উল্লেখ ছিল, কেউ কারো ব্যাবসা বানিজ্যে বাগড়া দিতে পারবে না। কিন্তু একে অন্যের জাত শত্রু হলে যা হয় একে অন্যর্কে খোঁচানো অব্যাহত রেখেছিল। কিন্তু সরাসরি না, একটু কৌশলে। নিজেদের শক্তি পুরোপুরি অক্ষুন্ন রেখে।

১৭৫০ এবং ১৭৫১ এর মাঝামাঝি সময়ে হায়দ্রাবাদের বৃদ্ধ নিজাম এবং কর্নাটকের নবাব মারা যান। ব্রিটিশ এবং ফ্রেঞ্চ দু-পক্ষই তাদের পছন্দের ব্যাক্তিকে মুকুট পরাতে রীতিমত যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অনেক রক্তক্ষয়, গুপ্তহত্যার পরে মনোনীত ব্যাক্তিরা ক্ষমতা দখলেে সফল হলেও ততক্ষনে মূল ক্ষমতা সাদা চামড়াদের হা্তে। বিশেষতঃ ইংরেজদের পকেটে। যুদ্ধে প্রাপ্ত ক্ষতিপুরন, লাভ আর ব্যাবসায়িক সুবিধা দিয়ে অন্যদের দক্ষিন ভারত থেকে প্রায় খেদিয়ে একচেটিয়া অর্থ আর প্রতিপত্তি অর্জন করতে শুরু করে তারা।

১৭৫৬ সালের এপ্রিলের কোন এক রৌদ্রজ্জ্বল দিনে বাংলার ক্ষমতা দখল করেন আলীবর্দী খাঁ। মারাঠারা বাংলা আক্রমন করলে তিনি ফ্রেঞ্চ এবং ব্রিটিশ দুপক্ষের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ নেন, বিনিময়ে তাদের দুর্গ তৈরী করার অনুমতি দান করেন। অপরদিকে একইসাথে দক্ষিন ভারতের রাজনীতিতে নবাব এবং নিজামের কাঠের পুতুল বনে যাবার পরিনতি তার চোখ এড়ায়নি। তাই তাদের আধিপত্যের ব্যাপারে উৎকণ্ঠিত ছিলেন। একই অবস্থা যেন বাংলায় না ঘটে সে ব্যাপারে সর্বদা চোখ কান খোলা রাখতেন। ফ্রেঞ্চরা অল্পতে তুষ্ট থাকলেও ব্রিটিশরা চরমভাবে অসন্তুষ্ট ছিল। তারা মনে করতো মুঘল সম্রাট ফররুখ শিয়রের ১৭১৭ সালের ফরমান অনুযায়ী পরিপুর্ন সুযোগ সুবিধা বাংলার নবাব দিচ্ছেন না। এ ব্যাপারে কয়েকবার দিল্লীর দরবারে নালিশ গড়ালেও আলীবর্দী খাঁ পাত্তা দেন নাই।

ঝামেলা শুরু হলো সিরাজের সময়ে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দুরদর্শিতার চরম অভাব ছিল তার। অকারনে বাজে ব্যাবহার করে ফাও শত্রু বানাতে তার জুড়ি ছিল না। দুর্ভাগ্যের সেরের উপরে সোয়াসের হিসেবে আলীবর্দী খাঁ এর অন্য দুই কন্যার স্বামী এবং পুত্র নবাব সিরাজের উপরে একদমই প্রসন্ন ছিলেন না। পারিবারিক গন্ডগোল সামাল দিতে সিরাজকে যুদ্ধে জড়াতে হলো আপন খালাতো ভাই শওকত জং এর সাথে। যুদ্ধ বিজয় সম্পন্ন না হতেই টের পেলেন ব্রিটিশ এবং ফ্রেঞ্চদের লড়াইয়ের ক্ষেত্র এবার বাংলা হতে যাচ্ছে। ইউরোপে আবার ফ্রান্স-ব্রিটেন যুদ্ধের রনদামামা বাজছে। নিজ দেশে এর প্রভাব এড়াতে কড়াকড়ি আদেশ দিলেন দুর্গ বানানো বন্ধ করতে। ফ্রেঞ্চরা আধা দুর্গ বানায়ে হতদ্যম হয়ে নির্দেশ পালন করলো কিন্তু ইংরেজরা বন্ধ করলো না। রীতিমত ঔদ্ধ্বত্ব দেখাতে শুরু করলো। এর জোর যতটা না ছিল সামরিক এর চাইতে বহুগুনে বেশী অর্থনৈতিক। আজকের ইসলামী ব্যাংকের মত আর কি। জবাবে প্রাথমিকভাবে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের দখল নবাব নিলেও কিছুদিনের মধ্যে তা বিপুল অর্থের বিনিময়ে বেদখল হয়ে যায়। ১০ হাজারের মত সৈন্য নিয়ে ১৫০০ সৈন্যের আক্রমনে নবাবের সেনাপতি এমন উর্ধশ্বাসে পালিয়ে যান যেন আধুনিক এফ-১৬ বিমান দিয়ে সেখানে হামলা করা হয়েছে। বিপুল পরিমান অস্র কামান এবং রসদের ভান্ডার উদ্ধার করে এই যুদ্ধে বেশ ভাল লাভবান হয় ব্রিটিশরা।

এই সামান্য যুদ্ধ পরাজয় নবাবের পরিবারে ঘাপটি মেরে থাকা শত্রুদের সুযোগ মেলে দেয়। ঘষেটি বেগম নিজ উদ্যোগে ইংরেজদের সাথে যোগাযোগ করেন। একমাত্র পুত্র সিরাজের হাতে যুদ্ধে মারা যাওয়ায় তার কোন উত্তরাধিকার অবশিষ্ট ছিল না। আলীবর্দী খাঁ এর অপর জামাতা মীর জাফরকে একান্তে ডেকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব হবার প্রস্তাব দেন। শুরু থেকে সিরাজের ভাগ্যের উপরে ক্ষিপ্ত মীরজাফর এক বাক্যে রাজি হয়ে যান। এত কিছুর পরেও বাংলার স্বাধীনতার সুর্য অস্ত যেত না যদি টাকার কাছে বিক্রি না হতেন ইয়ার লুতুফ খান, রায় দুর্লভেরা। অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে কিনে নেয়া হয়েছিল রাজ ক্ষমতায় প্রভাব রাখা ব্যাবসায়ীবৃন্দ যেমন- জগতশেঠ, উমিচাঁদ প্রমুখেরা। এক মীর জাফরের অধীনে পলাশীর প্রান্তরে ঠায় দাঁড়িয়েছিল ৩৫ হাজার পদাতিক এবং ১৫ হাজার অশ্বারহী সেনা। সেদিন যুদ্ধ করেছিল মোহনলাল এবং মীর মদনের অধীনে থাকা মাত্র ৭ হাজার সেনা। তাও পুরোপুরি পারেনি মীর জাফরদের চক্রান্তে।

নবাব সিরাজকে বারবার তার সৌভাগ্য কামনাকারীদের দ্বারা সাবধান করা হয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যাপারে। তিনি চাইলেই মীর জাফরকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারতেন কিংবা জগত শেঠের হুগলি নদী দিয়ে পাঠানো বিনে পয়সার রসদ ইংরেজদের কাছে পৌছানোর ব্যাবস্থা করার আগেই আটকে দিতে পারতেন। মীরজাফর, জগত শেঠদের মিষ্ট কথায় তুষ্ট হয়ে বাংলার স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছিলেন তরুন নবাব সিরাজউদ্দোলা।

আজকে জামাতের ব্যাপারেও একই কথা বার বার নানা ভাবে বলা হচ্ছে। সরকারের কেউ কর্নপাত করছে না। কোন সব ষড়যন্ত্রকারীদের মিষ্ট কথায় মজে আছে তারাই ভালো জানেন। তবে মীরজাফরেরা ক্ষমতার গন্ধে মাতোয়ারা। ইসলামী ব্যাংকের টাকায় বিক্রি হচ্ছে রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ খাঁ এর মত চক্রান্তকারীরা। শুধু সিরাজের যাবার জায়গা নেই। ইতিহাসের দুঃখ, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

১০ thoughts on “বাংলার মাটিতে বারবার ঘুরে ফিরে আসে পলাশীর প্রান্তরে উড়া ভয়াল শকুনেরা

  1. এটাই নির্মম সত্য, ইতিহাস থেকে
    এটাই নির্মম সত্য, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। তবে আওয়ামীলীগ বর্তমানে যে ফাঁদে পা দিয়েছে, তাদের অবস্থা সিরাজ থেকেও মর্মান্তিক হবে।

    1. তবে আওয়ামীলীগ বর্তমানে যে

      তবে আওয়ামীলীগ বর্তমানে যে ফাঁদে পা দিয়েছে, তাদের অবস্থা সিরাজ থেকেও মর্মান্তিক হবে।

      মনে হয় ২০২১ সালের আগে তাগো কিছুই হইবোনা। দেশ ও গণতন্ত্র বিরোধী মাস্টারপ্ল্যান আছেনা তাদের… :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

  2. আজকে জামাতের ব্যাপারেও একই

    আজকে জামাতের ব্যাপারেও একই কথা বার বার নানা ভাবে বলা হচ্ছে। সরকারের কেউ কর্নপাত করছে না। কোন সব ষড়যন্ত্রকারীদের মিষ্ট কথায় মজে আছে তারাই ভালো জানেন। তবে মীরজাফরেরা ক্ষমতার গন্ধে মাতোয়ারা। ইসলামী ব্যাংকের টাকায় বিক্রি হচ্ছে রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ খাঁ এর মত চক্রান্তকারীরা। শুধু সিরাজের যাবার জায়গা নেই। ইতিহাসের দুঃখ, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

    পুরোপুরি সহমত। আওয়ামীলীগ এই জাতিকে চরম এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

  3. ঠিক বলেছেন। বর্তমান
    ঠিক বলেছেন। বর্তমান আওয়ামীলীগে খন্দকার মোস্তাক আর মীর জাফরে ভরে গেছে। ইতিহাস থেকে এই দলটি কখনই শিক্ষা নেয় নি। মাশুল কড়া-গন্ডায় দিতে হবে। আপসুস হচ্ছে এই মাশুল শুধু আওয়ামীলীগ না, গোটা জাতিকে দিতে হবে।

    1. মতি কাকু দিলে তখন আওয়ামী
      মতি কাকু দিলে তখন আওয়ামী গোষ্টি মতি কাকুকে নিয়ে হরিলুট খেলত। আপনি খেয়াল করে দেখছেন, অনলাইনে আওয়ামী এক্টিভিস্ট এই বিষয়ে মুখে তালা লাগিয়ে রেখেছে।

  4. ইংরেজরা ২০০ বছর শাসন করে
    ইংরেজরা ২০০ বছর শাসন করে গেছে।এবার জামাত কতদিন করে তাই দেখার!সামনে বড়ই দুঃসময়!

    1. জামাত কখনোই ক্ষমতায় আসতে
      জামাত কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবেনা। বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক দলকেই পছন্দ করে। কোন ধর্মীয় লেবসধারী দলকে নয়। জামাতকে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি চান্স না দিলে এদের ভাত নাই।

      তাই, জামাত নিয়ে ভয়, আমার দৃষ্টিতে কিছুটা অমূলক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *