ডিজিটাল ভালো-বাসা খেলা আর কিছু বেদনা

আমি প্রতিনিয়িত মানুষের ভালোবাসা (!) দেখি। এই ভালোবাসা শুরু হয় মোবাইল অপারেটরের পিক আওয়ার থেকে, – জানপাখি ঘুমিয়েছো? ভাত খেয়েছো ? গভীর রাতে কেউ ভাত খাওয়ার কথা কেন জিজ্ঞেস করে আমার মাথায় আসে না। যাই হোক। সকালে একগাদা টেক্সট মেসেজ বা ক্ষুদে বার্তা আসে। একগাদা আবেগ নিয়ে – পাখি ঘুম থেকে উঠেছো? দিন যায় কেএফসি বিএফসির চিকেন সাবাড় করে, আর শপিং মলের দোকান খালি করে। সাথে জানপাখির সখা আড়ালে করা আর্তনাদ – আমার পকেট ফক্কা! সামনে কেউ কিছু বলে না। পাখির শপিং নিয়ে তার লোক দেখানো আনন্দের কোন সীমা থাকে না। এরপর ফেসবুকে প্রতিনিয়ত হ্যাশট্যাগ , ট্যাগ দিয়ে মানুষকে দেখানো – লাইলি মজনু , রোমিও জুলিয়েট তো ভুয়া! দেখো সবাই দেখো আমরা একে অপরকে এত্তগুলা ভালোবাসি! হায় ভালোবাসা! অবাক ভালোবাসা। সবই তরতর করে এগিয়ে চলে। হঠাৎ এক সুন্দর সকালে / বিকালে / রাতে / সন্ধ্যায় ছন্দপতন হয়, এবং, সাথে সাথে, ফেসবুকে, সেল ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে পাখি / সখার নাম বদলে যায়। নতুন প্রেমের আখ্যান শুরু হবার আগেই লেখকের কলমের কালি শুকিয়ে যায়।

তোমার কাঁধে মাথা রেখে জরিনা যখন আগামীর সুন্দর স্বপ্ন বুনে, তখন তোমার নজর থাকে সখিনার জিরো ফিগার দেহের দিকে। আবার তুমি যখন রবার্ট ব্রুসের মাকড়সার মতন স্বপ্নের জাল বুনো, তখন তোমার পাখি ভাবে তোমার ওয়ালেট এত হাল্কা কেন?
অবাক ভালোবাসা!

তোমার ভালোবাসা কয়েকটা টেক্সট, শপিং, আউটিং আর কিছু ঘোর লাগার মধ্যেই শেষ। তাতে তোমাদের কিছু যায় আসে না। কারণ তোমাদের কাছে এইটা কিছুই না। কিন্তু সেই মানুষগুলো, যাদের বিশ্বাস ভেঙে যায়, অনেক যত্নে গড়া বিশ্বাস, তাদের কাছে অবশ্যই বিশাল ব্যাপার। তাদের অনুভূতি তুমি বুঝবে না। কারণ এই অনুভূতি কিছু লুতুপুতু স্ট্যাটাস, কিছু টেক্সট আর আউটিং এ তৈরি হয় না। আজকে তুমি জানপাখি বলতে অজ্ঞান? জানপাখির বিপদের সময় তো তোমাকে ফ্লাডলাইট দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবার আগেই চম্পট দিবে।

কখনো সেই মেয়ে বা ছেলেটার কথা ভেবে দেখেছো, যাকে তুমি একগাদা রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে ভেলায় চড়িয়েছিলে? এরপর মাঝ দরিয়ায় ভেলার মাঝে তাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিলে? কখনো ভেবে দেখেছো তার বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা কতটা প্রবল? ক্ষতটা কতটা গভীর? তুমি ভাবোনি। কারণ তুমি তখন আরেক ভেলা ভাসানোর চিন্তায় ব্যস্ত । সাগরে ঢিল ছোঁড়া বেশ সহজ, কিন্তু কেউ ভাবেনা সেই ঢিলটা কত গভীরে গিয়ে পৌঁছাবে।

এই বিশ্বাসভঙ্গ নামের জিনিসটাকে আমি প্রচণ্ড ভয় পাই। কাছের মানুষগুলোকে , দূরের মানুষগুলোকে কম মূল্য দিতে দেখিনি এর জন্য। কাছের মানুষের টা মনে বেশি বাজে। বোবার মতন তাকিয়ে শুধু তাদের পরিণতিই দেখতে হয়েছে। অসাড়, হতবিহবল হয়ে দেখেছি শুধু। তাদের জন্য কিছু করতে পারিনি। আমার ব্যর্থতা আমি কিছু করতে পারিনি।

এসব দিয়ে তোমার কিছুই আসে যায় না। প্রিয় সানশাইন যেমন বলে, সব লোক দেখানো, তোমার অবস্থা তাই । তোমার কিছুই যায় আসেনা। কারো বিশ্বাস ভাঙলেই কি আর আস্ত থাকলেই বা কি! তুমি থোড়াই পরোয়া কর তাতে! তোমার সমস্ত চিন্তা তো জিরো ফিগার আর ওয়ালেটে । এসব ভাবার সময় কি তোমার আছে?

আমি প্রাচীন যুগের মানুষ তো, তাই তোমাদের এই ডিজিটাল ভালোবাসা বুঝার ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনটাই আমার নেই। আমার যুগের মানুষেরা বিশ্বাস, ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা এই ব্যাপারগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতো তাই, তাই আমিও দেই, এখন এতে যদি তুমি বলো , ডিউড ইউ আ’ সো ব্যাকডেটেড ! – হতে পারি। কারও বিশ্বাস ভাঙার মতন পাপ করার চাইতে ব্যাকডেটেড হওয়া ভালো।

কাউকে সত্যিই ভালোবাসো? ভালোবাসাটা যেন আফিমের নেশার মতন না হয় যে ঘোর কাটলেই শেষ। কাউকে যদি ভালোবাসো, সেই ভালোবাসা আর বিশ্বাসের মূল্য রেখো। আর না রাখলে, তোমরা ডিজিটাল মানুষ। আমাদের মতন অ্যানালগ অনুভূতি কি আর তোমাদের আছে নাকি? যাক বাবারা, মায়েরা আমি তোমাদের প্রণাম করি। তোমরা তোমাদের মতন ভালোবাসা (!) নামক টার্ন বেজড গেম খেলে যাও। শান্তিতে খেলে যাও, কিন্তু, যারা খেলতে চায় না, তাদের জোর করে খেলায় নামিয়ে দিয়ো না। তারা তোমাদের মতন গণ্ডারের চামড়া নিয়ে জন্মায়নি, তাদের মন অনেক নরম, তারা সইতে পারবে না। বাঁচাতে না পারো, অন্তত কাউকে মেরে ফেলো না। কারণ তোমার কাছে শরীর মূখ্য। তাদের কাছে মন, বিশ্বাস, অনুভূতি এগুলোই সব।

৪ thoughts on “ডিজিটাল ভালো-বাসা খেলা আর কিছু বেদনা

  1. বাঁচাতে না পারো, অন্তত কাউকে

    বাঁচাতে না পারো, অন্তত কাউকে মেরে ফেলো না। কারণ তোমার কাছে শরীর মূখ্য। তাদের কাছে মন, বিশ্বাস, অনুভূতি এগুলোই সব।

    :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *