“আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব” (দ্বিতীয় পর্ব)

তারাও ছিল। গোয়েন্দা বিভাগের চাকুরে মাহমুদের কথাগুলো তেমনই ছিল- “যাকগে আমাদের ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। কর্তারা যা করার করবে। যদি বলে ধরো, ধরব। যদি বলে ছাড়ো, ছাড়ব। যদি বলে মারো, মারব। আমাদের কি ভাই, টাকা পাই-চাকরি করি।”


তারাও ছিল। গোয়েন্দা বিভাগের চাকুরে মাহমুদের কথাগুলো তেমনই ছিল- “যাকগে আমাদের ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। কর্তারা যা করার করবে। যদি বলে ধরো, ধরব। যদি বলে ছাড়ো, ছাড়ব। যদি বলে মারো, মারব। আমাদের কি ভাই, টাকা পাই-চাকরি করি।”

ক্ষুধার রাজ্যে সবাই দাস। দুটো পয়সা মাইনের জন্য, দুটো টাকার জন্য, কেউ আরাম কেদারায় গা তা এলিয়ে দেবার জন্য, কেউবা ঘরের মানুষকে সুখ দেয়ার জন্য। কিন্তু “আরেক ফাল্গুনের” সেই তরুনেরা কারো দাস ছিল না। তারা চেয়েছিল দাসত্বের বাঁধন থেকে মুক্ত হতে, নিজেকে এবং অন্যকে মুক্ত করতে। দাসত্বের বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় তারা সেদিন দেখিয়ে দিয়েছিল। সেই ফাল্গুনে। এমনিই একদল প্রতিবাদী, কর্মঠ যুবক-যুবতীর কথা আছে এই উপন্যাসে। কেউ রাত জেগে রান্না করে প্রতিবাদী মানুষগুলোর জন্য, কেয় আন্দোলনের স্বার্থে রাত জেগে দেয়াল পত্রিকা লেখে, কেউবা দৌড়াদৌড়ি করে এ প্রেস থেকে ও প্রেস, মধুর ক্যান্টিন থেকে আরমানিটোলা। ক্লান্তির কথা কারো মাথায় নেই, ছিলও না। অতো ফুসরত কই।
শুধু কি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার গল্পই আছে আরেক ফাল্গুনে? না, তা নয়। সুকৌশলে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ‘৫২ এর দিনগুলোর কথা এনেছেন ফাঁকে ফাঁকে। নিঝুম রাতে হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে যেভাবে রাত জাগা পাখি ডেকে উঠে, সেভাবে।
“কেউ বললো, অমান্য কর।
কেউ বললো, অমান্য করো না।
অবশেষে ঠিক হল, দশজন করে একসাথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে ওরা। দল বেঁধে জেলে যাবে তবু তাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে দেবে না।

জহির রায়হান ছিলেন একজন সমাজ সচেতন কথা সাহিত্যিক। একাধারে তিনি ছিলেন সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী। তার লেখার মাঝেই তার রাজনৈতিক ছায়াটা বুঝতে পারা সম্ভব। হয়ত রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় ছিলেন বলেই রাজনীতিটাকে সুন্দরভাবে হেসে খেলে একটা সাহিত্যে রূপ দিতে পেরেছেন। আমাদের চলচ্চিত্রের জগতে তাঁর অনেক অবদান। “জীবন থেকে নেয়া”, “স্টপ জেনোসাইড” কিংবা “লেট দেয়ার বি লাইট” প্রভৃতি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
শুধু ইতিহাস কিংবা আন্দোলন নয়, কখনো কখনো মানব প্রেমকেও সামনে তুকে এনেছেন। প্রেমিকার নিষ্ঠুর ভালবাসা দেখিয়ে বাণী পৌছে দিয়েছেন। শহীদ স্মৃতির জন্য ব্যস্ত থাকা মুনিমকে লেখা ডলির পত্রটি তেমনি ছিল- “তুমি উত্তর মেরুর মানুষ, আমি দক্ষিণ মেরুর।
ভেবে দেখলাম তোমাতে আমাতে মিলন সম্ভব নয়। তাই বজলেকে গ্রহণ করলাম। ওকে আমি ভালবাসিনি কোন দিন। তবু একই মেরুর মানুষ তো, খাপ খাইয়ে নিতে পারব। তুমিও পারবে আশা করি।”
ভালবাসার ব্যর্থতা নিয়ে সেদিনের সেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তরুণরা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায়নি। ভাষা শহীদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে রাজপথ খামচে তারা যেভাবে নেমেছিল সেখান থেকে একবিন্দু সরে দাঁড়ায়নি। তারা বরাবর প্রতিবাদ করে গেছে। কোন হুমকি, ভয়-ভীতির কাছে মাথা নত করেনি। তাদের উপর একের পর এক আঘাত এসেছে। শেষ পর্যন্ত তাঁদের উপর হামলা করেছে শাসক শ্রেণি ও তাঁদের প্রতিভূ পুলিশ বাহিনী। হামলা চালিয়েছে, লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে, টিয়ার শে’ল্ল মেরেছে, গুলি ছুড়েছে। তবুও আন্দোলন দমানো যায় নি।

পুরো একটা আন্দোলনকে খুব ছোট্ট করে দুই মলাটে এভাবে আবদ্ধ করা একমাত্র জহির রায়হানের পক্ষেই সম্ভব। বর্তমান শাসক গোষ্ঠির এই শোষণের যুগে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার রূপরেখা হতে পারে “আরেক ফাল্গুন।” বানিয়ে বলা কোন কথা নয়, এটা উপলদ্ধি। যেভাবে হঠাৎ করে জহির রায়হান আরেক ফাল্গুনের গল্প বলা শুরু করেছিলেন, সেভাবেই এই গল্পের শেষ করেছেন। তাই বলে সংগ্রাম শেষ হয়ে যায় নি। তাঁর লেখাকেই শেষ করেছেন মাত্র। এই ফাল্গুনের গল্প তথা সংগ্রাম যে শেষ হবার নয় তা তিনি এই উপন্যাসেই বলেছেন, “নাম ডাকতে ডাকতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন জেলার সাহেব। একসময় বিরক্তির সাথে বললেন, উহু, এত ছেলেকে জায়গা দেব কোথায়? জেলখানা তো এমনিতে ভর্তি হয়ে আছে।
ওর কথা শুনে কবি রসূল চিৎকার করে উঠলো, “জেলখানা আরো বাড়ান সাহেব। এত ছোট জেলখানায় হবে না।” আর একজন বললো, “এতেই ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো।”

শেষ

১ thought on ““আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব” (দ্বিতীয় পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *