নির্ঝরের স্বপ্ন

রাফ খাতার সাদা পৃষ্ঠাটা কালো কালির একের পর এক দাগে ক্ষত বিক্ষত হয়ে উঠছে। দাগ বললে ভুল হবে। একদিন পরেই দিন ম্যাথ ফার্স্ট পার্ট পরীক্ষা। তাও যেনতেন পরীক্ষা নয়। বোর্ড পরীক্ষা। এ প্লাস না পেলে রফাদফা অবস্থা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির বাছাইয়ে অনেক পিছিয়ে যেতে হবে। তাই শুধু রেজাল্ট করলেই হবে না । সবগুলোতে জিপিএ ৫ রাখতেই হবে। ভালো কোথাও সুযোগ পেতে হবে, প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।


রাফ খাতার সাদা পৃষ্ঠাটা কালো কালির একের পর এক দাগে ক্ষত বিক্ষত হয়ে উঠছে। দাগ বললে ভুল হবে। একদিন পরেই দিন ম্যাথ ফার্স্ট পার্ট পরীক্ষা। তাও যেনতেন পরীক্ষা নয়। বোর্ড পরীক্ষা। এ প্লাস না পেলে রফাদফা অবস্থা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির বাছাইয়ে অনেক পিছিয়ে যেতে হবে। তাই শুধু রেজাল্ট করলেই হবে না । সবগুলোতে জিপিএ ৫ রাখতেই হবে। ভালো কোথাও সুযোগ পেতে হবে, প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

একে তো পরীক্ষার চাপ। তার ওপর এইটা ! উফ ! নির্ঝরের মাথা ফেটে পড়ছে একের পড় এক চিন্তায়। জোর করে খাতার উপরেরর আঁকিবুঁকির ওপর নজর দিলো সে – এই শেষ চ্যাপ্টার। এটা হলেই শেষ ! কফির কাপে হাত দিয়ে বুঝলো, কফি শেষ। এইটুকু কফি যে ঘরে এসেছে তাও নির্ঝরের পরীক্ষার কল্যাণে। এই দুর্মূল্যের বাজারে ঘরে কফি রাখাও বিলাসিতা।

রাত বাজে একটা । ঘুমে চোখ জ্বলছে। কিন্তু এই চ্যাপ্টার শেষ না করে সে উঠবে না । একসময় কলম থামলো। কাগজের সাদা খাতাটাও রক্ষা পেল নির্দয় কলমের ক্রমাগত আঘাত থেকে। সাইন কস ফাংশনের চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে নির্ঝর ঘুমাতে গেলো।

পরদিন সকাল বেলা। কলম ছুটে চলেছে খাতার ওপরে। কলমের একের পর এক আঁচড়ে খাতায় ফুঁটে উঠছে একের পর এক সমীকরণ। কখন দুপুর হয়ে গেছে নির্ঝরের হুঁশ নেই। হুঁশ ফিরলো মায়ের ডাকে। খেয়ে যা। অনেক পড়েছিস। এবার থাম। খাওয়া শেষে নির্ঝর ফিরে গেলো সেই পুরনো রাজ্যে।

পরীক্ষার হল। প্রশ্ন একেবারে সহজ। নির্ঝরের পরীক্ষা দেড় ঘণ্টায় শেষ। মুখে একটা চওড়া হাঁসই ফুটলো তার। এত সহজ প্রশ্ন হয় নাকি? তার মাথায় আসে না। গত কয়েক মাসে সে যে অমানুষিক পরিশ্রম করেছে তার ফল এটা । কয়েকবার রিভিশন করে খাতা দিতে যাবে, এমন সময় ইনভিজিলেটর জিজ্ঞেস করলেন, এত তাড়াতাড়ি পরীক্ষা শেষ। ওহ! তোমরা তো প্রশ্ন পেয়েছো গত রাতে। কি দিন এলো রে বাবা! সবাই প্রশ্ন পায়। কি যে হবে সামনে! নির্ঝর প্রথমে ভাবলো ঠাট্টা। পরে বুঝতে পারলো, ঘটনা সত্যি। ক্লাসের সবচাইতে গাধা স্টুডেন্ট ও ২ ঘণ্টায় পরীক্ষা শেষ করে ফেলেছে। প্রশ্ন যদি সবাই পেয়েই যায়, তাহলে সে কি জন্য এত পরিশ্রম করলো?

পরবর্তী কয়েক দিনের কথা। একের পর এক প্রশ্ন ফাঁসের খবরকে পত্রিকাগুলো একেবারে শিরোনাম বানিয়ে ছাপাচ্ছে । আর ওদিকে কর্তৃপক্ষ নির্বিকার হয়ে তামাশা দেখছে। আর নির্ঝর প্রতি পরীক্ষার আগের রাতে কলমের আঘাতে খাতায় স্বপ্ন বুনে যাচ্ছে। কিছু হবার স্বপ্ন, কিছু করে দেখানোর স্বপ্ন। মানুষ হবার স্বপ্ন – যে স্বপ্ন কিনা ফাঁস হওয়া প্রশ্নের আড়ালে গুমরে মরছে। কিন্তু এই নির্ঝরেরা এত সহজে দমে না। তারা তাদের স্বপ্ন অর্জনের রাস্তা ঠিকই তৈরি করে নেবে। একদিন এরা ঠিকই পারবে। দুঃখের বিষয়, এ জাতি সার্টিফিকেটের মাতাল। মানবিক গুণবোধের নয় – হলে এই নির্ঝরদের হতাশ হতে হতো না।

নির্ঝরেরা তোমাদের স্বপ্নভঙ্গ হবে না। তোমরা এগিয়ে যাও। বাকিদের এগিয়ে নাও। আর এই অসুস্থ সমাজকে সুস্থ করার দায়িত্ব নাও। এক দেড় লক্ষ এ+ দিয়ে আমার দেশের কিছু হবে না। কিন্তু কিছু অদম্য নির্ঝরকে দিয়ে অনেক কিছু হবে। আর রইল প্রশ্ন ফাঁস করে পাশ করারা, তোমাদের একটা কথাই বলবো, পূর্ণিমা চিরকাল থাকে না। অমাবস্যা দেখতে হবেই একদিন। সেদিন এই নির্ঝরদের স্বপ্নের আলো তাদের পথ দেখাবে, কিন্তু হায়! তোমরা যে অন্ধই থাকবে! করুণা হয় তোমাদের ওপর। বড়ই করুণা হয়।

ক্ষমা করে দিয়ো নির্ঝরেরা, আমরা তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি । ক্ষমা করো।

=======================================================

২ thoughts on “নির্ঝরের স্বপ্ন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *