লালন জীবনীঃ লালন গবেষকদের মতে,লালন কি জাত সংসারে?? (পর্ব ২)

লালনের জীবনী পড়তে গিয়ে পদে পদে কনফিউজড হয়েছি। সবচেয়ে বেশী যেই বিষয়টি নিয়ে কনফিউজড হয়েছি সেটা হচ্ছে লালনের জাত নিয়ে। লালনের জীবনী বিষয়ক যত বই পড়ছি ততি কনফিউজড হচ্ছি। আজকের এই পোষ্টে বিশিষ্ট লালন গবেষকদের আলোকে লালনের জাত নিয়ে আলোচনা করবো।

প্রথমে সবচেয়ে প্রচলিত যেই কাহিনী আছে সেটা দিয়ে শুরু করা যাক………

লালনের জাতসম্পর্কে প্রচলিত ধারনাঃ  

কিশোর লালন ছিলেন উড়নচণ্ডী স্বভাবের। ঘুরে বেড়াতেন মাঠে-ঘাটে। গানও গাইতেন গলা ছেড়ে। লালনকে নিয়ে প্রচলিত কাহিনীটি এমন গল্পেরই মতো। হয়তো সেটাই সত্য। নইলে লালন কেন লিখলেন, জাত গেল জাত গেল বলে …, যুবক লালন একবার গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন অনেকেই। কিন্তু স্নান থেকে ফেরার পথেই ঘটল অঘটন। প্রথমে তাঁর জ্বর দেখা দিল। পরে দেখা গেল বসন্ত। তখন পর্যন্ত এই রোগের কোনো চিকিৎসা-পদ্ধতি বের হয়নি। তাই সঙ্গীরা তাঁকে ভাসিয়ে দিলেন গঙ্গায়। ভাসতে ভাসতে চললেন।

এক মুসলিম নারী নদী থেকে কুড়িয়ে নেন লালনকে। অনেক সেবা-শুশ্রূষার পর সেরে ওঠেন লালন। দেখা করেন গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গে। চলতে থাকে গান-বন্দনা। কিন্তু বাড়ি তাঁর মনকে ডাকে। সেই ডাক শুনেই হয়তো একদিন ফিরে যান নিজ গ্রামে। কিন্তু মুসলিম ঘরে খেয়ে লালনের জাত গেছে- এই বলে তারা আর লালনকে ঘরে নেয় না। নিজের বাড়ি থাকতে বাড়িহীন হয়ে পড়েন লালন। নিজের পরিবার-স্বজন থাকতেও তাঁর আর কেউ থাকে না। অবশ্য তাঁর সহধর্মিণী সঙ্গী হতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পারেননি সমাজের কারণেই। লালনহীন সংসারে কয়েক বছর পর তাঁর মৃত্যু হয়।

লালন গবেষকদের মতে লালনের জাত সম্পর্কিত ধারনাঃ

## লালন শাহের বংশ পরিচয় সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথম বসন্তকুমার পাল তার “ফকির লালন শাহ্‌ ” বইয়ের ৪৯৮ পৃষ্ঠায় বলেছিলেন………
“সাঁইজী কায়স্তকুলে জন্মগ্রহন করেন,সাঁইজির  জননীর নাম পদ্মাবতী এবং মাতার নাম ভস্মদাস। সাঁইজির বাল্য নাম লালন দাস। “

একই গ্রন্থে বসন্তকুমার নিজের অভিমত ব্যাক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন, “সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান একথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম!!

সবাই শুধায় লালন ফকির
হিন্দু কি যবন

কারে বা কি বলব আমি

না জানি সন্ধান।।

বেদ- পুরাণে করছে জারী

যবনের সাঁই হিন্দুর হরি

তাও তো আমি বুঝতে নারি
দুইরূপ সৃষ্টি করলেন
তার কি প্রমান? ।।

এক-ই পথে আশা যাওয়া
এক-ই  পাটনী দিচ্ছে খেওয়া

কেউ  খায় না কারো ছোঁওয়া

ভিন্ন জল কে কোথায় পান।।

বিবিদের নাই মুছলমানি,

পৈতে যার নাই সেও তো বামনী

( বোঝ রে ভাই দিব্যজ্ঞানী)
লালন তেমনি
খৎনার জাত একখান।।

উপরের গানটির শেষ পংক্তিতে লালন শাহ্‌ আত্ন পরিচয়ের রহস্য উন্মোচন না করেও কিঞ্চিৎ পরিহাসের সুরে নিজেকে ” খৎনার জাত” বলে উল্লেখ করেছেন । খৎনা প্রথা একমাত্র  মুসলিম ও ইহুদীদের মধ্যেই প্রচলিত। তাহলে লালন কি মুসলিম সন্তান ছিলেন?

## অধ্যপক আনোয়ারুল কবির তার “বাউল কবি লালন শাহ্‌” ” বইতে  বলেছেন……

” লালন শাহ্‌ ইসলাম ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তার সমগ্র জীবন ইসলামের উপর ভিত্তি করে  গড়ে উঠেছিলেন।
( যদিও আনোয়ারুল কবির তার সিধান্তের ভিত্তি দেখাতে সক্ষম হননি)  অবশ্য আনোয়ারুল কবিরের এই মন্তবে  লালন গবেষক মনসুর উদ্দিন সমর্থন দেন।

## উপেন্দ্রনাথ ভট্রচার্য তার “বাংলার বাউল ও বাউল গান” বইতে বলেছেন………
” লালনের গুরু সিরাজ সাঁই মুসলমান হয়েও তার ধর্ম ছিলো ফকীরি ধর্ম। গুরুর মত শিষ্যের ধর্ম ছিলো ফকিরী।

## লালন শিষ্য দুদ্দু শাহের পান্ডূলিপিতে লালনকে মুসলমান না বলা হলেও তার পিতৃপরিচয় দিয়েছেন। তিনি লিখেন………

“দরীবুল্লাহ দেওয়ান তার আব্বাজীর নাম।
আমিনা খাতুন মাতা এবে প্রকাশিলাম”

তার পান্ডুলিপির অপর একজায়গায় উল্লেখ করেন ,

” একদিন জান এক পন্ডিত সভায়
পন্ডিতমন্ডলী তাঁরে বিবিধ পুঁছিলে
সাঁইজি নাম দাম সকলি বলিল
সেবার সময় হইল পন্ডিত সভার

যবন বলিয়া দূরে সেবা দেয় তার”

উপরের উল্লেখিত কথা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,  লালন শাহ্‌ নিজে তাদের নিকটে সেদিন “যবন’ অর্থাৎ মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্গত বলে পরিচয় দেওয়াতেই সাধু বাবাজীরা তাকে দূরে আহার্য পরিবেশন করেন। এ ঘটনা থেকে প্রমানিত হয় যে সাঁইজি মুসলিম সন্তান ছিলেন!!

## বাউল সমিতির প্রাক্তন সেক্রেটারী মরহুম শাহ্‌ লতীফি আফী আনহু জানিয়েছেন, সাঁইজির আখাড়ার জন্য বিভিন্ন দানপত্রে দান গ্রহীতার জাতি পরিচয়ে মুসলিম উল্লেখ আছে!

## আরও একটা ব্যাপার, সাঁইজির শিষ্যরা গুরু লালনের নামের শেষে  শাহ্‌ , সাঁই , দরবেশ প্রভৃতি শব্দ উল্লেখ করতেন কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় শব্দ “গোঁসাই” উল্লেখ করত  কোথাও উল্লেখ পানি নি।

## জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা লালন শাহ্‌ এর চিত্রে দেখা যায়– তিনি পাঞ্জাবী পরিহিত এবং মুসলিমের ন্যায় দাঁড়ির অধিকারী ।



উপরের লালন গবেষকদের মতামত গুলা পড়ে আপনারা যেমন কনফিউড লালন আসলে হিন্দু ছিলেন নাকি মুসলিম ছিলেন, আমিও আপনাদের মত কনফিউজড! এই কনফিউসান থেকে এই পোষ্ট খানা লিখছি। লালন গবেষকরাও ভালো ভাবে উল্লেখ করতে পারেন নি লালন আসলে কোন জাতের ছিলো?

আমার এই পোষ্টের মাধ্যমে লালন শাহ্‌কে কোন বিশেষ ধর্মে প্রমান করতে চাইতেছি কেউ এটা ভেবে ভুল বুঝবেন না দয়া করে।  কারন বিশ্ব মানবতার সাধক লালন শাহ্‌  গোত্র-বর্ন-সম্প্রাদায়ের উর্দ্ধে  থেকে মানব ধর্ম চর্চা করতেন।

সব লোকে কয় 
লালন কি জাত সংসারে
লালন বলে জাতের কি রূপ
দেখলাম না  তা নজরে

………………মেহেদী৪৪

৭ thoughts on “লালন জীবনীঃ লালন গবেষকদের মতে,লালন কি জাত সংসারে?? (পর্ব ২)

  1. সব লোকে কয়
    লালন কি জাত

    সব লোকে কয়
    লালন কি জাত সংসারে
    লালন বলে জাতের কি রূপ
    দেখলাম না তা নজরে

    এখানেই যা বলার বলে দিয়ে গেছেন লালন নিজেই।

    1. এইখানে যা বলার তা মানছি আতিক
      এইখানে যা বলার তা মানছি আতিক ভাই ,

      তবে অন্য জায়গায় অনেক কনফিউসান রেখে গেছেন স্বয়ং লালন নিজেই…

  2. কি দরকার সেসব ঘাটার?
    ধরে নিন

    কি দরকার সেসব ঘাটার?
    ধরে নিন তিনি মুসলিম ছিলেন কিন্তু তিনি কি নামাজ আদায় করতেন? তাহলে কি লাভ তাকে মুসলিম প্রমান করে?
    অথবা তিনি হিন্দু ছিলেন কিন্তু তিনি কি পুজা পাঠ করতেন? তাহলে সেখানেও কি লাভ?
    এই জাত-পাতের বিরুদ্ধে যে তিনি চরম অবস্থানে ছিলেন সেই তাকেই আপনারা মিলে আবার ঐস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন?
    যেখানে উনি নিজেই বলেন নাই উনি কোন জাত-ধর্মের সেখানে কেনো উনার সেই জাত-কূল নিয়ে এতো হাহাকার?
    বরঞ্চ উনি কি দিতে চেয়েছেন কি বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের সেইগুলোই তুলে আনলে ভালো হয়।

    1. সুমিত চোধুরী ভাই,আপনার
      সুমিত চোধুরী ভাই,আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
      নেক্সট পর্ব থেকে লালনের অন্যান্য বিষয়াদি নিয়ে লিখবো।

  3. আপনার লিখনি’তে যুক্তি প্রমাণ আছে বইলা লেখাটা পাঠ করেছি মনযোগ সহকারে। তবে বলাই বাহুল্য গুরু লালন’কে নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তিনি কোন জাতের! তাদের প্রতি কেন জানি আমার একটি ধিক্কার কাজ করে। কারণ হচ্ছে আমার জানামতে গুরু লালন’ই একমাত্র মানুষ যিনি ধর্ম বর্ণকে শুরু থেকেই বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মানবতার জয়গান করেছেন নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। যে ক্ষমতা ও জ্ঞান সবার থাকে না। যারা গুরু লালনকে নিয়ে জাতের গবেষণা করেছেন বা করবেন তাদের উদ্দশ্যে গুরু লালনের একটি উক্তি এখানে নোট করছি ” মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *