লাল সালাম ভাই ওমর ফারুক

ঝিনাইদহ’র হরিণাকুন্ডু উপজেলার সনাতনপুর পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত অবস্থায় নিহত পুলিশ সদস্য ওমর ফারুখের লাশের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এসময় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে। ফারুকের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। গতকাল সোমবার সকাল ১১টায় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গোয়ালডাঙ্গা মাদ্রাসার মাঠে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশের দাফন সম্পন্ন হয়।

ঝিনাইদহ’র হরিণাকুন্ডু উপজেলার সনাতনপুর পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত অবস্থায় নিহত পুলিশ সদস্য ওমর ফারুখের লাশের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এসময় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে। ফারুকের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। গতকাল সোমবার সকাল ১১টায় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গোয়ালডাঙ্গা মাদ্রাসার মাঠে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশের দাফন সম্পন্ন হয়।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গোয়ালডাংগা গ্রামের পুলিশ সদস্য ওমর ফারুকের মৃতদেহ সকালে আশাশুনিতে পৌঁছায়। ওমর ফারুখ ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুন্ডু উপজেলার সনাতনপুর পুলিশ ফাঁড়িতে কনষ্টেবল হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তার মৃত্যু সংবাদ গ্রামে পৌঁছালে সর্বত্র কান্নার রোল পড়ে যায়। সবাই হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করেন।
নামাজে জানাযা’য় সাতক্ষীরা সদর সার্কেলের পুলিশ সুপার সাজ্জাতুল রহমান, আশাশুনি থানার উপপরিদর্শক মিরাজ আলী, নূর মোহাম্মদ, বড়দল ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুল হক, সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুছ সানা, রউফ গাজীসহ গণমানুষের ঢল নামে। এর আগে রোববার রাতে ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনে অনুষ্ঠিত প্রথম জানাযায় খুলনা রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক মেজবাহউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
ফারুখের মা মর্জিনা খাতুন জানান, বড় সহজ সরল মানুষ ছিল ফারুখ। এলাকায় কারো সঙ্গে তার বিরোধ ছিল না। অভাবের সংসারে সকলকে সমান চোখে দেখতো সে। চাকরি পাওয়ার পর বাবার বয়স হয়েছে বলে ভ্যান চালানো বন্ধ করে দেয় ফারুখ। সংসারের বোঝা ঘাড়ে নেয় সে। আফসোসের সঙ্গে তিনি বলেন, নিজের সংসারে অভাব থাকলেও বাবা মা’কে সবসময় সাহায্য করতো। ছেলের মৃত্যুতে ছেলের বাবা মোহাম্মদ আলীকে আবারো ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামা ছাড়া পথ নেই। তিনি হরতালের নামে যারা সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি জানান। কথা বলতে বলতে ফারুখের মা বার বার আহাজারি করতে থাকেন। তার আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠতে থাকে। তিনি প্রশ্ন করতে থাকেন, জামাত শিবির কি বেছে বেছে ভালো মানুষদের খুন করে ?
আশাশুনি উপজেলার গোয়ালডাঙা গ্রামের নাসিরউদ্দিন গাজীর মেয়ে আজমিরা খাতুন জানান, সাড়ে পাঁচ বছর আগে তার সঙ্গে ওমর ফারুকের বিয়ে হয়। বর্তমানে তাদের জান্নাতুল কোবরা নামের চার বছরের একটি মেয়ে রেয়েছে। রোববার ভোরে তার ও মেয়ে জান্নাতুলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে শেষ কথা বলে ওমর ফারুখ। হরতালের ডিউটি শেষে বুধবার বাড়িতে আসার কথা জানিয়েছিল সে। ছোট্ট জান্নাতুল বারবার জানতে চাইছে সে বাবার কোলে আবার কখন উঠবে। ফারুখের স্ত্রী, শিশু সন্তান ও স্বজনদের আহাজারিতে উপস্থিত প্রত্যেকে চোখের পানি ফেলে।
ফারুখের গ্রামবাসীরা বলেন, ওদের (জামাত-শিবির) কেউ মারা গেলে কাড়ি কাড়ি টাকা পয়সা আর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব দেয়া হয়। ওরা এরকম এক গরীব পরিবারের আয়সক্ষম ব্যাক্তিকে নির্মমভাবে খুন করল। এদের দায়িত্ব কে নেবে। এরা যে পথে ভেসে যাবে তা কি জানে না খুনি জালেমেরা। ওদের কি কোন মায়া দয়া নেই। ওরা এত নিষ্ঠুর!
রবিবার হরতাল চলাকালে কর্তব্যরত ফারুখকে কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে জামাত-শিবিরের সশস্ত্র কর্মীরা নৃশংসভাবে পিটিয়ে ও জখম করে হত্যা করে বলে জানায় পুলিশ। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ১কন্যা সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
আশাশুনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ এমদাদ হোসেন জানান, তার মৃতদেহ সকালে আশাশুনিতে পৌঁছায়। একটি অগ্রবর্তী পুলিশ ও বিজিপি দল আশাশুনিতে নিয়ে আসে।
চুয়াডাঙা জেলার দামুড়হুদা মডেল থানার উপপরিদর্শক এমদাদ হোসেন জানান, তার ভাইপো ওমর ফারুক ১৯৮৬ সালের ২ এপ্রিল আশাশুনি উপজেলার গোয়ালডাঙ্গা গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করে। বাবা মোহাম্মদ আলী একজন ভ্যান চালক। তিন বোন ও দু’ ভাইয়ের মধ্যে মেঝ সন্তান ওমর ফারুখ। ছোট ভাই আলী আকবর যশোরের আকিজ গ্রূপের একটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বেতনের চাকুরি করে। বোন নাজমা, ফিরোজা ও মাফুজার বিয়ে হয়ে গেছে। বৃদ্ধ বাবার পরিবর্তে সংসারে হাল ধরেছিল ওমর ফারুক।
তিনি আরো জানান, ২০০২ সালে আশাশুনি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসি পরীক্ষায় পাশ করে ওমর ফারুক। ২০০৩ সালে আশাশুনি ডিগ্রী কলেজে বাণিজ্য বিভাগে পড়াশুনাকালিন পুলিশ সিপাহী হিসেবে খুলনায় ছয় মাসের প্রশিক্ষণে যায় সে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে কর্মরত অবস্থায় যৌথ বাহিনীতে যোগ দেয়। পরে রাঙামাটি থানায় এক বছর কাজ করার পর বরিশাল সদরের একটি ক্যাম্পে এক বছর কাজ শেষে তাকে ঝিনাইদহ জেলা সদরের পুলিশ লাইনে বদলী করা হয়। সেখান থেকে কালিগঞ্জ থানায় দেড় বছর কাজ করার পর হরিণাকুন্ড থানাধীন সনাতনপুর পুলিশ ফাঁড়িতে বদলী করা হয়। সেখানে মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত সততা ও দায়িত্বশীলতার সাথে কর্মরত ছিল।
হরিণাকুন্ডু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, রোববার সকালে ওমর ফারুখসহ কয়েকজনকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস গেটে অবস্থান করতে বলা হয়। সকাল ১১টার দিকে জামাত শিবিরের কয়েক’শ দেশীয় অস্ত্রেসজ্জিত নেতা-কর্মী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তাকে খবর দেয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি পৌঁছানোর পরপরই জীবন বাঁচাতে পুলিশ সদস্যদের ইউএনও অফিসে ঢুকে পড়ে তালা দিতে বলা হয়। ওমর ফারুখ বাইরে ছিল এটা কেউ জানত না। সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় হরতাল সমর্থকরা মাথায় ইট মারলে রক্তাক্ত অবস্থায় সে মাটিতে পড়ে যায়। এরপর তারা ওমর ফারুখকে দবিয়ে ও এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। খুনীরা উল্লাস করতে করতে চলে যায়।
ফারুখের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনে প্রথম জানাযা শেষে রাতেই তার লাশ সাতক্ষীরার গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। পুলিশ ফাড়ির সহকর্মীরা কিছু আর্থিক সহযোগিতা করে তার পরিবারকে।
তিনি আরও জানান, ওমর ফারুখকে হত্যার ঘটনায় তিনি বাদি হয়ে ২০০ জনকে আসামী করে রোববার রাতেই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

২ thoughts on “লাল সালাম ভাই ওমর ফারুক

  1. দুঃখ জানানোর ভাষা জানা নেই।
    দুঃখ জানানোর ভাষা জানা নেই। এইসব জানোয়ারের দল ধর্মের নাম করে এরকম নিরাপরাধী মানুষকে একাত্তরেও হত্যা করেছে, আজও করেই যাচ্ছে। চূড়ান্ত শাস্তির দাবী জানাই (জানিনা এই শাস্তি কে কাকে কিভাবে দেবে, কিংবা আদৌ দেবে কিনা? )

    ইস্টিশনের ব্লগারদের পক্ষ থেকে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। সেই উদ্যোগে এরকম পুলিশ ভাইদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যায় কিনা সবাইকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *