চুকনগর গণহত্যা ঠাঁই হয়নি স্বাধীনতার দলিলপত্রে! ভুলে গেছি জন্মের দাগ



গতকাল ছিলো ভয়াল ২০ মে। একদিনে সংগঠিত পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যা দিবস চুকনগর গণহত্যা দিবস। একদম নিরবেই চলে গেলো। চ্যাতনাদণ্ড উথিত সরকার নিরবেই যেতে দিলো এরকম একটি দিন। অনেকদিন আগে, ২০১০ সালে সেখানে গিয়েছিলাম। যারা বেচে আছেন, লাশ সরিয়েছেন , লাশ গুনেছিলেন এমন মানুষদের সাক্ষাতকার করে তৈরী করেছিলোম এ রিপোর্টটি। ছাপা হয়েছিলো কালের কন্ঠে।

চারপাশে আতঙ্কথকখন পাকিস্তানি বাহিনী এসে পড়বে। মানুষ প্রাণের ভয়ে পালাচ্ছে দিগ্বিদিক। সবার গন্তব্য সীমান্তের ওপারে, নিরাপদ আশ্রয় ভারত। এ রকম আতঙ্ক আর শরণার্থী হওয়ার জন্য গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, বরিশাল, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর থেকে লাখ লাখ মানুষ ভিড় জমিয়েছে খুলনার ডুমুরিয়া থানার চুকনগরে। ইতিমধ্যে অনেক মানুষ সীমান্তের ওপার ভারতে পাড়িও জমিয়েছে। ২০ মে ১৯৭১। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা থেকে আগত মানুষ অপেক্ষা করছে ভারতে পাড়ি দেওয়ার। দেশের মায়া, জন্ম ভিটের মায়া ত্যাগ করে এই পলায়ন শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য। অনেকের স্বপ্ন ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখানোর। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০টা। পাকিস্তানি বাহিনীর একটি কনভয় প্রবেশ করে চুকনগরে। তারপর? নির্বিচারে মানুষের ওপর মেশিনগানের তপ্ত বুলেট। নিহতের সংখ্যা কে গুনবে? জীবিত মানুষ কোথায়। একদিনে সংগঠিত পৃথিবীর এই ভয়াবহ বৃহত্তম গণহত্যা পৃথিবীবাসী জানে না। পৃথিবীবাসী তো দূরে থাক বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর হাতেগড়া ১৫ খণ্ডের স্বাধীনতার দলিলপত্রেও এই গণহত্যার ঠাঁই হয়নি। পৃথিবীর বৃহত্তম চুকনগর গণহত্যা ৩৯ বছর অতিক্রান্ত করল। খুলনার চুকনগর থেকে ঢাকায় ফিরে এই প্রতিবেদনটি তৈরী করা হয়েছে।


ভয়াল ২০ মে

১৯৭১ সালের ২০ মের গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনামতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বর্বরোচিত গণহত্যার নানা অজানা ঘটনা উঠে এসেছে। চুকনগর খুলনা জেলার অন্তর্গত ডুমরিয়া থানায় অবস্থিত। খুলনার উত্তরে যশোর ও ফরিদপুর, পূর্বে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল ও পটুয়াখালী। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে ভারতে শরণার্থীরা এই পথটিকেই বেছে নিত। ডুমরিয়া থানার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর বাজারটির বেশ নাম-ডাক ছিল। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে নদীপথে সহজেই শরণার্থীরা চুকনগরে পৌঁছে যেত।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সারা দেশে গণহত্যা শুরু করলে তার প্রভাব এসে পড়ে খুলনায়। গণহত্যার প্রথম ধাক্কায় দেশ থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ দলে দলে পালাতে শুরু করে ভারতে। স্থানীয় বাঙালি দালাল ও বিহারিরা আওয়ামী লীগ, বামপন্থীসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে পরিচিতদের বাড়ি বাড়ি নিয়ে যেত পাকিস্তানি বাহিনীকে। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে স্থানীয় দালালদের হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বেড়ে যাওয়ায় বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে দলে দলে বিশেষত ১৮ থেকে ১৯ মের মধ্যে হাজার হাজার শরণার্থী চুকনগরে এসে তাদের নৌকা নোঙর করে। তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাতে পারেননি। বেশ কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, খেয়াঘাটে এক বিহারি খানের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কথা কাটিকাটি থেকে গণহত্যার সূত্রপাত। ওই বিহারি খান এ সময় স্থানীয়দের দেখিয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদর্শন করেছিল।
২০ মে সকাল ১০টা, বৃহস্পতিবার ১৯৭১ সাল। অধিকাংশ শরণার্থী পরিবার সকালের খাবার শেষ করে ভারতে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সময় সাতক্ষীরা সড়ক ধরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুটি সামরিক কনভয় চুকনগরের (বর্তমান চুকনগর কলেজের পাশ দিয়ে) কাউতলায় প্রবেশ করে। এলাকাটি স্থানীয়দের কাছে পাতখোলা নামে পরিচিত। এ সময় পুটিমারি বিলের পাশে নিজ বাড়ি থেকে অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন চিকন আলী মোড়ল। এমন সময় সামরিক কনভয়ে চেপে আসা পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে জিজ্ঞেস করে, ‘কোন্ হ্যায় হিন্দু না মুসলিম?’ চিকন মোড়লকে কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই ব্রাশ ফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তারই অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছেলে এরশাদ আলী গুলিবিদ্ধ বাবাকে ফেলে বাড়িতে চলে যান। এরপরই শুরু হয় নারকীয় গুলির শব্দ। এক টানা গুলির শব্দে কানপাতা দায়। কালের কণ্ঠের কাছে এ রকমই বর্ণনা করলেন চুকনগরের প্রথম শহীদ চিকন আলী মোড়লের ছেলে এরশাদ আলী। তারপর পুটিমারির ঋষিপাড়ার দিগম্বরসহ আরো কয়েকজনকে হত্যা করে তারা।

গণহত্যার সংখ্যা

চুকনগরের গণহত্যার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা মত রয়েছে। যেহেতু নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শরণার্থীর সংখ্যাই বেশি তাই প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে জটিলতা কাটেনি এখনো। তবে গণহত্যা শেষে লাশ পরিষ্কারের যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের জবানবন্দিতে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজারের নিচে নয়।
গণহত্যার পর মাঠে, ঝোপঝাড়ে, জঙ্গলে, ধানক্ষেতে অসংখ্য লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। লাশের গা থেকে বের হতে থাকে বিকট গন্ধ। এ সময় চুকনগর বাজার কমিটির সদস্য সিরাজ উদ্দীন মোড়ল, গোলাম হোসেন নুরুজ্জামান ও হায়দার নামের তিন ব্যক্তি লাশ নদীতে ফেলার জন্য লোক ঠিক করে। ঠিক করা হয় প্রতিটি লাশ নদীতে ফেলে দিলে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে ৫০ পয়সা। অর্থের বিনিময়ে সে সময় নদীতে লাশ ফেলেছিলেন ৪০ জন। তাদের মধ্যে এখনো অনেকে জীবিত। কালের কণ্ঠের কাছে সেদিনের লাশ নদীতে ফেলানোর কাজে দায়িত্বে থাকা মো: ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘দুজনে মিলে একটি লাশ সে সময় আমরা ভদ্রা নদীতে ফেলেছি। এভাবে চার হাজার লাশ আমরা গুনেছিলাম। এরপর আর গুনিনি। সত্যি কথা বলতে কী, একটি লাশ ফেললে পঞ্চাশ পয়সা দেওয়ার কথা থাকলেও লাশের গায়ে যে সব সোনা ও টাকা পয়সা আমরা সে সময় পেয়েছি তার কারণে গুনে গুনে লাশ ফেলানোর ব্যাপারে আমাদের আর কোনো ইচ্ছে ছিল না। তবে যতগুলো লাশ আমরা গুনে রেখেছিলাম তারপরে ওই পরিমাণেরও বেশি লাশ আমরা ফেলেছি।’ ওয়াজেদ আলীর দেওয়া তথ্যমতে চার হাজার লাশ গুনে ভদ্রা নদীতে ফেলা হলে আরো চার হাজারের বেশি লাশ ভদ্রা নদীতে ফেলা হয়। তবে স্থানীয় একাধিক প্রৌড় জানিয়েছেন, এরপরও অনেক লাশ ক্ষেতের মধ্যে, বনজঙ্গলে পড়েছিল। এমন কী ভদ্রা নদীর আশপাশে তখন যাওয়া যেত না মানুষ পচার গন্ধে।

পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যা স্থান পায়নি ইতিহাসে

একদিনে সংঘটিত পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যার নাম হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে ভিয়েতনামের মাইলাইতে। মাইলাইতের গণহত্যায় মারা যায় প্রায় ১৫০০ মানুষ। আর চুকনগরে কম করেও হলে ২০ মে গণহত্যার শিকার হয়েছে ১০ সহস্রাধিক মানুষ। তবু পৃথিবীর কোনো ইতিহাসে এই গণহত্যার স্থান মেলেনি। বিশ্ব ইতিহাসের আগে চোখ ফেরানো দরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশে বাংলাদেশ সরকারের ‘স্বাধীনতার দলিল’ নামে ১৫ খণ্ডে লিখিত দলিল রয়েছে। সেই ১৫ খণ্ডের কোথাও চুকনগরের গণহত্যার স্থান হয়নি। কেন হয়নি? এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?


চুকনগরের মাটি এখনো কথা কয়

চুকনগরের ধানী জমিতে চাষ দিতে গেলে এখনো মানুষের হাড়গোড় ওঠে আসে। শুধু মানুষের হাড়গোড় নয় সোনার আংটি কিংবা কানের দুল পাওয়া যায় মাটির মধ্যে। নিহত মানুষের স্বর্ণালংকার এখনো চুকনগরের মাটিতে মিশে যায়নি। গণহত্যার সাক্ষ্য বহন করে চলছে চুকনগরের মাটি।
ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, গুম পেরিয়ে আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু যাঁদের রক্ত-ঋণে এই বাংলাদেশ সেই মহান আত্দত্যাগী শহীদ অথবা ধর্ষণে কুঁকড়ে যাওয়া নারী কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে আহত পঙ্গু মানুষটার হাহাকারের সীমা নেই। ‘আমরা এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?’ সম্মিলিত উচ্চারণের ঢেউ ওঠবে ৫৬ হাজার বর্গমাইলজুড়েথ’না’। এই বাংলাদেশে থেকে তাহলে কি করে আশা করা যায় নৃশংস গণহত্যার খবর পাওয়া যাবে ইতিহাসে? সঙ্গত কারণে বুলেট, রক্ত আর লাশের সেই ইতিহাস স্বাধীনতার ১৫ খণ্ড দলিলে ঠাঁই হয়নি। তবে কি আমরা জাতি হিসেবে অকৃতজ্ঞ? আমরা কি দ্রুতই ভুলে যেতে পারি আমাদের বুকের মধ্যে যাঁরা সেঁটে দিয়েছিলেন ভয়ঙ্কর কৃষ্ণপক্ষের সেই রাত? এসব অগণিত প্রশ্নের কোনো উত্তর আমাদের কাছে নেই।

৮ thoughts on “চুকনগর গণহত্যা ঠাঁই হয়নি স্বাধীনতার দলিলপত্রে! ভুলে গেছি জন্মের দাগ

  1. দারুণ তথ্যসমৃদ্ধ লেখার জন্য
    দারুণ তথ্যসমৃদ্ধ লেখার জন্য তুহিন ভাইকে স্যালুট। শাসকশ্রেণীর যেই কাজটা করার কথা ছিল সেটা জনগণকেই করতে হচ্ছে এটাই দুঃখজনক। এতো বড় গণহত্যার বিষয়টা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দলীল পত্রে স্থান পায়নি যেনে অবাক হলাম। এই তথ্যটা জানা ছিলোনা। চুকনগর গণহত্যা বিষয়ে প্রথম জানতে পারি তানভীর মোকাম্মেল যখন “জীবনঢুলী” চলচ্চিত্র তৈরি শুরু করেন তখন। তবে এতো বিস্তারিত জানতাম না।

  2. চুকনগর বধ্যভুমি সম্পর্কে এত
    চুকনগর বধ্যভুমি সম্পর্কে এত তথ্য জানা ছিল না। শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ। যাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসা, তাদের কাছে এসব বধ্যভুমি কোন চ্যাটের বাল!

  3. দেশের সকল বধ্যভুমি গুলো এখনো
    দেশের সকল বধ্যভুমি গুলো এখনো সঠিক ভাবে চিন্‌হিত হয়নি এবং যথাযথ ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। চিন্‌হিত গুলোর কিছু কিছুতে স্মৃতি স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে সুধুমাত্র স্তম্ভ তৈরি করেই সরকার খালাস। কিন্তু সেখানকার ইতিহাস জানানোর জন্য সরকারের কোন বিশেষ ব্যাবস্থা নেই। চুকনগর বদ্ধভূমি সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আপনার মাধ্যমে অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ…

  4. তাহলে কি আমরা জাতী হিসেবে
    তাহলে কি আমরা জাতী হিসেবে অকৃতজ্ঞ?
    লেখক ভাই ঠিক বলেছেন আসলে মূল কথা হলো আমরা জাতী হিসেবে অকৃতজ্ঞ।তাইতো চুকন নগরের গনহত্যার কথা ছাপা হয়নি আমাদের ইতিহাসের পাতায়!

  5. ধন্যবাদ, আপনাকে এই ইতিহাস
    ধন্যবাদ, আপনাকে এই ইতিহাস তুলে ধরার জন্য। খাতায় লিখা না থাক, আমাদের মনে থাক!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *