এদেশের ব্যান্ড মিউজিক ও আমার ভাবনা

একটা সময় ছিল প্রচুর গান শুনতাম। জেমস, আর্কের হাসান এদের গান যখন শুনতাম তখন ছিল ফিতার ক্যাসেট। টেপ রেকর্ডার দিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত গান শুনে শুনে কাটাতাম। হেডফোন ছিলনা। তাই অল্প ভলিউমে গান ছেড়ে সাউন্ড হোলটাতে কান ঠেসে ধরে রাখতাম। একদিন আর্টসেলের অন্যসময় আর আগুন্তুক মিক্সড অ্যালবামের একটা সিডি নিয়ে আসলাম। জি সিরিজ নামে নতুন একটা মিউজিক কোম্পানি আসছে এরা আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড গুলাকে চান্স দিচ্ছে। আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড কি জিনিস জানিনা। তবে এদের গানে অন্যরকম স্বাদ। তখনকার আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড আর্টসেল,অর্থহীন, ব্ল্যাক তখন তুমুল জনপ্রিয়। এর কিছুদিন পর যোগ হল স্টেন্টোরিয়ান, আর্বোভাইরাস, নেমেসিস। আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড বিপ্লবটার জন্ম থেকে মৃত্যু পুরোটা আমাদের জেনারেশন দেখেছে। তবে অন্যান্য মেইনস্ট্রিম ব্যান্ড গুলাও তখন বেশ প্রাসঙ্গিক। এলআরবি, মাইলস, রেঁনেসা,ফিডব্যাক,ওয়ারফেজ এবং মাকসুদের জনপ্রিয়তা এখনো যেমন আছে তখনো ছিল। তবে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডগুলো এসে আমাদের মিউজিককে বৈচিত্র্যময় করেছে। এদের মাধ্যমেই এদেশের মিউজিক পাগল প্রজন্ম থ্রেশ মেটাল,ডেথ মেটাল অলটারনেটিভ রক এসবের নাম শুনতে পায়। আমি কিছু ব্যান্ডের নাম উল্লেখ করেছি। কিন্তু বাস্তবে এর সংখ্যা ছিল কয়েকগুণ বেশি। তখন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি তার শিখরে অবস্থান করছিল। মানুষও সিডি কিনে শুনতো।এক্ষেত্রে সবচেয়ে বাহবা পাওয়ার যোগ্য জি সিরিজ। তারা নতুন নতুন ব্যান্ড গুলোকে চান্স দিয়েছে। তাদের উপর বিশ্বাস রেখেছে। তারাও বিশ্বাসের মূল্যটুকু দিতে পেরেছে।

তবে যে শুধু থ্রেশ মেটাল, ডেথ মেটালেরই চর্চা হয়েছে টা কিন্তু না। দেশীয় গানেরও চর্চা হয়েছে। যেমন বাউল গান নিয়ে বাঙলা ব্যান্ডের কাজগুলো ছিলো চমৎকার। অর্ণব নিজেই একটা ট্রেন্ড চালু করে দিয়ে গেছে, প্রেয়ার হলেও অর্নব ছিল। এই ব্যান্ডটা হুট করে এসে হুট করেই হারিয়ে গেল। শিরোনামহীন তো এখনো মাতিয়ে রেখেছে তাদের ভিন্ন ধারার কম্পোজিশন দিয়ে।
এমন হুট করে হারিয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতিশীল ব্যান্ডের সংখ্যা অনেক। এরা এসেই সাড়া জাগিয়ে ফেলেছে। কিন্তু দুইটা তিনটা এ্যালবামের পর আর এদের দেখা যাইনি। এদের মধ্যে ভাইব উল্লেখযোগ্য। অল্টারনেটিভ রক ধারার এই ব্যান্ডের প্রস্থান বাংলাদেশের অনেক ব্যান্ড মিউজিক প্রেমিদের দীর্ঘশ্বাসের নাম। তাদের একটাই এ্যালবাম বেরিয়েছে এবং এই এ্যালবামের প্রতিটা গান ছিল হিট। আইকনও একটি এ্যালবামের পর হারিয়ে যায়। স্টেন্টোরিয়ান ব্যান্ডটাও বেশকিছু ভালো গান দিয়ে হারিয়ে গেছে। আমি ব্যাক্তিগতভাবে এদের খুব মিস করি। ওয়াটসন ব্রাদার, ক্রিপটিক ফেইট, মেটাল মেইজ, স্কেয়ারক্রো এমন অনেক ব্যান্ড ছিল যারা এখন হয়তো আর নেই আর থাকলেও মিট মিট করে জ্বলছে।মাঝে ডিজুস রকস্টারের মাধ্যমে মেকানিক্স আর পাওয়ার সার্জের মতো নতুন কিছু ব্যান্ড পেয়েছে যাদের মাধ্যমে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড মিউজিক একটু উঠে দাঁড়াতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি।

অর্থহীন,শিরোনামহীন, ওয়ারফেজই মূলত এখন মেইন্সট্রিমে তাদের মেটাল ধারার মিউজিকের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। তবুও এদের এ্যালবাম নাই অনেক দিন ধরে। একমাত্র শিরোনামহীনই নিয়মিত এ্যালবাম বের করে যাচ্ছে।

এখন থেকে প্রায় দশ বছর আগে ওপেন কনসার্টের খুব চল ছিল। সে সময় একুশে টিভিতে ১২ টার পর সেগুলার পুনঃ প্রচার প্রায়ই দেখাত। কনসার্ট আয়োজনও হতো নিয়মিত। সারারাত ধরে খোলা আকাশের নীচের কনসার্ট ঢাকায় এখন হয়না বললেই চলে। হলেও অডিটোরিয়াম ভাড়া করে হয় নির্দিষ্ট কিছুজনের প্রবেশাধিকার থাকে।

দেশে ব্যান্ড মিউজিকের চর্চা এখনো চলছে। বন্ধু বান্ধব মিলে একটা ব্যান্ড গড়ে তোলার যে ধারা আমাদের বড় ভাইয়েরা দেখিয়ে দিয়ে গেছিলো সেটা এখনো অব্যাহত। ঢাকার খবর জানিনা। তবে চট্টগ্রামে প্রতিমাসে অন্তত একটা কনসার্ট হয়। আর সেগুলোতে অংশগ্রহণও করে লোকাল ব্যান্ডগুলা। আয়োজনেও থাকে তারা। ওপেন এয়ার কনসার্ট সারাদেশেই বন্ধ। কারণ নিরাপত্তার জন্য অনুমতি দেয়া হয়না। তাই অডিটোরিয়ামের মধ্যে করতে হয়। অনেক দোষ ত্রুটিও আছে অবশ্য। তবে এভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বড় কোন স্পন্সর ছাড়াই ব্যান্ড মিউজিকের চর্চা আমাদের দেশের সংস্কৃতির জন্য সত্যিই মঙ্গলজনক।

১০ thoughts on “এদেশের ব্যান্ড মিউজিক ও আমার ভাবনা

  1. ওপেন এয়ার কনসার্ট সারাদেশেই

    ওপেন এয়ার কনসার্ট সারাদেশেই বন্ধ। কারণ নিরাপত্তার জন্য অনুমতি দেয়া হয়না।

    এটা একটা ফাইজলামি ছাড়া আর কিছুই না।

  2. বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক
    বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক ভালো লাগে। তবে আমার মনে হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প নেই। দেশে একটা ভালো মানের মিউজিক কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় সময়ের দাবী। যা আছে সেগুলো কোন কাজের না।

    1. বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক
      বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের। তবে আপনার পরামর্শ আরও সমৃদ্ধ করবে
      নিশ্চিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *