শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি: শিক্ষার্থীদের যান্ত্রিক জীবনের যন্ত্রনা

কয়েক বছর আগের কথা। এক বড় ভাইয়ের সাথে গেলাম তারই এক আত্মীয়ের বাসায়। ঐ পরিবারে একটা অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে আছে। তার গার্ডিয়ানকে জিজ্ঞাসা করলাম,
:ইংরেজীতে কেমন?
:ইংরেজী ফার্স্ট পেপার মোটামুটি, সেকেন্ড পেপারে ভালো না।

এবার মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করলাম সেভেনে ফাইনালে ইংরেজীতে পেয়েছে কত। সে বললো,
:ফার্স্ট পেপারে ৯১ এবং সেকেন্ড পেপারে পেয়েছি ৮৬ আর ফার্স্ট গার্ল পেয়েছে ৯৫।


কয়েক বছর আগের কথা। এক বড় ভাইয়ের সাথে গেলাম তারই এক আত্মীয়ের বাসায়। ঐ পরিবারে একটা অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে আছে। তার গার্ডিয়ানকে জিজ্ঞাসা করলাম,
:ইংরেজীতে কেমন?
:ইংরেজী ফার্স্ট পেপার মোটামুটি, সেকেন্ড পেপারে ভালো না।

এবার মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করলাম সেভেনে ফাইনালে ইংরেজীতে পেয়েছে কত। সে বললো,
:ফার্স্ট পেপারে ৯১ এবং সেকেন্ড পেপারে পেয়েছি ৮৬ আর ফার্স্ট গার্ল পেয়েছে ৯৫।

আমিতো অবাক। আচ্ছা, ভালোর সংজ্ঞা কি? ভালোর লিমিট কত? ভালোর সংজ্ঞা কি যে ফার্স্ট তাকে অতিক্রম করে যাওয়া? তাহলে তো কোন ক্লাশে ফার্স্ট ছাত্র/ছাত্রী ছাড়া সবাই খারাপ। কারন একটা ক্লাশে ফার্স্ট একজনই থাকে। ভালোর লিমিট কি প্রতিটি বিষয়ে একশোতে একশো পাওয়া?
জানিনা, অভিভাবকরাই ভালো বলতে পারবে।
বেশ কিছুদিন প্রাইভেট টিউশনি করার অভিজ্ঞতায় শহরের স্টুডেন্টদের প্রত্যেককেই আমার মানসিক রোগী কিংবা রোবট মনে হয়। হয় তার মন নেই, যন্ত্রের মতো পড়ে যাচ্ছে, নয়তো মন থাকলেও মানসিক রোগী হয়ে গেছে। সকালে কোচিং, তারপর ক্লাশ, বিকেলে বাসায় এসেই একে একে হোম টিউটরদের সামনে আসা। গনিত, ইংরেজী, পদার্থ, রসায়নের শিক্ষকদের কাছে পড়তে পড়তেই রাত নয়টা কিংবা সাড়ে নয়টা। নিজের মত করে পড়ার সময় পায় দেড় বা দুই ঘন্টা, এই দেড় ঘন্টায় তাকে কোচিং স্কুল প্রাইভেট সবকিছুই শেষ করতে হয়। এরপরও অভিভাবকদের নালিশ, “আপনার ছাত্র পড়েনা।” আশ্চর্য, কোনো অভিভাবককে এখন পর্যন্ত বলতে শুনলাম না যে তার ছেলে/মেয়ে বিশ্রামের জন্য একঘন্টা সময় পায় না। আরো একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো, স্টুডেন্টকে পড়াচ্ছি, পাশের রুমে তাদেরই এক প্রতিবেশী গর্ব করে বলতেছে, “মেয়েটা ইংরেজীতে নম্বইয়ের কম পেয়েছে, এমন মার দিয়েছি,… … লেখাপড়াই করেনা।” কি মানসিকতা!
তাছাড়া সৃজনশীল পদ্ধতিটা স্টুডেন্টদের মনে কতটুকু সৃজনশীলতার জন্ম দিয়েছে এটাতে সন্দেহ আছে। এর কারন হলো শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির নামে নিম্ন শ্রেণীগুলোতে জটিল বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা। ইন্টারমিডিয়েটের পড়া নবম শ্রেণীতে, নবম শ্রেণীর পড়া সপ্তম শ্রেণীতে। একবারও ভাবা হলোনা শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতার কথা। তার উপর এই সৃজনশীল পদ্ধতটায় সুবিধা হয়েছে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যে, প্রকাশকদের গাইড বাণিজ্যে। বলতে লজ্জা নেই, কদর বাড়িয়েছে আমাদের প্রাইভেট টিউটরদের। অপরদিকে বোঝা বাড়িয়েছে স্টুডেন্টদের। দোষটা সৃজনশীল পদ্ধতির না, দোষটা প্রয়োগের। আর দোষটা মেধার উন্নয়নের নামে ছোট মাথায় আরো জটিল কিছু অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ার।
স্টুডেন্ট মাঝে মাঝে পড়া না পারলে জিজ্ঞেস করি, “পড়োনি কেন?” উত্তর দেয়, “সময় পাইনি।” কিছু বলতে পারিনা। খারাপ লাগে ওদের এই মানসিক চাপ দেখে।
নিজে হয়তো ওদের বয়সে অতটা ভালো ছাত্র ছিলাম না। তবে ভালো লাগে এই ভেবে যে পড়ালেখার পাশাপাশি অনেকটা মুক্ত সময় পেয়েছি, খেলাধুলা করেছি, গ্রীষ্মকালে খেজুর গাছে উঠে খেজুর পেড়েছি, খালে পুকুরে ডুবিয়ে চোখ লাল করেছি, বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ভিজেছি, আরো কত কি করেছি। হয়তো ওদের মত বেশি বেতনে চাকরী করবো না, ছোটখাটো বেতনে একটা চাকরী করবো যাতে কোনমতে সংসার চলে যায়। তবুও আমি ভাগ্যবান যে অসম্ভব সুন্দর রঙ্গীন একটা কৈশোর পেয়েছি। আমি ভাগ্যবান যে আমার বাবা মা এদের বাবা মায়েদের মত না।

৮ thoughts on “শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি: শিক্ষার্থীদের যান্ত্রিক জীবনের যন্ত্রনা

  1. আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা
    আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন আগামাথা আছে? কি পড়ে? কেন পড়ে? উদ্দেশ্য কি? কেউ কি জানে? একটু আগেই ভাবছিলাম আমার দুই বন্ধুর কথা। দুইজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করেছে। একজন ফার্মেসিতে অনার্স করে এখন পুলিশের এএসপি। আরেকজন আইনে পড়ে এখন রেলে চাকরী করছে বিসিএস দিয়ে। তাইলে এইসব পড়ে কি লাভ হইল? আজব সিস্টেম।

    1. একজন ফার্মেসিতে অনার্স করে

      একজন ফার্মেসিতে অনার্স করে এখন পুলিশের এএসপি। আরেকজন আইনে পড়ে এখন রেলে চাকরী করছে বিসিএস দিয়ে।

      :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: এইজন্যেই দেশে মেধার মূল্যায়ন হয় না। এখানে এক পক্ষ নয় বরং উভয়েই দায়ী, প্রথমত কর্মস্থানের সংকুলান, দ্বিতীয়ত প্যাটের চাহিদা মিটাতে অনার্স পাস ছেলে চাকরী করে পিয়নের।

    2. উদ্ভট এক উটের পিঠে চলছে
      উদ্ভট এক উটের পিঠে চলছে স্বদেশ। যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এত গলদ সে দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম কতটা সুশিক্ষিত হবে সেটাই চিন্তার বিষয়।

  2. আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের
    আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের অলরাউন্ডার হতে সাহায্য করে। :নৃত্য: :নৃত্য:

    1. “ছেলে ভালো অলরাউন্ডার, কিন্তু
      “ছেলে ভালো অলরাউন্ডার, কিন্তু মাঠে নামলে বল পায় না।” আমাদের অবস্থাও সেরকম।

  3. টিউশন করতে গিয়ে মনে হয়
    টিউশন করতে গিয়ে মনে হয় স্টুডেন্ট এর বাপ-মারে ঘাড় ধইরা পড়াইতে বসাই।

    1. আমারও সেটাই ইচ্ছে করে। একটা
      আমারও সেটাই ইচ্ছে করে। একটা স্টুডেন্ট যে কি পরিমান চাপের মধ্যে থাকে তা আমরা বুঝি, কিন্তু অভিভাবকরা বোঝে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *