দুটি অণুগল্পঃ এক টুকরো ছেলেবেলা

ডাহুকের জন্য বিষন্নতা

‘কেউ ধরো না আমায়! ধরো! পড়ে গেলাম তো। দাদি কই গেছে? যাহ! পড়েই যাচ্ছি—’

চৌকি থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ছি। কিন্তু, ধীরে— এত ধীরে! চৌকি আর মেঝের মধ্যকার দূরত্ব এ…ই বড়জোর দুই মিটার! কিন্তু পড়ছি অন্তত সেই দশ সেকেন্ড ধরে। ইচ্ছা করছে অনন্ত কাল ধরে যেন এই ভাবে মেঝের দিকে পড়তেই থাকি। শূন্যের মাঝে বসত বাড়ি। কিন্তু পড়তে পড়তে এবার পৌঁছে গেছি মেঝেতে। আলতো করে মাটি স্পর্শ করে শরীর। আহ—!


ডাহুকের জন্য বিষন্নতা

‘কেউ ধরো না আমায়! ধরো! পড়ে গেলাম তো। দাদি কই গেছে? যাহ! পড়েই যাচ্ছি—’

চৌকি থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ছি। কিন্তু, ধীরে— এত ধীরে! চৌকি আর মেঝের মধ্যকার দূরত্ব এ…ই বড়জোর দুই মিটার! কিন্তু পড়ছি অন্তত সেই দশ সেকেন্ড ধরে। ইচ্ছা করছে অনন্ত কাল ধরে যেন এই ভাবে মেঝের দিকে পড়তেই থাকি। শূন্যের মাঝে বসত বাড়ি। কিন্তু পড়তে পড়তে এবার পৌঁছে গেছি মেঝেতে। আলতো করে মাটি স্পর্শ করে শরীর। আহ—!

দরজার কাছে পৌঁছে যাই। পরে মনে করতে চেষ্টা করেছিলাম, কীভাবে ওখানে গিয়েছিলাম; কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারিনি। শুধু মনে পড়েছিল, উঠোন থেকে কে যেন ডাকছিল সেই কখন থেকে! দরজা খুলে আমি মুখ গলায়, হাত দিয়ে তারা ইশারা করে উঠোনে নামতে। দরজার হাতল ছেড়ে উঠোনে নামতে আমার ভাল লাগে। ভয় করে না একটুও; বরং খুশি হয়ে ওদের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াই। খুব আপন লাগে এদের, অথচ তখন একটুও চিনতে পারছি না তাদের একটাকেও।

আমার খুব ভাল লাগে। বাড়ি থেকে একা কোথাও বের হবার সাহস নেই, অথচ একাই চলে এসেছি এত দূর! জায়গাটা চিনতে পারি: আমার নানির বাড়ির মোড়! কে যেন পেছন থেকে বলে ওঠে: মামা, তুমি এইখানে? কণ্ঠস্বরটা আবার কোথায় হারিয়ে যায়। আমিও তাহলে একা বের হতে পারি! খুশিতে হাত দুটো শূন্যে মেলে দেই; মাটির থেকে পা আলগা হয়ে শূন্যে ভাসতে থাকে। আমি উড়ছি! উড়ছি! দ্যাখো— দাদি, দ্যাখো আমি উড়ছি! ও মা—

মাথার ওপর ডাহুক ডাকে। গতকাল এই ডাহুক খাঁচার ভেতর থেকে পালিয়ে গেছিল, আমি ঠিকঠিক চিনতে পারছি! অনেক মন খারাপ ছিল ডাহুকটা হারিয়ে যাবার পর। আমার মনে হয় কে যেন ছেড়ে দিয়েছিল। নাহলে পালানোর কথা তো নয়! ও…! আমি তাহলে এই ডাহুক ধরতেই এখানে এসেছি? কিন্তু কই গেলো উড়ে উড়ে। এই গাছটার ডালেই না বসে ছিল! হয়ত বাড়ি চলে গেছে।

সামনে একটা দোকান, তা আবার ঘেরা আছে হলদে কারেন্টের বাতির আলোয়। এত রাত, অথচ এখনো খোলা। পাশে কয়েকজন ভবঘুরে কেরাম খেলছে। কাছে যাই। কিসের ভবঘুরে! এরা তো দেখছি সেই ছেলেরা! এরাই ত আমাকে ঘর থেকে বাহির করেছে। অন্ধকার ছেড়ে ওদের দিকে হাঁটা দেই। আবছা আলোয় ওদের ওদের এখন অনেক বড় বড় লাগছে। কাছে গিয়ে দাঁড়াই। বলি, ‘আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও।’ তবু খেলতেই থাকে। আবার বলি। ‘এইযে শুনছ, আমি বাড়ি যাব।’ এবার, ঘুরে তাকায়। শূন্য চোখে ও তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। কোনো কথা বলে না। অপরপাশের একজন ধমকে ওঠে: ‘কে তুমি?’ আমি চোখ তুলে তাকাই। কাঁধে দেখি সেই ডাহুক পাখি।

এখন আমি কার সাথে বাড়ি যাব! একা একা হারিয়ে যাব যে! ডাহুক চাই না আমি। আমি দাদির কাছে যাব। যদি হারিয়ে যাই? ‘কেউ আছেন?’ চিৎকার করে ডাকতে চাই। কিন্তু কথাগুলা মুখ থেকে জোরে জোরে বেরোবার সাহস পায় না। ভয় পাওয়া পায়ে, পা টিপে টিপে সামনে এগোই। অন্ধকার সামান্য পাতলা হয়ে আসছে। দানা দানা অন্ধকার। সেই অন্ধকারে বাড়ি ফেরার পথ হাতড়ে বেড়াই।

[আমার শৈশবের অন্যতম প্রিয় স্মৃতি]

২.
পোড়া পাণ্ডুলিপির আর্তনাদ

আমাদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে, উত্তর বন্দের ধার ঘেঁষে যে লম্বা আর প্রশস্ত রাস্তাটি চলে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চোরের মতো এদিক-ওদিক নজর বোলাই। চারপাশ ঘিরে আছে কুয়াশা; খুব ঘন করে না হলেও রাস্তা থেকে কেউ খেয়াল করলেও সহজে বুঝতে পারবে না বোধহয় যে, খানিক দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা আসলে কী করছি সেখানে! ধোঁয়া আর আগুন দেখে বড়জোর ভাবতে পারে ‘পোলাপাইন আগুন তাফাইতেছে’!

খাড়া সড়ক বেয়ে নিচে ঢালু ক্ষেতে নামার জন্য আমরা পা বাড়াই। রবিন আমার দিকে তাকিয়ে আহ্বান করে যে, আমি যেন সামনে থেকে আগে নামি। নিচে নামতে নামতে অনুভব করি, ভালো লাগার একটা অনুভূতি সমস্ত মন ছেঁয়ে আছে; তাদের জন্য কিছু করতে যাচ্ছি, তারা খুব খুশি হয়েছে এতে— ভেবে সুখ পাচ্ছি। এখানে আমরা সাতজন।

খোর্শেদ জানতে চায়, আমি কীভাবে বইগুলো যোগাড় করলাম। রশিদ ডানদিক থেকে খুশুর কৌতূহল মেটায়, ‘পাঠাগার থাইকা!’

আমি ব্যাপারটা তাদেরকে খোলাসা করিঃ আমি অশিদ-রে আগে কই পাঠাগারে এরহম এরহম বই আছে। সে আর আমি পাঠাগার থাইকা বইগুলা পড়ার কতা কইয়া বাইর করি। সঙ্গে উবেলও আছিল। হে তো টুফি আর পায়জাম-পাঞ্জাবি পইরা আছিল, তো পাঠাগারের বেঠি, অংকনের মাও, কয় কী, কয়— ‘মুন্সি মাইনসেও এইসব পড়ব নাহি?’ আমি তাড়াতাড়ি কইলাম— ‘না না! আমি একলাই।’ ‘দেইখো, পইড়া আবার য্যান আল্লারে ভুইলা যাইয়ো না।’

কথাগুলা বলার সময় যে বেশ উত্তেজিত ছিলাম, প্রথমে বুঝতে পারিনি; খেয়াল হলে দেখি— রাস্তা থেকে বেশ দূরে চলে এসেছি আমরা। এতগুলো মানুষ, আর তারা এখন বেশ উত্তেজিত, তাদের হাসিখুশি মুখ— এবং, তাদের এই সুখি হাসিখুশি মুখের একমাত্র উপলক্ষ আমি। এই সন্ধ্যাটাকে তারা উত্তেজনা আর সুখের অনুভূতিতে ভরিয়ে রাখতে পারছে নিজেদের একমাত্র আমার কারণে, ভেবেই তৃপ্তিতে ভরে ওঠে মন। কল্পনায় ভেসে ওঠছে একটা চিত্রঃ গোলাকার বৃত্তটায় আমি মাঝখানে। এরা সবাই মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর বলছে, ‘বাহ! আমরা সুখি! তুমি একটা কামের মতন কাম করছো, মিয়া!’

কোলকাতার বিখ্যাত এক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত, বেশ মজবুত বাঁধাই, পাতাগুলোও মোটা আর শক্ত; বাঁধাই খুলে খুলে ছড়িয়ে দিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। মোট তিনখণ্ডের শেষখণ্ড আইনাল হকের হাতে, সে ছিঁড়তে ছিঁড়তে আমাদের দিকে তাকায়, বইটার দিকে ইঙ্গিত করে বলে, ‘একটু পরেই তোরা সব মা আগুনের প্যাঠে যাবি। তারপর গু হয়্যা বাইর হবি।’ আমরা সবাই হেসে ওঠি জোরে জোরে।

রাস্তা দিয়ে কারোর পায়ের আওয়াজ ভেসে আসছে হঠাৎ। আমরা চুপ হয়ে যাই। কান খাড়া করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শব্দের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় থাকি। অন্ধকার থেকে এসে আবার অন্ধকারেই হারিয়ে যায় শব্দটা। কেউ একজন তাড়া দেয় আমাদের। রবিন শান্ত গলায় বলে ওঠে, ‘এতো ডরের কী আছে? কেউ আইলে কমু আগুন তাফাইতেছি।’ আমার দিকে ফিরে সমর্থনের আশায় আমাকে প্রশ্ন করে, ‘কি কও, চাচা?’

কে যেন ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে দেয়। তারপর হাতে ধরে রাখা কয়েকটা ছেঁড়া পাতার প্রান্তে ছোঁয়ায়। পাতা বেয়ে বেয়ে জ্বলে ওঠে আগুন। সেই আগুনের আলোয় তাদের মুখ ঝলমল করে ওঠে। সবার ভেতর থেকে কোনো একজনের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, ‘শালা, নাস্তিক!’ এখন বেশ একটা অগ্নিকুণ্ড হয়ে গেছে।

— বাড়ি কই এই লেহকের?
— কোলকাতায়।
— শালারে উবতা কইরা চুদন দরকার।
— এ রহম আরো পাইলে খালি জানাবা।
— আইচ্ছা
— তারপরের কাম আমগো।

পাতা পুড়ে কভারে পৌঁছে গেছে আগুন। শক্ত, তাই পুড়ছে ধীরে ধীরে— আমি চুপচাপ তাকিয়ে আছি ওটার দিকে। আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে প্রচ্ছদের বড় বড় অক্ষরে লেখা—
‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ (২য় খন্ড)
প্রবীর মিত্র

অপেক্ষা শেষ। যার জন্য এতোক্ষণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ছিলাম, তা শেষ। কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগছে চারপাশ। তাদের কথা-বার্তা, ঠাট্টা-তামাসা অসহ্য ঠেকতে শুরু করেছে। বইয়ের পাতার ছাইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার নিজের উপর খুব রাগ হলো। শার্টের কলার অহেতুক মোচড়াতে থাকি চুপচাপ; মাথা নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে অন্ধকারে ক্ষেতের জমিনে আঁকতে থাকি অহেতুক আঁকিবুঁকি। সব নিরর্থক ঠেকে আমার। একটু আগে যেগুলো আস্ত তিনটি বই ছিল, এখন তা-ই ছাই। সে জ্বলন্ত ছাইয়ের স্তুপের দিকে তাকিয়ে থাকি একমনে; চোখের সামনে ভেসে ওঠে সরল সোজা লাইব্রেরিয়ানের মুখ! পাঠাগারের অন্ধকার কোণ… কড়কড়ে পৃষ্ঠা… নতুন কাঠের গন্ধ… হঠাৎ মনে পড়ে যায়, আমার তো পুড়বার আগে সব কটা খন্ড পড়ে ফেলার কথা! উত্তেজনায় কথাটা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। নিজের বোকামিতে ঠোঁট কাঁপতে থাকে আমার।

১ thought on “দুটি অণুগল্পঃ এক টুকরো ছেলেবেলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *