কে বলতে পারে সে নিরাপদ

দেশকে নিয়ে নানা জনে নানা কথা বলছে । দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অনেকেই বলছেন, দেশের বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে দেশটা অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে এবং শান্তিকামী মানুষের বাসযোগ্যতা হারাবে । এ অবস্থার সৃষ্টির পিছনে যেমন রাজনৈতিক অস্থিরতা দায়ী তেমনি আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াও দায়ী । যে কারনে দেশের আমলা থেকে শুরু করে সমাজের নিম্নস্তরের ছিচকে চোর পর্যন্ত সবাই অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে । রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং পারস্পরিক আস্থাহীনতার কারনে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষ পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের প্রতিযোগীতা থেকে ধীরে ধীরে গতিশীলতা হারাচ্ছে । যার কারনে ক্রমান্বয়ে মানুষ অপরাধ প্রবনতায় ঝুঁকছে। এ নৈতিকতা বিবর্জিত অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র সমূহের নেতৃত্বে চলে আসবে । যা স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের কাম্য ছিল না । বিদেশী পরাশক্তি আমাদের দেশকে ঘোষণা ছাড়াই “বাফার এস্টেট’ হিসেবে যুগের পর যুগ ব্যবহার করে আসছে অথচ আমরা তাদের আচরণকে বন্ধুসুলভ মনে করে তাদেরকে কেবল আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত হই নি বরং তাদের প্রশংসায় এমন কতগুলো বাক্য ব্যবহার করেছি যাতে তাদেরকে আমাদের জনম-জনমের আপন মনে হয়েছে । অথচ সেই সকল পরাশক্তিগুলো আমাদের দেশেকে ঘিরে এমন সব ষড়যন্ত্র করেছে যার ফল ভোগ করছে দেশের গার্মেন্টস খাত, পাট এবং চা শিল্পসহ অনেক গুলো ক্ষেত্র । এ সকল ক্ষেত্রে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করে দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তিকে যেমন স্থিমিত করে দেয়া হয়েছে তেমনি দেশের বদনামগুলো বিদেশের কাছে উত্তম(!) কিছু বাক্যবানে প্রকাশিত হয়েছে । যার কারনে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন আমাদের দেশের তৈরি পোশাক নিতে সাময়িক অসম্মতি প্রকাশ করেছিল এবং আমেরিকা কর্তৃক বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বাজারকে প্রদত্ত জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে রেখেছে । সরকার কর্তৃক বারবার চেষ্টা করেও যখন জিএসপি সুবিধা আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে তখন সেই ব্যর্থ পাতিশৃগাল এর “আঙুল ফল টক’’ নীতি অনুকরণ করতে শুরু করা হলো । যে সরকার দেশের মানুষকে বারবার আশা দেখাল, অচিরেই কুটনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এবং তাদের শর্তগুলো পূরণ করে আমেরিকা থেকে জিএসপি আদায় করা হবে এখন সেই সরকারই বলছে আমাদের জিএসপি সুবিধার দরকার নেই । কারন হিসেবে তার উল্লেখ করছে, জিএসপি সুবিধা থাকা কালীন সময়ে আমাদের দেশে বর্হিবিশ্বের পোশাক বাজার থেকে যে পরিমান রেমিটেন্স এসেছে তার থেকে জিএসপি সুবিধা স্থগিতকালীন সময়ে বেশি পরিমান রেমিটেন্স এসেছে । সরকার যা বোঝাতে চায় তা দেশের বর্তমান প্রধান বিরোধীদল সরকার বোঝানো আগেই বুঝে ফেলে কিন্তু দেশের অনেক মানুষ এমন দুর্বোধ্য বিষয় কি করে এত সহজে বুঝবে ? দেশের জ্ঞানী এবং বিজ্ঞ মানুষগুলোই তো সরকার এবং বিরোধীদলের মধ্যে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে আছে সুতরাং দেশের অন্যান্য ‘ভাঙাকুলোরা’ সব কথা সহজে বুঝবে না । তাদেরকে বুঝানোর জন্য রাঙা চোখ যেমন ব্যবহার করতে হবে তেমনি লাঠিও ব্যবহার করতে হতে পারে ।

স্বাধীনতার পর আমরা যে দেশগুলোর প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে পড়েছি তার মধ্যে ভারত অন্যতম । কেউ কেউ দাবী করেছে, আমরা নাকি কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের সার্বভৌম শক্তিকে ভারতের কাছে বিসর্জন দিয়েছি । আমরা সার্বভৌম শক্তি বিকিয়ে দিয়েছি এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় । যদি সার্বভৌম শক্তিই বিকিয়ে দিয়ে থাকি তাহলে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকে কিরুপে ? তবে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, আমরা সার্বভৌম শক্তিকে বিসর্জন না দিলেও এমন এক শক্তিকে বিসর্জন দিয়েছি যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে । কথাটাকে ঠিক মত বুঝিয়ে বলতে না পারলেও একটি উদাহরণ টানা যেতে পারে । স্যার আলবার্ট আইনাস্টাইন সরাসরি ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানেন নি তবে গোটা বিশ্ব জগতের মূলে যে একটি শক্তি আছে সে কথা তিনি বারবার বলেছেন । তার মতে, ‘সে শক্তি ঈশ্বর না অন্য কিছু তা আমি বলতে পারি না তবে এমন এক শক্তি আছে যা গোটা বিশ্ব জগতের নিয়ন্ত্রক’ । যদি এরকম কোন শক্তি না থাকত তবে জগতে অবশ্যই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হত । যেহেতু জগতের কোন ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা নেই সুতরাং জগতের চালক হিসেবে কিছু একটা অবশ্যই আছে । তেমনি আমরাও ভারতকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব না দিলেও এমন এক ক্ষমতা দিয়েছি যার বলে ভারত আমাদেরকে নাকে রশি লাগিয়ে ঘোরাচ্ছে । লাগাম লাগানো ঘোড়ার মত আমরাও নিরুপায় । এ যেন ‘যেমনি নাচাও তেমনি নাচে, পুতুলের কি দোষ’ অবস্থা । যাদের কারনে আমাদের সর্বস্ব উজাড় করলাম সেই তারাই আমাদের সুজলা-সুফলা, শস্য শ্যামল বিস্তৃত সবুজ অঞ্চলকে মরুভূমিতে রুপ দিতে চাচ্ছে । ইতোমধ্যে সে প্রক্রিয়াও শুরু করে দিয়েছে । স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যতগুলো সরকার ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে তার মধ্যে আওয়ামী সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো । সেই খাতিরের মানুষদের চাওয়াকেও অগ্রাহ্য করে ভারত বাংলাদেশকে চুক্তিমত তিস্তার পানি দিচ্ছে না । যার কারনে তিস্তা যেমন বিস্তৃত ফুটবল মাঠে পরিনত হয়েছে তেমনি দেশের অন্যন্য নদীগুলো দিনকে দিন নাব্যতা হারাচ্ছে । সবচেয়ে বড় কথা, তিস্তার পানি না দেয়ার কারনে বাংলাদেশের সমগ্র উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিনত হচ্ছে । এ ধারা চলতে থাকলে সৌভাগ্যবান(!) বাঙালী জাতিকে হাজার টাকা ব্যয়ে বিমানের টিকেট কেটে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরুভূমি দর্শন করতে যেতে হবে না । তখন বাঙালীরা কবির ভাষায় বলতে পারবে, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর হতে কেবল এক পা ফেলিয়া/দেশের উত্তারাঞ্চলের মরু উপাত্যকাগুলি’ । বাঙালীর একটা স্বভাব হল তারা শুধু কৃতজ্ঞ নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষ মিথ্যুকও ! ভারত পানি দেয়না এটা কে বলেছে ? ভারত বাংলাদেশকে অবশ্যই পানি দেয় । ভারতে যখন পানির চাপ বৃদ্ধি হয় এবং তাদের সে পানি সামাই দিতে সমস্যা হয় তখন তারা ফারাক্কার বাঁধ খুলে দেয় । যার কারনে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ উত্তারাঞ্চলের ডজন ডজন জেলা পানির নিচে তলিয়ে যায় । বাংলাদেশীদের দাবী পূরণ করে ভারতীয়তরা তখন বুক ফুলিয়ে বলে, খালি পানি চাই পানি চাই কর । নে- আর কত পানি লাগবে । তাদের উদারতা দেখে আমরাও প্রীতীত হই । আহারে ! আমরাও যদি তাদের মত উদার হতে পারতাম !

‘রক্ষক যখন ভক্ষক হয়’ তখন অভাগা জাতির চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া উপায় থাকে না । ২০০৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে অপরাধীরা আশঙ্কাজনকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠার কারনে কয়েকটি বাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হল “র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান’’ । যার সংক্ষিপ্ত না দেয়া হল র‌্যাব । র‌্যাব প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই দেশব্যাপী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্যতীত সবার কাঝেই প্রশংসনীয় হয়ে উঠল । অপরাধীদের জন্য চরম আতঙ্ক হিসেবে সুনাম কুড়াতে থাকল দেশের আধুনিক ফোর্স র‌্যাব । দেশময় শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল আপদমস্তক কালো পোশাকের সুশৃঙ্খল বাহিনীটি । বেশ কয়েক বছর সুনামের সহিত দেশের বিভিন্ন আঙ্গিকে র‌্যাবের বিচরনে দেশের মানুষ চরম নিরাপত্তা পেল । দেশের মানুষের হৃদয়ের বাহিনীটির একাংশ হঠাৎ করেই বদলে গেল । হঠাৎ দেশের মানুষ র‌্যাবকে মুর্তিমান আতঙ্ক মনে করতে শুরু করল । বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডার ট্রাজেডির পর যখন এদের হত্যাকারী হিসেবে র‌্যাবের দিকে আঙুল উঠল তখনই দেশের মানুষ র‌্যাব সম্পর্কে খারাপ ধারনা পোষণ করতে শুরু করল । র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাতা বিএনপির চেয়্যারপারসন বেগম খালেদা জিয়া স্বয়ং র‌্যাবকে বিলুপ্ত করার জন্য সরকারের কাছে দাবী করেছে । নারায়নগঞ্জের ঘটনা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ । তবে এ ঘটনার সাথে যদি র‌্যাবের ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যায় তবে র‌্যাব বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে । বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাগুলো পূর্ব থেকেই র‌্যাবের বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের কারনে তাদের প্রতি ক্ষেপে আছে । সেই ইস্যুর সাথে যদি সেভেন মার্ডারের কোন ক্লুও র‌্যাবের বিরুদ্ধে যোগ হয় তবে তারাও র‌্যাবের বিপক্ষে জনমত গঠনে উঠেপড়ে লাগবে । বিডিয়ার বিদ্রোহের পর সে কলঙ্কের হাত থেকে তাদেরকে রক্ষা করার জন্য বিডিয়ারের নাম বদলিয়ে বিজিবি করে দূর্ণাম থেকে রক্ষা পাওয়া গেলেও র‌্যাব নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তাতে নাম পাল্টিয়ে বা অন্যকোন নামকাওয়াস্তের পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যার কতটুকু সমাধান করা যাবে তা সময়েই বিবেচ্য হবে ।

সরকারে পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ছাড়া কিংবা সামান্য তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে গ্রেফতার করেছে এবং এখনো করছে । নারায়ণগঞ্জে দায়িত্বপালনরত র‌্যাব-১১ এর যে তিনজন কর্মকতার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল উঠেছে তাদের ‘স্বেচ্ছায় বাধ্যতামূলক’ অবসর দেয়া হলেও কেন গ্রেফতার করা হলো না ? এমনকি আদালত অর্ডার করার পরেও কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না তা নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্ন দানা বাঁধছে । আইনজীবি ডা. তুহিন মালিক বলেছেন,‘‘ছেলে চুক্তি করে, জামাই বাস্তবায়ন করে, আর শ্বশুড় ম্যানেজ করে’’ । পুলিশ বাহীনির গড়িমসি কি তুহিন মালিকের কথাগুলোর সত্যায়ণ করছে না ? দেশের কোন একটি পত্রিকায় দেখলাম, তিনজন কর্মকর্তার একজনের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না । পুলিশ প্রশাসন যেদিন আদেশপ্রাপ্ত হয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করতে বের হবে সেদিন অন্যদের হদিস পাওয়া যাবে তো ? নাকি হদিস হারানোর জন্যই গ্রেফতার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছে ? যেমন সুযোগ দেয়া হয়েছিল সেভেন মার্ডার অন্যতম প্রধান আসামী নূর হোসেনকে । দেশে যে অবস্থা চলছে তা অত্যন্ত উদ্ধেগের । সরকার যদি আন্তরিকাতার পরিচয় দিয়ে এর লাগাম না টানার ব্যবস্থা করে তবে অচিরেই দেশের সকল মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পরবে । তাতে কি সরকার কি বিরোধীপক্ষ । সুতরাং যথাশীঘ্র দোষীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে দেশের মানুষের নিরাপত্ত নিশ্চিত করা সরকারের যৌক্তিক কর্তব্য । এ অবস্থার দায়ভার শুধু সরকারের একার উপর না চাপিয়ে এবং সরকারকে শুধু দোষ না দিয়ে বরং সকলে মিলে সরকারকে সহায়তা করে সবার নিরাপত্ত নিশ্চিত করতে হবে । সরকার এবং সকল জনতা এটা যত দ্রত উপলব্ধি করতে পারবে ততই দেশবাসীর জন্য তা মঙ্গলজনক হবে । মনীষী জাষ্টিনিয়ানের মতো আমরাও যেন বলতে পারি, “দেশ এবং দেশের মানুষের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন” ।

রাজু আহমেদ । কলাম লেখক ।
raju69mathbaria@gmail.com

৩ thoughts on “কে বলতে পারে সে নিরাপদ

  1. আমরা কেউই নিরাপদ নই। একমাত্র
    আমরা কেউই নিরাপদ নই। একমাত্র রাজাকারগুলাই জেলে নিরাপদে জনগণের টাকায় তিনবেলা ভক্ষন করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *