রংপুরের যত বধ্যভূমি (পর্ব-০৩) : “বাঙালিরা মুসলমান নয়। তাদের লাশের দাফন-কাফনের দরকার নেই”!

১৪ মে, রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক বেদনা বিধুর দিন। ১৯৭১ এর এই দিনে রংপুর শহরের ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন নিসবেতগঞ্জের আশপাশ এলাকায় এক বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায় পাক হানাদার বাহিনী। রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যা ঘাঘটপাড়ের গণহত্যা হিসেবে পরিচিত। সেই হত্যাকাণ্ডের ৪৩ তম বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে জীবন উৎসর্গ করা সেই সব বীর শহীদদের।

ঘাঘটপাড়ের বধ্যভূমি :


১৪ মে, রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক বেদনা বিধুর দিন। ১৯৭১ এর এই দিনে রংপুর শহরের ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন নিসবেতগঞ্জের আশপাশ এলাকায় এক বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায় পাক হানাদার বাহিনী। রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যা ঘাঘটপাড়ের গণহত্যা হিসেবে পরিচিত। সেই হত্যাকাণ্ডের ৪৩ তম বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে জীবন উৎসর্গ করা সেই সব বীর শহীদদের।

ঘাঘটপাড়ের বধ্যভূমি :

মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস সারা দেশের মতো রংপুর জেলার চিহ্নিত গণহত্যার স্থানগুলোতে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করতো পাক হানাদার বাহিনী। রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন অনেক বধ্যভূমি। সংস্কার ও সংরক্ষণে অবহেলার কারণে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে এই বধ্যভূমিগুলো। তেমনই একটি বধ্যভূমি হচ্ছে ঘাঘটপাড়ের বধ্যভূমি, যেখানে এনে হত্যা করা হয়েছিল ইপিআর বাহিনীর সদস্যদের। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি হায়েনার দল, “বাঙালিরা মুসলমান নয়। তাদের লাশের দাফন-কাফনের দরকার নেই” – এই কথা বলে লাশগুলো দাফনও করতে দেয়নি। এই লাশগুলো শেষ পর্যন্ত পড়েই ছিল ঘাঘটের পাড়ে।

১৯৭১-এর ১৪ মে শুক্রবার। মধ্যরাতে রংপুর শহরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকা সংলগ্ন নিসবেতগঞ্জের আশপাশ ছিল প্রায় জনমানবশূন্য। দু’একটি বাড়িতে যারা অবস্থান করছিলেন তারাও প্রাণভয়ে কোনো রকম শব্দ করার সাহস পায়নি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বহনকারী কনভয়ের গোঁ গোঁ শব্দে সচেতন হয়েছিল তাদের অনেকেই। মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর শুরু হলো একটানা গুলিবর্ষণ। প্রায় আধঘণ্টা পর পর থেকে থেকে আবার বিকট শব্দ। রাতেই এক সময় থেমে গেলো গুলির শব্দ। চলে গেল হায়েনাদের কনভয়।


(ছবি : শহীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ “রক্ত গৌরব”)

পরদিন ভোর বেলা সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে এলো আশপাশের গ্রাম থেকে কিছু মানুষ। তারা এসে দেখেছে অত্যন্ত ভয়াবহ চিত্র। একগাদা লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল ঘাঘট নদীর পাড়ে। সেদিন শহীদদের সবার পরনে ছিল খাকি পোশাক। হাত পেছনের দিকে বাঁধা। হতভাগ্যরা সংখ্যায় প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট জন। নিসবেতগঞ্জ এলাকাবাসীর ধারণা, শহীদেরা সবাই ছিল ইপিআর বাহিনীর সদস্য। লাশের তাজা রক্তে লাল হয়েছিল ঘাঘট নদীর পানি। লাশ থেকে নিঃসৃত রক্ত ঘাঘটের পানি তখন লালে লাল হয়ে রক্তের ঢেউ বয়ে গেল সেসময় ঘাঘট দিয়ে। প্রাণভয়ের মাঝেও স্থানীয় দু’চারজন সিদ্ধান্ত নেয় লাশগুলো দাফন করার।

ঐ দিন সকালে আটটার দিকে হঠাৎ করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেপরোয়া ভাবে ছুটে এলো চার-পাঁচটি আর্মি ট্রাক। উদ্ধত সঙ্গিন হাতে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ট্রাকে দাঁড়িয়ে ছিল। আশপাশের মানুষ প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। যে দু’চারজন আশপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ঘাতক সেনারা তাদের ধমক দেয়। ভয়ার্ত মানুষের উদ্দেশে সেনারা বলেছিল –

“লাশগুলো যেন সেখানেই পড়ে থাকে। বাঙালিরা মুসলমান নয়। তাদের লাশের দাফন-কাফনের দরকার নেই”।

বলেই ঘাতক সেনা দল চলে গেলো ক্যান্টনমেন্টের দিকে। ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ জন আস্তে আস্তে সরে যেতে শুরু করলেন। বেলা গড়িয়ে এক সময় দূরের মসজিদের থেকে ভেসে আসলো জুম্মার নামাজের আযান। এই লাশগুলো শেষ পর্যন্ত পড়েই ছিল ঘাঘটের পাড়ে। আজো এদের পরিচয় জানতে পারেনি এলাকার লোকজন। তবে স্থানীয় লোক জনের ধারণা এরা সবাই ছিল বন্দি ইপিআর বাহিনীর সদস্য।

ঘাঘটপাড়ের এ বধ্যভূমি এখন ভাঙ্গনের মুখে বিলীন প্রায়। রাস্তার পাশে থাকার পর অনেকেই জানে না এখানে ১৯৭১ সালে জীবন দিয়েছে ইপিআর বাহিনীর নাম-পরিচয় না জানা সদস্যরা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাদের একটাই পরিচয় ছিল তখন, তারা বাঙালি। এটাই ছিল তাদের অপরাধ। স্বাধীনতার ৪২ বছরেও এই বধ্য ভূমি সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এখানেই রাস্তার পাশে রয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ “রক্ত গৌরব”। যা স্মরণ করাচ্ছে শহীদদের কথা। অথচ অনেক দিনের দাবী মূল বধ্যভূমি সংরক্ষণের কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হলো না আজও। পথচারীরা ঐ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হয়তো আর কিছুদিন পরে সনাক্ত করতে পারবে না মূল বধ্যভূমি। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম। রংপুরের গণমানুষের দাবী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও শত শহীদের আত্মবলিদানের যে স্মৃতিগুলো এখনও অবশিষ্ট রয়েছে সেই সব সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। জেলার প্রতিটি বধ্যভূমিতে একটি করে কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হোক। সরকারীভাবে এখনই উদ্যোগ না নেয়া হলে হয়তো আগামী প্রজন্ম জানতেই পারবে না এখানে কেমন পৈশাচিকতার শিকার হয়েছিলেন তাদের পূর্বসূরি নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ।

কৃতজ্ঞতা : প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ রফিকুল ইসলাম গোলাপ, মুক্তিযোদ্ধা শাহ্‌ এমদাদুল হক।

তথ্য সূত্র :
১) মুক্তিযুদ্ধে রংপুর : মুকুল মুস্তাফিজ
২) রাজনীতি আমার জীবন : কাজী মোহাম্মাদ এহিয়া
৩) রংপুর জেলার ইতিহাস : জেলা প্রশাসন (২০০০ সালে প্রকাশিত)।

৮ thoughts on “রংপুরের যত বধ্যভূমি (পর্ব-০৩) : “বাঙালিরা মুসলমান নয়। তাদের লাশের দাফন-কাফনের দরকার নেই”!

  1. স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন দেয়া
    স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন দেয়া রংপুরের সেইসব বীর সেনানীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আর মহান আল্লাহতা’লার কাছে তাঁদের বেহেস্ত কামনা করছি, তা ঐ সেনানীরা যে ধর্মেরই হোউন।

  2. বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তাঁদের।
    বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তাঁদের। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনভাবে বেঁচে আছি।

    আর ধিক্কার জানাই নিজেদের।

  3. এইসব গনহত্যার বিচার চাই।
    এইসব গনহত্যার বিচার চাই। সবগুলা রাজাকারের ফাঁসি চাই। পোস্টের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

  4. মুক্তিযুদ্ধের সময়টার ভয়াবহতা
    মুক্তিযুদ্ধের সময়টার ভয়াবহতা সারা বাংলা জুড়ে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যে পুরোটা একসাথে কল্পনা করতেই কষ্ট হয়। উত্তর বাংলা ভাইকে অনেক ধন্যবাদ ধীরে ধীরে আমাদের কাছে এই ভয়ংকরতম হত্যাকান্ডের আসল চিত্রটা তুলে ধরার জন্য।

  5. বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তাঁদের।
    বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তাঁদের। মন্তব্য করেছেন : ডাঃ আতিক >>
    এইসব গনহত্যার বিচার চাই। সবগুলা রাজাকারের ফাঁসি চাই। পোস্টের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *