“ভিক্ষুক” (সত্য ঘটনাবলী অবল্বনে)

——————————————————————-
একবার এক বিত্তবান ব্যাক্তি বলেছিলেন, “বাংলাদেশ হচ্ছে একটি ফকিন্নীর দেশl এদেশ ফকিরে ভরপুরl” সেসময় কথাটা খুব গায়ে লেগেছিলl আরে,তুই নিজে পয়সা ওয়ালা হয়েছিস বলে কি অন্যদেরকে ফকিন্নী
ভাববি? মেজজটাই বিগড়ে গিয়েছিলl কিন্তু যখন পবিত্র শবে বরাত-শবে কদর রাতে ও দুই ঈদের নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হই, লোকটির মন্তব্যের সত্যতা প্রমাণ পাইl শত শত ভিক্ষুকের সবল হাত ভিক্ষার থালা পেতে দেয় আমার সামনেl বিশেষ করে শবে বরাতে শুধুমাত্র ঢাকাতে নাকি সারা দেশের লাখ লাখ ভিক্ষুক এসে জড়ো হয়l আর রাতভর চলে ভিক্ষা বানিজ্য!


——————————————————————-
একবার এক বিত্তবান ব্যাক্তি বলেছিলেন, “বাংলাদেশ হচ্ছে একটি ফকিন্নীর দেশl এদেশ ফকিরে ভরপুরl” সেসময় কথাটা খুব গায়ে লেগেছিলl আরে,তুই নিজে পয়সা ওয়ালা হয়েছিস বলে কি অন্যদেরকে ফকিন্নী
ভাববি? মেজজটাই বিগড়ে গিয়েছিলl কিন্তু যখন পবিত্র শবে বরাত-শবে কদর রাতে ও দুই ঈদের নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হই, লোকটির মন্তব্যের সত্যতা প্রমাণ পাইl শত শত ভিক্ষুকের সবল হাত ভিক্ষার থালা পেতে দেয় আমার সামনেl বিশেষ করে শবে বরাতে শুধুমাত্র ঢাকাতে নাকি সারা দেশের লাখ লাখ ভিক্ষুক এসে জড়ো হয়l আর রাতভর চলে ভিক্ষা বানিজ্য!

আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, ওদের কলেজের সামনে এক মধ্যবয়স্ক লোক প্রতিদিন টয়োটা’য় চড়ে সকাল সাড়ে ছটার দিকে এসে নামতl তারপর পাশের একটি দোকানে ঢুকে ভাল পোষাক পাল্টে ছেড়া-ফাটা জামা পড়ে ভিক্ষায় বসে যেতl আমার সেই বন্ধুটি শিক্ষা-যুদ্ধের সচেতন যোদ্ধা বিধায় সকাল থেকেই কোচিং ক্লাস করতl যার ফলে বিষয়টি তার নজরে আসেl বেশ কয়েকদিন এমনটি দেখার পর সে তার বন্ধু-বাহিনী সাথে নিয়ে লোকটাকে আচ্ছামত ধোলাই দিয়েছিলl সেদিনের পর থেকে নাকি তাকে আর দেখা যায়নিl

আমাদের দেশের অলিতে-গলিতে ভিক্ষুকের অভাব নেইl এদের কয়েকজনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট তো খুবই মজারl তেমনই এক ভিক্ষুককে এখনও ভুলিনিlবছর তিনেক আগের কথাl আমি আর আমার বন্ধু রাস্তায় হাঁটছিলামl আমাদের অবস্থা এমন ছিল যে দুজনের পকেটে গুগল-মার্কা সার্চ দিয়েও ফুটো পয়সাটি বের হবে নাl সেই কর্পদহীন অবস্থায় এক ভিক্ষুক আমাদের কাছে ভিক্ষা চাইলl বন্ধুটি মজা করে বলল,
-“চাচা, আপনারে কি ভিক্ষা দিমু? আমাগোরেই তো ভিক্ষা দেওন লাগবl”
ভিক্ষুকটি আমাদের অবাক করে ততক্ষনাৎ পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বের করে বলল,
-“এই নেন, আফনেগোরেই আমি ভিক্ষা দিলামl”
আমার বন্ধুটি টাকা ফেরত দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলlপরে আমাকে বলল,
-“দেখেছিস? ভিক্ষুকটার কি আত্নসম্মানবোধ? কখনো ভিক্ষুকদের সরাসরি ভিক্ষুক বলবি নাl”
বিজ্ঞ বন্ধুটির কথা শুনে হেসে বললাম,
-“ব্যাটা’র যদি আত্নসম্মানবোধ থাকত, তবে ভিক্ষা করত নাlআর যেখানে আমাদের কাছে একটি টাকাও নেই, অথচ সে কিভাবে পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার কড়কড়ে নোট বের করে দিল? নিশ্চয়, ভিক্ষা করে তার সেরকমই আয় হয়l

আমার বাসা একটি হাউজিং এলাকায়, যেখানে ভিক্ষুক ঢোকা নিষেধl তাই ঘরে থেকে ভিক্ষুকের কান্না জড়ানো আবেদন আমার কাছে পৌছায় নাl কিন্তু হাউজিংয়ের বাইরে চলতে ফিরতে অহরহই ভিক্ষুক দেখিl তাদের কথা মনে থাকার কথা নাl কিন্তু শত ভিক্ষুকের মাঝে একজনের চেহারা আমার স্পষ্ট মনে আছেl

তবে, আমি তাকে ভিক্ষুক বলতে নারাজ! কারন সে আর দশটা ভিক্ষুকের মত বেসুরে গলার অশুদ্ধ উচ্চারনে আল্লাহকে ডাকত না!জীর্ণ-শীর্ণ হাতটি কারও সামনে পেতে ধরত নাl সে শুধু বসে থাকতl রাস্তার একপাশে,জবথুবু হয়েl মাঝে মাঝে আঁচলে দিয়ে চোখ মুছতl তাকে প্রতিদিনই দেখতাম,স্কুলের যাবার পথেlমাঝে মাঝে কিছু দেওয়ার ইচ্ছে হতl কিন্তু পকেটে থাকত মাত্র দশ টাকা! দুপুরে টিফিনে আমারও যে ক্ষুধা লাগবেl তার ক্ষুধার চেয়ে আমার ক্ষুধাটাই প্রাধান্য পেতl তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে দিতামl যখন পরীক্ষা দিতে যেতাম, তার আগেl কারন পরীক্ষা উপলক্ষে বাসা থেকে টাকা একটু বেশি দিয়ে দিতl যেদিন পরীক্ষার রেজার্ল্ট বের হবে, সেদিন কষ্ট করে হলেও দিতামl যেন এই ক্ষুদ্র দানের ফলে রেজার্ল্টটা ভাল আসে!তবে প্রতিবার যখনই আমি তাকে টাকা দিতাম, তার মাথায় হাত বুলিয়ে যেতামl

একদিন খুব ভোরে বাসা থেকে বের হয়েছিl দেখি একটি অল্প বয়স্ক মেয়ে সেই বৃদ্ধা মহিলাটিকে রাস্তার পাশে বসিয়ে রেখে চলে যাচ্ছেl আমি বৃদ্ধার কাছে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলামl সে তার কম্পিত গলায় যা বলল তাতে জানতে পারলাম, তার মেয়ে পাশের গার্মেস্টসে চাকরি করেl প্রতিদিন সকালে তাকে এখানে দিয়ে যায় আর রাতে কাজ থেকে ফেরার পথে আবার সাথে করে নিয়ে যায়l তার দুটো ছেলেও আছেl কিন্তু তারা কেউই বৃদ্ধ মায়ের খোজঁটি পযর্ন্ত নেয় নাl রিক্সা চালক স্বামীর সংসারে থেকে একমাত্র মেয়ে নিজের মাকে আর কতটুকু সাহায্য করবে?তাই নিজের অন্নের জোগান নিজেই করছেনl
বৃদ্ধার কথা শুনে খুবই কষ্ট লেগেছিলl ঠিক করলাম, মাকে বলে সামনের রোজার ঈদে ওনাকে জাকাতের কাপড় ও কিছু টাকা দেবl

রোজার পরেই টেস্ট পরীক্ষাl তাই সে সময় পড়ালেখা নিয়ে ভীষন ব্যাস্ত সময় কাটাতে হলl ঈদের পরের সময়টাও ব্যস্ততার মধ্যেই কাটালামl দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষাও এসে পড়লl প্রথম পরীক্ষা দিন যখন বাসা থেকে বের হলাম, হঠাৎ সেই বৃদ্ধা মহিলার কথা মনে পড়ে গেলl কিন্তু বৃদ্ধা মহিলাটিকে খুঁজে পেলাম নাl এরপর প্রতিটি পরীক্ষার সময় বাসা থেকে বের হয়েই ওনাকে খুজঁতাম, পেতাম নাlএরপর তাকে আর কখনও দেখিনিl

সেই জায়গাটিতে এখন এক পাগলী বসেlপথ চলতে চলতে তার আকুল আবেদন আমার কানে বাজে- “ও বাই, কিছু খাইতে দেনl” মনটা খচখচ করে ওঠেl পকেট থেকে দশ টাকার নোট বের করে দেইl আর মনে পড়ে যায় সেই বৃদ্ধা মহিলার কথা,যাকে কিছু দেব ভেবেছিলামl কিন্তু দেয়া হল নাl ওনার অনেক বয়স হয়েছিলl হয়তো মারা গেছেনl মাথা থেকে চিন্তাটা দূর করে সামনে এগিয়ে যাইl আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে এসব ছোটখাটো ব্যাপারগুলো মনে রাখলে চলবে না
——————————————————————–
llমাস ছয়েক পূর্বের আমার পুরোনো স্টাইলে লেখা গল্পl শব্দের কোররূপ সম্পাদনা ছাড়াই পোস্ট দিলামll
——————————————————————–

৪ thoughts on ““ভিক্ষুক” (সত্য ঘটনাবলী অবল্বনে)

  1. -“দেখেছিস? ভিক্ষুকটার কি
    -“দেখেছিস? ভিক্ষুকটার কি আত্নসম্মানবোধ? কখনো ভিক্ষুকদের সরাসরি ভিক্ষুক বলবি নাl”
    বিজ্ঞ বন্ধুটির কথা শুনে হেসে বললাম,
    -“ব্যাটা’র যদি আত্নসম্মানবোধ থাকত, তবে ভিক্ষা করত নাlআর যেখানে আমাদের কাছে একটি টাকাও নেই, অথচ সে কিভাবে পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার কড়কড়ে নোট বের করে দিল? নিশ্চয়, ভিক্ষা করে তার সেরকমই আয় হয়l

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *