রাক্ষুসি

সেই সময়টা কেমন ছিল,যখন নারীদের প্রায় বন্দি করে রাখা হত ঘরের চার দেয়ালের মাঝে?যখন তখন স্ত্রীকে পেটানোকে সামাজিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হত,সেই সময়টা কেমন ছিল?ভবিষ্যতে স্বামি মরে যাবার ‘যোগ’ আছে বলে যখন বিয়ে হওয়ার আগেই একটা মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে দেয়া হত-এবং এই ‘সামাজিক অমার্যাদা’র কারণে সেই মেয়েটির আর কখনও বিয়ে হতনা,সেই সময়টা আসলে কেমন ছিল?সেই সময়ে কি এখনকার মতই বৈশাখে উঠত ঝড়?বৃষ্টিতে ডুবে যেত ঘরের আঙ্গিনা?যে সময়টাতে বিয়ের রাতে ছোট মেয়েটিকে ‘বৈধ ধর্ষন’ করা হত পতিদেব কর্তৃক-সেই সময়টা আসলে কেমন ছিল?সেই সময়েও কি কোন নারীর মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠত না?কোন নারী কি সব ভেঙ্গে চুড়ে বের হয়ে আসত তখন?কিংবা বের হয়ে আসার কথা ভাবত?হয়তো ভাবত,না হলে যেসব নারিদের ডাকিনী,যোগিনী,ডাইনি কিংবা রাক্ষুসি হিসেবে পুড়িয়ে কিংবা অন্য কোন ভাবে মেরে ফেলা হত তারা কারা? তারা নিশ্চয়ই সেই সব নারী-যাদের রক্তে ছিল তেজ,মনে ছিল বিদ্রোহের আগুন।যারা জীর্ণ ধ্বংসস্তূপ হতে সব লন্ড ভন্ড করে দিয়ে নতুন করে গড়তে চেয়েছিল সব কিছু!সেই অগ্নিকন্যাদের,যাদের অগ্নিতেই ভস্মীভূত করতে হত-তাদের বলা হত ‘রাক্ষুসি’।

প্রচলিত নিয়ম ভেঙে দিয়ে,মনের সুখ খুজতে যারা ‘ভদ্র সভ্য সমাজ’কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিল তারাই কি রাক্ষুসি?তাহলে আমার জন্ম যে নারীর গর্ভে তাকেও কি রাক্ষুসি বলা চলে?হ্যা,না হলে পাড়া প্রতিবেশি,আত্মীয় স্বজন আমার জন্মদাত্রি কে কেন রাক্ষুসি,ডাইনি বলে?হ্যা যিনি আমার জন্মদাত্রি,যাকে আমি ডাকি মা বলে,তিনি তাহলে রাক্ষুসিই!রাক্ষুসি না হলে তিনি কি করতেন?গুমরে মরতেন চার দেয়ালের মাঝ,কিংবা অভিনয় করে যেতেন সারা জীবন-আদর্শ মায়ের,আদর্শ স্ত্রীর?অভিনয়?হ্যা অভিনয়ই তো।আমরা সবাই অভিনেতা।কে করিনা অভিনয়?কার মুখে নেই কোন মুখোশ?এই আমি,আমার মুখে কয়টা মুখোশ-একটা,দুইটা,তিনটা?নাকি আরও বেশি?

আমি কি সেই নারীকে,যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম তাকে,রাক্ষুসি বলে ভাবি?ভালবাসি আমাকে জন্ম দেয়ার জন্য না ঘৃণা করি আমাকে অতল অন্ধকারে নিক্ষেপ করে দেয়ার জন?হয়তো আমার একটা মুখোশে আছে ভালবাসার আদ্রতা,আরেকটা মুখোশে আছে ঘৃণার তীব্রতা।মুখোশের আড়ালে চাপা পড়তে পড়তে আমার আসল চেহারাটাই হারিয়ে গেছে-ভুলে গেছি আমি আসলে কে?কেমন ছিলাম?সেই মুখোশ গুলো সড়িয়ে সড়িয়ে আসল চেহারাটা বের করা সম্ভব না,তাই জানাও সম্ভব না-আমি সেই নারীকে যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম তাকে,ভালবাসি না ঘৃণা করি।

যে নারী আমার জন্মদাত্রী,যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম-তাকে কি কেবলই একজন নারী হিসেবে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব?যদি কল্পনা করি কিংবা করার চেষ্টা করি তার ‘মা’ পরিচয়ের বাইরে তিনি একজন নারী,একজন ‘মেয়ে মানুষ’ তাহলে ব্যাপারটা আসলে কেমন দাঁড়াবে?তখন কি মা পরিচয়ে তাকে ঘৃণা করব বা ভালবাসব নাকি একজন নারী পরিচয়ে সবাই যে নারীকে বলে রাক্ষুসি-সেই পরিচয়ের জন্য বাহবা দিব?কারণ তিনি রাক্ষুসি,তিনি সমাজ নামক হাস্যকর ব্যবস্থাকে শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলি নয়,হাতের পাচ আঙ্গুলই দেখিয়ে দিয়েছে।সেই জন্যতো তাকে বাহবা জানাতেই হয়।দারুন দারুন!তালিয়া!


সুলতানার আজ মন ভাল নেই।মনটা উতলা হয়ে আছে।মন খারাপ হবার নির্দিষ্ট কোন কারন নেই তবে অস্থির হবার যথেষ্ট কারণ আছে।সুলতানার বাবা হাট থেকে তার মেয়েদের জন্য শাড়ি চুড়ি সহ নানা রকম জিনিস পত্র এনেছেন-যেটা তিনি সচরাচর করেন না।যেহেতু এই কাজটা তিনি এমনিতে করেন না,তাই তার কোন ধারণাও নেই।ফলে তিনি আসলে বুঝতে পারেননি-চার মেয়ের জন্য আলাদা আলাদা ভাবেই কেনা দরকার ছিল!প্রসাধন সামগ্রি নিয়ে সুলতানার অন্য তিন বোন কাড়াকাড়ি লাগিয়ে দিয়েছে,যেকোন সময় সেটা চুলোচুলিতে রূপ নেবার সম্ভাবনা প্রকট।সুলতানা বরাবরই চুপচাপ,নিরীহ গোছের।সে এই সব জিনিসের প্রতি কোন আগ্রহ বোধ করছে না।তার মন অস্থির।কারন তার কাপড়ের ব্যাগটাতে যে জিনিসটি আছে সেটার চিন্তাতেই সে অস্থির।ব্যাগটি চোখে চোখে রাখছে সে।জিনিসটা নিয়ে কি করবে বুঝে উঠতে পারছেনা।

কামাল যখন জিনিসটা তাকে দিয়ে বলেছিল,”সাবধানে রেখ এটা।আমার পিছনে লোক লাগিয়ে রেখেছে ওরা।যেকোন সময় পুলিশও ধরতে পারে।কিছুদিন পালিয়ে থাকতে হবে।জিনিসটা যেন হাতছাড়া না হয়।”
এই অল্প কটি কথার সাথে সুলতানার হাতে গুজে দিয়েছিল এক টুকরো কাগজ!যে কাগজের জন্য সুলতানা এক একটা নির্ঘুম রাত কাটাতো।কাগজ গুলোতে অল্প কিছু কথা লেখা থাকত।কিন্তু সেই কথা গুলোই বারবার করে পড়তো সুলতানা।কাগজের প্রতিটা শব্দকে মনে হত স্বর্গ হতে আসা পবিত্র বানী।সব গুলো কাগজকে সে খুব যত্নের সাথে লুকিয়ে রেখেছে।যদিও কামাল বলেছিল কাগজ গুলো পড়ার পর ছিড়ে ফেলতে।কিন্তু ছিড়ে ফেলতে গিয়ে মনে হচ্ছিল সে যেন তার কলিজাটা ছিড়ে ফেলছে!

বড় দুবোনের বিয়ে হয়ে গেছে।সুলতানার জন্য এখনও পাত্র দেখা শুরু হয়নি,তবে যেকোন সময়ই শুরু হয়ে যাবে।প্রস্তাব আসা শুরু করবে নানা দিক থেকে।ভাল ঘরের সুন্দরি মেয়েদের বিয়ে আটকে থাকেনা।সমস্যা সেখানেই,সুলতানার যাবতীয় চিন্তাও সেখানে।সুলতানা খুব ভাল করেই জানে কামালের পরিবারের সাহসও হবেনা তাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দিতে।তাহলে কি হবে এখন?কামাল কে ছাড়া বাচার কথা চিন্তাও করতে পারেনা সুলতানা।কিন্তু কামালের এসব নিয়ে কোন চিন্তা আছে বলে মনে হয়না।তাছাড়া ওরকম একটা ভয়ংকর জিনিস দিয়ে কামাল করেটা কি?ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সুলতানা,তার সাথে আজ ঘুমিয়ে আছে আকাশের চাদটাও,আজ যে অমাবস্যা!

সুলতানার বাবা আমজাদ হোসেন রাশভারি মানুষ।একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন-গ্রামের রাজনীতি তিনিই নিয়ন্ত্রন করেন এখন।আমজাদ হোসেনের বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে যাবার সময় গ্রামের মানুষেরা মাথা নীচু করে হাটে,ফিসফিস করে কথা বলে-কেউ শ্রদ্ধায় কেউবা ভয়ে।সকালের রোদে বসে চা খাওয়া আমজাদ হোসেনের বহুদিনের অভ্যাস।এসময় তিনি সাধারণত কারও সাথে দেখা করেন না।বাড়ির উঠোনে বসে নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন।এসময় বরাবরই তার মন মেজাজ থাকে ফুরফুরে।আমজাদ হোসেনের দুই ছেলে,চার মেয়ে।বড় ছেলেটি ঢাকায় থাকে,ভাল চাকরি করে।চার মেয়ের মধ্যে দুজনের বিয়ে দিয়েছেন,বিবাহ যোগ্য আরেকটি কন্যা রয়েছে-সুলতানা।এর পরের দুজন এখনও শৈশবের গন্ডি পেড়োয়নি।

আজ আমজাদ সাহেবের মনটা একটু বেশিই ফুরফুরে।এবার ধানের ফলন বেশ ভাল হয়েছে।ভাল লাভ হবে বলে মনে হচ্ছে।ছোট ছেলেটিকে আসতে দেখা গেল।গটগট করে সে বাবার সামনে এসে দাড়ালো।বলল,”আব্বা তুমি বুবুর জন্য খেলনা পিস্তল আনছ,আমার জন্য আনো নাই কেন?”
আমজাদ সাহেব অবাক হয়ে বললেন,”কে কইলো তোর বুবুর জন্য পিস্তল আনছি?”
ছোট ছেলেটি জবাব দিল,”ঐ যে বুবুর ব্যাগের মধ্যে পিস্তল।”

আমজাদ সাহেবের মুখ শক্ত হল।আকাশে এই সকালেই মেঘ করেছে।খুব বড় ঝড় উঠবে বলে মনে হয়।


জীবন কারও জন্য থেমে থাকেনা।অনেকের মা মারা যায়না,তারা কিভাবে থাকে?-এই কথা গুলো দিনের মধ্যে কতবার শুনতে হয় সেটা হিসেব করা হয়নি।এদের কথা শুনে মনে হয় আমি অসহায়,মাতৃ শোকে মরে যাচ্ছি।আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়।পুরো ব্যাপারটি আমি উপভোগ করছি।এই যে মানুষ গুলো আসছে আমাদের সহানুভূতি জানাতে এরা বেশিরভাগই এই ঘটনায় আনন্দিত না হলেও খুশি হয়েছে।মনে মনে বিদ্রুপের হাসি হাসছে।গ্রামের বাড়ি থেকে আমার ফুপু এসে হাজির হয়েছেন আমার একমাত্র ফুপাতো বোনকে নিয়ে।এসেই বাসায় কয়সেটা থালা বাসন আছে,কোথায় কি আছে সেগুলোর তদারকি শুরু করেছেন।আর হা হুতাশ করে বলছেন,আমাদের আর কোন ভয় নেই-তিনি এসে গেছেন!

আরেকদল আছে যারা আমাদের নিয়ে এতই হা হুতাশ করছেন যে মনে হচ্ছে তাদের সহমর্মিতার চাপে কখননা আবার এই চার তলা ভবনটা ভেঙে পড়ে!মা ছাড়া আমাদের চলবেই না,তাই যেকরেই হোক একজন মা ধরে আনতেই হবে-এটাই তাদের মতামত।বাবাকে পিড়াপিড়ি করছে এই দলের আত্মীয়রা।একটা ‘মেয়ে’ গেছেতো কি হয়েছে-বাজারে আরও ভাল ভাল মেয়ে পাওয়া যায়,একটা ধরে আনলেই হবে!এ আর এমন কি?একটা মা গেছে তো নিউমার্কেট থেকে আরেকটা মা কিনে আন!

রাক্ষুসি বলে যাকে ডাকা হচ্ছে,যিনি আমার জন্মদাত্রি,যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম-তার অভাব কি আমি বোধ করছি?না এই মুহুর্তে আমি তার কোন অভাব বোধ করছি না।বরং একটা স্বাধীনতা পাচ্ছি বলে আনন্দিত হচ্ছি।এই হতচ্ছাড়া আত্মীয়ের দল বিদায় হলেই বাসাটায় আমি একা।যখন যা ইচ্ছা তাই করা যাবে,প্রতি পদে পদে প্রশ্ন করার কেউ থাকবেনা।খেতে ইচ্ছা না হলে খাবনা-কেউ ধমক দিয়ে খাওয়াবেনা।যখন ইচ্ছা বাইরে যাব,কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবেনা কই যাচ্ছি,কেন যাচ্ছি।বাহ!এর থেকে আনন্দের আর কি হতে পারে?এটাই তো স্বাধিনতা।আমি চাইলে এখন যেকোন কিছু করতে পারি।এমনকি খালি বাসাতে কোন মেয়েকে নিয়ে এসে ফূর্তিও করতে পারি।ঘরে বসেই টানতে পারি বেনসন অ্যান্ড হেজেস!আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে!

জোকার টাইপ আত্মীয় স্বজনরা এক সময় হতাশ হয়ে চলে গেল।আমার বাবাকে তারা দোকান হতে আমাদের জন্য মা খরিদ করাতে রাজি করতে পারেনি।সর্বময় নিয়ন্ত্রন নেয়া আমার একমাত্র ফুপু দেখলেন তার এই রাজ্য দখল আমরা ঠিক আমলে নিচ্ছিনা-তখন তিনি হতাশ হয়ে রাজ্য ত্যাগ করে চলে গেলেন।অতঃপর আমিই রাজ্যের সর্বময় কর্তা।বাবা সকালে অফিসে চলে যাবার পর আমি স্বাধিন।অনন্ত স্বাধীনতা!এই যেমন আমি আজ সকালে দুপুরে খাইনি,আমার খাবার কথা মনেও নেই।কেউ খাবার জন্য আমাকে বিরক্ত করেনি!বিকালে যখন জ্বরে বিছানায় পড়ে রইলাম তখন কেউ মাথায় হাত দিয়ে,কেমন লাগছে জিজ্ঞেস করে বিরক্ত করেনি।জ্বরের ঘোরে কি চমৎকার সব স্বপ্ন দেখলাম,মা নামের কোন চরিত্র এই মুহুর্তে থাকলে কি আর এই স্বপ্ন গুলো দেখা সম্ভব হত?হতনা।

জ্বরের ঘোরে আমি নাকি ভুলভাল বকছিলাম,বাবা তো তাই বলল।বাবা আবার এই নারীকে যিনি কিনা আমাকে জন্ম দিয়েছেন তাকে রাক্ষুসি বলে সম্বোধন করল।বাহ আমি তো তাকে নিয়ে গর্ব করতেই পারি।আমি নাকি বলছিলাম,”আমি স্বাধীন।মা দেখে যাও আমি স্বাধীন।মা, মা গো।”

এই প্রথমবার ঢাকায় এসেছে সুলতানা।কি বিচিত্র শহর।ছোটবেলা থেকে কত গল্প শুনেছে এই শহরের।কিন্তু বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকলেও কিছুই দেখছেনা সুলতানা।কিছু দেখার নেই তার,যেখানে নিজের জীবনের সামনের পথটাই অন্ধকার সেখানে রাস্তার চাকচিক্য কিভাবে আলোকিত করবে?আসার পথে বাবা তার সাথে একটা কথাও বলেননি।সুলতানা যাচ্ছে তার বড় ভাইয়ের বাসায়।বড় ভাই বাসা করার পর এই প্রথম ঢাকায় আসলো সে।কিন্তু কোন উত্তেজনা বোধ করছেনা সে।উত্তেজিত হবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে সুলতানা।কি হবে বা কি হতে পারে-এটা নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয় সে।

আমজাদ হোসেন সাহেব এখন একটু নিশ্চিন্ত বোধ করছেন।অনেক বড় বিপদ সামাল দেয়া গেছে।কামাল কে ধরা গেছে,অস্ত্র সহ তাকে পুলিশে দেয়া হয়েছে-বের হতে অনেক সময় লাগবে বলেই মনে হয়।সুলতানাকে নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন তাড়াহুড়ো করেই,কারণ একটা ভাল ছেলে পাওয়া গেছে।সম্ভ্রান্ত পরিবারের,ছেলে ঢাকায় থাকে,ভাল চাকরি করে।যদিও বয়সের পার্থক্যটা একটু বেশিই,তবে সেটা কোন ব্যাপার না।দু এক দিনের মধ্যেই কাজটা শেষ করে ফেলতে হবে।সুলতানাকে এখনও কিছু জানানো হয়নি।তিনি সুলতানার সাথে একটা কথাও বলেননি।যা বলার তার বড় ছেলেই বুঝিয়ে বলবে।

বিয়ের কথায় সুলতানার কোন ভাবান্তর হলনা।যেন সে অনুভূতিহীন একটা যন্ত্র।সে নিরুপায়।নিয়তি মেনে নেয়া ছাড়া তার আর কোন বিকল্প নেই।সুলতানাদের আর কোন বিকল্প থাকেনা,কখনও ছিলনা।

না,আজ প্রমানীত হল আমি ভীতু প্রকৃতির মানুষ।এটা অবশ্য আমি আগেই জানতাম,আজ নিশ্চিত হলাম।ভাবছিলাম মানুষ নিজেকে বিসর্জন দেয় কিভাবে?অবশ্য আমি নিজেকে বিসর্জন দিতে চাইনি।আমি একটা পরিক্ষা করতে গিয়েছিলাম।ঠিক যে মুহুর্তটায় আমি চারতলা দালানের ছাদ হতে লাফ দিব,ঠিক সেই সময়ে আমার মনের অনুভূতি কি হবে?ঠিক সেই সময়টাতে আমি কি ভাবব?অভিকর্ষজ ত্বরনে পড়ব বলে ওজন শুন্য লাগার কথা,অবশ্য মাত্র চার তলা দালান বলে বিষয়টা অনুভূত হবার আগেই মাথা থেতলে যাওয়ার কথা।কিন্তু না,শেষ পর্যন্ত পরিক্ষাটি করতে পারলাম না।সাহস হলনা।আমি আসলেই ভীতু প্রকৃতির।এই জন্যই আজ পর্যন্ত কোন মেয়েকে বলতে পারলাম না-আমি তোমাকে ভালবাসি!

আচ্ছা,কোন মেয়েকে আমি এখন কি বলব,”আমি তোমাকে ভালবাসি?আমাকে তুমি ভালবাসবে?আমি কিন্তু স্বাধিন মানুষ।আমাকে যে নারী জন্ম দিয়েছেন,যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম সে কিন্তু একজন রাক্ষুসি।তুমি কি একজন রাক্ষুসির গর্ভযাত সন্তান কে ভালবাসবে?”

সিগারেটের অভ্যাসটা নতুন হয়েছে।সিগারেট জিনিসটা বিস্বাদ,তবে কোথায় যেন একটা শান্তি আছে।কোথায় যেন!পড়াশুনা নামক কোন একটা কিছু কোন এক কালে করতাম।এখন করিনা।স্বাধিন মানুষেরা পড়াশুনা করেনা।আমি এখন সত্যিকারের স্বাধিন মানুষ।যা ইচ্ছা তাই করতে পারি আমি।আমাকে বাধা দেয়ার কেউ নেই।যখন ইচ্ছা বাসায় আসি আমি,কারন আমার জন্য বাড়িতে কেউ অপেক্ষা করে নেই।না খেলেও কিছু যায় আসেনা,কারন আমার জন্য খাবার নিয়ে কেউ বসে নেই।

তবে একসময় ছিল।কি পরাধীনই না ছিলাম সেই সময়টাতে।একজন নারী যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম তিনি আমার জন্য খাবার নিয়ে বসে থাকতেন।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেই অস্থির হয়ে যেতেন যদি আমি বাড়ি না ফিরতাম।ভাবুন একবার কি পরাধিন অবস্থা!কিন্তু এখন আমি স্বাধিন।আমার জন্মদাত্রি,যাকে আমি মা ডাকি কিংবা ডাকতাম,যাকে সবাই এখন রাক্ষুসি বলে-তাকে নিয়ে আমি এখন গর্ব করতে পারি।পারি না???

সময় হল সব থেকে রহস্যময় বস্তু।সবাই মনে করে সময় হল পানির মত সরল সোজা কোন একটা বিষয়,আসলে তা নয়।সময় কখন আসে,কখন যায়,আবার হারিয়ে যাওয়া সময় কখন আবার ফিরে আসে-কেউ বলতে পারেনা।সুলতানার তাই মনে হচ্ছে।কত গুলো বছর কেটে গেল জীবন থেকে।কতগুলো বছর!কিভাবে গেল?সুলতানার কোন অভাব নেই।সব আছে তার।সুন্দর ছোট্ট সংসার।মা-বাবা,ভাই বোনেরা সবাই এখন ঢাকায়।সবাই একসাথে থাকে।বিয়ের এক বছরের মাথায় কোল জুড়ে এসেছে এক দেব শিশু!হ্যা দেবশিশুই বটে,কি সুন্দর মায়াকারা চেহারা।ছোট বেলায় ছেলের কপালে কাজল কালো টিপ লাগিয়ে দিত সুলতানা।যেন কারও নজর না লেগে যায়।গোলগাল চেহারার ছেলেটির বিদেশীদের মত গায়ের রঙ!এই ছেলেকে নিয়েই সারাটা দিন কাটতো সুলতানার।

দেখতে দেখতে সেই ছেলেও আজ কত বড়।মাধ্যমিক দিয়ে এখন কলেজে পড়ছে।তার নিজস্ব জগত আছে।ছেলেটি বড্ড বই পাগল।ক্লাসের বই মোটেও পড়েনা,গল্প উপন্যাসে ডুবে থাকে।সুলতানা বাধা দেয়না।ছেলে যে ক্লাসের বইয়ের ভিতরে লুকিয়ে গল্পের বই পড়ছে সেটা বুঝতে পারে সুলতানা-কিন্তু কিছুই বলেনা,পড়ুক না।তারও এমন বই পড়ার অভ্যাস ছিল কিশোরি বেলায়।সুখের সংসার এখন তার!আসলেই কি তাই?সুখ কি?ঠিক কোন জিনিসটা থাকলে একজন মানুষ বলতে পারে আমি সুখী?

সুলতানা কি সুখি?সুলতানা জানেনা সে সুখী কিনা।সেই বহু বছর আগে যখন ঢাকায় এসেছিল সুলতানা বাবার সাথে,সেই সময় থেকে সে যন্ত্র হয়েই আছে।যন্ত্র যেমন কাজ করেই যায়,কারণ কাজ তাকে করতেই হবে-সুলতানাও তেমনি এতগুলি বছর তার কর্তব্য করে গেছে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে।কেউ বলতে পারবেনা সুলতানা ভাল না।শ্বশুড় বাড়ির লোকজন তাকে দারুন পছন্দ করে।কারন বাড়ির বউ হিসেবে সে খুব নিষ্ঠার সাথে তার কর্তব্য গুলো পালন করে গেছে।কারও যত্নের কোন ত্রুটি করেনি।কিন্তু সে কি সুখী?

যে মানুষটার সাথে তার বিয়ে হয়েছে তাকে কি সে কখনও ভালবাসতে পেরেছে?ভালবাসা কি?ভালবাসা কি সেটা কখনও জানতে চায়নি সুলতানা।ভালবাসার কথা মনে হলে তার শুধু কেবল বহু বছর আগের কিছু কথা মনে পড়ে যখন সে একটা কাগজের জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করত।যখন সে একজন কে একনজর দেখার জন্য পাগল হয়ে যেত।এছাড়া ভালবাসা বলে আর কিছু আছে বলে মনে হয়না তার।যে মানুষটির সাথে এত বছর একই ছাদের নীচে,একই বিছানায় পাশাপাশি থাকল তার প্রতি যেটা আছে সেটা কি?ভালবাসা না দায়বদ্ধতা?নাকি আদৌ কিছু নেই?

দায়িত্ব পালন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে সুলতানা।একটু শান্তি দরকার।যন্ত্র হয়ে থাকতে পারছেনা আর সে।সারাদিন বোনদের সাথে ফোনে কথা বলেই কাটে সুলতানার।অনেক কষ্টে পুরানো বন্ধু বান্ধবদের ফোন নাম্বার যোগাড় করেছে।সবার সাথে কথা হয়েছে,কত বদলে গেছে সবাই।পুরানো দিনের কথা মনে করে সুলতানা যেন সেই ছোট্ট গ্রামে হারিয়ে গিয়েছিল,যেখানে বাড়ির পিছন দিয়ে চলে গেছে সরু খাল।যতগুলো ফোন নম্বর পেয়েছে সব গুলোতেই ফোন করেছে সে,একটা ছাড়া।সেই নাম্বারটিতেই ফোন করল এখন,
“হ্যালো।কে কামাল?”


আমার বন্ধু সংখ্যা খুব সীমিত।আমি কেন জানি মানুষের সাথে খুব একটা মিশতে পারিনা।কেন পারিনা কে জানে?আমার একমাত্র ভাল বন্ধু হল বই।তবে ইদানীং এই বন্ধুর সংগতেও আমি খুব একটা আনন্দ পাচ্ছিনা।আনন্দ?হুম সেই জিনিসটা যে আসলে কেমন মনে পড়ছেনা।অল্প যে কজন বন্ধু আছে তাদের সবাই জানেনা যে আমাকে যিনি জন্ম দিয়েছেন,যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম তিনি রাক্ষুসি হয়ে গেছেন।তার রাক্ষুসি হবার খবরটা কি আমি বন্ধুদের বলব কিনা,কিংবা বললেও কিভাবে বলব সেটা বুঝে উঠতে পারছিনা।রাক্ষুসির ছেলে হিসেবে তারা আমাকে পরিত্যাগ করে কিনা সেটাও একটা চিন্তার বিষয়।তবে হ্যা কেউ আমাকে পরিত্যাগ করলে আমার কিছু যায় আসেনা।আসলে আমার কিছুতেই কিছু যায় আসেনা।আমাদের এখন পারতপক্ষে কোন আত্মীয় স্বজন নেই।যেসকল জোকার আত্মীয়রা শুরুতে এসেছিল,তারা এখন আর আসেনা।আর এখন যদি আমার বন্ধুরাও আমাকে পরিত্যাগ করে আমার কিছু মনে হবেনা।বরং আমি পরিপূর্ণ স্বাধীন হব!

আসলে সেই নারী যিনি আমাকে জন্ম দিয়েছেন,যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম তিনি যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন,তখন আর সবাই কোন ছাড়।আমি খুব চমৎকার একটা জিনিস শিখেছি,মানুষ নামক যে প্রানীটি পৃথীবিতে রাজত্ব করছে সেটি আসলে খুবই অসহায় এবং নিঃসংগ একটি প্রানী।সে একদম একা।একদমই একা।

সুলতানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছেলেকে সব বলবে।ছেলের সাথে তার সম্পর্ক বন্ধুর মত।কলেজে পড়ুয়া ছেলেটা এখনও তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে!কোলে শুয়ে শুয়ে গল্প করে।ছেলে তাকে নিশ্চয়ই বুঝবে।আর তার ছেলে যে তাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না,এটাও সে নিশ্চিত।
ছেলেটি আজও তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে।সেই বলল,”মা তুমি ইদানীং বাবার সাথে ঝগড়া করছ কেন?আগে তো করতেনা।বাবা কিছু বললেও চুপ করে থাকতে!”
সুলতানা বুঝল এখনই বলার উপযুক্ত সময়।বলল,”বাবা আমি তোমাকে কিছু কথা বলব।এই কথা তুমি আর কাউকে বলবেনা।মনে রেখ এছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই।না হলে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে।”


আমি আসলে অনেক বড়।আসলে মানুষের শারিরীক বয়সটা আসল না,অনেক সময় এমন অনেক অভিজ্ঞতা হয় যা মানসিক বয়সটা অনেক বাড়িয়ে দেয়।ছোট একটা মানুষের মধ্যে তখন বয়স্ক একজন মানুষ বসে থাকে।সেই রাতে আমার বয়স তেমনি অনেক বেড়ে গিয়েছিল যখন সেই নারী যিনি আমাকে জন্ম দিয়েছেন যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম তিনি আমাকে তার জীবনের কাহিনী শুনালেন।অবশেষে জানালেন তার সিদ্ধান্ত।তিনি আর থাকতে পারছেন না।অতীতের সেই কাগজ গুলো তাকে আবার নাড়া দিয়ে গেছে।ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে সেই বহু বছর আগে।সে আর তখন নারী ছিলনা,হয়ে গিয়েছিল চঞ্চল কিশোরী।সেই কিশোরীর থেকে আমার বয়স বেশি ছিল,কিশোরী আমাকে ধরে কাদছিল,ক্ষমা চাইছিল-কিসের জন্য সেটা আমি বুঝিনি। কিশোরী আমার কাছে পরামর্শ চাইছিল।কিশোরী বালিকা যেমন বাবার কাছে আবদার করে,তেমনি সেই নারী রূপ কিশোরীও আমার থেকে আবদার করছিল-যেন তাকে আমি ক্ষমা করে দেই।

আমি বুঝতে পারলাম আমার বয়স হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেছে।আমি এখন আর কলেজে পড়া কোন ছেলে নই,আমি প্রাপ্ত বয়স্ক একজন মানুষ যে কিনা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে।আমার কাছে এই কিশোরী জানতে চাইছে,সে তার প্রেমিকের কাছে যেতে চায়,যাবে কিনা।যদি যায় তার ছেলে তার সাথে থাকবে কিনা?আবার ছোটদের মত শর্তও জুড়ে দেয় সে-না যেতে পারলে আমি আত্মহত্যা করব!

আমি তখন বড় মানুষ,সিদ্ধান্ত নিতে আমার এতটুকু দেরি হলনা।বয়স্ক পিতা যখন দেখে মেয়ের আবদার মেনে না নিলে মেয়েকে বাচানোই যাবেনা তখন স্নেহার্দ্র পিতা মেয়ের কথা মেনে নেয়-তবে সমর্থন করেনা।সেই রাতে আমি বাবা,আর যে নারী আমাকে জন্ম দিয়েছেন যাকে আমি মা বলে ডাকি কিংবা ডাকতাম-সে ছিল আমার কন্যা!

আমি তাকে বললাম,”তোমার যেটা ভাল মনে হয় তুমি সেটাই করবে।তবে আমি তোমার সাথে যেতে পারবনা।”

আমার কন্যা কিছু বলল না,শুধু চোখের পানি ফেলল।ফেলুক,কান্নার দরকার আছে।কান্না জিনিসটা না থাকলে যে কি হত সেটা আমি এই কদিনে বুঝেছি।

১০

জীবন একটা চমৎকার বিষয়।এই বিশাল মহাবিশ্বের বয়স কোটি কোটি বছর।সেই সময়ের মধ্যে কেউ যদি একশ বছরও বাচে সেটাও খুব কমই হবে।তাই জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত মূল্যবান।যে যার জীবনকে নিয়ে মহাবিশ্বের পথে নিরন্তর যাত্রা করে যাচ্ছে।কেমন আছে সুলতানা,কিংবা কেমন আছে তার ছেল?কি হল শেষ পর্যন্ত তাদের জীবনে?সেটা জানা কি খুব দরকার?

থাকুক না তারা তাদের মত।তারা বেচে আছে,এটাই সব থেকে বড় কথা।বেচে থাকাটা সব সময়ই বড় আনন্দের।বড়ই আনন্দের।

৬ thoughts on “রাক্ষুসি

  1. বর্ননাশৈলী ভাল লেগেছে…. তবে
    বর্ননাশৈলী ভাল লেগেছে…. তবে আরও সূক্ষ হলে বেশী ভাল লাগত…..

  2. ‘অণুগল্প’ !!!!!!!!!!!!
    স্ক্রল

    ‘অণুগল্প’ !!!!!!!!!!!!
    স্ক্রল করতে গিয়ে ভাবলাম মাউসের প্রবলেম। ভাই, পুরোটা পড়তে পারিনি, সময় হলে পড়ে নেব। এই সাইজের পোষ্টগুলো পর্যায়ক্রমে ২/৩ পর্বে পোষ্ট দিলে পাঠকদের জন্য সুবিধা হয়। ভেবে দেখবেন আশা করি।

  3. ভালো লাগলো। বড় লেখা হলেও পড়তে
    ভালো লাগলো। বড় লেখা হলেও পড়তে ক্লান্তি লাগেনি। শুভকামনা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *