মা, তুমি আমার জন্য হাজার বছর বেঁচে থাক

“মা কথাটি ছোট্ট অতি/ কিন্তু যেন ভাই/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভূবনে নাই’’ । কবির এ অভিব্যক্তি পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে চিরন্তন সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে । মাত্র একটি অক্ষরে গঠিত শব্দ ‘মা’ । যে শব্দটি বিশ্বের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত শক্তিশালী শব্দ । ভাষাভেদে এক এক জনপদের মানুষ জন্মদাত্রীকে ভিন্ন ভঙ্গিতে প্রকাশ করলেও এই মা, ম্যাম, কিংবা মাদার-ই বিশ্বের বুকে একটি শিশুর মুখ থেকে আওড়ানো সর্বপ্রথম ভাষা । কত যে মধু এই নামে । একবার ডাকলে আরেকবার ডাকতে ইচ্ছা করে । যত বার ডাকা হউক না কেন কোন ক্লান্তি নাই । পৃথিবীতে শিশু আগমন করে আস্তে আস্তে যখন বুঝতে শুরু করে তখন সর্বপ্রথম তার মাকেই বুঝতে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করে । এ যেন এক অতি আশ্চার্যের ব্যাপার । সকলের কোলে গিয়েও যখন একটি শিশুর কান্নাকাটি বন্ধ হয় না তখন তার মায়ের বুকে আশ্রয় পেলেই শিশুটি কত শান্ত হয়ে যায় তা ব্যক্তি মাত্রই জানেন । মা তো মা-ই । তার কোন তুলনা হয় না । শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তার অবুঝ শিশুকে দুধ পান করাতে কিংবা অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে ভোলেন না । শৈশব, কৈশোর, তারুন্য, যৌবন এমনকি বার্ধক্যেও একজন মা তার সন্তানকে বুকে আগলে রাখে, রাখতে চেষ্টা করেন । পৃথিবীর সকল বিচারালয়েও যদি সন্তানকে দোষী প্রমানিত করে তবুও সেই দোষী সন্তানও মায়ের কাছে বিনা বিচারে নির্দোষ । ছোট বেলার একমাত্র আশ্রয়স্থল, যে মানুষটি একটু অনাদর করলে পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হত প্রতিটি মানুষ সেই মা দিনে দিনে সন্তানদের কাছ থেকে অবহেলা পাচ্ছে । যা সত্যিকারার্থেই মর্মান্তিক, লজ্জার । মানুষ দিনে দিনে যান্ত্রিক চরিত্রের হয়ে যাওয়ার কারনে সন্তানদের যৌবনে বৃদ্ধা মাকে আশ্রয় নিতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে কিংবা ঘরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট কোঠাটিতে । যে মা সন্তানের আশ্রয়হীন সময়ের একমাত্র অবলম্বন ছিল সেই দুর্বল সন্তানটি সবল হওয়ার পর বৃদ্ধা মাকে বোঝা মনে করছে । এর চেয়ে দূর্ভাগ্যের আর কিইবা থাকতে পারে ।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪৬টি দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্ব ‘মা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয় । এটি এমন একটি সম্মান প্রদর্শন দিবস যে দিবসে মায়ের সম্মানে এবং মাতৃত্ব, মাতৃক ঋণপত্র এবং সমাজে মায়েদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি দেয়া হয় । ধারনা করা হয়, এ দিনটির সূত্রপাত প্রাচীন গ্রীসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে । যেখানে গ্রিক দেবতাদের মধ্যে এক বিশিষ্ট দেবী ‘সিবেল’-এর উদ্দেশ্যে পালন করা হত একটি উৎসব । তবে আমাদের দেশসহ অন্যান্য দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারে যে ‘আন্তর্জাতিক মা দিবস’ পালন করা হয় তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা ১৯১২ সালে । ১৯১২ সালে ‘আনা জার্ভিস’ স্থাপন করেন ‘মাদার’স ডে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসেশিয়েশন’ ( আন্তর্জাতিক মা দিবস সমিতি) । আমাদের দেশের বিশ্ব মা দিবসে সরকারী ছুটি পালন না করা হলেও আমেরিকা এ দিনটিকে সরকারী ছুটি ঘোষণা করে এবং যথাযোগ্য মর্যাদায় মা দিবসের অনুষ্ঠান সূচি পালন করে । যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছুটির দিনটিকেই অন্যান্য দেশ এবং সংস্কৃতি একরূপে গ্রহণ করে সেহেতু যুক্তরাজ্যতে মাদারিং সানডে বা গ্রিসের মন্দিরে যিশুর প্রাচীনপন্থী পুজার্চনার মত মাতৃত্বের সম্মানে বিদ্যমান অনুষ্ঠানগুলির সাথে দেওয়ার জন্য তারিখটিকে পাল্টে দেওয়া হয় । তবে উল্লেখ্য যে, যে সকল দেশ আন্তর্জাতিক মা দিবস পালন করে না তারা ৮ই মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবসে’ মা দিবসের অনুরূপ কতগুলি কার্য সম্পাদন করে ।

‘‘দেখিলে মায়ের মূখ/মুদে যায় সব দুঃখ’ । সন্তানের প্রতি মায়ের এবং মায়ের প্রতি সন্তানের যতটুকু ভালবাসা সৃষ্টি হয় বিশ্বের অন্য জীবের প্রতি এতখানি ভালবাসা সৃষ্টি হয় না । মায়ের ঋণ শোধ করা আদৌ সম্ভব নয় । বিশ্বের সকল প্রচলিত ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম বিশ্বের বুকে মাকে সবচেয়ে মর্যাদাবান বলে উল্লেখ করেছে । ইসলাম ধর্মে আরও বলা হয়েছে “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত” । এত মর্যাদা সম্পন্ন মায়ের সাথেও মানুষ বেয়াদবি করতে শুরু করেছে । বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে এরকম কিছু জঘন্য ঘটনা । কোন কোন কুলাঙ্গার সন্তান স্ত্রীর প্ররোচনায় কিংবা মদ্যপ হয়ে জীবনদাত্রী মায়ের গায়ে হাত তুলছে । মায়ের বার্ধক্যে তাকে ঠিকমত ভরণ পোষণ করছে না । যা নিয়ে মাকে মাঝে মাঝে আদালতে যেতেও দেখা যায় । যে মা সন্তানকে শীতের রাতে বুকের মধ্যখানে শুইয়ে রেখে নিজে সন্তানের প্রস্রাবের মধ্যে শুয়ে রাত কাটিয়েছে, হাটতে এবং কথা বলাতে শিখিয়েছে সেই মায়ের সাথে যারা অন্যায় আচরণ করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে । হাদিসে বলা হয়েছে ‘মা তোমার জন্য জান্নাত, জাহান্নাম উভয়ই” । অর্থ্যাৎ তোমার মা যদি তোমার প্রতি খুশি থাকে তবে তুমি জান্নাতী আর যদি অখুশি থাকে তবে জাহান্নামী ।

মা ! তোমার ঋণ কেমনে শোধ করব । পৃথিবীর সকল দ্বার থেকে নিরাশ হলেও তুমি ছিলে আমার নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল । সবার কাছ থেকে শাস্তি পেলেও তোমার কোলে ফিরে এসে পেয়েছি চরম প্রশান্তি । তুমি ছাড়া আমার অস্তিত্ত্ব কল্পনাই করতে পারি না । এ শুধু আমার মা দিবসের কথা নয় বরং ৩৬৫ দিনের, গোটা জীবনের কথা । তুমি থাকবেনা আর আমি থাকতে পারব এটা ভাবতেই পারি না । তুমি চলে গেলে কে আমার অগোছালো জীবনটাকে গুছিয়ে দেবে বলতে পারো মা ? তুমি আরও হাজার বছর বেঁচে থাক শুধু আমার জন্য । আল্লাহ আমার জন্য তোমার দোয়া নিশ্চিত কবুল করতে পারলে কেন তোমার জন্য আমার দোয়া কেন কবুল করবেন না ? ছোট বেলা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তুমি আমার জন্য যা করেছ তার ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারব না জানি তবুও তার কিছু অংশ যেন পূরণ করতে পারি । মহান স্রষ্টা যেন আমাকে সে তাওফিক দান করেন ।

যারা মাকে অবহেলা করো তারা সাবধান হও । মাকে ভালবাসার জন্য, তাকে মর্যাদা দেয়ার জন্য কোন দিবসের প্রয়োজন নেই । মায়ের জন্য দিবস হবে বছরের ৩৬৫ দিন, জীবনের সর্ব সময় । মায়ের আদর, স্নেহ, মমতা অমূল্য । একজন সন্তানের পায়ের পাতা থেকে শুরু করে চুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত, জীবনের প্রারম্ভ থেকে শুরু করে মৃত্যু দিন পর্যন্ত সবটাই মায়ের । সুতরাং বিশ্ব মা দিবসে শপথ করি, আমাদের যাদের মা বেঁচে আছেন তারা যেন তাদের জীবনের বাকী দিনগুলোতে আমার কোন কাজে কষ্ট পেয়ে ‘উহ’ শব্দ পর্যন্ত বলতে না পারেন এবং অতীতে তাদের সাথে যদি কোন অন্যায় আচরণ করে থাকি তবে তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করি । তিনি দয়ার সাগর । তিনি অবশ্যই আমাদেরকে ক্ষমা করে বুকে টেনে নিবেন । আমাদের জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করবেন । আর যাদের মা বেঁচে নেই তারা যেন মহান স্রষ্টার কাছে প্রার্থণা করে বলি, “হে আমার প্রতিপালক ! আমার মা যেমনিভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন পালন করেছে তেমনিভাবে তুমিও তাকে লালন পালন কর” ।

রাজু আহমেদ । কলাম লেখক ।
raju69mthbaria@gmail.com

৩ thoughts on “মা, তুমি আমার জন্য হাজার বছর বেঁচে থাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *