‘আমি কোথায় পাব তারে’ থেকে ‘আমার সোনার বাংলা’

আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জাতীয় সঙ্গীতটি ১৯৭৫ সালের পর থেকেই নানাবিধ বিরোধিতার সম্মুখিন হচ্ছে কখনো ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কাছ থেকে–কখনো ছদ্মপ্রগতিশীলদের কাছ থেকে। এই বিরোধিতারস্বরূপটি দেখার চেষ্টা করা হয়েছে এই রচনায়।

গগনে গগনে আপনার মনে কী খেলা তব।
তুমি কত বেশে নিমেষে নিমেষে নিতুই নব।।


আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জাতীয় সঙ্গীতটি ১৯৭৫ সালের পর থেকেই নানাবিধ বিরোধিতার সম্মুখিন হচ্ছে কখনো ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কাছ থেকে–কখনো ছদ্মপ্রগতিশীলদের কাছ থেকে। এই বিরোধিতারস্বরূপটি দেখার চেষ্টা করা হয়েছে এই রচনায়।

গগনে গগনে আপনার মনে কী খেলা তব।
তুমি কত বেশে নিমেষে নিমেষে নিতুই নব।।

নাম তার গগন দাস। বাড়ি কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। আড়পাড়া গ্রামের এক কায়স্থ পরিবারে জন্ম উনিশ শতকের মাঝামাঝি।
তার বাবা-মা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে কিরণ চন্দ্র দাস নামে গগনের এক ছেলের নাম জানা যায়। এইটুকু গগন-কথা।

গবেষক প্রফেসর ড. আবুল আহ্সান চৌধুরী রবীন্দ্র উত্তরসূরী গ্রন্থে জানাচ্ছেন– দুই যুগ আগেও গগনের ভিটার অস্তিত্ব ও ফলের বাগানের সাদৃশ্য ছিল। লোকমুখে জানতে পারা যায় যে, গগন হরকরা’র একটি বড় ফলের বাগান ছিল। উল্লেখ্য যে, গগনের বাস্তুভিটায় আসামদ্দি নামক একজন কৃষক বাড়ি করে থাকতেন এবং সেই বাড়িটি আজও ‘দাসের ভিটা’ নামে পরিচিত সে সময় দাসেরা মণ্ডল নামেও পরিচিত ছিল।

শিলাইদহের শচীন্দ্রনাথ অধিকারী লিখেছেন– গগন সামান্য শিক্ষা-দীক্ষায় পারদর্শী ছিলেন এবং তার ফলশ্রুতিতেই তৎকালীন শিলাইদহের ডাক ঘরের ডাক হরকরা’র চাকুরি পেয়েছিলেন। গাঁয়ে গাঁয়ে চিঠি বিলি করতেন। আর করতেন গান। তিনি শিলাইদহে ‘সখীসংবাদের’ গানে এমন করুণ আখর লাগিয়ে গাইতেন যে, শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে সে গান শুনতেন। গগন সম্পর্কে পণ্ডিত ক্ষিতি মোহন সেন শাস্ত্রি বলেছেন: লালন-এর শীর্ষ ধারার একজন ছিলেন রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের ডাক হরকরা–যাঁর নাম গগন। রবীন্দ্রনাথ গগনকে সবার মাঝে বিভিন্ন ভাবে পরিচিত ও বিখ্যাত করে যথাসাধ্য মূল্যায়ন করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ থেকে ১৯০১ সাল বাংলাদেশের শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে জমিদারী দেখাশুনা করতে নিয়মিত যেতেন। তখন শিলাইদহে তাঁর সঙ্গে গগনের পরিচয় হয়েছিল। গগণ তাকে গান গেয়ে শোনাতেন।

শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে গগন হরকরা, গোঁসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, গোঁসাই রামলাল এবং লালনের অজস্র শিষ্য, প্র-শিষ্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি বাউল-ফকিরদের গান শুনে আপ্লুত – নিজে শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া অঞ্চল হতে অনেক বাউল গান সংগ্রহ ও প্রচার করেছেন। তারপরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সেগুলো প্রচার করার ব্যবস্থা করেন। উদ্দেশ্য একটাই-যাতে- সুধী সমাজের মধ্যে বাংলাদেশের বাউল গান সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে।

অধ্যাপক মনসুরউদ্দীনের হারামণির গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাত-সারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে বাউলের সুর ও বাণী কোন্‌-এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে,তখন আমার নবীন বয়স, শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল–

কোথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে!
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে

গগন হরকরার গানটির পূর্ণপাঠ :
আমি কোথায় পাব তারে

আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে –
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হত খুশি দেখতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই অনল কেমন করে
মরি হায় হায় রে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
ওরে দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগৎ সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে।
মরি হায় হায় রে –
ও সে না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষ্যে মন চুরি করে।
কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে –
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায় হায় রে –
ও সে মানুষের উদ্দিশ যদি জানুস কৃপা করে
আমার সুহৃদ হয়ে ব্যথায় ব্যথিত।

রবীন্দ্রনাথ গগন হরকরার এই ‘কোথায় পাব তারে আমার মনে মানুষ যে রে’ গানটি বিষয়ে আরও লিখেছেন, কথা নিতান্ত সহজ, কিন্তু সুরের যোগে এর অর্থ অপূর্ব জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। এই কথাটিই উপনিষদের ভাষায় শোনা গিয়েছে : তং বেদ্যং পুরুষং বেদ মা বো মৃত্যুঃ পরিব্যথাঃ। যাঁকে জানবার সেই পুরুষকেই জানো,নইলে যে মরণবেদনা। অপণ্ডিতের মুখে এই কথাটিই শুনলুম তার গেঁয়ো সুরে সহজ ভাষায়–যাঁকে সকলের চেয়ে জানবার তাঁকেই সকলের চেয়ে না-জানবার বেদনা–অন্ধকারে মাকে দেখতে পাচ্ছে না যে শিশু তারই কান্নার সুর–তার কণ্ঠে বেজে উঠেছে। ‘অন্তরতর যদয়মাত্মা’ উপনিষদের এই বাণী এদের মুখে যখন ‘মনের মানুষ’ বলে শুনলুম, আমার মনে বড়ো বিস্ময় লেগেছিল। এর অনেক কাল পরে ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের অমূল্য সঞ্চয়ের থেকে এমন বাউলের গান শুনেছি, ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলে না–তাতে যেমন জ্ঞানের তত্ত্ব তেমনি কাব্যরচনা, তেমনি ভক্তির রস মিশেছে। লোকসাহিত্যে এমন অপূর্বতা আর কোথাও পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করি নে।

রবীন্দ্র উত্তরসূরিতে প্রফেসর ড. আবুল আহ্সান চৌধুরী লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী সরলা দেবী (১৮৭২-১৯৪৫). ‘‘ভারতী’’ পত্রিকায় (ভাদ্র-১৩০২) গগনের কয়েকটি গান সংগ্রহ ও প্রকাশ করেছিলেন। সরলা দেবী উক্ত প্রবন্ধের শেষ অংশে আবেদন করেছিলেন যে, ‘‘প্রেমিক গগনের ভক্ত জীবনীর বিবরণ সংগ্রহ করিয়া কেহ ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশার্থে পাঠাইয়া দিলে আমাদের কাছে বিশেষ কৃতজ্ঞতা ভাজন হইবেন।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা-প্রবন্ধে গগনের গানের কথা ও গগনের নাম উল্লেখ করেছেন একাধিকবার। রবীন্দ্র সংগৃহীত গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ এই গানটি দিয়েই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে ‘হারামণি’ বিভাগের (বৈশাখ- ১৩২২) সূচনা হয়েছিল। শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ যেমন সাঁইজি লালন কর্তৃক প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং লালনের পরেই প্রভাবিত হয়েছিলেন গগন হরকরা কর্তৃক। তাঁর মনে ধর্ম সম্পর্কে যে নতুন ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল, তারই সমর্থন তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন বাউলদের গানে। এমনকি আজীবন লালিত ঔপনিষদিক দর্শনের সঙ্গেও তিনি এ সময় থেকে বাউলদের একটা সমন্বয় ঘটাতে চেষ্টা করেছিলেন। যে সত্যের বাণী তিনি উপনিষদের শ্লোকে শুনতে পেয়েছিলেন, তার প্রতিধ্বনি শুনতে পেলেন বাউল গানে। গগনের ‘আমি কোথায় পাব তারে’ এই গানের সুরে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন ‘‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’’।. সরলা দেবী ইতিপূর্বে শতগান (বৈশাখ ১৩০৭) এ মূল গানটির স্বরলিপি প্রকাশ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনএকবার যদি আমাদের বাউলের সুরগুলি আলোচনা করিয়া দেখি তবে দেখিতে পাইব যে, তাহাতে আমাদের সংগীতের মূল আদর্শটাও বজায় আছে, অথচ সেই সুরগুলা স্বাধীন। ক্ষণে ক্ষণে এ রাগিণী, ও রাগিণীর আভাস পাই, কিন্তু ধরিতে পারা যায় না। অনেক কীর্তন ও বাউলের সুর বৈঠকী গানের একেবারে গা ঘেঁষিয়া গিয়াও তাহাকে স্পর্শ করে না। ওস্তাদের আইন অনুসারে এটা অপরাধ। কিন্তু বাউলের সুর যে একঘরে, রাগরাগিণী যতই চোখ রাঙাক সে কিসের কেয়ার করে! এই সুরগুলিকে কোনো রাগকৌলীন্যের জাতের কোঠায় ফেলা যায় না বটে, তবু এদের জাতির পরিচয় সম্বন্ধে ভুল হয় না–স্পষ্ট বোঝা যায় এ আমাদের দেশেরই সুর, বিলিতি সুর নয়।

১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ফালগুনী নাটক রচনা করে সেখানে অন্ধ বাউল চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯১৬ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের একটি ছবি আঁকেন। ছবিটিতে দেখা যায় বাউল রবীন্দ্রনাথ একতারা হাতে বিভোর হয়ে নাচছেন।

দুই.
আমার সোনার বাংলা

আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গানটি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় গীত হয়। প্রশান্ত পাল রবিজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন, ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথ-রচিত নূতন স্বদেশী গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ (দ্রষ্টব্য গীত ১।২৪৩; স্ব ৪৬) নিয়ে কলকাতা উত্তাল হয়ে পড়েছে। গানটির পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। রচনার তারিখও জানা নেই। সত্যেন রায় লিখেছেন: বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ৭ আগস্ট (১৯০৫ খৃ:) কলিকাতার টাউন হলে যে সভা হয়েছিল, সেই উপলক্ষ্যে… রবীন্দ্রনাথ নূতন সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাউল সুরে গীত হয়েছিল।. …১৯০৫ খৃ: ৭ই সেপ্টেম্বর (১৩১২ সনের ২২শে ভাদ্র). তারিখের ‘সঞ্জীবনী পত্রিকায় এই গানটি রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরে প্রথম প্রকাশিত হয়। সঞ্জীবনীর উক্ত সংখ্যাটি দেখার আমরা সুযোগ পাইনি, গানটি রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত আশ্বিন-সংখ্যা বঙ্গদর্শন-এ (পৃষ্ঠা ২৪৭-৪৮) মুদ্রিত হয়।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বঙ্গের মানুষ তাদের আত্মপরিচয় খুঁজে পান। সে সময়ে নতুন করে বাঙালির ভাবসম্পদ পূর্ববঙ্গের মানুষের জীবনানুসঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সে সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথ বাঙালির চলার পথের সঙ্গী। আইয়ুব খানের কঠিন মার্শাল লয়ের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়। ফলে তখন সারাদেশে সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমেই বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রা্মের পরম্পরাটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গানটি তখন থেকেই মানুষের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করে। চলচ্চিত্রকার শহীদ জহির রায়হান ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার বিখ্যাত ‘জীবন থেকে নেওয়া’ কাহিনীচিত্রে এই গানের চলচ্চিত্রায়ন করেন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ গঠিত হয় স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ। পরে ৩ মার্চ তারিখে পল্টন ময়দানে ঘোষিত ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এই গান প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পরিবেশিত হতো। স্বাধীনতার পর সাংবিধানিকভাবে .(অনুচ্ছেদ ৪.১). ‘আমার সোনার বাংলা’ .গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত রূপে ঘোষিত হয়। গানের প্রথম ১০ লাইন কন্ঠসঙ্গীত এবং প্রথম ৪ লাইন যন্ত্রসঙ্গীত হিসেবে পরিবেশনের বিধান রাখা হয়েছে। জাতীয় সঙ্গীতের সিগনেচার টিউন তৈরী করেন প্রয়াত সুরকার সমর দাস।

তিন.
বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বিরোধিতার স্বরূপ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে পাকিস্তানপন্থীরা বাংলাদেশের ক্ষমতায় নানা কায়দায় বহাল হয়। সে সময় থেকেই একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা দাবী তোলে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে হিন্দু রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলাকে বাতিল করা হোক।

গানটির বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ করা হয় রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রনাথ পাঠ বইটিতে। লেখক—ফরহাদ মজহার। তার অভিযোগগুলোর সার সংক্ষেপ–
১. রবীন্দ্রনাথের এই গানটি কোনো অসাধারণ গান নয়। শুধু রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই এই গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত করা হয়েছে।

২. রবীন্দ্রনাথের গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ না করে কোনো বাংলাদেশীকে দিয়েই রচনা করালে ভাল হত। কারণ পারিবারিক ও ধর্মীয় পরিচয়, মনন, দর্শন, পঠন, পাঠন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে মনোগাঠনিক প্রক্রিয়া ও প্রকাশ সচল ছিল তার সম্পৃক্তি হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে, বৌদ্ধ বা ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে নয়। সুতরাং হিন্দু রবীন্দ্রনাথের গানটিকে মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গীত করাটা একটা ঐতিহাসিক ভুল।

৩. আমার সোনার বাংলা গানটির বাংলা শব্দটির বানান রবীন্দ্রনাথ পাল্টে দিয়েছেন। কারণ বাংলা বানানটি আদিতে মুসলমানেরা বাঙ্গালা বলতেন। রবীন্দ্রনাথ মুসলমান বিরোধী ছিলেন বলে বাঙ্গালা শব্দটিকে বাংলা করে দিয়ে হিন্দুয়ানি করে দিয়েছেন। সে কারণেও গানটিকে বাতিল করা দরকার।

এই তিনটি অভিযোগে কতটুকু সারবত্তা আছে তা একটু খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

১. রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলা গানটি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের ভাব ও ভাষায় রচিত। আর সুরটিও কুষ্টিয়ার শিলাইদহের বাউল গানের থেকে নেওয়া। গানটির মধ্যে দিয়ে বাংলার শ্যামল জননী প্রকৃতির নিরাভরণ বর্ণনা দিচ্ছেন সহজ সরল মুগ্ধতায়। বানীতে প্রকাশ পাচ্ছে স্বদেশমায়ের প্রতি সন্তানের ভালবাসার নিবেদন। স্বদেশের গলায় পরানোর জন্য বিদেশী আভরণ কেনাকে তিনি ফাঁসির তুল্য বলছেন। বলছেন—স্বদেশকে স্বদেশের সম্পদে পুর্ণ করতে হবে। সে অর্থে এই গানটি শুধু বর্ণনাবহুলতা পূর্ণ নয়, আকুলতা পুর্ণও গান নয়— এ গানে স্বদেশকে রক্ষার একটি ঐক্যের সতেজ আহ্বানও আছে। সে অর্থে গানটি অসাধারণ। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতির শুধু রাজনীতিতে নয়—জীবনের সর্বত্রই জড়িয়ে আছেন। শুধু রাজনীতির কথাটি নির্দেশ করলে সংকীর্ণ ব্যাখাই করা হয়। কারণ মিছিলে মিটিংএ যেমন রবীন্দ্রনাথের গান করা হয়, আনন্দে উৎসবে, ব্যাথা বেদনায়ও রবীন্দ্রনাথ উচ্চারিত হন। তিনি প্রেমে-প্রকৃতিতে আসেন, শীতে আসেন, বর্ষায় আসেন। আলোতে আসেন। অন্ধকারেও তাকে নিয়ে পথ চলা যায়। তিনি সর্বত্র ছুঁয়ে আছেন। তাঁকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার দরকার হয় না। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু মানুষের প্রাণের মধ্যেই আরও জাগরুক হয়ে উঠেছেন।

২. রবীন্দ্রনাথকে গোড়া সাম্প্রদায়িক লোকজন হিন্দু বলে ঘোষণা করার চেষ্টা করলেও তিনি অবশ্য নিজের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে ততটা নিশ্চিত ছিলেন না। কারণ, বেশির ভাগ মানুষের মতো যে ধর্ম নিয়ে জন্মেছিলেন, সেই পারিবারিক ধর্মমত তিনি চিরকাল আঁকড়ে রাখতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ব্রাহ্ম পরিবারে। ব্রাহ্মরা একেশ্বরবাদি। হিন্দুরা তাদের অহিন্দু মনে করে। আর ব্রাহ্মরা নিজেদের হিন্দুদের চেয়ে পৃথক মনে করেছে। রবীন্দ্রনাথ কখনোই কোনো পুরণো বিশ্বাসে নিজেকে বদ্ধ রাখেননি। কোনো কিছু নিয়েই তিনি অচল ছিলেন না। গাছ যেমন প্রতি বসন্তে সজ্জিত হয় নতুন পাতায়, তিনও তেমনি নব-নব রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। নিজেকে নিরন্তর পাল্টে নিয়েছেন—নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন। কখনো নেতির দিকে তাঁর যাত্রা ছিল না। যাত্রা ছিল ইতির দিতে। প্রতিক্রয়াশীলতা নয়–প্রগতিশীলতাই তার লক্ষ্য। পুরনো বিশ্বাসকে নতুন বিশ্বাসে বদলে দিয়েছেন। তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজের সীমানা অতিক্রম করেছিলেন অল্পকালের মধ্যেই। নতুন কোনো গুরুর সন্ধান তিনি পাননি অথবা কারও কাছে তিনি দীক্ষাও গ্রহণ করেননি। তা সত্ত্বেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি ধর্মচিন্তা বদলে গেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর সূচনা হয় যখন তিনি ক্ষুদ্র জোড়াসাঁকো তথা কলকাতার সীমানা পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজের মুখোমুখি হলেন, তখন। তখন থেকেই তিনি হৃদয় প্রসারিত করে চারদিকে চেয়ে দেখলেন। তিনি সর্বমানবের মিলনের কথা ভেবেছেন। তিনি মানব ধর্মে পৌছে গিয়েছিলেন। ‘হিন্দু মুসলমান’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোনো বাঁধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে-দেশ হতভাগ্য। যে-দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে-বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। …মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেইটিকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। যে দেশে ধর্মই সেই বুদ্ধিকে পীড়িত করে রাষ্ট্রিক স্বার্থবুদ্ধি কি সে-দেশকে বাঁধতে পারে? ‘’ শেষ বেলায় রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন—মোহমুগ্ধ ধর্মবিভীষিকার চেয়ে সোজাসুজি নাস্তিকতা অনেক ভালো। ধর্মমোহ কবিতায় লেখেন—

ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,
ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।

৩. বঙ্গ নামটি রামায়ণ মহাভারতের মতো অনেক পৌরাণিক কাহিনীতে পাওয়া যায়। ফার্সি নথিতে শাহ-এ বঙ্গালিয়া বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পর্তুগীজ নথিতে বাঙ্লা নামটি পাওয়া যায়। বৃটিশ আমলে দুটো বঙ্গ ছিল। একটি পূর্ব বঙ্গ। আরেকটি পশ্চিমবঙ্গ। এই দুটো প্রদেশ মিলেই ছিল বঙ্গ।

রবীন্দ্রনাথ জমিদার হলেও তাঁর মূল কাজ আসমানদারী। কবিতার ছন্দ মেলানোর জন্য কবিতায় বঙ্গদেশ লিখলেন না। লিখলেন না বাঙ্গালাদেশ বানান। বাঙলাদেশও লিখলেন না। তিনি কবিতার ছন্দ মেলানোর জন্য যুক্তাক্ষরকে দুই মাত্রা হিসাবে গণনা করেছিলেন। তখন তিনি লক্ষ করলেন—’ঙ্গ’ অক্ষরটি যুক্তাক্ষর। ‘ঙ্গ’ থেকে যদি যদি পুরো আওয়াজ আদায় করতে হয়—তো সে এক মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সেটা ভারি মুশকিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—শব্দতত্ত্ব অনুসার লিখিব এক, আর ব্যবহার অনুসারে উচ্চারণ করিব আর, সেটা ছন্দ পড়িবার জন্য বড়ো অসুবিধা।

যেখানে যুক্ত অক্ষরেই ছন্দের আকাঙ্ক্ষা সেখানে যুক্ত অক্ষর লিখলে পাঠকের কোনো সংশয় থাকে না। পাঠক যুক্ত অক্ষর গণ্য করে সেটা পড়তে পারে। যেমন—

বাঙ্গলা দেশে জন্মেছ বলে বাঙালি নহ তুমি
সন্তান হইতে সাধনা করিলে লভিবে জন্মভূমি।।

কিন্তু যদি বাঙ্গালার মাটি বাংলার জল—লেখা হয় তাহলে কবিতাটির ছন্দ মাটি হয়। যেখানে এই পঙক্তিতে তিন মাত্রা দরকার—তখন বাঙ্গালা বা বাঙ্গলা লিখলে চার মাত্রা হয়ে যায়। কিন্তু বাঙ্গালার ঙ্গ-এর বদলে অনুস্বার ব্যবহার করে বাংলার মাটি বাংলার জল লেখা হয় তাহলে অনুস্বার থেকে তিন মাত্রাই পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ছন্দ বজায় থাকে। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটির ক্ষেত্রেও এই কারণে ঙ্গ এর বদলে অনুস্বার রেখেছেন। এখানে তিনি কোনো ধরনের মুসলমান শাসক মুগলদের বিরোধিতার জন্য করেননি। আর ব্যকরণের বিষয় হিসাবে বানান পরিবর্তিত হয়। এখানে সাম্প্রদায়িক বিভেদ খোঁজার অর্থই হল আরেকটি সাম্প্রদায়িকতার সূত্রপাত ঘটানো। রবীন্দ্রনাথ তো চিরকাল হিন্দুমুসলমানদের মিলনের কথা কথাই ভেবেছেন। কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় তার মন পীড়িত হয়ে পড়েছে। তিনি ১৩৩২ সালে রানী মহলানবিশকে এক পত্রে লিখছেন–কোথাও একটা কোনো অন্যায় উপদ্রব হলে আমার বুকের ভিতর ভারি একটা ক্ষোভ উপস্থিত হয়। এই হিন্দু-মুসলমান উৎপাতে আমার শরীরটাকে ভারি পীড়ন করচে। সে অর্থে বাংলাদেশ বানান নিয়ে এই ধরনের সাম্প্রদায়িক অভিযোগ শুভবুদ্ধিকে উৎপীড়িত করে মাত্র।

চার.
রবীন্দ্রনাথকে চোর বলা হল–

বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে আরেকটি অভিযোগ সম্প্রতি উত্তাপিত হয়েছে অন্তর্জালে। লেখা হয়েছে—রবীন্দ্রনাথ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গানটি চুরি করেছেন। শুধু সাহিত্যে নয়—বাংলা গানেও যে রবীন্দ্রনাথের অবদান মহাবৃক্ষের মত, সেই রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই অভিযোগটি মারাত্মক।

আমার সোনার বাংলা গানটির সন্ধান পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায়। বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন–রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহে যান ১১ অগ্রহায়ণ, ১২৯৬ বঙ্গাব্দ/ ২৫ নভেম্বর ১৮৮৯ সালে। সঙ্গে ছিলেন মৃণালিনী দেবী, তাঁর একজন সহচরী, বড় মেয়ে বেলা ও পুত্র রথীন্দ্রনাথ। আরও ছিলেন বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সে সময় রবীন্দ্রনাথ জমিদারী পরিচালনা করতে ব্যস্ত থাকতেন। বলেন্দ্রনাথ সিলাইদহ/ সুনাউল্লাহর-গান শীর্ষক লেখায় লিখেছেন, আমরা যখন সিলাইদহে ছিলুম তখন রোজ রোজ আমাদের বোটে সেখানকার গ্রাম্য গাইয়েদের আমদানি হত। তার মধ্যে দুজন আমাদের মার্কামারা হয়ে পড়েছিল। একজন বষ্ণম–সে কাঙ্গাল ফিকির চাঁদ ফকিরের গান গাইত। …আরেকজন আসত সুনাউল্লাহ। এক-একদিনের পাল্লায় তার দুআনা পয়সা বরাদ্দ ছিল। … নিয়মিত বরাদ্দ ছাড়াও কাকীমার দানশীলতায় তাঁর একখানি সাড়ি এবং তার সহচরীর ফসফরিক সালসার একটা খালি বোতল লাভ হয়েছিল।

বলেন্দ্রনাথ সে সময় সুনাউল্লাহর মুখ থেকে শোনা ১২টি গান খাতায় নকল করে রেখেছেন। ৪ ও ৭ সংখ্যক গানের পাশে মার্জিনে লেখা যথাক্রমে ২৩শে ও ২৫ শে অগ্রাহয়ণ ‘৯৬–অনুমান করা যায় অন্তত এই দুটি গান উক্ত তারিখগুলিতে শুনেছিলেন। এর মধ্যে ২ সংখ্যক গানের রচয়িতা গগন মণ্ডল, বলেন্দ্রনাথ তার নামের পাশে ব্রাকেটে গগন মণ্ডলের পরিচয় লিখেছিলেন–সিলাইদহের ডাক হরকরা। এই গগণহরকরা ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যেরে’ গানটি রবীন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল, এর সুর অবলম্বনে তার বিখ্যাত স্বদেশী সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ রচিত হয়।

বলেন্দ্রনাথ রবিঠাকুরের স্নেহের পাত্র ছিলেন। তাকে দিয়েই শান্তিনিকতনের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেছিলেন খসড়টি। বলেন্দ্রনাথ অকালে মারা যান। বলেন্দ্রনাথ গগন হরকরার গানটির কথা এবং রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা রচনার ইতিহাসটি বলছেন। এখানে কোনো তথ্যই লুকানো হয়নি। রাহাজানি করলে গোপন করার বিষয় থাকে। সেটা তো করা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই গানটির সুর কোথা থেকে নিয়েছেন–তা অকুণ্ঠ চিত্তে বলেছেন। সেগুলো ঠাকুরবাড়ির লোকজনই গেয়েছেন। লালন করেছেন। মূল গান এবং তার প্রভাবে সৃষ্ট গান–সবই রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় গীত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কখনো কোথাও বলেছেন–আমার সোনার বাংলা গানটির তাঁর নিজে সুরে করা।

সঙ্গীতের বিষয়টিই সেকালে এরকম ছিল। রজনীকান্তের কোনো কোনো গান আছে–যেগুলো রবীন্দ্রনাথের গানের সুরকে হুবহু নেওয়া হয়েছে। সেগুলো তিনি রবীন্দ্রনাথকেও গেয়ে শুনিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ শুনে তারিফ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ, ডিএল রায়, অতুল প্রসাদ, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায় রামপ্রসাদের সুর থেকে গান করেছেন। নজরুল তার গজল গানের সুরগুলো পারস্য গজল থেকে নিয়েছেন। সেগুলোকে কেউ রাহাজানি বলেনি। শ্যামা সঙ্গীতের কথাই ধরা যাক। শ্যামা সঙ্গীতের সুরের একটা ঘরানা আছে। লক্ষ করলেই বোঝা যায়– একই সুরে বহু গীতিকার সাধক তাঁদের নিজেদের কথা বসিয়েছেন। কাজী নজরুলইসলামের ২/৩ টা সুরে ভিন্ন বাণী বসিয়ে গান বেঁধেছেন অতুল প্রসাদ। ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের একি গানে বাণী বদল করে একি সময় গান বেঁধেছেন কাজী নজরুল আর শচীন কর্তা। বড়ে গুলাম আলীর সাহেবেরও এক গানের সুর নিয়ে নতুন গান বেঁধেছেন এরা দু’জন। মোজার্টের সুরে সরাসরি বাণী বসিয়ে গান বেঁধেছেন সলিল চৌধুরী। এমন কি রবীন্দ্রনাথও তার একই গানে দুরকম সুর ব্যবহার করেছেন। কেউ তো কখনো বলেনি–তারা চুরি বা রাহাজানি করেছেন। কীর্তনেরও বিষয়টাও তাই। রবীন্দ্রনাথ পদাবলী থেকে সুর নিয়েছেন। সেখানে কথা বসিয়েছেন। অন্য পদকর্তাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আর রবীন্দ্রনাথ দক্ষিণ ভারতীয় রাগাশ্রয়ী গানগুলোকে ব্যবহার করেছেন নিজের মত করে। তাঁর টপ্পা গানগুলোর কথাও দক্ষিণ ভারতীয় গানের সুরভাণ্ডার থেকে নিয়েছেন। তিনি কোন গান থেকে তিনি নিয়েছেন–সবই বিবৃত আছে। কিছুই লুকোনো হয়নি। জ্ঞানপ্রসাদের বাংলা রাগাশ্রয়ী গানগুলোর সঙ্গে মূল রাগগুলিও শুনে দেখলে এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সনদ পিয়ার লেখা একটি বিখ্যাত ঠুমরী গান ভেঙে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ঠুমরী গান লিখেছেন। মুল ঠুমরীটি গিরিজা দেবী গেয়েছেন। আর রবীন্দ্রনাথের গানটি নীলিমা সেনের গলায় শুনলেও এর মাধুর্য টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ এভাবেই বাংলায় ঠুমরীর রসটি সফলভাবে বাঙালির করে রবীন্দ্রনাথ সনদ পিয়ার ঠুমরীটি ভেঙে যখন খেলার সাথী গানটি করলেন, তখন কিন্তু বাঙালি ঠুমরীর আস্বাদটি নিজের করে পেল। ঠুমরী তো এক সময় দরবারী সঙ্গীত ছিল। সেখানে বাঙালির পরিচয় খুব বেশি ছিল না। রবীন্দ্রনাথ যখন এই ঠুমরীর সুরে বাণী বসালেন–দেখেন কী বিষাদ আর হাহাকার আমাদের মনে পৌঁছে দিলেন। ঠুমরীর দরবার মনের প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ল।

খেলার সাথি, বিদায়দ্বার খোলো–
এবার বিদায় দাও।
গেল যে খেলার বেলা।।
ডাকিল পথিকে দিকে বিদিকে,
ভাঙিল রে সুখমেলা।।

রবীন্দ্রনাথ শুরুই তো করেছিলেন গান রচনা এভাবে। জ্যোতিদাদা পিয়ানোতে সুর তুলতেন–আর রবি সে সুরে কথা বসাতেন। রবীন্দ্রনাথের নিজের জবানীতে এই ইতিহাস আছে। এমনকি জ্যোতিদাদা নিজেও সেভাবে অনেক গান রচনা করেছেন। আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথতো পাশ্চাত্য সঙ্গীতে কৃতবিদ্য ছিলেন। পিয়ানোতে তিনি পাশ্চাত্যগানের সুরই বাজাতেন।

জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, পিয়ানো বাজাইয়া জ্যোতিদাদা নূতন নূতন সুর তৈরি করায় মাতিয়াছিলেন। প্রত্যহই তাঁহার অঙ্গুলিনৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে সুরবর্ষণ হইতে থাকিত। আমি এবং অক্ষয়বাবু তাঁহার সেই সদ্যোজাত সুরগুলিকে কথা দিয়া দিয়া বঁধিয়া রাখিবার চেষ্টায় নিযুক্ত ছিলাম। গান বাঁধিবার শিক্ষানবিশি এইরূপে আমার আরম্ভ হইয়াছিল।

বাল্মিকীপ্রতিভা গীতিনাট্য রচনা বিষয়ে লেখেন, দেশী ও বিলেতি সুরের চর্চার মধ্যে বাল্মিকীপ্রতিভার জন্ম হইয়াছিল। ইহার সুরগুলি অধিকাংশই দেশি, কিন্তু গীতিনাট্যে তাহাকে তাহার বৈঠকি মর্যাদা হইতে অন্য ক্ষেত্রে বাহির করিয়া আনা হইয়াছে; উড়ায়া চলা যাহার ব্যবসায় তাহাকে মাটিতে দৌড় করাইবার কাজে লাগানো গিয়াছে।

তিনি গান রচনার এই পদ্ধতিকে বলেছেন সঙ্গীতের বন্ধন মোচন। এই গীতিনাট্যটির অনেকগুলি গানই বৈঠকি-গান-ভাঙা, অনেকগুলি জ্যোতিদাদার রচিত গতের সুরে বসানো এবং গুটি তিনেক গান বিলাতি সুর হইতে লওয়া। কালমৃগয়া গিতীনাট্য রচনা করেন কয়েকটি বিলেতি সুরে।

জ্যোতিদাদার সুরে রবীন্দ্রনাথের বসানো গানের তালিকা গানের বহি ও বাল্মিকীপ্রতিভার লেখা আছে। ২৫টির সন্ধান পাওয়া যায় গীতবিতানে।
এর মধ্যে–

১) অনেক দিয়েছ নাথ, ২) এত দিন পরে, সখী, ৩) এমন আর কতদিন চলে যাবে রে, ৪) ওকি সখা, মুছ আঁখি ৫) কে যেতেছিস আয় রে হেথা, ৬) খুলে দে তরণী, ৭) দাঁড়াও, মাথা খাও, ৮) দে লো সখী, দে পরাইয়ে গরে, ৯) দেশে দেশে ভ্রমি তব দুখগান গাহিয়ে, ১০) না সজনী, না, আমি জানি জানি, ১১) নিমেষের তরে শরমে বাধিল, ১২) নীরব রজনী দেখো মগ্ন জোছনায়, ১৩) প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন, ১৪) ভূল করেছিনু, ভুল ভেঙেছে, ১৫) সকলি ফুরাইল, ১৬) সখা হে, কী দিয়া আমি তুষিব তোমায়, ১৭) সখী, বল দেখি লো, ১৮) সমুখেতে বহিছে তটিনী, ১৯) সহে না যাতনা, ২০) হল না, হল না সই, ২১) হা সখি, ও আদরে, ২২) হায়রে, সেইতো বসন্ত ফিরে এল, ২৩) হাসি কেন নাই ও নয়নে, ২৪) হৃদয়ের মনি আদরিণী মোর ২৫) গেল গো–ফিরিল না, চাহিল না।

গানের বহিতে–হিন্দিগান বিশেষের রাগ-রাগিনীর অনুসরণে রচিত হয়েছে এরূপ গানের সংখ্যা ৯০/৯২টি। আরও কিছু তালিকা করেছেন রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ধন্য ইন্দিরা দেবী। পুরাতন গানকে ভাঙিয়াও রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য রচনা করেছেন। তার তালিকাও পাওয়া যায়। কোনো কিছুই গোপন করা হয় নাই। কারণ এটা গান রচনারই একটি প্রচলিত পদ্ধতি।

এবার দেখুন কালমৃগয়া ও বাল্মিকীপ্রতিভা গীতিনাট্যে কতকগুলি গানে ইংরেজি স্কচ আইরিশ সুর দেওয়া হয়েছে। তার তালিকা–

১) ও দেখবি রে ভাই, আয়রে ছুটে : The Victor of Bray,
২) তুই আয় রে কাছে আয় : The British Grenediers,
৩) ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে : Ye banks and braes.
৪) মানা না মানিলি : Go where glory wait thee,
৫) আহা আজি এ বসন্তে : Go where glory wait thee,
৬) তবে আয় সবে আয় : অজ্ঞাত
৭) কালি কালি বলো রে আজ : Nancy Lee
৮) মরি, ও কাহার বাছা : Go where glory wait thee
৯) ওহে দয়াময় :Go where glory wait thee
১০) কতবার ভেবেছিনু : Drink to me only
১১) পুরনো সেই দিনের কথা : Auld Lang Syne.

বঙ্গভঙ্গ নিয়ে যখন সারা দেশ উত্তাল তখন রবীন্দ্রনাথ ভাবের দিক থেকে ইন্ধন যুগিয়েছেন গান লিখে। বাংলার নিজস্ব বাউল সারি ভাটিয়ালি রামপ্রসাদী প্রভৃতি সুরে অনেকগুলি গান লিখেছেন। লোকপ্রচলিত বা পুরাতন বাংলা গানের সুরে রচিত গানের তালিকা–

১) এবার তোর মরা গাঙ্গে : ( মন-মাঝি সামাল সামাল)
২) যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে : (হরিনাম দিয়ে জগৎ মাতালে)
৩) আমার সোনার বাংলা : (কোথায় পাব তারে/ লেখা আছে– মূল বাউল সঙ্গীতটি শিলাইদহে গগন হরকরার নিকট পাইয়াছিলেন)
৪) বেঁধেছ প্রেমের পাশে : (চাঁচর চিকুর আধো)
৫) ক্ষমা আমায়–আমায় : (জয় জয় ব্রহ্মণ ব্রহ্মণ) ।

বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, বঙ্কিমচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার বড়াল, সুকুমার রায়, হেমলতা দেবীর ৮টি গানের সুর নিয়েও তিনি গান করেছেন। তার তালিকাও আছে-
বেদমন্ত্র ও বৌদ্ধ মন্ত্রেও তিনি সুর দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন গানের সুর নিয়েছেন বিভিন্ন ভাণ্ডার থেকে। কোথা থেকে কোন সুরটি নিয়েছেন সব তথ্যই দেওয়া আছে। গানের বাণী তার নিজের। সুর সর্বপ্রাণের। এই সুর ও বানীর মেল বন্ধনে বাংলা গানের ধারা পুষ্ট হয়েছে। মিশেছে বিশ্বসঙ্গীতের প্রবাহে।

সূত্র.
১. রবিজীবনী : প্রশান্তকুমার পাল।২. রবীন্দ্রজীবনকথা : প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। ৩. হাজার বছরের বাঙালি : গোলাম মুরশিদ। ৪. রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন : সমীর সেনগুপ্ত। ৫. রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ : পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়। ৬. আত্মজীবনী : মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ৭. ছিন্নপত্রাবলী : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ৮. রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয় : গোলাম মুরশিদ।৯. রবীন্দ্র উত্তরসূরি : প্রফেসর ড. আবুল আহ্সান চৌধুরী। ১০. কাঙাল হরিনাথ : প্রফেসর ড. আবুল আহ্সান চৌধুরী। ১১. হারামণি : মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন। ১২. সুধীর চক্রবর্তী : ব্রাত্য লোকায়ত লালন। ১৩. রবি ঠাকুর, রাহাজানি এবং রবীন্দ্র পূজারীবৃন্দ : ফরিদ আহমদ ও অভিজিৎ রায়–মুক্তমনা ব্লগ ও বিডিআর্টস।

লেখকঃ
কুলদা রায়
এমএমআর জালাল

৮ thoughts on “‘আমি কোথায় পাব তারে’ থেকে ‘আমার সোনার বাংলা’

  1. চমৎকার লেখা। আমার সোনার
    চমৎকার লেখা। আমার সোনার বাংলার সুর যে গগন হরকরার গানের সুর থেকে নেওয়া সেটা জানতাম, কিন্তু এতো তথ্য জানা ছিলোনা। ধন্যবাদ কুলদা রায়কে লেখাটির জন্য।

  2. শুধু পোস্টে কমেন্ট করতে
    শুধু পোস্টে কমেন্ট করতে অনেকদিন পরে লগিন করলাম। অসাধারণ লিখছেন।

    রবীন্দ্রনাথ চোর হইলে তামাম দুনিয়ার মানুষের মধ্যেই চৌর্য্য বৃত্তি প্রকাশ পায় :নৃত্য:

    যাউকগা, বেশ কিছু নতুন তথ্য জানলাম তার জন্যে ধন্যবাদ। এই অপবাদ গুলার সম্পর্কে জানা ছিল না আগে।

    ধন্যবাদ 🙂

  3. হুম, আরও কিছু যুক্তি আছে তার
    হুম, আরও কিছু যুক্তি আছে তার রচিত গান কেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হবে, এই টাইপের কথা বার্তা, বিভিন্ন মময় পড়া থেকে………………………………… ভাল লাগল

  4. এবার দেখুন কালমৃগয়া ও

    এবার দেখুন কালমৃগয়া ও বাল্মিকীপ্রতিভা গীতিনাট্যে কতকগুলি গানে ইংরেজি স্কচ আইরিশ সুর দেওয়া হয়েছে। তার তালিকা–

    ১) ও দেখবি রে ভাই, আয়রে ছুটে : The Victor of Bray,
    ২) তুই আয় রে কাছে আয় : The British Grenediers,
    ৩) ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে : Ye banks and braes.
    ৪) মানা না মানিলি : Go where glory wait thee,
    ৫) আহা আজি এ বসন্তে : Go where glory wait thee,
    ৬) তবে আয় সবে আয় : অজ্ঞাত
    ৭) কালি কালি বলো রে আজ : Nancy Lee
    ৮) মরি, ও কাহার বাছা : Go where glory wait thee
    ৯) ওহে দয়াময় :Go where glory wait thee
    ১০) কতবার ভেবেছিনু : Drink to me only
    ১১) পুরনো সেই দিনের কথা : Auld Lang Syne.

    — এই গানগুলো সবই আমার অত্যুন্ত প্রিয়!

  5. চমৎকার পোস্ট। এই পোস্ট পড়ার
    চমৎকার পোস্ট। এই পোস্ট পড়ার পর আশাকরি আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সুর নিয়ে অনেক বিতর্কের অবসান হবে।

  6. অসাধারণ, যৌক্তিক, তথ্যসম্বলিত
    অসাধারণ, যৌক্তিক, তথ্যসম্বলিত একটা লেখা। অনেক ভালো লাগলো। ধন্যবাদ :থাম্বসআপ:

  7. খুব কম পোস্ট-ই প্রথম থেকে শেষ
    খুব কম পোস্ট-ই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়া হয়ে ওঠে।
    বিস্বাস করুন, এই পোস্টের একটি বর্ণ-ও বাদ যায় নি।
    খুব ভাল লেগেছে………
    খুবই ভাল লেগেছে, এ রকম তথ্যসমৃদ্ধ লেখার জন্য অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি গ্রহণ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *